প্রতিবেদন

যে কারণে ঐশীর সাজা কমে আমৃত্যু কারাদন্ড হলো

নিজস্ব প্রতিবেদক : বাবা-মাকে হত্যার অভিযোগে বিচারিক আদালতে মৃত্যুদ-প্রাপ্ত ঐশী রহমানের সাজা কমিয়ে যাবজ্জীবন কারাদ- প্রদান করেছে হাইকোর্ট। যাবজ্জীবন কারাদ-ের সঙ্গে ঐশীকে ৫ হাজার টাকা জরিমানা, অনাদায়ে আরও ৬ মাসের কারাদ- দেয়া হয়েছে। হত্যায় সহযোগিতার জন্য ঐশীর বন্ধু মিজানুর রহমানকে বিচারিক আদালতের দেয়া দুই বছরের কারাদ-ের রায় হাইকোর্টেও বহাল রাখা হয়েছে।
৫ জুন ঐশী রহমানের ডেথ রেফারেন্স (মৃত্যুদ- অনুমোদন), আপিল ও জেল আপিলের শুনানি শেষে এ রায় ঘোষণা করে আদালত। বিচারপতি জাহাঙ্গীর হোসেন সেলিম ও বিচারপতি মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর হোসেনের সমন্বয়ে গঠিত বেঞ্চ এ রায় প্রদান করে। গত ৭ মে এ বিষয়ে শুনানি শেষ হয়। সেদিন বিষয়টি রায়ের জন্য অপেমাণ (সিএভি) রাখা হয়েছিল। হাইকোর্টে এ মামলায় রাষ্ট্রপে শুনানি করেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল জহুরুল হক জহির; তার সঙ্গে ছিলেন সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেল আতিকুল হক সেলিম। অন্যদিকে ঐশীর পে ছিলেন সুজিত চ্যাটার্জি বাপ্পী।
আসামিপরে আইনজীবী সুজিত চ্যাটার্জি বাপ্পী বলেন, এ রায়ের বিরুদ্ধে আমরা আপিল করব প্রাথমিকভাবে এটাই সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। আশা করি আপিলে আমরা বেনিফিট পাব। আদালত তার রায়ে ঐশীকে কনডেম সেল থেকে সাধারণ কয়েদিদের সঙ্গে রাখারও নির্দেশ দিয়েছে। উচ্চ আদালতে না গেলেও আসামি রেয়াত পাবেন। জেল কোড অনুযায়ী প্রতি বছরই রেয়াত পাবে। এছাড়া ঐশী গ্রেপ্তার হবার পর যতদিন কারাগারে আটক রয়েছেন সেটা বাদ যাবে। উল্লেখ্য, এর আগে সুপ্রিমকোর্টের জারিকৃত এক সার্কুলারে বলা হয়েছে, আসামির মামলা বিচারাধীন থাকাবস্থায় তার কারাবাস যেকোনো প্রকার কারাদ-ে মোট দ-ের সময়কাল হতে বিয়োগ হবে।
অপরদিকে ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল জহিরুল হক জহির সাংবাদিকদের জানান, ঐশী রহমানের মৃত্যুদ-ের সাজা ৫ কারণে কমিয়ে যাবজ্জীবন কারাদ- দেয় হাইকোর্ট। এর মধ্যে রয়েছে বয়স, পারিবারিক মানসিক রোগ, বাবা-মার অবহেলা, ঘটনার দুদিনের মধ্যে আত্মসমর্পণ ও মাদকাসক্ত।
এর আগে গত ১০ এপ্রিল মানসিক অবস্থা পর্যবেণে ঐশীকে হাইকোর্টে হাজির করা হয়। সেদিন খাস কামরায় দুপরে আইনজীবীর উপস্থিতিতে তার সঙ্গে কথা বলেন বিচারকরা। তার আগে ১২ মার্চ ডেথ রেফারেন্স ও আপিলের শুনানি শুরু হয়। পুলিশ কর্মকর্তা মাহফুজুর রহমান ও তার স্ত্রী স্বপ্না রহমানকে হত্যার দায়ে ২০১৫ সালের নভেম্বরে তাদের মেয়ে ঐশী রহমানকে মৃত্যুদ- প্রদান করে আদালত। একই সঙ্গে ঐশীর বন্ধু মিজানুর রহমান রনিকে ২ বছর কারাদ- ও ৫ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। অনাদায়ে এক মাসের কারাদ- দেয়া হয়। মামলার অন্য আসামি আসাদুজ্জামান জনিকে খালাস দেয় আদালত।
