রাজনীতি

নানামুখী চ্যালেঞ্জে বিএনপি : দলের নিষ্ক্রিয়তায় হতাশ বিএনপির তৃণমূলের নেতাকর্মী

নিজস্ব প্রতিবেদক : ৮ জুন জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় আদালতে হাজিরা দেন বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া। সাম্প্রতিক সময়ে খালেদা জিয়াকে প্রায়ই আদালতে হাজিরা দিতে হচ্ছে। দলের শীর্ষ নেতা খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানের একাধিক মামলায় সাজা হওয়ার আশঙ্কাসহ রাজনৈতিক নানা ইস্যুতে ব্যাপক চাপে রয়েছে বিএনপি। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের আগে পরের তিন মাসের ধারাবাহিক আন্দোলনে ‘জ্বালাও-পোড়াও’-এর অভিযোগে কোণঠাসা হয়ে পড়ে দলটি। তবে ৬ষ্ঠ জাতীয় কাউন্সিলের মাধ্যমে নতুন কমিটি গঠন, নির্বাচন কমিশন পুনর্গঠন ও ভিশন-২০৩০ প্রস্তাব তুলে ধরার মাধ্যমে ‘স্বাভাবিক রাজনীতিতে’ ফেরার মুহূর্তে আরো কয়েকটি সমস্যায় নতুন করে চাপে পড়েছে বিএনপি। প্রধান সমস্যাটি হলো বিএনপি একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নেবে কি নেবে না সে প্রশ্নে। খালেদা জিয়ার জেল হলে দলের হাল কে ধরবেন, তা নিয়েও দ্বিধাদ্বন্দ্বে আছে বিএনপির নেতাকর্মীরা। জাতীয় নির্বাচনের আর ১ বছরের কিছু বেশি সময় বাকি আছে। অথচ সাংগঠনিকভাবে বিএনপি এখনো নিজেদের গুছিয়ে উঠতে পারেনি। দলের শীর্ষ নেতারা জেলায় জেলায় কমিটি গঠন করতে গিয়ে পড়েছেন বিপাকে। প্রায় প্রতি জেলায়ই উপদলীয় কোন্দল মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে। অনেক জেলা থেকে দলের শীর্ষ নেতারা কোনো কমিটি গঠন না করে সংঘর্ষের মুখে ঢাকা ফিরতে বাধ্য হয়েছেন। দলের নেতাকর্মীদের মতে, আগামী নির্বাচনে অংশ না নিলে নিবন্ধন বাতিলের খড়গ, নির্বাচনকালীন দল নিরপে সরকারের দাবি আদায়, দলের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রীয় নেতাসহ তৃণমূল কর্মীদের বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলা মোকাবিলা, দল পুনর্গঠন করতে গিয়ে জেগে ওঠা দলীয় অভ্যন্তরীণ কোন্দল কিভাবে মোকাবিলা করা হবে তা নিয়ে নতুন করে সংকটে পড়েছে দলটি। এমন অবস্থায় দলের শীর্ষ নেতৃত্বের সিদ্ধান্তহীনতায় চরম হতাশায় নিমজ্জিত হয়ে পড়েছে বিএনপির তৃণমূলের নেতাকর্মী। তবে দলের শীর্ষ নেতারা মনে করেন দেশের অন্যতম একটি বৃহৎ রাজনৈতিক দল হিসেবে সমস্যা ও প্রতিবন্ধকতা মোকাবিলা করেই ক্ষমতার বাইরে থাকা বিএনপিকে সামনের দিকে এগিয়ে যেতে হবে।
দুর্নীতির মামলায় বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার মামলার পরিণতি নিয়ে এ মুহূর্তে দলটির ভেতরে-বাইরে বেশ আলোচনা চলছে বলে জানা গেছে। মামলায় রায় হয়ে গেলে খালেদা জিয়া আগামী নির্বাচনে অংশ নিতে পারবেন কি নাÑতা নিয়ে বেশ উদ্বেগ রয়েছে দলের নেতাকর্মীদের। কারণ খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে দায়ের করা জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট ও জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট মামলা দুটির বিচার কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে। যেকোনো দিন রায় হয়ে যেতে পারে। বিএনপি নেতারা আগামী নির্বাচনের পূর্বেই এ দুটি মামলায় খালেদা জিয়ার সাজা হয়ে যেতে পারে বলে আশঙ্কায় রয়েছেন। তাদের অভিযোগ, সরকার খালেদা জিয়াকে নির্বাচন থেকে দূরে রাখতে তার মামলার কাজ দ্রুত গতিতে এগিয়ে নিচ্ছে। যদিও তারা মনে করেন, সাজা হলেও উচ্চ আদালতে আপিল করলে খালেদা জিয়া নির্বাচন করতে পারবেন। তবে শেষ পর্যন্ত কী হয়, তা নিয়ে বেশ অনিশ্চয়তায় আছেন বিএনপির তৃণমূলের নেতাকর্মীসহ দলের শীর্ষ অনেক নেতা। এমন আশঙ্কা শুধু বিএনপির