কলাম

শান্তি প্রতিষ্ঠায়ও বিশ্ব দরবারে প্রশংসিত বাংলাদেশ

ড. কাজী এরতেজা হাসান : ২৯ মে বিশ্বের অন্যান্য রাষ্ট্রের মতো বাংলাদেশেও পালিত হলো আন্তর্জাতিক জাতিসংঘ শান্তিরী দিবস। প্রায় ৭০ বছর ধরে শান্তি, নিরাপত্তা ও সমৃদ্ধির েেত্র জাতিসংঘ শান্তিরা কার্যক্রম আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সবচেয়ে কার্যকরী বিনিয়োগের একটি হিসেবে প্রমাণিত হয়েছে। বিভিন্ন আকার ও ম্যান্ডেট সত্ত্বেও সব মিশনের ল্য একইÑ জীবনরা, জনগণের সুরা ও শান্তির মঞ্চ স্থাপন। এসব বলেছেন জাতিসংঘের মহাসচিব অ্যান্তোনিও গুতেরেস। বলাই বাহুল্য যে, সারা বিশ্বের শান্তি প্রতিষ্ঠায় জাতিসংঘের ভূমিকা অপরিসীম। যদিও অনেক েেত্র জাতিসংঘ কার্যকর ভূমিকা নিতে ব্যর্থ হয়েছে। তারপরও জাতিসংঘের প্রয়োজনীয়তা এখন পর্যন্ত অপরিহার্য হিসেবে প্রমাণিত হয়েছে। জাতিসংঘের এই শান্তি প্রতিষ্ঠার েেত্র বাংলাদেশও এক গর্বিত অংশীদার। এ উপলে দেয়া এক বাণীতে রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ বলেছেন, বাংলাদেশ বিশ্বের দরবারে শান্তি ও সম্প্রীতির এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে। পেশাদারিত্বের পাশাপাশি অর্পিত দায়িত্বের প্রতি একনিষ্ঠতা বাংলাদেশি শান্তিরীদের এ সাফল্য অর্জনে ভূমিকা রেখেছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তার বাণীতে বলেছেন, শান্তিরা মিশনে দায়িত্ব পালনকালে বাংলাদেশের সদস্যরা বিপদসংকুল ও সংঘাতপূর্ণ এলাকায় নিয়োজিত থাকেন। বাংলাদেশি শান্তিরীদের দৃষ্টান্তমূলক সেবা, কঠোর পরিশ্রম, আত্মত্যাগ, নিঃস্বার্থ মনোভাব ও সাহসিকতা বিশ্ব দরবারে প্রশংসিত। বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছে ৪৬ বছর হলো। বাংলাদেশের সেনাবাহিনীর ইতিহাসও অনুরূপ বয়সী। তবে ১৯৮৮ সালে প্রথম জাতিসংঘের হয়ে ইরান-ইরাক সামরিক পর্যবেক দলে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ১৫ সদস্যের সেই গর্বিত যাত্রার শুরু। এরপর থেকে একের পর এক প্রশংসার স্বার রেখে আসছেন বাংলাদেশের গর্বিত সেনা সদস্যরা। ১৯৮৯ সালে প্রথমবারের মতো শান্তি প্রক্রিয়া ও নির্বাচন পর্যবেণের জন্য জাতিসংঘ একটি পূর্ণ শান্তিরী সৈন্যবাহিনী নিয়োগ করে। এ পর্যন্ত ৪০ দেশে ৫৪টি শান্তিরা মিশনে ১ লাখ ৪৯ হাজার ৫৮৫ জন শান্তিরী পাঠিয়েছে বাংলাদেশ, যা জাতিসংঘ শান্তিরা কার্যক্রমে এক অনন্য দৃষ্টান্ত।
