কলাম

বাজেট ২০১৭-১৮ : সময় এখন বাংলাদেশের

ধীরাজ কুমার নাথ : সমৃদ্ধির মহাসড়কে বাংলাদেশের নিরন্তর অভিযাত্রা চলতেই থাকবে, সময় এখন আমাদের, সময় এখন বাংলাদেশের, এমন একটি লক্ষ্য ও বাসনা নিয়ে ১ জুন এবারের বাজেট ২০১৭-১৮ মহান জাতীয় সংসদে উপস্থাপিত হয়েছে। নবমবারের মতো বাজেট উপস্থাপনকালে প্রবীণ ও অভিজ্ঞ অর্থমন্ত্রীকে মনে হয়েছে তারুণ্যের প্রতিবিম্ব, প্রাণপ্রাচুর্যে ভরা উদ্যমী এক মহান ব্যক্তিত্ব। ধন্যবাদ অর্থমন্ত্রীকে বর্ণাঢ্য এক রূপকল্প উপহার দেয়ার জন্য।
বাংলাদেশের ইতিহাসে ২০১৭-১৮ অর্থবছরের বাজেট হচ্ছে দেশের বৃহত্তম বাজেট, যার আকার হচ্ছে ৪ লাখ ২৬৬ কোটি টাকা। অর্থমন্ত্রীর ভাষায় এ হচ্ছে সাফল্যের এক বছর। অবশ্যই দেশ অগ্রগতির পথে চলছে। কিন্তু কথা হচ্ছে তার মাত্রা আরও দ্রুত হতে হবে, তা না হলে দেশ আগামী ৪ বছরে মধ্যম আয়ের দেশ হিসেবে পরিচিতি লাভ করবে কিভাবে? কিভাবে ২০৪১ সালে দেশ উন্নত রাষ্ট্র হিসেবে বিশ্বের দরবারে পরিচিতি লাভ করার স্বপ্ন বাস্তবায়িত হবে?
উল্লেখ্য, তৎকালীন অর্থমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ যখন ১৯৭২-৭৩ অর্থবছরের বাজেট জাতীয় সংসদে পেশ করেন, তখন এর আকার ছিল মাত্র ৭৮৬ কোটি টাকা এবং পরবর্তী অর্থবছরে এর পরিমাণ ছিল মাত্র ৯৯৫ কোটি টাকা। আমাদের স্বাধীনতার জঘন্যতম শত্র“ হেনরি কিসিঞ্জার এমন একটি দুর্বল অবস্থান দেখে বলেছিলেন, এ হচ্ছে বাংলাদেশ এক তলাবিহীন ঝুড়ি। তার ধারণা ছিল, মুসলিম বাংলার অনুসারীরা শিগগিরই বাংলাদেশকে পাকিস্তানে পরিণত করে ফেলবে। কথাটি মনে হবে অপ্রাসঙ্গিক, কিন্তু স্বাধীনতা যুদ্ধের ভয়াবহ দিনগুলোর কথা মনে হলে এবং আমাদের চরম বিরোধীদের ব্যঙ্গ-বিদ্রƒপের কথা স্মৃতির পাতায় উঠে এলে এমন সব কথা না বলে পারি না। ১৯৭২-৭৩ সালের বাজেটের আকার ছিল ক্ষুদ্র, কিন্তু অর্থমন্ত্রী তাজউদ্দীন তার ঐতিহাসিক ভাষণে জাতিকে যে স্বপ্ন দেখিয়েছিলেন বাংলাদেশের ইতিহাসে সেই ভাষণ এখনো শ্রেষ্ঠ ভাষণ হিসেবে চিহ্নিত হয়ে আছে। অর্থের আকার ও ব্যয়ের পরিধি বড় কথা নয়, বড় হচ্ছে জাতির সামনে স্বপ্ন কী? কী হতে চাই আমরা? ভারতের সাবেক রাষ্ট্রপতি এপিজে আবদুল কালামের ভাষায় বলতে হয়, ‘ঘুমের মধ্যে তুমি যা দেখো তা স্বপ্ন নয়, স্বপ্ন হচ্ছে তাই, যা তোমাকে ঘুমাতে দেয় না।’
এবারের বাজেট বক্তৃতা ছিল হিসাব-নিকাশে ভরা এক পরিসংখ্যানমূলক কথামালা। কিন্তু ২০২১ সালে মধ্যম আয়ের দেশ হতে পারবে কি না বাংলাদেশ অথবা ২০৪১ সালে উন্নত দেশের প্রস্তুতি কী আছে তার আভাস মেলেনি দীর্ঘক্ষণের কথামালায়। বাজেট বক্তৃতায় উঠে এসেছে ২০১৭-১৮ সালের প্রস্তাবিত ব্যয় ৪ লাখ ২৬৬ কোটি টাকা, উন্নয়ন ব্যয় ১ লাখ ৬৪ কোটি ২৮৬ কোটি ও অনুন্নয়ন ব্যয় ২ লাখ ৩৫ হাজার ৯৮০ কোটি টাকা। তারপর এসেছে রাজস্ব আয় ২ লাখ ৮৮ হাজার কোটি টাকা, ঘাটতি হচ্ছে ১ লাখ ১২ হাজার ২৬৬ কোটি টাকা।
