প্রতিবেদন

চালের বাজার স্থিতিশীল করতে ভিয়েতনাম থেকে চাল আসছে

নিজস্ব প্রতিবেদক : চালের বাজার সহনশীল করতে ভিয়েতনাম থেকে ৯০৮ কোটি ৮৫ লাখ টাকা ব্যয়ে ২ লাখ ৫০ হাজার টন চাল আমদানির প্রস্তাবে অনুমোদন দিয়েছে সরকার। ভিয়েতনাম সরকার টু বাংলাদেশ সরকার, অর্থাৎ জিটুজি পদ্ধতিতে এই চাল আমদানি করা হবে। ১৪ জুন সচিবালয়ে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতের সভাপতিত্বে সরকারি ক্রয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির বৈঠকে চাল আমদানির এই প্রস্তাব অনুমোদন দেয়া হয়। বৈঠক শেষে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের অতিরিক্ত সচিব মোস্তাফিজুর রহমান সাংবাদিকদের জানান, ভিয়েতনাম থেকে প্রতি মেট্রিক টন ৪৭০ মার্কিন ডলার মূল্যে ৫০ হাজার মেট্রিক টন সেদ্ধ চাল আমদানি করা হবে। এতে মোট খরচ হবে ১৯৫ কোটি ৫ লাখ টাকা। এছাড়া ভিয়েতনাম থেকে ৪৩০ মার্কিন ডলার মূল্যে ২ লাখ মেট্রিক টন আতপ চাল আমদানি করা হবে। এতে মোট খরচ হবে ৭১৩ কোটি ৮০ লাখ টাকা।
হাওরাঞ্চলে আগাম বন্যার কারণে বোরো মৌসুমে লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় ১৫ লাখ টন চাল কম উৎপাদন হবে বলে সরকারি-বেসরকারি পর্যায় থেকে বলা হচ্ছে। এর পরিপ্রেক্ষিতে সরকার দেশের বাজার থেকে যে পরিমাণ চাল সংগ্রহ করার লক্ষ্য নিয়েছিল তা সংগ্রহ করা সম্ভব হচ্ছে না। সরকার চালের যে দাম ঘোষণা করেছে, বাজারে দাম তার চেয়ে অনেক বেশি। পরে ১ লাখ টন চাল বিদেশ থেকে আমদানির জন্য আন্তর্জাতিক টেন্ডার আহ্বান করলেও সেখান থেকে সরবরাহ নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি। ফলে দেশের বাজারে চালের দামের ঊর্ধ্বগতি বজায় রয়েছে। গত কয়েক বছরের মধ্যে বর্তমানে সবচেয়ে বেশি দামে চাল বিক্রি হচ্ছে। এদিকে সরকারের মজুদও কমে এসেছে। কিন্তু সরকার হাওর অঞ্চলসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় কাজের বিনিময়ে খাদ্য কর্মসূচি, ১০ টাকা কেজি দরে চাল বিতরণ এবং ওএমএস কর্মসূচি অব্যাহত রেখেছে। এসব কর্মসূচির জন্য প্রয়োজনীয় চাল সরকারকে সংগ্রহ করতে হচ্ছে।
জানা গেছে বাজার দর স্থিতিশীল রাখতে চাল আমদানির ওপর রাষ্ট্র কর্তৃক আরোপিত আমদানি শুল্ক কমানোর ব্যবসায়ীদের দাবি মেনে নেয়ার চিন্তাভাবনা করছে সরকার।
এদিকে মিলাররা অতিরিক্ত মুনাফার আশায় ধান-চাল মজুদ করে থাকতে পারেনÑ এ তথ্যের ভিত্তিতে তাদের প্রকৃত মজুদ জানতে চেয়েছে সরকার। এরই মধ্যে বেশির ভাগ চালকল মালিকের কাছে খাদ্য অধিদপ্তরের এ সংক্রান্ত চিঠি পৌঁছে গেছে।
মালিক সমিতির সভাপতি লায়েক আলী জানান, কিছু কিছু চালকল মালিক খাদ্য অধিদপ্তরের চিঠি পেয়েছেন। এখন তারা মজুদ জানানোর প্রস্তুতি নিচ্ছেন। তিনি বলেন, আমাদের কাছে অতিরিক্ত মজুদ থাকবে কী করে? সরকার প্রতি কেজি চালের দর নির্ধারণ করেছে ৩৪ টাকা। অথচ বাজারে দাম ৪৫ টাকার ওপরে। ধানের দামও পাল্লা দিয়ে বাড়ছে। আমরা অতিরিক্ত দাম দিয়ে ধান কিনে মজুদ করে কী করব?’
