কলাম

দুর্যোগ মোকাবিলায় বাংলাদেশ সেনাবাহিনী

অধ্যাপক ড. মিল্টন বিশ্বাস : ১৩ জুন (২০১৭) পাহাড় ধসের কবলে পড়ে কেবল রাঙ্গামাটিতেই শতাধিক মানুষের মৃত্যু ঘটেছে। তার মধ্যে মানিকছড়িতে পাহাড় ধসে ২ সেনা কর্মকর্তাসহ ৫ সেনাসদস্য নিহত এবং ১০-১২ জন সেনাবাহিনীর সদস্য আহত হয়েছেন। এ ঘটনায় নিখোঁজ সেনাসদস্য আজিজুর রহমানের লাশ ১৫ জুন উদ্ধার করা হয়েছে। রাঙ্গামাটি শহর থেকে ২ কিলোমিটার দূরে শহরের প্রবেশমুখে রাঙ্গামাটি-চট্টগ্রাম সড়কে পাহাড় ধসের কারণে সড়ক যোগাযোগ বন্ধ হয়ে আছে এমন খবরের ভিত্তিতে রাঙ্গামাটি সদর জোনের সেনাবাহিনীর ১৬ সদস্যের একটি দল উদ্ধার কাজ চালাতে যায়। দলটি ঘটনাস্থলে পৌঁছে উদ্ধার তৎপরতা শুরু করে। সেসময় অকস্মাৎ নতুন করে পাহাড় ধস শুরু হলে সেনা সদস্যরা ৩০ ফুট নিচে নিক্ষিপ্ত হয়ে মাটি চাপা পড়েন। এতে ঘটনাস্থলেই বেশ কয়েকজন সেনাকর্মকর্তা হতাহত হন। নিহত সেনা কর্মকর্তাগণ হলেনÑ মেজর মাহফুজ (৪৪ লং কোর্স), ক্যাপ্টেন তানভির (৬৪ লং কোর্স), কর্পোরাল আজিজ এবং সৈনিক শাহীন। মেজর মাহফুজের ৫ বছরের একটি সন্তান রয়েছে এবং ক্যাপ্টেন তানভির সালমান নববিবাহিত। মেজর মাহফুজ ১৯৯৯ সালে সেনাবাহিনীতে যোগদান করেন। তিনি ‘র‌্যাব’ এবং জাতিসংঘ শান্তিমিশনেও কাজ করেছেন। অন্যদিকে ক্যাপ্টেন তানভির ২০০৯ সালে সেনাবাহিনীতে যোগদান করেন এবং এক সময় মাহফুজের সঙ্গে শান্তিমিশনে কাজ করেছেন তিনিও। ১৩ জুনের পাহাড় ধসের ঘটনায় দেড় শতাধিক মানুষের মর্মান্তিক মৃত্যু ঘটেছে। তবে প্রশিক্ষিত সেনা সদস্যদের মৃত্যু অনাকাক্সিক্ষত ছিল। কারণ তাঁরা এর আগেও যেকোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগে দুর্গত মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছেন। ২০০৭ সালের ভয়াবহ ঘূর্ণিঝড় সিডর এবং ২০০৯ সালের আইলায় সেনাবাহিনী বিশেষ করে ৫৫ পদাতিক ডিভিশন দুর্যোগ পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রশংসনীয় ভূমিকা পালন করেছে। উপরন্তু দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে ভূমিহীন জনগোষ্ঠীর জন্য আশ্রয়ণ প্রকল্প বাস্তবায়নের মাধ্যমে এই ডিভিশন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করছে।
২.