নেতাকর্মীদের মধ্যেই নয়, কূটনীতিকদের মধ্যেও রয়েছে। কয়েকদিন আগে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার সঙ্গে তার বাসভবনে ঢাকায় নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত বার্নিকাটের বৈঠকেও এমন আশঙ্কার কথা উঠে এসেছে। খালেদা জিয়ার সঙ্গে দীর্ঘ বৈঠকে যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত বিএনপির কাউন্সিলসহ সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা করেছেন। এ সময় বার্নিকাট বিএনপি চেয়ারপারসনের নামে একাধিক মামলা বিচারাধীন থাকার বিষয়টি উল্লেখ করে জানতে চেয়েছেন, যদি মামলায় তিনি জেলে যান তাহলে বিএনপির নেতৃত্বের কী হবে। দলের কর্মকা- কিভাবে চলবেÑএ বিষয়েও প্রশ্ন করেন তিনি। ওয়ান-ইলেভেনের সময়ে দায়ের করা মামলায় শেখ হাসিনার সরকার খালেদা জিয়াকে ফাঁসিয়ে দিতে পারে এমন কথা দলের অভ্যন্তরেও আলোচনা হচ্ছে।
তবে মামলায় সাজা হলে খালেদা জিয়া নির্বাচন করতে পারবেন কি নাÑএ ব্যাপারে ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে দলের স্থায়ী কমিটির সিনিয়র সদস্য সাবেক আইনমন্ত্রী ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ স্বদেশ খবরকে বলেন, খালেদা জিয়ার শাস্তি হলেও নির্বাচন করতে পারবেন না, এটা ঠিক নয়। ধরে নিলাম ‘মিথ্যা মামলায়’ একটি রায়ে খালেদা জিয়ার সাজা হয়ে গেল। ওই রায়ের বিরুদ্ধে আমরা আপিল ফাইল করব। আপিলটা হলো ‘কনটিনিউশন অব দা প্রসিডিংস’। অর্থাৎ যে বিচার হয়েছে, এটা হলো সে বিচারের ধারাবাহিকতা। তখন আমরা তার জন্য ইনশাআল্লাহ জামিন নেব। বেগম খালেদা জিয়া সাজাপ্রাপ্ত হলেও নির্বাচনে সরাসরি অংশগ্রহণ করতে পারবেন। নির্বাচনে অংশ নেয়ার পাশাপাশি দল ও জোটের নেতৃত্বও দিতে পারবেন তিনি।
এদিকে দলের দ্বিতীয় ব্যক্তি সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমানের বিরুদ্ধে মুদ্রা পাচার মামলায় নিম্ন আদালতের খালাসের রায় বাতিল করে ৭ বছরের কারাদ- ও ২০ কোটি টাকার অর্থদ- দিয়েছে হাইকোর্ট। তারেক রহমান ২০০৮ সাল থেকে যুক্তরাজ্যে রয়েছেন। শেখ হাসিনা হত্যাচেষ্টাসহ দুর্নীতি, রাষ্ট্রদ্রোহ ও মানহানির অভিযোগে কয়েক ডজন মামলা রয়েছে তার বিরুদ্ধে।
এমতাবস্থায়, খালেদা জিয়া ও তারেক রহমান ছাড়া বিএনপি নির্বাচনে আসবে কি নাÑসেটিও দলে এখন বড় প্রশ্ন হয়ে দেখা দিয়েছে। দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন বর্জন করা বিএনপি আগামী নির্বাচনেও যদি অংশ না নেয়, তাহলে আইন অনুযায়ী নির্বাচন কমিশনে দলটির নিবন্ধন বাতিল হয়ে যাবে। আওয়ামী লীগের নেতারা প্রায় একযোগেই বক্তব্য দিচ্ছেন যে, একাদশ জাতীয় নির্বাচনে অংশ না নিলে বিএনপির নিবন্ধন বাতিল হবে। যদিও এেেত্র দলটির নেতারা বলছেন, বিএনপি দলীয় প্রতীকে সব ধরনের স্থানীয় নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে। সেহেতু নিবন্ধন বাতিলের কোনো আশঙ্কা নেই। দলের শীর্ষ নেতা খালেদা-তারেক সংকট ছাড়াও বিএনপি-জামায়াত সম্পর্ক ইস্যুতেও অস্পষ্টতা বিএনপির তৃণমূল নেতাকর্মীদের হতাশার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাছাড়া নির্বাচনকালীন সরকার ছাড়া শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন বর্তমান ক্ষমতাসীন সরকারের অধীনে বিএনপি একাদশ জাতীয় নির্বাচনে অংশগ্রহণ করবে কি নাÑতা নিয়েও দলের মধ্যে রয়েছে চরম সিদ্ধান্তহীনতা। তবে দলের তৃণমূল নেতাকর্মীরা একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নিতে উন্মুখ। কিন্তু খালেদা-তারেকের অংশগ্রহণ এখনো অনিশ্চিত। কেউ রয়েছেন লন্ডনে, আবার কেউ রয়েছেন কারাতঙ্কে। আর এসব অনিশ্চয়তাই বিএনপিকে হতাশায় জর্জরিত করে ফেলেছে আষ্টেপৃষ্ঠে।