শান্তিরা কার্যক্রমে বিশ্বের নানা প্রান্তে বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনী ও পুলিশ সদস্যরা নিরবচ্ছিন্নভাবে গৌরবের সঙ্গে কাজ করছেন। বর্তমানে জাতিসংঘ সদর দপ্তরসহ বিশ্বের ১২টি দেশে বাংলাদেশের ৬ হাজার ৯২৭ জন শান্তিরী নিয়োজিত রয়েছেন। শান্তিরা মিশনে সেনা পাঠানোর েেত্র বাংলাদেশ আজ বিশ্বের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় দেশ। কঙ্গো, লাইবেরিয়া, লেবানন, দণি সুদান, সুদান (দারফুর), পশ্চিম সাহারা, মালি, হাইতি, থাইল্যান্ড, সোমালিয়া, সাইপ্রাস ও জাতিসংঘ সদর দপ্তরে সব মিলিয়ে ৬ হাজার ৯২৭ বাংলাদেশি সেনা সদস্য অত্যন্ত সুনামের সাথে দায়িত্ব পালন করে আসছেন। এছাড়া ১ হাজার ২৪২ জন নারী শান্তিরী বিশ্বের বিভিন্ন দেশে যোগদান করেন। বর্তমানে ৮টি মিশনে বাংলাদেশ পুলিশের ১ হাজার ১২৬ জন সদস্য নিয়োজিত আছেন। যেখানে নারী সদস্য রয়েছেন ১৬৪ জন। এই শান্তি মিশনে যোগ দিয়ে বাংলাদেশের সেনা ও পুলিশ সদস্যরা দেশের জন্য যেমন বিপুল বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করছেন পাশাপাশি তাদের দায়িত্ব পালন ও কর্মনিষ্ঠা বিশ্ব দরবারেও প্রশংসিত হচ্ছে। জাতিসংঘ শান্তিরা মিশনে যোগ দিয়ে এ পর্যন্ত বেশ কিছু সেনা ও পুলিশ সদস্যকে প্রাণও হারাতে হয়েছে। এতে বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনীর ১১২ ও পুলিশের ২০ সদস্য প্রাণ হারান। এছাড়া সশস্ত্র বাহিনীর ২০১ ও পুলিশের ১০ সদস্য আহত হয়েছেন। শুরু থেকেই বাংলাদেশি শান্তিরীরা তাদের কর্মদতা দিয়ে মানুষের হৃদয় জয় করেছেন। বিশ্বের বিভিন্ন যুদ্ধবিধ্বস্ত অঞ্চলে শান্তি প্রতিষ্ঠা ও মানবাধিকার রার েেত্র বাংলাদেশ এরই মধ্যে জাতিসংঘের বিশ্বস্ত ও পরীতি বন্ধু হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে।
শান্তিরায় বিশ্বব্যাপী ব্লু হেলমেটধারীদের কাছে বাংলাদেশ এখন অনুপ্রেরণার নাম। বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনী ‘মডেল অব পিস কিপারস’ হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে। তার স্বীকৃতিস্বরূপ সিয়েরা লিয়নে বাংলাদেশের নামে একটি সড়কের নামকরণ করা হয়। বাংলা ভাষাকে তাদের অন্যতম দাপ্তরিক ভাষা হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। দণি সুদানের জুবায় বাংলাদেশি কন্টিনজেন্ট অকান্ত পরিশ্রমের মধ্য দিয়ে জাতিসংঘ আয়োজিত গণভোট সাফল্যের সঙ্গে সম্পন্ন করে, যা দণি সুদানের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব নিশ্চিত করতে বিশেষ ভূমিকা রাখে। এভাবে বিভিন্ন মিশনে বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনীর শান্তিরী সদস্যরা বিশ্বের সংকটাপন্ন দেশগুলোতে প্রশংসনীয় ভূমিকা রেখে বাংলাদেশকে বিশ্বের দরবারে সম্মানিত করতে সহায়তা করেছেন। আমরা বিশ্বাস করি, আগামী দিনেও বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যরা জাতিসংঘ শান্তিরা মিশনে তাদের বর্তমান গর্বিত ভূমিকা একইভাবে অব্যাহত রাখবেন।