প্রচ্ছদ প্রতিবেদন

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাথে আনুষ্ঠানিক বৈঠককালে সুইডেনের প্রধানমন্ত্রী স্টিফেন লোফভেন : বাংলাদেশের আর্থসামাজিক উন্নয়নে সুইডেনের সহযোগিতার আশ্বাস


বিশেষ প্রতিবেদক : বাংলাদেশের আর্থসামাজিক উন্নয়নে সুইডেন অব্যাহতভাবে সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছে। ঢাকা ও স্টকহোম অর্থনৈতিক সহযোগিতার খাতসমূহে সম্পর্কোন্নয়ন এবং দ্বিপক্ষীয় সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ (এফডিআই) আরও উৎসাহিত করার ব্যাপারে একসঙ্গে কাজ করতে সম্মত হয়েছে। দুই দেশের নেতৃবৃন্দ অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও বিনিয়োগের লক্ষ্যে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য ও বিনিয়োগ বৃদ্ধিতে সদিচ্ছা প্রকাশ করেছেন। ১৫ জুন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও সুইডেনের প্রধানমন্ত্রী স্টিফের লোফভেনের মধ্যে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক শেষে এক যৌথ বিবৃতিতে একথা বলা হয়।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সুইডেনের প্রধানমন্ত্রী স্টিফেন লোফভেনের আমন্ত্রণে ৩ দিনের রাষ্ট্রীয় সফরে ১৪ জুন সুইডেন যান। বাংলাদেশ ও সুইডেনের মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠার ৪৫ বছরের ইতিহাসে এই প্রথম বাংলাদেশের কোনো সরকার প্রধান স্টকহোম সফর করেন। ১৯৭২ সালের ৪ ফেব্র“য়ারি সদ্যস্বাধীন বাংলাদেশকে সুইডেন স্বীকৃতি প্রদান করে। তখন থেকেই পল্লী কর্মসংস্থান, পল্লী অবকাঠামো, মানবাধিকার, প্রাথমিক শিক্ষা, স্বাস্থ্য এবং লিঙ্গ সমতাসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ খাতের উন্নয়নে সুইডেন বাংলাদেশকে সহায়তা দিয়ে আসছে।
যৌথ বিবৃতিতে বলা হয়, দুই প্রধানমন্ত্রী উভয় দেশের সম্পর্ক উচ্চতর পর্যায়ে নিয়ে যেতে একসঙ্গে কাজ করতে সম্মত হয়েছেন। তারা গত বছরের সেপ্টেম্বরে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সুইডেন সফরকালে দুই দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর মধ্যে এমওইউ স্বাক্ষরে সন্তোষ প্রকাশ করেন। উভয় প্রধানমন্ত্রী উৎপাদনশীলতা ও প্রবৃদ্ধি অর্জনে বৈশ্বিক চুক্তির অবকাঠামোর আওতায় সহযোগিতা করতে দৃঢ় অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন।
সুইডেনের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ‘রেডিমেড গার্মেন্টস ট্রিপাটি কনসালটেটিভ কাউন্সিল’-এর প্রতি সমর্থন ঘোষণাকে স্বাগত জানান। বাংলাদেশের নাগরিকদের প্রশিক্ষণ ও বৃত্তি প্রদানে সুইডেন সরকারের চলমান কর্মসূচির প্রতি স্বাগত জানিয়েছে ঢাকা। উভয় দেশের মধ্যে সহযোগিতার আরও নতুন নতুন ক্ষেত্র উন্মোচনে বিশেষ করে শিক্ষা ও গবেষণায় উৎসাহ প্রদানে বাংলাদেশ ও সুইডেন সরকার একমত হয়েছে। দুই প্রধানমন্ত্রী এসডিজিসহ ‘২০৩০ এজেন্ডা ফর সাসটেইনেবল ডেভেলপমেন্ট’ বাস্তবায়নে অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন।