বাজেটের আকারের চেয়েও বড় হয়ে উঠে এসেছে ভ্যাট আইনের বাস্তবায়ন, ভ্যাট আইনের সহজীকরণ ও ভ্যাট অব্যাহতির কথা কাহিনি। আয়করকে গুরুত্ব না দিয়ে ভ্যাট আদায়ের প্রতি অধিক গুরুত্ব দেয়াকে অনেকে মনে করেন, অর্থনীতির মূলধারা থেকে ব্যতিক্রমধর্মী ভাবনার প্রভাবও প্রসার লাভ করেছে। আগামী ২০১৭-১৮ অর্থবছরে করমুক্ত আয়সীমা বাড়বে না, অর্থাৎ আড়াই লাখ টাকার বেশি আয় হলেই কর দিতে হবে। আর পণ্য ও সেবায় ভ্যাটের হার ১৫ শতাংশই থাকছে। এর ফলে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের উদ্যোক্তারা ক্ষতিগ্রস্ত হবেন, যার প্রভাব অবশ্যই পড়বে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের ওপর। তবে ১ হাজার ৫৭৯টি পণ্য ভ্যাট অব্যাহতি পাবে।
অর্থমন্ত্রী বলেছেন, জাতীয় প্রবৃদ্ধির হার হবে ৭ দশমিক ৪ শতাংশ, বর্তমানে যা আছে ৭ দশমিক ২ শতাংশ। অর্থাৎ আগামী অর্থবছরে বৃদ্ধি পেতে পারে মাত্র শূন্য দশমিক ২ শতাংশ, যা বাংলাদেশকে মধ্যম আয়ের দেশ হিসেবে উপস্থাপন করতে সক্ষম হবে বলে অনেকেই মনে করেন না। অর্থমন্ত্রী বলেছেন, মূল্যস্ফীতি হতে পারে মাত্র ৫ দশমিক ৫ শতাংশ। কিন্তু ভ্যাট বাড়লে, গ্যাসের দাম বাড়ানো হলে মূল্যস্ফীতি এমন একটি পরিসীমার মাঝে সীমাবদ্ধ রাখা সম্ভব হবে কিভাবে?
জাতীয় রাজস্ব বোর্ড করদাতার সংখ্যা বাড়ানোর জন্য কর মেলা ছাড়াও কত বড় বড় আয়োজন, বিজ্ঞাপন দিয়ে চলেছে দীর্ঘদিন ধরে; কিন্তু কোথায় তার ফল। করদাতার সংখ্যা মাত্র ২৫ লাখ থেকে বেড়ে হতে পারে ২৯ লাখ, যা নেহাতই কম এবং হতাশাব্যঞ্জক। করদাতার সংখ্যা বাড়াতে হবে, কর রেয়াতের কৃষ্টি থেকে বেরিয়ে আসতে হবে, যদি দেশ উন্নত হতে চায়। কর বিভাগের কর্মকর্তাদের সততা ও নিষ্ঠার প্রতি জোরদানের কথা বলা হয়নি একবারও। অথচ দেশের মানুষের এ নিয়ে অনেক বেদনার উপাখ্যান আছে। মানুষ কর দিতে চায়, কর দিতে গিয়ে অপমান ও লাঞ্ছনার শিকার হতে চায় না। ‘কর বাহাদুর পরিবার’ বলা হবে তাদের, যারা পরিবারের সবাই কর দেন। কথাটি শুনতে ভালো লাগে, তবে যারা বরাবর কর ফাঁকি দেন তাদের কী হবে?
দেশে রেমিট্যান্স হ্রাস পেয়েছে প্রায় ১৬ শতাংশ। বাজেটে বলা হয়েছে, এই বৈদেশিক মুদ্রার প্রবাহ বাড়াতে হবে এবং একই সঙ্গে দেশের মধ্যে সেই অর্থ বিনিয়োগের সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে। কিন্তু বেশ কিছুদিন ধরে পত্রপত্রিকায় বড় করে খবর আসছে অনেকেই হাজার হাজার কোটি টাকা চোরাই পথে বিদেশে পাচার করছে। এ বিষয়টি সম্পর্কে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে কোনো একটা বক্তব্য থাকলে জনগণ বা বিশিষ্টজনরা ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা আশার আলো দেখতে পেতেন। সরকার এসব ব্যাপারে কঠোর, এমন একটি মনোভাবের বহিঃপ্রকাশ দৃশ্যমান হতে পারত। এখন অনেকেই সমালোচনা করছেন, এভাবে বিদেশে অর্থ পাচারের সঙ্গে রাজনীতিবিদরা জড়িত বলে কি বিষয়টি বড় হয়ে উঠে আসেনি?
সামাজিক নিরাপত্তাবেষ্টনীতে অনেক সংযোজন হয়েছে এবার। একটি জনকল্যাণমুখী রাষ্ট্রের কাছ থেকে এই হচ্ছে বড় ধরনের প্রত্যাশা। কিন্তু ক্ষুদ্র সঞ্চয়ের পরিধি ও সুযোগকে বৃদ্ধি করার লক্ষ্যে নিত্যনতুন কর্মসূচি উপহার দিতে না পারলে পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর পক্ষে মধ্যম আয়ের মাত্রায় উঠে আসা সম্ভব হবে না। সেই সুযোগ সৃষ্টি হয়নি। পক্ষান্তরে ১ লাখ টাকা রাখলে তার ওপর আবগারি শুল্কের পরিমাণ বাড়িয়ে ৮০০ টাকা করা হলো, এ কেমন হিসাব। এতে মনে হয় পুরো বাজেট হচ্ছে সরকারের রাজস্ব আহরণের এক প্রক্রিয়ামাত্র, সুশাসন ও সমৃদ্ধি অর্জনের ভাবনা থেকে বাজেট প্রণীত হয়নি।
শিক্ষা, প্রযুক্তি, জনসেবা, পরিবহন ও যোগাযোগ খাতে বরাদ্দ বৃদ্ধি পাবে; কিন্তু স্বাস্থ্য খাতের কথা তেমনটি জোরদারভাবে আসেনি সত্যি। তবে সরকার এবারের চতুর্থ স্বাস্থ্য জনসংখ্যা পুষ্টি খাতভিত্তিক প্রকল্পে ৮৪ শতাংশ অর্থায়নের ঘোষণা দিয়ে সরকারের সদিচ্ছা প্রকাশ করেছে। অনেকের মতে, স্বাস্থ্যবীমা চালু করতে না পারলে সরকারি কোষাগার থেকে অর্থ দিয়ে জনস্বাস্থ্য সংরক্ষণ করা কঠিন হবে। সামাজিক সুরক্ষা খাতে মোট বাজেটের ৬ শতাংশ রাখা হয়েছে এবং টাকার পরিমাণে সামাজিক নিরাপত্তা ও কল্যাণ খাতে প্রায় ২৪ হাজার ৪৮৯ কোটি টাকা রাখা হয়েছে; যার পরিমাণ চলতি অর্থবছর থেকে প্রায় ২ হাজার ৭৪৩ কোটি টাকা বেশি। কিন্তু যে দেশে ২৪ শতাংশ লোক এখনো দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাস করে এবং ৯ দশমিক ৯ শতাংশ লোক হতদরিদ্র, সেই দেশে সামাজিক নিরাপত্তার পরিধি আরও অধিক হতে হবে।
অনেকের ভাবনা হচ্ছে, উন্নয়নের মহাসড়কে পদচারণা করতে হলে গতানুগতিক বাজেট দিয়ে চলবে না, সংস্কার করতে হবে অনেক, বিশেষ করে প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধির প্রতিটি পদক্ষেপে। অর্থমন্ত্রী তার বাজেট বক্তৃতায় নানা সংস্কারের আভাস দিয়েছেন, বিশেষ করে বিনিয়োগ পরিবেশের উন্নয়ন, বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল সক্রিয় করা, দেশে দক্ষ শ্রমশক্তি সৃষ্টি করা এবং শিক্ষা ও প্রযুক্তি খাতে আমূল পরিবর্তন সাধনের ইচ্ছা পোষণ করেছেন। কিন্তু দুর্ভাগ্য হলেও সত্য যে, ব্যাংক-বীমা খাতে যে দৃশ্যমান দুর্নীতি দেশবাসীকে বিচলিত করছে প্রতিনিয়ত, তার প্রতি অর্থমন্ত্রী খুব একটা মনোযোগ দেননি বলেই জনগণের প্রত্যাশা এ ক্ষেত্রে তিনি পূরণ করতে পারেননি।
তবে বাজেট বক্তৃতায় প্রমাণিত হয়নি অর্থমন্ত্রী জাতীয় নির্বাচন সামনে রেখে বাজেট প্রণয়ন করেছেন। এই বাজেট সত্যিই উন্নয়নের মহাসড়কে অভিযাত্রার কথাই বারবার বলেছে এবং তা-ই হচ্ছে সত্যি ও বাস্তবতা।
লেখক : সাবেক সচিব