ফিচার

রমজান মাসে কী খাবেন কী খাবেন না

ডা. জয়নাল আবেদীন টিটো : রোজার মাসে খাওয়া-দাওয়া ও স্বাস্থ্যগত সমস্যা নিয়ে কম-বেশি অভিযোগ নেই এমন মানুষ পাওয়া মুশকিল। সংশ্লিষ্ট অনেক বিষয়ের মধ্যে এখানে রোজার মাসে স্বাস্থ্যসম্মত খাদ্যাভ্যাস বিষয়ে কিছুটা আলোকপাত করা হলো।
সেহেরিতে যা খাওয়া উচিত
সেহেরির খাবার এমন হওয়া উচিত যা দীর্ঘণ পেটে থাকে অর্থাৎ হজম হতে বেশি সময় লাগে। কেউ কেউ মনে করেন, সেহেরিতে প্রচুর পরিমাণ আমিষ জাতীয় খাবার খেলে সারাদিন একটু সবল থাকা যাবে। কেউ আবার ভাত বেশি খাওয়ার পপাতী। আসলে এর কোনোটিই ঠিক নয়। সেহেরিতে খাবারের প্রত্যেকটি উপাদান যেন প্রয়োজনীয় পরিমাণে থাকে সেদিকে ল্য রাখতে হবে। বছরের অন্যান্য সময়ের মতো রোজার মাসে সুষম খাবার গ্রহণের দিকে বিশেষ খেয়াল রাখতে হবে ।
শর্করা জাতীয় খাবার বেশি খাওয়ার ফলে অগ্ন্যাশয় বা প্যানক্রিয়াস থেকে ইনসুলিনের নিঃসরণ বেড়ে যায়। এই অতিরিক্ত ইনসুলিন গ্লুকোজকে রক্ত থেকে দ্রুত দেহকোষে প্রবেশ করিয়ে দেয়। অর্থাৎ অতিরিক্ত ইনসুলিনের কারণে রক্তে গ্লুকোজ বেশিণ থাকতে পারে না। অতিরিক্ত ইনসুলিন নিঃসরণের কারণে দেহের স্থূলতা বেড়ে যায়। আমাদের প্রতিদিনের খাদ্যাভ্যাসের কারণে দৈনিক যে নির্দিষ্ট পরিমাণ আমিষ-হজমকারী এনজাইম পাকস্থলী থেকে নিঃসৃত হয়, তা দিয়ে অতিরিক্ত আমিষ হজম করা সম্ভব নয়। তাছাড়া অতিরিক্ত আমিষ গ্রহণের ফলে শরীরে ঝিমুনি আসে ও রক্তে ইউরিয়ার পরিমাণ বেড়ে যায়। এই ইউরিয়া আমাদের দেহের জন্য একটি তিকারক বর্জ্য পদার্থ।
অনুরূপভাবে অতিরিক্ত চর্বিজাতীয় খাবার দেহকোষ ও রক্তে অনাকাক্সিত মেদ তৈরি ছাড়া আর কোনো উপকার করতে পারে না। যাদের পিত্তথলি বা লিভারের সমস্যা আছে তাদের জন্য অতিরিক্ত চর্বি অত্যন্ত তিকর। সেজন্য সেহেরিতে অন্য মাসগুলোর মতো স্বাভাবিক খাবার খাওয়াই শ্রেয়।
জটিল শর্করা জাতীয় খাবার খুব ধীরে হজম হয় বলে এ ধরনের খাবার সেহেরিতে খাওয়া ভালো। এই খাবারগুলো পাকস্থলীতে দীর্ঘণ স্থিত থাকে, হজম হয় ধীরে ধীরে। তাই রোজাদারের ুধাভাব কম অনুভব হয়। এর সঙ্গে পছন্দ অনুযায়ী পরিমিত মাছ, মাংস ও প্রচুর শাক-সবজি খাওয়া যেতে পারে।
