আন্তর্জাতিক

ট্রাম্পের বিরুদ্ধে তদন্ত : সারা বিশ্বের নজর এখন যুক্তরাষ্ট্রের দিকে

স্বদেশ খবর ডেস্ক : বিশ্বের সবচেয়ে ক্ষমতাধর রাষ্ট্রপতি ক্ষমতাসীন থাকা অবস্থাতেই তদন্তের মুখোমুখি হওয়াতে সারা বিশ্বের নজর এখন ডোনাল্ড ট্রাম্পের দিকে। জানা যায়, বিচার প্রক্রিয়ায় বাধা সৃষ্টি করা ইস্যুতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু হয়েছে। স্পেশাল কাউন্সেল রবার্ট এস মুয়েলার এ তদন্ত করছেন। ২০১৬ সালে অনুষ্ঠিত মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে রাশিয়ার ভূমিকা নিয়ে চলমান তদন্ত তত্ত্বাবধান করছেন স্পেশাল কাউন্সেল মুয়েলার। তদন্তের পরিধি বিস্তৃত করার অংশ হিসেবে তিনি সিনিয়র কিছু গোয়েন্দা কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলবেন। এখন খতিয়ে দেখা হবে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বিচারে বাধা দেয়ার চেষ্টা করেছিলেন কি না। ট্রাম্পের কর্মকা- তদন্তে স্পেশাল কাউন্সেল রবার্ট মুয়েলারের পদক্ষেপ প্রায় বছরখানেক ধরে চলমান এফবিআই তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ এক মোড় নেবে বলে মনে করা হচ্ছে। কেননা, এতদিন এ তদন্তের মনোযোগ ছিল প্রেসিডেন্টের নির্বাচনি প্রচারণায় রাশিয়ান হস্তক্ষেপের ওপর। খতিয়ে দেখা হচ্ছিল নির্বাচনি মৌসুমে ট্রাম্পের প্রচারণা শিবির ও ক্রেমলিনের মধ্যে কোনো প্রকার সমন্বয় ঘটেছিল কি না। ট্রাম্প সহযোগীদের কেউ সম্ভাব্য আর্থিক অপরাধ করেছেন কি না তার তথ্যপ্রমাণ খুঁজেছেন তদন্তকারীরা।
এফবিআইয়ের বরখাস্তকৃত সাবেক প্রধান জেমস কমির তরফে এর আগে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ব্যক্তিগতভাবে নিশ্চয়তা পেয়েছিলেন যে, তিনি তদন্তাধীন নন। এখন হোয়াইট হাউজের কর্মকর্তারাই বলছেন, কমিকে বরখাস্ত করার পরপরই সে পরিস্থিতি পাল্টে গেছে।
ওয়াশিংটন পোস্টের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের কাছে সাক্ষাৎকার দেয়ার অনুরোধের বিষয়ে অবগত আছেন এমন ৫ জন পরিচয় গোপন রাখার শর্তে ওয়াশিংটন পোস্টের সঙ্গে কথা বলেছেন। জনসমক্ষে বিষয়টি আলোচনা করার অনুমতি তাদের নেই। তারা বলেছেন, ন্যাশনাল ইন্টেলিজেন্সের বর্তমান পরিচালক ড্যানিয়েল কোটস, ন্যাশনাল সিকিউরিটি এজেন্সির (এনএসএ) প্রধান মাইক রজার্স এবং রজার্সের সদ্য সাবেক হওয়া ডেপুটি রিচার্ড লেজেট সাক্ষাৎকার দিতে সম্মত হয়েছেন। চলতি সপ্তাহেই তারা মুয়েলারের সঙ্গে কথা বলবেন। গোপনীয়তার চাদরে চলছে এই তদন্ত। আর এ ইস্যুতে এফবিআই আর কাকে কাকে প্রশ্ন করেছে সেটাও স্পষ্ট নয়।
এনএসএ এক বিবৃতিতে বলেছে, তারা স্পেশাল কাউন্সেলের সঙ্গে পূর্ণাঙ্গ সহযোগিতা করবে। এর বেশি কিছু বলতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে সংস্থাটি। অপরদিকে ন্যাশনাল ইন্টেলিজেন্স পরিচালকের কার্যালয় এবং রিচার্ড লেজেট এ নিয়ে কথা বলতে রাজি হননি। তবে মনে করা হচ্ছে কোটস, রজার্স ও লেজেট স্বেচ্ছায় হাজির হবেন। কমি বরখাস্ত হওয়ার কয়েক দিন পরই ৯ মে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের বিরুদ্ধে বিচার প্রক্রিয়ায় বাধা সংক্রান্ত তদন্ত শুরু হয়।
