প্রতিবেদন

পাহাড়ে শান্তি-সম্প্রীতি ও উন্নয়ন কাজে জীবন উৎসর্গ করলেন ৫ সেনাসদস্য

নিজস্ব প্রতিবেদক : পাহাড়ে ‘শান্তি সম্প্রীতি ও উন্নয়ন’ কাজে নিয়োজিত বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর একদল অকুতোভয় সৈনিক। তারা সাহসী ও দুর্জয়। পাহাড়ে শান্তি সম্প্রীতি রক্ষায় ও উন্নয়ন কাজে সেনাসদস্যরা বছরের পর বছর কর্মকা- চালিয়ে যাচ্ছেন। রাঙ্গামাটি সদর এলাকা ও জেলাজুড়ে ১১ জুন থেকে অবিরাম ভারী বর্ষণ ও ঝড়ো হাওয়া অব্যাহত ছিল। অতি মাত্রার বর্ষণের ফলে একদিকে যেমন বাড়িঘর, গাছপালা বিধ্বস্ত হয়ে যায়, তেমনি পাহাড়ি ঢলে ভেসে যায় মানুষের বাড়িঘর ও সহায় সম্পদ। এ ধরনের প্রতিকূল পরিস্থিতিতে ১৩ জুন ভোর ৪টার দিকে জেলার মানিকছড়ি এলাকায় চট্টগ্রাম-রাঙ্গামাটি সড়কের ওপরে ঘটে পাহাড় ধস। বিরাট আকৃতির পাহাড় থেকে বড় একটি অংশ ধসে পড়ার পর বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় চট্টগ্রাম-রাঙ্গামাটি সড়ক যোগাযোগ। লোকালয়ের অদূরে এ ঘটনাটি ঘটে। সড়ক যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর সেনাবাহিনীর মানিকছড়ি ক্যাম্পের পক্ষ থেকে ধ্বংসস্তূপ সরানো কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। ফলে অপরদিক থেকে রাঙ্গামাটি জোনের নির্দেশে মেজর মাহফুজের নেতৃত্বে ১৬ সদস্যের একটি সেনাদল ঘটনাস্থলে চলে আসে। তারা ত্বরিত গতিতে সড়ক যোগাযোগ পুনঃস্থাপনের জন্য ধ্বংসস্তূপ সরানোর কাজে লিপ্ত হন। সময়টা ছিল তখন সকাল ১০টা। কাজ শুরু করার পর সেনাসদস্যরা পাহাড়ি এক পরিবারের ৬ সদস্যকে অক্ষত অবস্থায় উদ্ধার করেন। এর মাত্র আধাঘণ্টার মধ্যেই একই পাহাড় থেকে বড় আকারের আরেকটি অংশের ধস সৃষ্টি হয়। ফলে ১৬ সেনাসদস্যই চাপা পড়েন ধসে পড়া মাটির নিচে। যারা অপেক্ষাকৃত কম আহত হন তারা অন্যদের উদ্ধার কাজে লিপ্ত হন। এরই মধ্যে মানিকছড়ি ক্যাম্পের সেনাসদস্য ও স্থানীয় লোকজন যোগ দেয় উদ্ধার কাজে। একে একে ১৫ সেনা সদস্যকে উদ্ধার করে আনা হলেও এদের মধ্যে মৃত অবস্থায় পাওয়া যায় টিম লিডার মেজর মাহফুজ (৩৭), ক্যাপ্টেন তানভির (২৭), সৈনিক শাহীন (৩০) ও কর্পোরাল আজিজ (৩২)। ক্যাপ্টেন তানভিরের তখনও শ্বাসপ্রশ্বাস চলছিল। দ্রুতগতিতে তাকে পাঠানো হয় রাঙ্গামাটি হাসপাতালে। সেখানে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। আহত অবস্থায় আরও উদ্ধার হয় সৈনিক মামুন, আজমল, মোজাম্মেল, ফিরোজ ও সেলিম। এদের মধ্যে সৈনিক ফিরোজের অবস্থা সংকটাপন্ন। এছাড়া মাটিচাপা অবস্থায় নিখোঁজ ছিলেন সৈনিক আজিজুর রহমান। ঘটনার দুই দিন পর তার লাশ উদ্ধার করা হয়। আহত ১১ জনের মধ্যে ৬ জনের অবস্থা আশঙ্কাজনক হওয়ায় তাদের হেলিকপ্টারযোগে ঢাকা সিএমএইচে নেয়া হয়। অবশিষ্ট ৫ জনকে রাঙ্গামাটি হাসপাতালে চিকিৎসা দেয়া হয়। ১৩ জুন সকাল ১১টার মধ্যেই রাঙ্গামাটি থেকে বিপুলসংখ্যক সেনা সদস্য, পুলিশ, বিজিবি ও ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা ঘটনাস্থলে পৌঁছে উদ্ধার কাজ শুরু করেন। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে বিষয়টি অবহিত করার পর চট্টগ্রাম থেকে দ্রুত প্রেরণ করা হয় একটি হেলিকপ্টার। কিন্তু দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ার কারণে হেলিকপ্টারটি কয়েকবার আকাশে চক্কর দিয়ে নামতে না পেরে পুনরায় চট্টগ্রামে ফিরে আসে। এরপর আবহাওয়া কিছুটা অনুকূলে এলে প্রথমে একটি হেলিকপ্টার গিয়ে গুরুতর আহত ৫ জনকে সরাসরি ঢাকায় সিএমএইচে নিয়ে যায়। এরপর আরেকটি হেলিকপ্টার প্রেরণ করা হয় নিহতদের নিয়ে আসার জন্য। এই হেলিকপ্টারটি মৃত ৪ জনকে নিয়ে বিকেল ৩টা নাগাদ চট্টগ্রাম ক্যান্টনমেন্টে পৌঁছায়। নিহতদের নেয়া হয় সিএমএইচে। রাখা হয় হিমঘরে। এরই মধ্যে সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল আবু বেলাল মোহাম্মদ শফিউল হক ও সেনাবাহিনীর ২৪ পদাতিক ডিভিশনের জিওসি মেজর জেনারেল জাহাঙ্গীর কবির তালুকদার রাঙ্গামাটিতে যান। সেখানে গিয়ে তারা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন এবং প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা দেন।
নিহত চার সেনা সদস্যের লাশ ১৪ জুন ঢাকায় প্রেরণ করা হয়। মেজর মাহফুজ ও ক্যাপ্টেন তানভিরকে বনানী গোরস্তানে দাফন করা হয় এবং সৈনিক শাহীন ও কর্পোরাল আজিজের লাশ তাদের পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়। ১৩ জুন বিকেল ৩টায় চট্টগ্রাম ক্যান্টনমেন্টে হেলিকপ্টার থেকে নিহত মেজর মাহফুজ, ক্যাপ্টেন তানভির, সৈনিক শাহীন ও কর্পোরাল আজিজের লাশ যখন নামানো হচ্ছিল তখন সহকর্মীদের অনেকেই কান্নায় ভেঙে পড়েন। সেনা সূত্রে জানা গেছে, নিহত মেজর মাহফুজ ৫ বছর বয়সী এক পুত্র সন্তানের জনক। আর ক্যাপ্টেন তানভির মাত্র ছয় মাস আগে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। তিনি একজন কমান্ডোও।
আইএসপিআরের প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে নিহতদের পরিচয় দেয়া হয়েছে। নিহত মেজর মো. মাহফুজুল হকের বাড়ি মানিকগঞ্জের সিঙ্গাইরে। ১৯৯৯ সালে তিনি বাংলাদেশ মিলিটারি একাডেমিতে যোগদান করেন এবং ৪৪ বিএমএ লং কোর্সে কমিশনপ্রাপ্ত হন। নিহত ক্যাপ্টেন তানভির সালাম শান্তর বাড়ি পটুয়াখালীর বাউফলে। তিনি ২০০৯ সালে বাংলাদেশ মিলিটারি একাডেমিতে যোগ দেন এবং ৬৪ বিএমএ লং কোর্সে কমিশন প্রাপ্ত হন। নিহত কর্পোরাল মো. আজিজুল হক ৯৫ সালে সেনাবাহিনীতে যোগ দেন। তিনি বিবাহিত ও ১ পুত্র ও ১ কন্যার জনক। নিহত সৈনিক মো. শাহীন আলমের বাড়ি বগুড়ার আদমদীঘি। তিনি বিবাহিত ও এক সন্তানের জনক। সর্বশেষ লাশ উদ্ধার হওয়া সৈনিক মো. আজিজুর রহমানের বাড়ি মাদারীপুরে। তিনি বিবাহিত এবং এক কন্যার জনক।