প্রায় প্রতি বছরই আমাদের দেশ ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস ও বন্যাসহ নানা প্রাকৃতিক দুর্যোগের কবলে পড়ে। বিগত দুই বছরে সৃষ্ট প্রাকৃতিক দুর্যোগে পার্বত্য এলাকাগুলোতে প্রচুর মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। তাছাড়া পাহাড় ধসে নতুন করে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার শঙ্কায় রয়েছেন লাখো মানুষ। পাহাড়ে একটানা বৃষ্টিতে সব সময়ই ধসের আশঙ্কা থাকে। বহু ঘরবাড়ি বিধ্বস্ত হয়। পানিতে তলিয়ে যায় ফসলি জমি। মানবেতর জীবনযাপন করে লাখো মানুষ। পার্বত্য এলাকায় পাহাড় ধস, অতিবৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢল, বজ্রপাত, ভূমিকম্প প্রভৃতি প্রাকৃতিক দুর্যোগের প্রবণতা বেশি। সেখানকার দুর্যোগ মোকাবিলায় সেনাবাহিনীর অবদান অনেক।
অর্থাৎ বাংলাদেশের সেনাবাহিনীর সদস্যরা দেশ ও মানুষের জন্য নিজের জীবন উৎসর্গ করতে কখনো পিছপা হয় নাÑ ১৩ জুনের ঘটনাসহ এ ধরনের অসংখ্য উদাহরণ রয়েছে। বাংলাদেশ সেনাবাহিনী আত্মত্যাগে, দেশ ও জাতির যেকোনো দুর্যোগে অগ্রণী ভূমিকা পালন করে। বিশেষ করে পাহাড়ে বিভিন্ন জাতিসত্তার সাধারণ মানুষের শিক্ষা-স্বাস্থ্য অবকাঠামোগত উন্নয়নে আমাদের সেনাবাহিনী নিরলসভাবে নিজের জীবনকে বাজি রেখে দেশ ও জাতির স্বার্থে কাজ করে যাচ্ছে। রাস্তায় যখন পাহাড় ধসে পড়েছিল সেনাবাহিনীর সদস্যরা রাস্তা চলাচলের উপযোগী করার জন্য ওই বৃষ্টি-ঝড়ের মহাদুর্যোগে জনকল্যাণে কাজ করছিল। তাই সেনাদের এ আত্মত্যাগে আমরা গভীর শোক জানাই। পার্বত্য এলাকার ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর জীবন ও মান উন্নয়নে সেনাবাহিনীর অবদান অনস্বীকার্য। প্রত্যন্ত এলাকায় রাস্তা নির্মাণ, ডিজিটাল শিক্ষা, বিভিন্ন দুর্গম এলাকায় ক্যাম্প করে স্বাস্থ্যগত সেবা ও সব শ্রেণির সাধারণ মানুষের নিরাপত্তার কাজে নিয়োজিত তারা। পার্বত্য এলাকার নিরাপত্তা বিধানে তারাই সার্বক্ষণিক দায়িত্ব পালন করেন। এভাবে দেশমাতৃকার কাজে নিজের জীবনকে উৎসর্গকারীদের গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করব আমরা।
কেবল দুর্যোগ মোকাবিলা নয় দেশের অখ-তা রক্ষায় যেকোনো অশুভ শক্তিকে দৃঢ়ভাবে প্রতিহত করতে আমাদের সেনাবাহিনী সম্পূর্ণভাবে প্রস্তুত রয়েছে। নিঃস্বার্থ সেবাদানের মাধ্যমে জনগণের ব্যাপক আস্থাও অর্জন করেছেন সেনাসদস্যরা। কারণ জনগণের সমর্থন ও আস্থা ছাড়া একজন সৈনিক যুদ্ধে বিজয়ী হতে পারেন না। রাজনীতিবিদ এবং সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যদের প্রধান শক্তি হচ্ছে জনগণ। সেনাবাহিনীকে দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষায় একটি আধুনিক ও সুসজ্জিত বাহিনী হিসেবে গড়ে তুলেছেন বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। প্রকৃতপক্ষে দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষায় একটি শক্তিশালী সামরিক