একজন রোজাদারের জন্য সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন যথেষ্ট পানি (দৈনিক অন্তত ২ লিটার) ও তাজা ফলের রস পান করা। পানি দেহকে সতেজ রাখে। পানি কম খেলে মূত্র তৈরি হয় কম, তাই দেহের বর্জ্য পদার্থ বের হতে পারে না, ফলে দেখা দেয় নানাবিধ সমস্যা।
স্বাস্থ্যবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে সেহেরি খাওয়ার বেলায় আল্লাহ রাসূলের (সা.) নিয়ম অনুযায়ী খাওয়াই উত্তম। সে নিয়মটি হলো পাকস্থলীর তিন ভাগের একভাগ খাবার ও তিন ভাগের একভাগ পানি দিয়ে পূরণ করতে হবে এবং বাকি এক-তৃতীয়াংশ খালি রাখতে হবে শ্বাস নেয়ার জন্য। পাকস্থলীর উপরে আছে ‘ডায়াফ্রাম’ নামের একটি বড় মাংসল পর্দা। আমরা যখন শ্বাস গ্রহণ করি, তখন ডায়াফ্রাম সংকুচিত হয়ে নিচের দিকে নেমে আসে এবং ফুসফুস স্ফীত হয়। খাদ্য দিয়ে পাকস্থলী পূর্ণ থাকলে শ্বাস গ্রহণের সময় নিঃশ্বাস-প্রশ্বাসের এই মূল পেশি ডায়াফ্রাম সংকুচিত হয়ে নিচের দিকে নামতে পারে না, ফুসফুস পর্যাপ্ত স্ফীত হয় না ও পরিমাণমতো অক্সিজেন দেহে প্রবেশ করতে পারে না। তাই খাবার গ্রহণের ব্যাপারে রাসূল (সা.) এর নিয়ম মেনে চলা শরীরের জন্য সবচেয়ে উপকারী।
সেহেরিতে যা খাওয়া উচিত নয়
ভাজাভুজি, অতিরিক্ত তেল বা মশলাযুক্ত খাবার সেহেরিতে খাওয়া উচিত নয়। এ ধরনের খাবার পেটে গোলযোগ তৈরি করে। সেহেরিতে চা পান না করাই উত্তম। চায়ে থাকে মূত্র-বর্ধক উপাদান। চায়ের মূত্র-বর্ধকের প্রভাবে দেহের পানি প্রস্রাবের মাধ্যমে দ্রুত বের হয়ে যায়।
ইফতারে যা খাওয়া উচিত
ইফতারে শরীরের জন্য সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন হয় পানি এবং তরল জাতীয় খাবারের। সারাদিন রোজা রাখার পর পাকস্থলীতে এমন কিছু খাবার দেয়া উচিত যা দ্রুত শরীরে শক্তি জোগায় ও বিভিন্ন ঘাটতি পূরণ করে। ইফতার হিসেবে সরল শর্করা উত্তম। কেননা এটি দ্রুত হজম হয় ও শক্তি জোগায়। দেহের শারীরবৃত্তীয় চাহিদা পূরণের জন্য কিছু অত্যাবশ্যক উপাদান গ্রহণ করা জরুরি। যেমন মস্তিষ্কের খাদ্য হলো গ্লুকোজ। গ্লুকোজের অভাবে মস্তিষ্কের কাজ ব্যাহত হয়। সৃষ্টিকর্তা মস্তিষ্ককে এভাবে তৈরি করেছেন যে, ইন্সুলিনের সাহায্য ছাড়াই গ্লুকোজ মস্তিষ্ক কোষে ঢুকে যায়। শরীরের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ হলো কিডনি, যা পানির অভাবে মারাত্মকভাবে তিগ্রস্ত হতে পারে। ১২ ঘণ্টায় ৩০০ মিলির কম প্রস্রাব উৎপন্ন হলে কিডনি