আন্তর্জাতিক

যে কারণে কাতারের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করলো ৬টি দেশ

স্বদেশ খবর ডেস্ক : সন্ত্রাসবাদে মদদের অভিযোগে মধ্যপ্রাচ্যের তেলসমৃদ্ধ দেশ কাতারের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করেছে প্রতিবেশী ৬টি দেশ। দেশগুলো হলো : সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই), বাহরাইন, ইয়েমেন, মিসর ও লিবিয়া। কাতারের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করতে ৫ জুন দিনের শুরুতে সৌদি আরব ও মিসর আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেয়। পরে অন্য দেশগুলোও একই পথে হাঁটে। কাতারের বিরুদ্ধে অভিযোগ দেশটি মধ্যপ্রাচ্যের সিরিয়া ও ইরাকে সক্রিয় জঙ্গিগোষ্ঠী ইসলামিক স্টেটকে (আইএস) মদদ দিচ্ছে। অবশ্য এ অভিযোগ কঠোর ভাষায় অস্বীকার করেছে কাতার।
সৌদি আরবের বার্তা সংস্থা এসপিএ জানিয়েছে, রিয়াদ (সৌদি আরবের রাজধানী) কাতারের সঙ্গে তাদের স্থল, নৌ ও আকাশসীমান্ত বন্ধ করে দিয়েছে। এ ধরনের সিদ্ধান্তে তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করেছে কাতার। তারা বলছে, প্রতিবেশী দেশগুলোর সমন্বিত এ সিদ্ধান্ত দুঃখজনক ও ভিত্তিহীন। এরই মধ্যে উপসাগরীয় তিন দেশÑ সৌদি আরব, বাহরাইন ও সংযুক্ত আরব আমিরাত ২ সপ্তাহের মধ্যে তাদের ভূখ- থেকে কাতারের সব নাগরিককে চলে যেতে বলেছে। সেইসঙ্গে ইয়েমেনে সৌদি নেতৃত্বাধীন আরব জোট থেকেও বের করে দেয়া হয়েছে কাতারকে।
মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম প্রভাবশালী দেশ কাতার। সেখান থেকেই সম্প্রচার হয় বিশ্বব্যাপী প্রভাব বিস্তারকারী সংবাদ মাধ্যম আল জাজিরা। এ সিদ্ধান্তের মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্যে মুসলিম দেশগুলোর মধ্যে ভাঙন আরও স্পষ্ট হয়ে সামনে এলো। মধ্যপ্রাচ্যের সিরিয়া, ইরাক ও ইয়েমেনে যুদ্ধাবস্থা থাকলেও অনেকটা শান্ত পরিস্থিতি কাতারসহ আয়তনে ছোট কয়েকটি উপসাগরীয় দেশে। এ কারণে দেশগুলোর অর্থনৈতিক অগ্রগতিও চোখে পড়ার মতো। তবে একঘরে হয়ে পড়লে অর্থনৈতিক অগ্রগতি ধরে রাখাটা কষ্টকর হয়ে পড়বে কাতারের প।ে ২০২২ সালে বিশ্বকাপ ফুটবল অনুষ্ঠিত হবে কাতারে। বিশ্বকাপ ফুটবল আয়োজন নিয়েও সমস্যায় পড়লো দেশটি।
ইরানের সঙ্গে সৌদি প্রভাব বলয়ের দেশগুলোর ক্রমবর্ধমান উত্তেজনার মধ্যে কাতারের সঙ্গে এ দেশগুলোর সম্পর্ক ছিন্নের এ ঘোষণা এলো। আরব দেশগুলোর এ ধরনের সিদ্ধান্তকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সৌদি সফরের সঙ্গে মেলাচ্ছেন ইরানের কর্মকর্তারা। ইরানি প্রেসিডেন্টের ডেপুটি চিফ অব স্টাফ বলেন, যা ঘটছে, তা তরবারি নৃত্যের প্রথম ফল। গেল মাসে ট্রাম্প সৌদি সফরকালে দেশটির ঐতিহ্যবাহী তরবারি নৃত্যে অংশ নেন।
কাতারের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করতে একেক দেশ একেক ধরনের যুক্তি দেখিয়েছে। সৌদি-সমর্থিত ইয়েমেন সরকার বলছে, হুথি বিদ্রোহীদের সঙ্গে যোগসাজশ রয়েছে কাতারের। মিসর বলছে, মুসলিম ব্রাদারহুডের সঙ্গে যোগাযোগ রয়েছে কাতারের। মিসরের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় তাদের আকাশসীমা বা বন্দর কাতারের উড়োজাহাজ বা নৌযানের জন্য নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে। সংযুক্ত আরব আমিরাতভিত্তিক ইতিহাদ, এমিরেটস ও ফাইদুবাই এরই মধ্যে কাতারে যাওয়া-আসার সব ফাইট বাতিল করেছে। বাহরাইন তাদের ঘোষণায় কাতারের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসবাদে সহযোগিতার পাশাপাশি অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তেেপরও অভিযোগ এনেছে।