বাহিনীর প্রয়োজন। এ জন্য বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতার পরই সশস্ত্র বাহিনীকে আধুনিকায়ন করার উদ্যোগ নিয়েছিলেন। বঙ্গবন্ধু সেনাবাহিনীর জন্য উপযুক্ত নেতৃত্ব গড়ে তুলতে মিলিটারি একাডেমি প্রতিষ্ঠা করেন। ১৯৭৫ সালের ১১ জানুয়ারি তিনি প্রথম বিএমএ শর্ট কোর্সের ‘রাষ্ট্রপতি কুচকাওয়াজে’ সালাম গ্রহণ করেন। এ জন্য আজ বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সদস্যরা পেশাদারিত্বের উজ্জ্বল স্বাক্ষর বহন করছেন। তারা পেশাগত কর্মকা-ের পাশাপাশি দেশ ও জাতির প্রয়োজনে অর্পিত দায়িত্ব পালন করে আসছেন। গত নির্বাচনের সময় সেনাবাহিনী তাদের ওপর অর্পিত দায়িত্ব নিরপেক্ষতা ও দক্ষতার সঙ্গে পালন করে গণতন্ত্রের অগ্রযাত্রাকে অব্যাহত রাখতে সহযোগিতা করেছেন। ছবিসহ ভোটার তালিকা প্রণয়ন ও জাতীয় পরিচয়পত্র তৈরি করে সেনাবাহিনী দেশ-বিদেশে ভূয়সী প্রশংসা কুড়িয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার মতে, জনগণই হচ্ছে দেশের শক্তি। সেনাবাহিনী হচ্ছে জনগণের অবিচ্ছেদ্য অংশ। এ জন্য তাদের সকলের দায়িত্ব হচ্ছে সাধারণ মানুষের ভাগ্যোন্নয়ন। বিশ্ববাসী আজ বাংলাদেশ সেনাবাহিনীকে একটি আধুনিক ও যুগোপযোগী সুশৃঙ্খল বাহিনী হিসেবে জানে। জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে সশস্ত্র বাহিনী বিশেষ করে সেনাবাহিনীর অবদান আজ সর্বজন স্বীকৃত ও বিশ্ব দরবারে সুপ্রতিষ্ঠিত। জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে বাংলাদেশের অবস্থান এখন শীর্ষে।
৩.
পার্বত্য এলাকায় দুর্যোগের মুহূর্তে সেনাবাহিনীর সদস্যরা ছুটে গিয়ে তাদের দায়িত্ব পালনের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত প্রতিষ্ঠা করেছেন। তবে দুর্যোগ মোকাবিলায় পার্বত্য এলাকায় পাহাড়ি-বাঙালির ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টা জরুরি। ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি এড়াতে পাহাড়ের বিদ্যমান বৃক্ষবেষ্টনীসমূহ সুরক্ষা করতে হবে। আশ্রয়কেন্দ্রসমূহ সংস্কার, দুর্যোগ সহনীয় গৃহ নির্মাণ, বিদ্যমান অবকাঠামোর যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণ করতে হবে। তাছাড়া পাহাড়ি ধস থেকে সাধারণ মানুষকে রক্ষার জন্য সচেতনতা সৃষ্টি করা দরকার। বনায়ন রক্ষার জন্য লিজ প্রথা বাতিল করে পাহাড়ের প্রকৃতি বজায় রাখতে হবে। উপরন্তু পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর জুম চাষের পদ্ধতি পরিবর্তন করলে বন সংরক্ষণের প্রচেষ্টা সফল হতে পারে। বনদস্যু আর সবুজায়ন বিরোধী মানুষকে হটিয়ে পাহাড়কে রক্ষা করা গেলে ধসের কবল থেকে পার্বত্য এলাকা এক সময় মুক্তি পাবে। এক্ষেত্রে সেনাবাহিনীর সঙ্গে জনগণের একীভূত প্রচেষ্টাই জয়ী হতে পারে।
লেখক : অধ্যাপক
বাংলা বিভাগ এবং পরিচালক
জনসংযোগ, তথ্য ও প্রকাশনা দপ্তর
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়