রায়ের বিরুদ্ধে ২০১৫ সালের ৬ ডিসেম্বর হাইকোর্টে ঐশীর আইনজীবী আপিল আবেদন করেন। এর আগে মৃত্যুদ- অনুমোদনের জন্য ডেথ রেফারেন্স হিসেবেও মামলাটি হাইকোর্টে পাঠানো হয়। ওই দিন ৬ ডিসেম্বর ২৫টি যুক্তি দেখিয়ে ঐশী রহমান হাইকোর্টে আপিল করেন। স্ত্রী, দুই সন্তান এবং শিশু গৃহকর্মীকে নিয়ে মালিবাগের চামেলীবাগের এক ফ্যাটে থাকতেন পুলিশের স্পেশাল ব্রাঞ্চের (রাজনৈতিক শাখা) পরিদর্শক মাহফুজুর রহমান। ২০১৩ সালের ১৬ আগস্ট ওই বাসা থেকেই তাদের তবিত লাশ উদ্ধার করা হয়। এর পরদিন ঐশী গৃহকর্মী সুমীকে নিয়ে রমনা থানায় আত্মসমর্পণ করে। হত্যাকা-ের ঘটনায় নিহত মাহফুজুর রহমানের ভাই মশিউর রহমান ওই দিনই পল্টন থানায় হত্যা মামলা করেন। ২৪ আগস্ট ঐশী আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেয়। তবে পরে ঐশী তার ওই জবানবন্দি প্রত্যাহারের আবেদন করে।
২০১৫ সালের ৯ মার্চ ঐশী ও তার দুই বন্ধুর বিরুদ্ধে একটি অভিযোগপত্র এবং নিহতদের বাসার শিশু গৃহকর্মী সুমীর বিরুদ্ধে শিশু আইনে পৃথক অভিযোগপত্র দেয় ঢাকা মহানগর পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগ (ডিবি)। পরে ওই বছরের ৬ মে ঢাকার মহানগর দায়রা জজ আদালত প্রথমে ঐশীসহ তিনজনের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করে। পরে মামলাটি (নিষ্পত্তি) বিচারের জন্য দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে পাঠায়। ট্রাইব্যুনাল ৩০ নভেম্বর আবারও অভিযোগ গঠন করে।
সাজা কমানোর বিষয়ে হাইকোর্টের রায়ে বলা হয়, মৃত্যুদ-প্রাপ্ত আসামি জোড়া খুনের ঘটনা ঘটিয়েছে সুস্পষ্ট উদ্দেশ্য ছাড়া ও মানসিকভাবে বিচ্যুতির কারণেই। মামলার আসামি (ঐশী রহমান) অ্যাজমাসহ নানা রোগে আক্রান্ত। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালের প্রতিবেদন অনুযায়ী, আসামি ঐশীর দাদি ও মামা অনেক আগে থেকেই মানসিকভাবে বিপর্যস্ত ছিলেন। তার পরিবারে মানসিক বিপর্যস্তের ইতিহাস রয়েছে।
হত্যাকা-ের ঘটনার সময় তার বয়স ছিল ১৯ বছর। সে এ ঘটনার সময় সাবালকত্ব পাওয়ার মুহূর্তে ছিল। তার বিরুদ্ধে অতীতে ফৌজদারি অপরাধের নজির নেই। সে ঘটনার দুইদিন পরই স্বেচ্ছায় থানায় আত্মসমর্পণ করে। উদ্ভূত পারিপার্শ্বিক অবস্থা বিবেচনায় নিয়ে সাজা কমানো হয়েছে। তার (ঐশী) বাবা পুলিশে ও মা ডেসটিনিতে চাকরিরত ছিলেন। জীবন-জীবিকা নিয়ে ব্যস্ত ছিলেন তারা। ঐশীকে পর্যাপ্ত সময় দিতে পারেননি। তারা যখন উপলব্ধি করছিলেন ঠিক সে সময় ঐশীর জীবন আসক্তিতে ও উচ্ছন্নে (ধ্বংস) চলে গেছে।
আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়া, কানাডাসহ বিভিন্ন দেশে মৃত্যুদ-কে নিরুৎসাহিত করা হয়েছে। কিন্তু আমাদের দেশে মৃত্যুদ- কমানোর কোনো গাইডলাইন নেই। এমনকি তা বিলুপ্ত করার পরিবেশ আসেনি। শিার হার বেড়েছে। জনসংখ্যাও বেড়েছে। ফলে অপরাধের প্রবণতাও বাড়ছে। এ অবস্থায় মৃত্যুদ- রহিত করা যুক্তিসঙ্গত নয়। মৃত্যুদ-ই একমাত্র দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নয়। এটা কার্যকর করলেই যে সমাজ থেকে অপরাধ দূর হয়ে যাবে তা নয়। কম সাজাও অনেক সময় সমাজ থেকে অপরাধ কমাতে সুস্পষ্ট ও গুরুত্বপূর্ণভাবে ভূমিকা রাখতে পারে বা সাহায্য করে।
মৃত্যুদ- রহিত করতে সমাজের প্রতিটি স্তরে সুশাসন ও মানুষের মধ্যে অপরাধ প্রবণতা রোধে সচেতনা বৃদ্ধি করতে হবে। শুধু রাষ্ট্রের মধ্যে নয় সমাজের প্রতিটি স্তরে সুশাসন নিশ্চিত করতে হবে। নিম্ন আদালত সামাজিক অবয় বিবেচনায় নিয়ে কিছুটা আবেগপ্রবণ হয়ে এ রায় দিয়েছে।
রায়ে আরও বলা হয়, সন্তানদের জন্য বাবা-মা ও অভিভাবকই হলেন প্রাথমিক শিক। এটা হিসাব করেই তাদের জন্য ভালো পরিবেশ ও সময় দেয়া প্রয়োজন।