রাজনীতি

শেখ হাসিনা সরকারের অধীনেই নির্বাচনে যাবে বিএনপি!

নিজস্ব প্রতিবেদক : শেখ হাসিনা সরকারের অধীনেই যে বিএনপি একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নেবে, তার আলামতই ধীরে ধীরে স্পষ্ট হচ্ছে বলে মনে করছেন অনেক রাজনৈতিক বিশ্লেষক। ইতোমধ্যে গত ১৪ জুন ধানের শীষের পক্ষে ভোট চেয়েছেন দলটির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া। ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে খালেদা জিয়া জনগণের কাছে ধানের শীষের পক্ষে ভোট চেয়েছিলেন। দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি অংশ না নেয়ায় ভোট চাওয়ার প্রয়োজন হয়নি। সে হিসাবে বলা চলে ৯ বছর পর জাতীয় সংসদ নির্বাচনের জন্য ধানের শীষের পক্ষে ভোট চাইলেন খালেদা জিয়া। তাঁর এই ভোট চাওয়ার মধ্য দিয়ে স্পষ্ট হলো শেখ হাসিনা সরকারের অধীনেই জাতীয় নির্বাচনে অংশ নেয়ার মতো ইতিবাচক রাজনীতির পক্ষে আনুষ্ঠানিকভাবে অবস্থান নিয়েছে বিএনপি। শুধু তাই নয়, সিনিয়র নেতাদের পরামর্শে বিএনপি আগামী জুলাই মাসে নির্বাচন কমিশনের (ইসি) সঙ্গে সংলাপেও যোগ দেবে। ইতোমধ্যে এর প্রস্তুতিও শুরু হয়েছে। দলটির একাধিক সিনিয়র নেতা স্বদেশ খবরকে জানান, কৌশলগত বিভিন্ন দিক পর্যালোচনা করেই নির্বাচনমুখী অবস্থান স্পষ্ট করছে বিএনপি। এর প্রথম উদ্দেশ্য হলো দলের নেতাকর্মীদের চাঙা রাখা। দ্বিতীয়ত জনগণকে দেখানো যে বিএনপি নির্বাচনের মাঠে নেমে গেছে। কিন্তু সুষ্ঠু নির্বাচনের স্বার্থে শেষ পর্যন্ত সরকার যদি কোনো দাবি না মানে এবং বিএনপির নির্বাচন বর্জন করতে হয়, সেই দায় যেন সরকারের ওপরই বর্তায়Ñএমনটিই লক্ষ্য তাদের।
১৪ জুন বসুন্ধরা কনভেনশন সিটিতে বিএনপির এক ইফতার পার্টিতে দেয়া বক্তব্যে হঠাৎ করেই ধানের শীষের পক্ষে ভোট চেয়ে খালেদা জিয়া বলেন, ‘সরকারকে আর একতরফা নির্বাচন করতে দেয়া হবে না।’ তিনি ভোটের প্রস্তুতি নিতে দলের নেতাকর্মীদের প্রতি আহ্বান জানান। একইভাবে পরের দিন ১৫ জুনও তিনি জানান, ২০ দলীয় জোট নির্বাচনে যাবে।
হঠাৎ বিএনপি চেয়ারপারসনের নির্বাচনমুখী ওই বক্তৃতা শুনে সেদিন উপস্থিত বিএনপি নেতারাও হকচকিয়ে যান। পরে তাঁদেরকে খালেদা জিয়া জানান, ইতিবাচক রাজনীতির আবহ তৈরি করার জন্যই তিনি ধানের শীষে ভোট চেয়েছেন। সেই সঙ্গে উপস্থিত নেতাদের তিনি সাম্প্রতিক সময়ে বিএনপির স্থায়ী কমিটির বৈঠকের আলোচনা এবং গুলশান কার্যালয়ে অনানুষ্ঠানিক একাধিক বৈঠকের কথাও স্মরণ করিয়ে দেন।
জানা যায়, গত ২২ মে দলটির স্থায়ী কমিটির ওই বৈঠকে নির্বাচনে ‘যাওয়া না যাওয়া’ প্রশ্নে নেতাদের বক্তব্য তথা দলীয় অবস্থান প্রশ্নে অনানুষ্ঠানিক আলোচনা ওঠে। সিনিয়র একাধিক নেতা বৈঠকে বলেন, নির্বাচন প্রশ্নে বিএনপি নেতারা একেকজন একেক রকম বক্তব্য দিচ্ছেন। গয়েশ্বর চন্দ্র রায়ের বক্তব্যের প্রতি ইঙ্গিত করে এক নেতা বলেন, ‘নিরপেক্ষ সরকার ছাড়া কেয়ামত পর্যন্ত বিএনপি নির্বাচনে যাবে না’Ñ এ ধরনের বক্তৃতা আসছে। পাশাপাশি বিএনপি নির্বাচনে যাবেÑ ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদসহ দলের সিনিয়র বেশ কয়েকজন নেতা এ ধরনের বক্তব্য দিচ্ছেন। ফলে বিএনপির প্রকৃত অবস্থান নিয়ে নেতাকর্মীদের মধ্যে বিভ্রান্তি সৃষ্টি হচ্ছে, যা দূর করা দরকার বলে নেতারা অভিমত দেন।
এ আলোচনার পরিপ্রেক্ষিতে খালেদা জিয়া উপস্থিত সব নেতার মতামত জানতে চান। তিনি এও বলেন, বক্তব্য সবার এক সুরে হওয়া উচিত। এরপর উপস্থিত কয়েক নেতা বলেন, নির্বাচনে অংশ নেয়ার পর, এমনকি মনোনয়নপত্র জমা দেয়ার পরও তা প্রত্যাহার করে নেয়া যায়। তাছাড়া নির্বাচনে যাব নাÑ এ কথা বললে ইসি পুনর্গঠনসহ নির্বাচনমুখী যেসব তৎপরতা বিএনপি চালাচ্ছে সেগুলো নিয়েও জনমনে প্রশ্ন উঠবে বলে কয়েকজন নেতা মতামত দেন।
সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, ওই দিনের আলোচনা ছাড়াও দলের বেশ কয়েকজন সিনিয়র নেতার সঙ্গে চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার সাম্প্রতিক সময়ে নির্বাচন প্রশ্নে আলোচনা হয়। এসব আলোচনায় নেতারা যুক্তি দেন, সহায়ক সরকার না হলে নির্বাচনে যাব নাÑ এ কথা না বলে সহায়ক সরকারের দাবি পূরণ করেই নির্বাচনে যাবÑ এভাবে বলা ঠিক হবে। তাছাড়া নির্বাচনে না যাওয়ার কথা বললে নেতাকর্মীরা নিরুৎসাহিত হয়। আবার সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন নিশ্চিত করতে বর্তমানে বিএনপি নির্বাচনমুখী যেসব তৎপরতা চালাচ্ছে সে বিষয়ে সরকার কিংবা জনগণও প্রশ্ন তুলতে পারে বলে কেউ কেউ মত দেন।
বস্তুত বিএনপির নির্বাচনমুখী তৎপরতা শুরু হয় গত বছরের ১৯ মার্চ অনুষ্ঠিত জাতীয় কাউন্সিল থেকে। সেখানে খালেদা জিয়া ‘ভিশন ২০৩০’ শিরোনামে বিএনপির রূপকল্প উপস্থাপন করেন; যাতে ক্ষমতায় গেলে সুশাসন প্রতিষ্ঠায় দল কী কী পদক্ষেপ নেবে তা তুলে ধরা হয়। আবার ওই রূপকল্পই বিস্তারিত প্রস্তাব ও প্রতিশ্রুতি আকারে জনসম্মুখে উপস্থাপিত হয় গত ১০ মে। এর আগে নির্বাচন কমিশন পুনর্গঠন নিয়ে গত বছরের ২০ নভেম্বর ১৩ দফা প্রস্তাব উপস্থাপন করে বিএনপি। আর এখন নির্বাচনে যাওয়ার জন্য দলটি সহায়ক সরকার তথা নির্বাচনকালীন সরকারের সম্ভাব্য প্রস্তাব নিয়ে কাজ করছে, যা ঈদের পরে উপস্থাপন করার কথা।
এছাড়া নির্বাচনি রোডম্যাপ অনুযায়ী মধ্য জুলাইয়ে অনুষ্ঠিতব্য ইসির সঙ্গে সংলাপে অংশ নেয়ার প্রস্তুতি চলছে বিএনপিতে। বিশেষ করে গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশের (আরপিও) যেসব ধারা বিএনপি সংশোধন বা পরিমার্জন চায় সেগুলো নিয়ে প্রস্তাবনা তৈরি করা হচ্ছে। এছাড়া সংসদীয় এলাকার সীমানা পুনর্নির্ধারণ, ভোটার তালিকা হালনাগাদসহ সবার জন্য লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড তৈরির বিষয়ে বিএনপির পক্ষ থেকে যেসব দাবি বা সুপারিশ করা হবে তারও প্রস্তুতি নিচ্ছে দলটি। গত ১২ জুন এ ব্যাপারে তথ্য-উপাত্ত চেয়ে সারাদেশের তৃণমূল নেতাকর্মীদের কাছে চিঠি পাঠিয়েছেন মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। চিঠিতে সীমানা পুনর্নির্ধারণের বিষয়ে কোন কোন আসনে ঝামেলা রয়েছে সে বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য কেন্দ্রে পাঠাতে বলা হয়েছে। এছাড়া ভোটার তালিকা থেকে বিএনপি নেতাকর্মী ও সমর্থকরা যাতে বাদ না পড়ে এবং সরকার সমর্থকরা যাতে ভুয়া ভোটার না করতে পারে সেদিকে সতর্ক দৃষ্টি রাখতে বলা হয়েছে চিঠিতে। জানা যায়, তৃণমূল থেকে প্রাপ্ত তথ্য-উপাত্তের ভিত্তিতে সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো নিয়ে ইসির হস্তক্ষেপ চাইবে বিএনপি। দলটি ইসি ঘোষিত রোডম্যাপও প্রত্যাখ্যান করেনি।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ‘ভিশন ২০৩০’-এ দেয়া প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করতে হলে বিএনপিকে ক্ষমতায় যেতে হবে। আর ক্ষমতায় যেতে হলে নির্বাচনের বিকল্প নেই। এটা চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াও বুঝতে পেরেছেন। আর বুঝতে পেরেছেন বলেই ধানের শীষের পক্ষে তিনি ভোট চাওয়া শুরু করে দিয়েছেন। বিএনপির সাম্প্রতিক কর্মকা- পর্যালোচনা করে অনেকেই এখন মনে করছেন, নির্বাচনকালীন নিরপেক্ষ সহায়ক সরকার দাবি করলেও বিএনপি দলের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে শেষ পর্যন্ত শেখ হাসিনা সরকারের অধীনেই নির্বাচনে যাবে।