যৌথ বিবৃতিতে বলা হয়, সুইডেন ও বাংলাদেশ মানবাধিকার আইন এবং নিরাপত্তা পরিষদসহ একটি শক্তিশালী জাতিসংঘ ব্যবস্থা, বহুমুখী সহযোগিতা এবং আন্তর্জাতিক আইনের প্রতি দৃঢ় সমর্থন ঘোষণা করছে। তারা জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা অভিযান ও শান্তি প্রতিষ্ঠা কর্মকা- এবং আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তার প্রতি অবদানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার কথা স্বীকার করেন। উভয় প্রধানমন্ত্রী দুই দেশে সম্প্রতি ঘটে যাওয়া সন্ত্রাসী কর্মকা-ের তীব্র নিন্দা করেন। তারা সন্ত্রাসী কর্মকা-ে ক্ষতিগ্রস্তদের প্রতি সহানুভূতি প্রকাশ করেন। তারা সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে একযোগে কাজ করারও অঙ্গীকার করেন। তারা সুইডেন ও বাংলাদেশের মধ্যে অভিবাসন এবং উন্নয়ন খাতে উদীয়মান ঘনিষ্ঠ অংশীদারিত্বকে স্বাগত জানান।
সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে
একযোগে কাজ করার অঙ্গীকার
বাংলাদেশ এবং সুইডেন সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে লড়াই এবং সহযোগিতার নতুন ক্ষেত্র হিসেবে জ্বালানি নিরাপত্তা, প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন, ব্যবসা এবং নগর উন্নয়নে একযোগে কাজ করতে অঙ্গীকারবদ্ধ হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং সুইডিশ প্রধানমন্ত্রী স্টিফেন লোফভেনের মধ্যে দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে দুই দেশের মধ্যে এই মতৈক্য হয়। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার এই দ্বিপাক্ষিক সফরের মধ্য দিয়ে দুই দেশের মধ্যে সম্পর্কের ক্ষেত্রে নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয়েছে। বৈঠকে দুই নেতা দুই দেশের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয়ে বিস্তারিত আলাপ-আলোচনা করেন এবং উভয় দেশের মধ্যে সহযোগিতার জন্য জ্বালানি নিরাপত্তা, প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন, ব্যবসা এবং নগর উন্নয়ন খাতকে চিহ্নিত করেন। বৈঠকে সুইডিশ প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, ‘বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর সুইডেন সফরের মধ্য দিয়ে দুই দেশের মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি সম্পর্কের দুয়ারও উন্মোচিত হয়েছে।’ এই প্রসঙ্গে সুইডেনের প্রধানমন্ত্রী স্টিফেন লোফভেন শেখ হাসিনার সঙ্গে আলোচনা করেন কিভাবে এই স্ক্যান্ডিনেভিয়ান দেশটি বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণে সহযোগিতা করতে পারে। সুইডেনের প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশকে প্রযুক্তিগত উদ্ভাবনের বিষয়ে সহযোগিতা করতে আগ্রহ প্রকাশ করেন এবং এক্ষেত্রে তাদের বেসরকারি খাতের ভূমিকাও তিনি তুলে ধরেন। সুইডেনের প্রধানমন্ত্রী বলেন, এক্ষেত্রে এ দুটি দেশের ব্যবসাবাণিজ্য সম্প্রসারণের ব্যাপক সম্ভাবনা রয়েছে।
বিনিয়োগ ফোরামের বাণিজ্য সংলাপে
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভাষণ
১৬ জুন সুইডিশ প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের রোজেনব্যাড সম্মেলন কেন্দ্রে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বাংলাদেশ-সুইডেন বিনিয়োগ ফোরামের বাণিজ্য সংলাপে ভাষণ দেন। সেখানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা অভিন্ন সমৃদ্ধি ও দুই দেশের মানুষের জীবনযাত্রার উন্নয়নে বিনিয়োগ ও বাণিজ্যে বাংলাদেশের অংশীদার হতে সুইডেনের বাণিজ্য ও শিল্প নেতৃবৃন্দকে আমন্ত্রণ জানিয়ে বলেন, আমি দুই দেশের সমৃদ্ধি ও মানুষের জীবনযাত্রার মানোন্নয়নে বিনিয়োগ, ব্যবসা ও উদ্ভাবনী বাণিজ্যে আমাদের অংশীদার হতে সুইডেনের ব্যবসায়ী ও শিল্প নেতৃবৃন্দকে জোরালোভাবে উৎসাহিত করছি।
শেখ হাসিনা বলেন, দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশের বিনিয়োগ নীতি খুবই উদার। এখানে ব্যবসাবাণিজ্যের ব্যয় তুলনামূলকভাবে কম। আমরা ইইউ, অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, ভারত, জাপান ও নিউজিল্যান্ডের কাছ থেকে শুল্কমুক্ত ও কোটামুক্ত সুবিধা ভোগ করি। বাংলাদেশে ১০০টি বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তোলা হচ্ছে এবং এ ধরনের অর্থনৈতিক অঞ্চল জিটুজি ভিত্তিতে বিশেষভাবে চীন, ভারত ও জাপানকে বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। আমরা অনেক হাইটেক পার্কও গড়ে তুলছি। আমি আমাদের উন্নয়ন প্রয়াসে অংশীদার হতে সুইডেনের কোম্পানিগুলোকে আমন্ত্রণ জানাচ্ছি।
শেখ হাসিনা বলেন, আমি জেনে আনন্দিত যে সুইডেন ও বাংলাদেশে অবস্থিত উভয় দেশের বাণিজ্য পরিষদের মধ্যে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হচ্ছে। আমি বিশ্বাস করি এ পদক্ষেপ দুই দেশের বাণিজ্যে ঘনিষ্ঠ সহযোগিতা প্রতিষ্ঠায় সহায়ক হবে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সময় থেকে বাংলাদেশ সুইডেন সম্পর্কের কথা উল্লেখ করে বলেন, প্রধানমন্ত্রী উলফ পার্মের নেতৃত্বাধীন সরকার ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে সংহতি প্রকাশ করে এবং ১৯৭২ সালের ৪ ফেব্র“য়ারি ইউরোপের প্রথম সমর্থনকারী দেশগুলোর মধ্যে সুইডেন বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেয়। সে সময় থেকে এ সম্পর্ক জোরদার থেকে আরো জোরদার হয়ে বর্তমানে অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে তা গভীর ও শক্তিশালী হয়েছে।
শেখ হাসিনা বলেন, আজকের এ আয়োজন দুই দেশের বাণিজ্য-বিনিয়োগের লক্ষ্যসমূহ অর্জনে আরও উৎসাহ জোগাবে। আমি বিশ্বাস করি দুই দেশের বিজনেস কমিউনিটি মতামত ও অভিজ্ঞতা বিনিময় ও তথ্য ব্যবহারে এ সুযোগ কাজে লাগাবে। তৈরি পোশাক খাতে বাংলাদেশ একটি সফল দেশ এবং এ দেশ এখন বিশ্বে দ্বিতীয় বৃহৎ পোশাক রপ্তানিকারক দেশ। তৈরি পোশাক খাতের মতো অন্যান্য খাতেরও উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি সাধিত হচ্ছে। আমাদের ওষুধ বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রসহ ১২৭টি দেশে রপ্তানি হয়। মেধা শিল্প, আইসিটি ও সংশ্লিষ্ট অন্যান্য খাতও দ্রুত বিকশিত হচ্ছে। জাহাজ নির্মাণ শিল্পও সম্প্রসারিত হচ্ছে। এখন সমুদ্রগামী হালকা ও মাঝারি আকারের জাহাজ বাংলাদেশে নির্মিত হচ্ছে।