ফেইলিউরের আশঙ্কা থাকে। দেহের স্বাভাবিক কার্যকারিতার জন্য বিভিন্ন খনিজ উপাদান যেমন সোডিয়াম, পটাশিয়াম, ক্যালশিয়াম, ম্যাগনেশিয়াম ইত্যাদি অত্যাবশ্যক। ইফতারে এমন সব খাবার খাওয়া উচিত যে খাবারে প্রয়োজনীয় পরিমাণ পানি, গ্লুকোজ ও খনিজ উপাদান থাকে। তাতে মস্তিষ্ক, কিডনি ও ত্বকের কার্যক্রম ঠিক থাকবে।
রাসূল (সা.) বলেছেন, ‘যদি তোমাদের কেউ রোজা রাখে তাহলে সে যেন খেজুর দিয়ে ইফতার করে। যদি সে তা না পায় তাহলে পানি দিয়ে। নিশ্চয়ই পানি হলো পরিশোধক।’ খেজুরে আছে গ্লুকোজ ও নানা ধরনের খনিজ উপাদান। এতে রয়েছে সরল শর্করা যা দ্রুত শোষণ হয় এবং মস্তিষ্ক ও দেহে শক্তি জোগায়। উচ্চ রক্তচাপ, রক্তশূন্যতা, কোষ্ঠকাঠিন্য ও বিভিন্ন হদরোগ…. প্রতিরোধে খেজুরের অবদান অপরিসীম। হাড়ের সুস্থতা বজায় রাখতে ও রক্তে কোলেস্টেরল কমানোর েেত্রও এর ভূমিকা রয়েছে। ফলমূলে আছে প্রচুর গ্লুকোজ, ভিটামিন ও খনিজ উপাদান। বিশেষত তরমুজ, বাঙ্গি এ জাতীয় পানীয় ফল ইফতারের জন্য খুব ভালো। এছাড়াও ছোলা সেদ্ধ, হালিম, পায়েস, হালুয়া, দই-চিড়া, দুধ-সাগু, পুডিং, যেকোনো রকমের মিষ্টি, রকমারি ফলের চাটনি বা যেকোনো তাজা ফল, মুরগির স্যুপ বা স্যুপ নুডুলস, সবজির স্যুপ ইত্যাদি ইফতার হিসেবে শরীরের জন্য উপকারী।
ইফতারে যা খাওয়া উচিত নয়
ভাজা-পোড়া ও অতিরিক্ত তৈলাক্ত খাবার শরীরের জন্য সব সময়ই তিকর। বিশেষ করে শরীরের তাৎণিক ঘাটতি পূরণ ও শক্তি জোগানের েেত্র এদের ভূমিকা নেই বললেই চলে। এসব খাবারের উপরিভাগে তেলের আবরণ থাকার কারণে এরা পাকস্থলীতে পরিপাক হয় না। এ ধরনের খাবার পাকস্থলী অতিক্রম করতে অনেক সময় নেয়। তারপর অন্ত্রে গিয়ে শোষিত হয় এবং রক্তে মিশে। হজম প্রক্রিয়ার এই বিলম্বের কারণে এ ধরনের খাবার দেহে দ্রুত শক্তি জোগাতে পারে না। রোজার সময় দাঁতের যতেœর ব্যাপারে আমরা অনেকেই বেখেয়াল হয়ে যাই। রমজান মাসে সেহেরির পর অবশ্যই টুথপেস্ট ও ব্রাশ দিয়ে দাঁত ও জিহ্বা পরিষ্কার করা উচিত। সম্ভব হলে একটু কুসুম গরম পানিতে লবণ মিশিয়ে কুলি করে নেয়া যেতে পারে। ইফতারের পর আরেকবার ব্রাশ করে নেয়া ভালো। এর মাঝে রোজা রাখা অবস্থায় মেসওয়াক অথবা শুধু ব্রাশ দিয়ে দাঁত পরিষ্কার করতে পারেন। তাতে মুখে দুর্গন্ধ কম হবে এবং দাঁত ও মাঢ়ির রোগ থেকে রেহাই পাওয়া যাবে।