খাদ্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, দুটো পরিস্থিতিতে সরকার মিলার বা চালকল মালিকদের মজুদ জানতে চায়। দর অস্বাভাবিক বেড়ে গেলে সরকার অভ্যন্তরীণ বাজার থেকে সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা ঠিক করেও যখন তা পূরণ করতে পারে না, তখন মিলারদের কাছে জানতে চায় তারা অতিরিক্ত ধান বা চাল মজুদ করেছেন কি না। আর যখন সরকারের মজুদ তলানিতে গিয়ে ঠেকে তখনো জানতে চাওয়া হয় কারসাজি করে মিলাররা ধান-চাল মজুদ করেছেন কি না। বর্তমানে দুটো পরিস্থিতিই বিরাজ করছে। কারণ মিলাররা খাদ্য অধিদপ্তরের গুদামে চাল সরবরাহ করতে চাচ্ছেন না। তাদের এই অনীহার কারণ হচ্ছে সরকার যে দর নির্ধারণ করে দিয়েছে সেই দরে চাল পাওয়া যায় না। বাজারে মোটা চালের কেজি ৪৬ থেকে ৪৮ টাকা। এ অবস্থায় মালিকরা চাল সরবরাহের জন্য চুক্তিই করতে চাচ্ছেন না। বাংলাদেশে ২৪ হাজার মিলার রয়েছেন; তাদের মধ্যে মাত্র প্রায় ৫ হাজার মিলার চাল সরবরাহের জন্য সরকারের সঙ্গে চুক্তি করেছেন।
খাদ্য অধিদপ্তরের একজন কর্মকর্তা বলেন, ‘আমরা মিলারদের কাছে তাদের মজুদ জানতে চেয়েছি। তারা যদি অবৈধভাবে মজুদ করে থাকেন, তাহলে অবশ্যই তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে। আর মিলাররা খাদ্য অধিদপ্তরকে চাল দিতে বাধ্য, কারণ তাদেরকে মিল পরিচালনার যে লাইসেন্স দেয়া হয়েছে সেখানেই এ ধরনের শর্তের কথা উল্লেখ আছে। প্রয়োজনে খাদ্য অধিদপ্তর তাদের লাইসেন্স বাতিল করবে।’ জানা যায় ২০০৮ সালে চালের যখন চরম সংকট ছিল, তখনো মিলারদের বাধ্য করা হয়েছিল। তখন বিশ্বব্যাপী চালের সংকট ছিল। এখনকার পরিস্থিতি তেমন নয়। বর্তমানে বাংলাদেশে চালের যে সংকট তা একেবারেই নিজস্ব। অন্যান্য এশীয় দেশে কোনো সংকট নেই। চাল রপ্তানিকারক দেশ থাইল্যান্ড বা ভিয়েতনামে অতিরিক্ত চাল উৎপাদন হয়েছে।
অন্যান্য বছর সরকারি গুদামে চাল সরবরাহের জন্য প্রতিযোগিতা চলে। মিলাররা খাদ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক তো বটেই, খাদ্যমন্ত্রী ও সচিবকেও তোষামোদি করেন চাল নেয়ার জন্য। মিলারের নামে ক্ষমতাসীন দলের নেতারাও সরকারি গুদামে চাল সরবরাহ করেন। অথচ এবার পরিস্থিতি সম্পূর্ণ ভিন্ন।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, অভ্যন্তরীণ বাজারে চালের দাম বৃদ্ধির বড় কারণ হচ্ছে হাওরে অকাল বন্যা। সরকার মনে করছে ৬ লাখ টন বোরো নষ্ট হয়েছে। এ কারণেই ৬ লাখ টন আমদানি করে পরিস্থিতি মোকাবিলা করার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। এরই অংশ হিসেবে দেড় লাখ টন চাল আমদানির টেন্ডার আহ্বান করা হয়েছে। আরো ৩ লাখ টন ভিয়েতনাম থেকে সরকার টু সরকার (জিটুজি) পর্যায়ে আমদানির চুক্তি হয়েছে। কিন্তু যে দরে টেন্ডারে চাল পাওয়া যাচ্ছে জিটুজি পর্যায়ের দর তারচেয়ে বেশি। বাংলাদেশ ৬ লাখ টন চাল কিনবে। এই তথ্য বিভিন্ন চাল উৎপাদনকারী দেশের বাংলাদেশি দূতাবাসকে জানানো হয়েছে। অনেকে বলছেন, এ তথ্য আগেভাগে জানানো ঠিক হয়নি। খবর পেয়ে রপ্তানিকারক দেশগুলো দাম বেশি হাঁকাচ্ছে।
সরকারের নীতিনির্ধারণী পর্যায় থেকে জানা গেছে, শিগগিরই চালের আমদানি শুল্ক কমানো হতে পারে। বিষয়টি প্রধানমন্ত্রীর বিবেচনাধীন রয়েছে। বর্তমানে ২৫ শতাংশ শুল্কের পাশাপাশি ৩ শতাংশ রেগুলেটরি শুল্ক রয়েছে। ২৫ শতাংশ আমদানি শুল্ক ১০ শতাংশে নামিয়ে আনা হতে পারে। বাজারে চালের দাম ধারাবাহিকভাবে বাড়ার কারণে সরকার এমন চিন্তা করছে বলে দায়িত্বশীল সূত্রে জানা গেছে।