শেখ হাসিনা বলেন, বাংলাদেশ দারিদ্র্য বিমোচন, খাদ্য নিরাপত্তা, স্বাস্থ্য ও স্যানিটেশন, নারীর ক্ষমতায়ন এবং সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর মতো ক্ষেত্রগুলোতে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি সাধন করেছে। বাংলাদেশে কৃষিভিত্তিক অর্থনীতি থেকে দ্রুত একটি অর্থনৈতিক পরিবর্তন এসেছে। দেশে এখন প্রক্রিয়াভিত্তিক, বহুমুখীকরণ এবং মূল্য সংযোজন অর্থনীতি রূপান্তরিত হচ্ছে। বাংলাদেশ ইনক্লুসিভ উন্নয়নের জন্য একটি রোল মডেল হিসেবে বিশ্বে স্বীকৃতি লাভ করেছে। গত ফেব্র“য়ারি মাসে প্রাইস অথারহাউস কুপার্সের এক প্রতিবেদনে বাংলাদেশকে আগামী তিন দশকের মধ্যে দ্রুত ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক অগ্রসরমান তিনটি দেশের মধ্যে একটি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। বাংলাদেশের অর্থনীতি বিশ্বব্যাপী স্বীকৃত। এ বছর আমরা ৭ দশমিক ২৪ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছি। জনসংখ্যার তুলনায় ভূমি কম হলেও বাংলাদেশ খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করেছে। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সোনার বাংলা গড়ার স্বপ্ন বাস্তবায়নে ২০২১ সালের মধ্যে দেশ ডিজিটালাইজড মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হতে যাচ্ছে।
অনুষ্ঠানে সুইডেনের এন্টারপ্রাইজ ও ইনোভেশনমন্ত্রী বক্তব্য রাখেন। এছাড়া এফবিসিসিআইয়ের সভাপতি সফিউল ইসলাম মহিউদ্দিন এবং বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান কাজী আমিনুল ইসলামও বক্তব্য রাখেন। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সিনিয়র সচিব সুরাইয়া বেগম এবং শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের সচিব মিকাইল শিপার প্যানেল আলোচনায় অংশ নেন। অনুষ্ঠানে সুইডেনের ব্যবসায়ী নেতৃবৃন্দ এবং বাংলাদেশের ব্যবসায়ী প্রতিনিধিদলের সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন।
দুই দেশের মধ্যে ব্যবসাবাণিজ্য ও বিনিয়োগের ক্ষেত্রে সহযোগিতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে সুইডেন-বাংলাদেশ বিজনেস কাউন্সিল, স্টকহোম এবং নরডিক চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির মধ্যে একটি সমঝোতা চুক্তি স্বাক্ষর হয়। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং সুইডেনের এন্টারপ্রাইজ ও ইনোভেশনমন্ত্রী এ সময় উপস্থিত ছিলেন।
দুই সুইডিশ কোম্পানির
বাংলাদেশে বিনিয়োগে আগ্রহ
