প্রতিবেদন

ঈদে সারাদেশে ভোটের আমেজে আওয়ামী লীগ-বিএনপিসহ সব রাজনৈতিক দল

নিজস্ব প্রতিবেদক : ঈদুল ফিতরে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির প্রায় সব নেতাই নিজ নিজ এলাকায় গিয়ে নির্বাচনি জনসংযোগ করেছেন। এবার ঈদের উচ্ছ্বাসের সঙ্গে তৃণমূলের রাজনৈতিক কর্মকা-ে সরগরম ছিল সারাদেশ। সম্ভাব্য প্রার্থীরা ঈদের আগে ও পরে কয়েক দিন ধরে নিজ এলাকায় অবস্থান করে কর্মী, সমর্থক ও এলাকাবাসীর সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময়কালে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ইস্যুতে কথা বলেছেন, নির্বাচনে নিজে প্রার্থী হওয়ার ইঙ্গিত দিয়েছেন। এতে ভোটাররা বেশ ভালোই ঈদ শুভেচ্ছা ও সালামি পেয়েছেন। সর্বোপরি এলাকার সাধারণ ভোটারদের কদর বেড়েছে। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ও বিএনপির সম্ভাব্য প্রার্থীরা নিজ এলাকার মানুষের খোঁজখবর নেয়া ও সাহায্য-সহযোগিতার নামে এবার অকাতরে বিলিয়েছেন শাড়ি, লুঙ্গি, নতুন জামা, সেমাই-চিনি ও নগদ টাকা। ক্ষমতার বাইরে থাকলেও এই উপঢৌকন বিনিময়ে আওয়ামী লীগের চেয়ে এগিয়ে ছিল বিএনপি। বিএনপির একটি বিশ্বস্ত সূত্রের মতে, ঈদ উপলক্ষে দলটি ৩০০ আসনের ভোটারদের মধ্যে কোটি কোটি টাকার ঈদ উপঢৌকন বিলানোর কাজ করেছে। আওয়ামী লীগও এ খাতে খরচ করেছে উল্লেখ করার মতোই অঙ্ক।
মূলত, রমজানে ইফতার পার্টিকে কেন্দ্র করে রাজধানী ঢাকায় ভোটের আমেজ ছড়িয়ে পড়ে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা রমজানের আগে নৌকার পক্ষে ভোট চান এবং বিএনপি চেয়ারপারসন রমজানে প্রথমবারের মতো ধানের শীষের পক্ষে ভোট চান। মূলত রমজানের মাঝামাঝি থেকেই রাজধানীতে নির্বাচনি প্রচারণার তোড়জোড় শুরু হয়ে যায় এবং ঈদের ছুটিতে তা সারাদেশে ছড়িয়ে পড়ে। ঈদের ছুটিতে যে জোর নির্বাচনি তৎপরতা শুরু হয়েছে তা ঈদের পরও থেমে নেই। সারাদেশে নতুন আঙ্গিকে নির্বাচনি মাঠে নামছে দেশের প্রধান দুই রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ ও বিএনপি।
নিজ নিজ এলাকায় যারপরনাই সরব হচ্ছেন নির্বাচনে মনোনয়ন প্রত্যাশীরা। তৃণমূলে বাড়ছে নেতৃত্বের প্রতিযোগিতা। দশম সংসদের মেয়াদ অনুসারে জাতীয় নির্বাচনে দেড় বছর আগেই পোস্টার, ডিজিটাল ব্যানারে ছেয়ে যাচ্ছে এলাকা। নিজের এলাকায় অনেকে উঠোন বৈঠকও শুরু করে দিয়েছেন।
যাওয়া শুরু করেছেন পাড়া-মহল্লায়। সবার ল্য একটাইÑ একাদশ জাতীয় নির্বাচন। নির্বাচনে নিজ দলের মনোনয়ন ও জয়লাভ দুটোই করতে হবে যেকোনো মূল্যে। সেজন্য তারা উঠেপড়ে লেগেছেন। তাছাড়া বর্তমানে সারাদেশের প্রতিটি নির্বাচনি এলাকায় আওয়ামী লীগের প্রার্থী মনোনয়নের জন্য কেন্দ্রীয়ভাবে একাধিক জরিপ টিম কাজ করছে। এ জরিপ চলাকালে কেন্দ্রের দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য শোডাউনের পরিমাণও বাড়াচ্ছেন মনোনয়ন প্রত্যাশীরা। একই সঙ্গে পদ্মা সেতু নির্মাণসহ সরকারের দৃশ্যমান বড় বড় উন্নয়ন কর্মকা- জনগণের সামনে তুলে ধরারও ব্যাপক উদ্যোগ নিয়েছেন আওয়ামী লীগ নেতারা। ফলে সঙ্গত কারণেই দেশের প্রতিটি এলাকায় যেতে হচ্ছে তাদের। তবে নিজ দলের মনোনয়ন প্রত্যাশী প্রতিপ নেতারাই এখন একে অপরের সবচেয়ে বড় প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে উঠেছেন। এলাকার আধিপত্য আর নেতৃত্বের প্রভাব বিস্তারের প্রচেষ্টায় অনেকে দ্বন্দ্ব-সংঘাতেও জড়িয়ে পড়ছেন। নিজ দলের নেতাদের নামে একে-অপরের বিরুদ্ধে হামলা-মামলা-হয়রানির অভিযোগও উঠছে হরদম। বিশেষ করে মতাসীন আওয়ামী লীগের ভেতরে এ অভিযোগ উঠছে সবচেয়ে বেশি। ঈদের পর সিরাজগঞ্জ, নাটোরের রামশা, কাজিপুরের নলডাঙ্গা, মাগুরা জেলার মহম্মদপুর উপজেলা, লক্ষ্মীপুরের কমলনগরসহ দেশের বেশকিছু স্থানে এলাকার আধিপত্য ও প্রভাব বিস্তার নিয়ে আওয়ামী লীগের এক গ্র“পের সঙ্গে আরেক গ্র“পের মারামারি ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। অন্যদিকে বিএনপি নেতাদের মধ্যেও চলছে একই প্রতিযোগিতা। রাজশাহী ও চট্টগ্রামসহ অনেক এলাকায় নেতৃত্বের প্রতিযোগিতা আর দলীয় আধিপত্য বিস্তারের প্রচেষ্টা চালাতে গিয়ে মারামারি ও সংঘর্ষেও লিপ্ত হচ্ছেন নিজ দলের অনেক নেতাকর্মী।