সৌদিপন্থি বিভিন্ন দেশের এসব দাবি জোর গলায় অস্বীকার করে কাতারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলছে, তাদের এ সিদ্ধান্ত অন্যায়। যেসব অভিযোগ ও দাবি করা হয়েছে, সেগুলোর কোনো ভিত্তি নেই। বিবিসির বিশ্লেষণে এ ধরনের সিদ্ধান্তকে ‘নজিরবিহীন’ হিসেবে উল্লেখ করে বলা হয়, উপসাগরীয় অঞ্চলে যারা যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ মিত্র, শুধু তাদের সঙ্গে কাতারের সম্পর্কচ্ছেদ হয়েছে। সৌদি আরবের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কে আবদ্ধ এমন আরও কয়েকটি দেশ কাতারের সঙ্গে সম্পর্কচ্ছেদ করতে পারে বলেও আশঙ্কা রয়েছে।
এদিকে তুরস্ক পার্লামেন্ট কাতারে সৈন্য মোতায়েন করার অনুমতি দিয়েছে। ৭ জুন পার্লামেন্টে এ সংক্রান্ত একটি বিল পাস হয়েছে। এতে ২৪০ এমপি পে ভোট দিয়েছেন। প্রধানত তাইয়্যিপ এরদোগানের একেপিই এর পে ভোট দিয়েছে। আর জাতীয়তাবাদী এমএইচপি এর বিরোধিতা করে। সৌদি আরবসহ বেশ কয়েকটি দেশ কাতারের সাথে কূটনৈতিক ও বাণিজ্যিক সম্পর্ক ছিন্ন করার প্রোপটে তুর্কি পার্লামেন্ট এই সিদ্ধান্ত নিল।
দীর্ঘ দিন ধরেই তুরস্কের মিত্র হিসেবে ছিল কাতার। ফলে এই কঠিন পরিস্থিতিতে কাতারের পাশে থাকার সিদ্ধান্ত নিয়েছে তুরস্ক। দেশটি কাতারে একটি সামরিক ঘাঁটি প্রতিষ্ঠা করছে। উল্লেখ্য, মধ্যপ্রাচ্যের বৃহত্তম মার্কিন বিমান ঘাঁটিও কাতারে অবস্থিত।
তুরস্ক ২০১৪ সালে সামরিক ঘাঁটি স্থাপনের জন্য কাতারের সাথে চুক্তি করে। ২০১৫ সালে কাতারে নিযুক্ত তুর্কি রাষ্ট্রদূত আহমদ দেমিরক বলেছিলেন, তুরস্ক দেশটিতে প্রায় ৩ হাজার সৈন্য মোতায়েন করতে চায়।
এদিকে উপসাগরীয় অঞ্চলে সংকট নিরসনে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প কাতারের আমিরকে ফোন করেছেন। এ সময় তিনি দেশগুলোর মধ্যে দূরত্ব দূর করতে সহায়তা করারও প্রস্তাব দেন। কাতারকে একঘরে করা নিয়ে বিতর্কের পরিপ্রেেিত উপসাগরীয় আরব দেশগুলোর ঐক্য বহাল রাখার জন্য মাত্র এক দিন আগে সৌদি বাদশাহর প্রতি আহ্বান জানিয়েছিলেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। কাতারের সঙ্গে দেশগুলোর সম্পর্ক ছিন্ন করার ঘটনায় নিজের কৃতিত্বও দাবি করেন ট্রাম্প।
কাতারের সরকারি কর্তৃপকে উদ্ধৃত করে বলা হয়েছে, ফোনে ট্রাম্প আরব দেশগুলোর মধ্যে কূটনৈতিক সংকটের সমাধান খুঁজতে তার প্রস্তুতির কথা প্রকাশ করেন এবং এ অঞ্চলকে স্থিতিশীল করতে তার আগ্রহের ওপর জোর দেন। ট্রাম্পের কার্যালয় থেকে জানানো হয়েছে, প্রেসিডেন্ট দেশগুলোর মধ্যে দূরত্ব দূর করতে সহায়তা করার প্রস্তাব দেন। প্রয়োজনে এ ব্যাপারে হোয়াইট হাউজে বৈঠক করা যেতে পারে বলেও জানান তিনি।
এদিকে শাসক পরিবর্তন চেয়ে কাতারের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করা হয়নি বলে জানিয়েছেন সংযুক্ত আরব আমিরাতের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী আনোয়ার গারগ্যাশ। তিনি বলেন, এই অঞ্চলে উগ্রপন্থা ও সন্ত্রাসবাদে কাতার চ্যাম্পিয়ন। তবে সম্পর্ক ছিন্ন করার পেছনে কাতারে নতুন নেতৃত্ব খোঁজা তাদের উদ্দেশ্য নয়। উদ্দেশ্য হচ্ছে দেশটির নীতি ও অবস্থান পরিবর্তন হোক।
এদিকে চলমান সমস্যার সমাধানে কুয়েত মধ্যস্থতা করছে। দেশটির আমির শেখ সাবাহ আল-আহমাদ আল-সাবাহ দুবাইয়ের শাসক শেখ মোহাম্মদ বিন রশিদ আল-মাকতুয়াম ও ঊর্ধ্বতন কর্তৃপরে সঙ্গে বৈঠক করেছেন। এর আগে তিনি সৌদি বাদশাহ সালমান বিন আবদুল আজিজ আল-সৌদের সঙ্গে কথা বলেন। সংযুক্ত আরব আমিরাত সফর শেষে তিনি কাতার সফরে যাবেন বলে শোনা যাচ্ছে। এর আগেও ২০১৪ সালে সৌদি আরব, কাতারসহ অন্যান্য আরব দেশের মধ্যে কূটনৈতিক বিরোধ নিরসনে ভূমিকা রেখেছিল কুয়েত। সমস্যার সমাধানে যুক্তরাষ্ট্র, ফ্রান্স ও রাশিয়া আলোচনা শুরুর আহ্বান জানিয়েছে। তবে কাতারের পে দাঁড়িয়েছে তুরস্ক। কাতারের সঙ্গে সম্পর্ক আরও উন্নয়ন করার কথা বলেছে দেশটি।