শীর্ষ স্থানীয় দুটি সুইডিশ কোম্পানি দি ইনভেস্টর এবি এবং এবিবি সুইডেন বাংলাদেশের বিদ্যুৎ ও তৈরি পোশাক খাতের উন্নয়নে কাজ করতে আগ্রহ দেখিয়েছে। ইনভেস্টর প্রেসিডেন্ট জ্যাকব ওয়ালেনবার্গ, ইনভেস্টর ভাইস প্রেসিডেন্ট মারকাস ওয়ালেনবার্গ এবং এবিবি সুইডেনের জন সোডারস্টর্ম ১৬ জুন গ্র্যান্ড হোটেলে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে পৃথক সাক্ষাৎকালে তারা এ আগ্রহের কথা জানান। সাক্ষাতে ইনভেস্টর এবি এবং এবিবি সুইডেনের শীর্ষ নির্বাহীরা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার গতিশীল নেতৃত্বে দেশের সমৃদ্ধি এবং ব্যাপক আর্থসামাজিক উন্নয়নের প্রশংসা করেন। শেখ হাসিনা দেশের উন্নয়নে সরকারের বিভিন্ন পদক্ষেপের ব্যাপারে তাদের অবহিত করেন। পরে এইচ অ্যান্ড এম-এর প্রেসিডেন্ট ও সিইও কার্ল যোহান পার্সন প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে তাঁর হোটেল কক্ষে সাক্ষাৎ করেন। বৈঠককালে প্রধানমন্ত্রী তৈরি পোশাক খাতের উন্নয়নে তাঁর সরকারের গৃহীত পদক্ষেপ তুলে ধরেন।
প্রবাসী বাংলাদেশিদের দেয়া
নাগরিক সংবর্ধনায় প্রধানমন্ত্রী
১৫ জুন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা স্টকহোমের সিটি কনফারেন্স সেন্টারে প্রবাসী বাংলাদেশিদের দেয়া এক নাগরিক
সংবর্ধনায় যোগ দেন। সেখানে দেয়া বক্তৃতায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সুস্থ রাজনীতিতে ফিরে আসার জন্য বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, হত্যা, লুটপাট ও দুর্নীতির রাজনীতি বাদ দিয়ে আগামী নির্বাচনে অংশ নিন। আমরা চাই গণতন্ত্রের ধারা অব্যাহত থাকুক। আমরা চাই তারা (বিএনপি) পুনরায় নির্বাচন থেকে সরে যাওয়ার মতো ভুল না করুক। আমরা চাই তারা নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবে এবং জনগণ বিচার করবে কারা ক্ষমতায় আসবে।
শেখ হাসিনা বলেন, খালেদা জিয়া দেশের কোনো উন্নয়নে স্বস্তিবোধ করেন না এবং তিনি সর্বদা দেশের ধ্বংস দেখতে চান, উন্নয়ন নয়। বাংলাদেশ খারাপ পরিস্থিতির দিকে যাচ্ছে খালেদা জিয়ার এই মন্তব্য তুলে ধরে শেখ হাসিনা বলেন, বাংলাদেশ খারাপ পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে না বরং যারা এতিমের অর্থ আত্মসাৎ করেছে, যারা মামলার মুখোমুখি হতে ভয় পায় এবং দেড়শবার রিট দাখিল সত্ত্বেও উচ্চ আদালতে মামলায় হেরে যায়, তাদেরই দুর্দিন যাচ্ছে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশের মানুষ যখন ভালো থাকেন বিএনপি নেতা তখন স্বস্তি অনুভব করেন না। তারা স্বস্তি অনুভব করেন যখন তারা লোকদের হত্যা করেন এবং দেশের সম্পদ ধ্বংস করেন। যখন বিএনপি ক্ষমতায় ছিল তখন হাওয়া ভবন খুলে জনসাধারণের অর্থ লুট করেছে এবং অবাধে দুর্নীতি করেছে। খালেদা জিয়া শুধু লুট ও কমিশন নেয়া জানে এবং তারা কেবলমাত্র জানে কিভাবে সম্পদ ধ্বংস করতে হয়।
১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের মর্মান্তিক হত্যাকা-ের সঙ্গে পুনরায় জিয়াউর রহমানের সম্পৃক্ততার অভিযোগ তুলে আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা বলেন, বিএনপি নেতারা ২১ আগস্টের গ্রেনেড হামলা এবং ১০ ট্রাক অস্ত্রের চালানের সঙ্গে যুক্ত। তারা আমার জীবননাশের কয়েকবার চেষ্টা করেছে, কিন্তু আমি রাজনীতি, দেশ এবং জনগণের স্বার্থে এই ঘটনাগুলো ভুলে যাওয়ার চেষ্টা করেছি। শেখ হাসিনা ২০১৩, ২০১৪ এবং ২০১৫ সালে বিএনপি-জামায়াতের হত্যা ও ধ্বংসযজ্ঞের কথা উল্লেখ করে বলেন, বিএনপি হত্যা ছাড়া অন্য কিছুই বুঝে না এবং ধ্বংসের বাইরে কোনো কিছুই জানে না। দেশবাসীর ওপর বিএনপি যে নির্যাতন চালিয়েছে, জনগণ তা ভুলবে না।