এর বিপরীতে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে জনপ্রিয়তা যাচাই এবং দলীয় প্রার্থী বাছাইয়ে আসনভিত্তিক জরিপ শুরু করেছে আওয়ামী লীগ। ঈদের পর এখন আটঘাট বেঁধে মাঠে নামছে দলটির নেতারা। জোরদার করা হচ্ছে সাংগঠনিক কার্যক্রম। পূর্ণাঙ্গ করা হচ্ছে অসম্পন্ন ৬টি সাংগঠনিক জেলা কমিটি। জেলা থেকে ইউনিয়ন যেখানেই সমস্যা সেখানেই তা নিরসনের উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে।
সংসদ নির্বাচনে ৩০০ আসনে দলের মনোনয়ন পেতে আগ্রহী রয়েছেন সাড়ে ৩ হাজার প্রার্থী। এদের মধ্যে থেকে ৩ থেকে ৪ জনের একটা শর্টলিস্ট করা হবে। এছাড়াও নির্বাচনি এলাকাভিত্তিক ভোটারদের অবস্থান, দলের প্রতি সমর্থনের হার, এমপি-মন্ত্রীদের কাজের প্রতি তৃণমূল কর্মীদের সন্তোষ, ােভ, বিােভ, বিরোধী দলের প্রতি সমর্থনের ভিত্তি ও প্রার্থীদের জনপ্রিয়তার মাত্রা বিশ্লেষণ করে দলের হাইকমান্ডের কাছে তুলে ধরা হবে। আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন পর্যন্ত এ কর্মসূচি অব্যাহত থাকবে। দলের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের কয়েকজন নেতা এমন তথ্য জানিয়েছেন।
পাশাপাশি ঈদের পর নতুন আঙ্গিকে মাঠে নেমেছেন বিএনপি নেতারাও। দুই-এক মাসের মধ্যে যেকোনো দিন কর্মসূচির ডাক দিতে পারেন দলের প্রধান খালেদা জিয়া। এ কর্মসূচি হবে আগামী নির্বাচনকে ঘিরে। রমজানের ঈদের পর যেকোনো সময় শান্তিপূর্ণ কর্মসূচির ডাক দিতে পারেন বলে ঘোষণাও দিয়েছেন তিনি। তবে বিএনপির মনোনয়ন প্রত্যাশী অনেক নেতা একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণের জন্য এখনই নিজ নিজ এলাকায় নির্বাচনি কাজে সক্রিয় হয়েছেন।
এদিকে জানা গেছে, আগামী সপ্তাহে বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া চিকিৎসার জন্য লন্ডন যাবেন। সেখান থেকে ফিরেই দেবেন নির্বাচনকালীন সহায়ক সরকারের রূপরেখা। তারপর আন্দোলন ও নির্বাচনি প্রস্তুতি একসাথে চালানো হবে বলে দলের নেতারা জানান।
তবে রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দুটি কাজ একসঙ্গে বিএনপির করা ঠিক হবে না। নির্বাচনি প্রস্তুতি চালাতে গিয়ে দলটি যদি আন্দোলন প্রস্তুতিতে বেশি সময় ব্যয় করে তাহলে তাদের আন্দোলনও হবে না, নির্বাচনি প্রস্তুতিও নেয়া হবে না। অনেক রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞ বলছেন, আন্দোলনের বিষয়টি বিএনপি তার রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ আওয়ামী লীগকে চাপে রাখার জন্যই বলছে। সাংগঠনিকভাবে অপেক্ষাকৃত দুর্বল বিএনপি নিশ্চিত করেই বুঝে গেছে, আন্দোলন করে আওয়ামী লীগকে ক্ষমতা থেকে সরানো যাবে না। তাই তারা যে ইতোমধ্যে আওয়ামী লীগের সমানতালে নির্বাচনি প্রচারণা শুরু করে দিয়েছে তা তাদের কথাবার্তা ও সাম্প্রতিককালের বিভিন্ন কর্মকা-ে স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে। বিএনপির তৃণমূল নেতাদের চাপে এবং দলের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার জন্য দলটি এবার শেখ হাসিনার অধীনে হলেও নির্বাচনে অংশগ্রহণ করবেÑ এমনটিই মনে করছেন অনেক রাজনৈতিক বিশ্লেষক।