প্রতিবেদনে আরো বলা হয়, সম্ভাব্য অপরাধ নিয়ে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের বিরুদ্ধে তদন্ত করাটা জটিল একটা বিষয়। এমনকি অপরাধ সংঘটনের বিশ্বাসযোগ্য তথ্যপ্রমাণ মিললেও জটিলতা থাকবে। আইন মন্ত্রণালয় মে মাসের মাঝামাঝি থেকেই এমনটা বলে আসছে যে, ক্ষমতাসীন একজন প্রেসিডেন্টকে অভিযুক্ত করা সঠিক হবে না। বিশেষজ্ঞরা বরং বলছেন, কোনো অপরাধমূলক আচরণের তথ্যপ্রমাণ পর্যালোচনা করার দায়ভার বর্তাবে কংগ্রেসের ওপর। এরপর তারা সিদ্ধান্ত নেবেন অভিশংসন প্রক্রিয়া শুরু করবেন কি না। গত ২০ মার্চ কংগ্রেসের শুনানিতে কমি জনসমক্ষে নিশ্চিত করেছেন যে, ট্রাম্প প্রচারণা শিবির ও রাশিয়ার মধ্যকার সম্ভাব্য যোগসাজশ তদন্ত করছিল এফবিআই। হাউজ ইন্টেলিজেন্স কমিটিকে দেয়া কমির বিবৃতি ট্রাম্পকে নাখোশ করেছিল। তিনি বারবারই রাশিয়ানদের সঙ্গে যোগসাজশের অভিযোগ অস্বীকার করে আসছেন। ট্রাম্প চেয়েছিলেন কমি জনসমক্ষে প্রকাশ করুক যে, তিনি তদন্তাধীন ছিলেন না। কিন্তু তৎকালীন এফবিআই পরিচালক কমি তা করতে অস্বীকৃতি জানান। এর পরপরই ট্রাম্প রুশ তদন্ত নিয়ে কোটস ও রজার্সের সঙ্গে কথা বলেছিলেন। কোটস তার সহকর্মীদের বলেছিলেন ট্রাম্প তার কাছে জানতে চেয়েছিলেন তিনি সাবেক জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা মাইকেল ফ্লিনের রাশিয়া কানেকশন তদন্ত বন্ধে হস্তক্ষেপ করতে পারবেন কি না। এর এক কি দুই দিন পর ২২ মার্চ ট্রাম্প কোটস ও রজার্সের সঙ্গে আলাদা কথা বলেন। তার প্রচারণা শিবির ও রাশিয়া সরকারের মধ্যে সংযোগ থাকার কোনো তথ্যপ্রমাণের অস্তিত্ব নেইÑ এই মর্মে বিবৃতি দিতে তাদের অনুরোধ করেছিলেন ট্রাম্প। কর্মকর্তারা জানান, দুজনই প্রেসিডেন্টের এ অনুরোধে অস্বীকৃতি জানিয়েছিলেন। আর লেজেটের সঙ্গে ট্রাম্পের বা অন্যান্য শীর্ষ কোনো কর্মকর্তার সরাসরি যোগাযোগ ছিল কি না তা স্পষ্ট নয়। তবে কর্মকর্তারা বলছেন, রজার্সের সঙ্গে প্রেসিডেন্টের একটি ফোনালাপের মেমো লিপিবদ্ধ করেছিলেন লেজেট। তদন্তের অংশ হিসেবে স্পেশাল কাউন্সেল মুয়েলার ট্রাম্পের সঙ্গে কমির আলোচনার লিখিত মেমোগুলোও সংগ্রহ করেছেন। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প অভিযোগ করেছেন কমি তার সঙ্গে আলোচনা নিয়ে মিথ্যা বলেছেন।
ওয়াশিংটন পোস্টের এই প্রতিবেদন আসার পরও চিরাচরিতভাবে ক্ষোভ ঝেড়েছেন ট্রাম্প। এক টুইটে তিনি প্রতিবেদনটিকে ভুয়া প্রতিবেদন আখ্যা দিয়েছেন। পরে আরেক টুইটে চলমান তদন্তকে ফের ‘উইচহান্ট’ বলে মন্তব্য করেছেন।
তবে দায়িত্বরত প্রেসিডেন্টরা সাধারণত ফৌজদারি অভিযোগে বিচারের মুখোমুখি হন না। তবে বিচারের পথে বাধা সৃষ্টির অভিযোগ প্রমাণ হলে ট্রাম্পবিরোধীরা প্রেসিডেন্টকে অভিশংসনের প্রস্তাব আনতে পারবেন। কিন্তু এ প্রস্তাব আনার জন্য কংগ্রেসের প্রতিনিধি পরিষদের অনুমতি লাগবে। কংগ্রেসে ট্রাম্পের দল রিপাবলিকানরাই সংখ্যাগরিষ্ঠ। এর আগে বরখাস্ত হওয়া এফবিআই প্রধান জেমস কমি কংগ্রেসকে বলেছেন, তার বিশ্বাস রাশিয়ার বিরুদ্ধে তদন্ত ধামাচাপা দিতেই ট্রাম্প তাকে বহিষ্কার করেছেন। দায়িত্বে থাকার সময় ট্রাম্প তার আনুগত্য চেয়েছিলেন।
ট্রাম্প প্রচারণা দলের সঙ্গে রাশিয়ার গোপন আঁতাতের অভিযোগ তদন্তের জন্য মার্কিন কংগ্রেসের একাধিক কমিটি কয়েক মাস ধরে তদন্ত করছে। এই তদন্তের অংশ হিসেবেই জেমস কমি সিনেটের গোয়েন্দা বিষয়ক কমিটির সামনে প্রথমে উন্মুক্ত সভায় ও পরে রুদ্ধদ্বার কক্ষে প্রশ্নের উত্তর দেন। কমি বলেন, যেভাবে রুশ তদন্ত পরিচালিত হচ্ছিল, তা পরিবর্তনের জন্যই তাকে দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেয়া হয়। তবে ট্রাম্পের জন্য আশার কথা হলো তার বিরুদ্ধে যে তদন্ত চলছে তা প্রমাণিত হলে এটি হবে একটি ফৌজদারি অপরাধ। আর যুক্তরাষ্ট্রের আইনে ফৌজদারি অপরাধে প্রেসিডেন্টকে অপসারণের জন্য অভিশংসনের কোনো নিয়ম নেই।