শেখ হাসিনা দেশের উন্নয়নের পাশাপাশি জনগণের সামনে বিএনপির সন্ত্রাসী কার্যক্রম তুলে ধরার জন্য প্রবাসী বাংলাদেশিদের প্রতি আহ্বান জানান। এ পর্যায়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, জনগণকে অবহিত করতে হবে যে বিএনপি একটি জঙ্গি ও সন্ত্রাসী সংগঠন এবং তারা মানুষ পুড়িয়ে হত্যা করেছে। জনগণের সামনে তাদের চরিত্রকে উন্মোচিত করতে হবে।
একনজরে প্রধানমন্ত্রীর সুইডেন সফর
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সুইডিশ প্রধানমন্ত্রী স্টিফেন লোফভেনের আমন্ত্রণে তিন দিনের দ্বিপক্ষীয় সফরে ১৪ জুন রাতে স্টকহোম পৌঁছলে তাঁকে লালগালিচা সংবর্ধনা দেয়া হয়। স্ক্যান্ডিনেভিয়ান এয়ার লাইন্সের একটি বিমান প্রধানমন্ত্রী ও তাঁর সফরসঙ্গীদের নিয়ে স্থানীয় সময় রাত ৯টা ৪০ মিনিটে সুইডিশ রাজধানীর আরলান্ডা বিমানবন্দরে অবতরণ করে। সুইডিশ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের চিফ অব প্রটোকল অ্যাম্বাসেডর ক্লাস মোলিন, স্টকহোমে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত গোলাম সারোয়ার এবং ঢাকায় নিযুক্ত সুইডিশ রাষ্ট্রদূত যোহান ফ্রিসেল বিমানবন্দরে প্রধানমন্ত্রীকে অভ্যর্থনা জানান।
পরে সুইডিশ সশস্ত্র বাহিনী প্রধানমন্ত্রীকে গার্ড অব অনার প্রদান করে। ঢাকা থেকে স্টকহোম যাওয়ার পথে শেখ হাসিনা লন্ডনে প্রায় ২৪ ঘণ্টা যাত্রাবিরতি করেন। স্টকহোমের আরলান্ডা বিমানবন্দর থেকে প্রধানমন্ত্রীকে মোটর শোভাযাত্রা সহকারে গ্র্যান্ড হোটেলে নিয়ে যাওয়া হয়। সুইডেন সফরকালে তিনি সেখানেই অবস্থান করেন। শেখ হাসিনা হোটেলে পৌঁছলে সেখানে অল-ইউরোপিয়ান আওয়ামী লীগ নেতারা তাঁকে স্বাগত জানান। এ সফরকালে প্রধানমন্ত্রী ৪৭ সদস্যের ব্যবসায়ীসহ একটি উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দেন। এ সফরে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কনিষ্ঠ কন্যা শেখ রেহানাও প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে ছিলেন।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা স্টকহোমে ১৫ জুন ব্যস্তদিন অতিবাহিত করেন। তিনি সুইডেনের প্রধানমন্ত্রী স্টিফেন লোফভেনের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক আলোচনাসহ বেশ কয়েকটি কর্মসূচিতে যোগ দেন। শেখ হাসিনা পরে তাঁর সম্মানে আয়োজিত সুইডেনের প্রধানমন্ত্রীর সান্ধ্য ভোজে অংশ নেন। এর আগে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা রয়্যাল ক্যাসল-এ সুইডেনের রাজা ষোড়শ কার্লের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। প্রধানমন্ত্রী সুইডেনের পার্লামেন্ট পরিদর্শন করেন এবং ভারপ্রাপ্ত স্পিকার তোবিয়াস বিলসট্রোমের সঙ্গে বৈঠকে মিলিত হন। সুইডেনের উপ-প্রধানমন্ত্রী ইসাবেল্লা লাভিন এবং বিচার ও অভিবাসন মন্ত্রী মরগান জোহানসন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন।