প্রচ্ছদ প্রতিবেদন

চলতি মাসেই প্রধানমন্ত্রী উদ্বোধন করতে যাচ্ছেন দ্বিতীয় সাবমেরিন কেবল : বাংলাদেশের তথ্যপ্রযুক্তির মহাসড়কে যুক্ত হচ্ছে নতুন মাত্রা

তারেক জোয়ারদার : ২০০৭ সালে কক্সবাজারে বাংলাদেশের প্রথম সাবমেরিন কেবল স্থাপিত হওয়ার ১০ বছরের মাথায় ২০১৭ সালে দ্বিতীয় সাবমেরিন কেবলে সংযুক্ত হচ্ছে বাংলাদেশ। বাংলাদেশ সাবমেরিন কেবল কোম্পানি লিমিটেডের (বিএসসিসিএল) তত্ত্বাবধানে দ্বিতীয় সাবমেরিন কেবলের সম্পূর্ণ কাজ ইতোমধ্যে শেষ হয়েছে। চলতি মাসেই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দ্বিতীয় সাবমেরিন কেবলের উদ্বোধন করার আগ্রহ ব্যক্ত করেছেন বলে জানান বিএসসিসিএল’র এমডি প্রকৌশলী মো. মনোয়ার হোসেন। কক্সবাজারে দেশের প্রথম সাবমেরিন কেবল স্থাপিত হওয়ায় বাংলাদেশের মানুষের পক্ষে ইন্টারনেট দুনিয়ায় বিচরণ অনেকটাই সহজ হয়ে যায়। তথ্যপ্রযুক্তিতে দেশ নিরবচ্ছিন্নভাবে এগিয়ে যেতে থাকে। ইন্টারনেট মানুষের হাতের নাগালে চলে যাওয়ায় তথ্যপ্রযুক্তির মহাসড়কে যুক্ত হয় বাংলাদেশ। আর দ্বিতীয় সাবমেরিন কেবল চালু হওয়ার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের তথ্যপ্রযুক্তির মহাসড়কে যুক্ত হচ্ছে নতুন মাত্রা।
পটুয়াখালীর কুয়াকাটায় স্থাপিত হয়েছে বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দ্বিতীয় সাবমেরিন কেবল। কুয়াকাটায় ১০ একর জমিতে ল্যান্ডিং স্টেশনের মূল ভবন (ঋঁহপঃরড়হধষ ইঁরষফরহম), ইলেকট্রিক্যাল সাব স্টেশন, হাই ভোল্টেজ ট্রান্সফরমার, জেনারেটর, পাওয়ার সাপ্লাই, নিরাপত্তা ক্যামেরা, অগ্নিনির্বাপক ব্যবস্থা ইত্যাদিসহ সাবমেরিন কেবলের ইকুইপমেন্ট স্থাপন ও ডেটা সেন্টার, বিচ ম্যানহোল, ল্যান্ডিং স্টেশন থেকে বিচ ম্যানহোল পর্যন্ত স্থল কেবল সংযোগসহ মূল সাবমেরিন কেবল সংযুক্তির মাধ্যমে আন্তর্জাতিক লিংকের কাজ শেষ হয়েছে। ১৯টি দেশের টেলিযোগাযোগ সংস্থার সম্মেলনে গঠিত সিমিউই-৫ আন্তর্জাতিক কনসোর্টিয়ামের অধীনে ২০ হাজার কিলোমিটারব্যাপী অত্যাধুনিক ১০০ জিবিপিএস আলোক তরঙ্গের ডিডব্লিউডিএম প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে ঘঊঈ, ঔধঢ়ধহ এবং অষপধঃবষ খঁপবহঃ, ঋৎধহপব দ্বিতীয় সাবমেরিন কেবলটি নির্মাণ করেছে। কুয়াকাটা সৈকত থেকে একটি ব্রাঞ্চের মাধ্যমে মূল কেবলে যুক্ত হয়েছে বাংলাদেশ। বাংলাদেশসহ মিয়ানমার, সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া, শ্রীলঙ্কা, ভারত, পাকিস্তান, সৌদি আরব, কাতার, ওমান, জিবুতি, মিশর, তুরস্ক, ইতালি, ফ্রান্স ইত্যাদি দেশ এই কেবলে যুক্ত। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে কনসোর্টিয়াম সভায় বিভিন্ন দেশের ল্যান্ডিং স্টেশনে ইকুইপমেন্ট স্থাপন ও টেস্টিং করে সম্পূর্ণ সিস্টেম চালু করার আনুষ্ঠানিক ঘোষণা এসেছে। এর আগে যুক্তরাষ্ট্রের হাওয়াই শহরে মেলার আকারে বর্ণাঢ্য প্রচারণামূলক অনুষ্ঠান করা হয়। কুয়াকাটা থেকে ঢাকাসহ গুরুত্বপূর্ণ বিভাগীয় ও জেলা শহরগুলোতে ব্যান্ডউইডথ পৌঁছানোর জন্য অপটিক্যাল ফাইবার ব্যাকহল তৈরিতে কিছুটা সময় লেগে যায়। যদিও সম্প্রতি কুয়াকাটা-ঢাকা ব্যাকহল নির্মাণ কাজও শেষ হয়েছে। ইতোমধ্যে ঢাকায় বিএসসিসিএল-এর আইআইজির ২০ জিবিপিএস সংযোগ নতুন সিমিউই-৫ সাবমেরিন কেবল দিয়ে চলছে।
দেশের ইন্টারনেটের মূল ব্যাকবোন সংযোগ চলছে সরকারি পাবলিক লিমিটেড কোম্পানি, বাংলাদেশ সাবমেরিন কেবল কোম্পানি লিমিটেড (বিএসসিসিএল)-এর সাবমেরিন কেবল এবং আন্তর্জাতিক টেরেসট্রিয়াল কেবল (আইটিসি) লাইসেন্সধারী কোম্পানিগুলোর দ্বারা। দ্বিতীয় সাবমেরিন কেবল আসার পূর্ব পর্যন্ত সাবমেরিন কেবলের বিকল্প ব্যবস্থার প্রয়োজন ছিল এবং তাই ৬টি কোম্পানিকে আইটিসি লাইসেন্স দেয়া হয়। আইটিসিগুলো সীমান্ত অতিক্রমী অপটিক্যাল ফাইবার স্থল কেবলের মাধ্যমে ভারত থেকে ব্যান্ডউইডথ আমদানি করে থাকে। নতুন বিকল্প সাবমেরিন কেবলে যুক্ত হওয়ার পর নিরবচ্ছিন্ন সংযোগসহ প্রচুর ব্যান্ডউইডথ পাচ্ছে বাংলাদেশ। তাই আর বিদেশ থেকে ব্যান্ডউইডথ ক্রয়ের প্রয়োজন নাও হতে পারে বলে টেলিযোগাযোগ বিশেষজ্ঞদের অভিমত।
মোট কথা হলো দেশের দ্বিতীয় সাবমেরিন কেবল ল্যান্ডিং স্টেশনের মাধ্যমে দেড় হাজার জিবিপিএস ব্যান্ডউইডথ সুবিধাসহ নিরবচ্ছিন্ন ইন্টারনেট নিয়ে সংযুক্ত হতে যাচ্ছে গোটা দেশ। কক্সবাজারে প্রথম স্থাপিত সাবমেরিন স্টেশনের চেয়ে ৮ গুণ মতাসম্পন্ন পটুয়াখালীর কুয়াকাটায় নির্মিত দ্বিতীয় সাবমেরিন কেবল ল্যান্ডিং স্টেশনটি। এটি চালু হলে সারাদেশের মানুষ দ্রুত গতির নিরবচ্ছিন্ন ইন্টারনেট সেবা পাবেন। শুধু তাই নয়, এ প্রকল্পটি চালু হলে এর উচ্চ মতাসম্পন্ন নেটওয়ার্কের কারণে দেশের চাহিদা মিটিয়ে উদ্বৃত্ত ব্যান্ডউইডথ রপ্তানি করে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করাও সম্ভব হবে বলে স্বদেশ খবরকে জানিয়েছেন বাংলাদেশ সাবমেরিন কেবল কোম্পানি লিমিটেডের এমডি ইঞ্জিনিয়ার মো. মনোয়ার হোসেন। তিনি আরো জানান, দেশে ২০১৮ সালের মধ্যে ইন্টারনেটের ব্যবহার দ্বিগুণ হবে। এতে ব্যান্ডউইডথ (ইন্টারনেট একক) ব্যবহারের সমতা বাড়বে আড়াইগুণ। পরিমাণের দিক থেকে ইন্টারনেট ব্যবহার হবে ১ টেরাবাইট। জন্মলগ্ন থেকে বিএসসিসিএল-এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী মো. মনোয়ার হোসেন স্বদেশ খবরকে জানান, বর্তমানে বাংলাদেশে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা অন্তত সাড়ে ৫ কোটি। ক্রমেই এই সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে। বর্তমানে কক্সবাজারে একটি মাত্র সাবমেরিন কেবল ল্যান্ডিংয়ের মাধ্যমে দেশে ইন্টারনেট সরবরাহ করছে। কিন্তু এ সাবমেরিন স্টেশনটির কেবল (তার) লাইন কাটা পড়লে বিএসসিসিএলের কাছে নেটওয়ার্ক সরবরাহের বিকল্প কোনো ব্যবস্থা না থাকায় গ্রাহকরা প্রায়ই চরম দুর্ভোগের শিকার হন। পটুয়াখালীতে নবনির্মিত দ্বিতীয় সাবমেরিন কেবলের ল্যান্ডিং স্টেশনটি চালু হলে গ্রাহকদের আর এ দুর্ভোগে পড়তে হবে না। আর কক্সবাজারে নির্মিত ২০০ জিবিপিএস মতাসম্পন্ন প্রথম সাবমেরিন স্টেশনটির লাইফ টাইম শেষে পটুয়াখালীর উচ্চ মতাসম্পন্ন সাবমেরিন কেবল স্টেশন থেকে গোটা দেশে নিরবচ্ছিন্ন ইন্টারনেট সরবরাহ করা হবে। এটি চালু হলে গ্রাহকরা খুব সহজেই দ্রুত গতিসম্পন্ন নিরবচ্ছিন্ন নেটওয়ার্কে ইন্টারনেট সুবিধা পাবেন।
জানা যায়, কুয়াকাটার লতাচাপলি ইউনিয়নের আমখোলা গ্রামে ২০১৩ সালের শেষের দিকে প্রায় ১০ একর জমির ওপর ৬৬০ কোটি টাকা ব্যয়ে দ্বিতীয় সাবমেরিন কেবল ল্যান্ডিং স্টেশনের কাজ শুরু হয়। বর্তমানে প্রকল্পটির কাজ সম্প্রতি শেষ হয়েছে। এখন কেবলমাত্র উদ্বোধনের পূর্বমুহূর্তের প্রস্তুতিমূলক কাজ চলছে। সাগরের তলদেশ দিয়ে ফ্রান্স থেকে সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া, শ্রীলঙ্কা ও মিয়ানমার হয়ে বাংলাদেশ পর্যন্ত ২০ হাজার কিলোমিটার দীর্ঘ কেবল লাইনের সংযোগ স্থাপন কাজ ইতোমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে। ইউরোপ থেকে সিঙ্গাপুর হয়ে আসা সঞ্চালন লাইন সংযুক্তির জন্য ল্যান্ডিং স্টেশন স্থাপনের কাজও সম্পন্ন হয়েছে। কুয়াকাটা স্টেশন থেকে মাত্র সাড়ে ৯ কিলোমিটার দূরত্বে উপকূলের কাছাকাছি বঙ্গোপসাগরে আসা লাইনটির সংযোগ স্থাপনের কাজও শেষ হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর উদ্বোধনের মধ্য দিয়ে শিগগিরই চালু করা হবে দেশের দ্বিতীয় সাবমেরিন স্টেশনটি। আর সংশ্লিষ্টরা বলছেন, উদ্বোধনের তারিখটি খুব সম্ভবত এ মাসেই হবে বলে তারা এর সকল প্রস্তুতি ইতোমধ্যে সম্পন্ন করে রেখেছেন।
বিএসসিসিএল’র এমডি ইঞ্জিনিয়ার মো. মনোয়ার হোসেন স্বদেশ খবরকে জানিয়েছেন, দ্বিতীয় সাবমেরিন কেবলের সঙ্গে ইতোমধ্যে যুক্ত হয়েছে কুয়াকাটা ল্যান্ডিং স্টেশন। দ্বিতীয় সাবমেরিন কেবল সংযুক্ত হওয়ায় দেশে অতিরিক্ত ১ হাজার ৩০০ জিবিপিএস ব্যান্ডউইডথ পাওয়া যাবে। ভবিষ্যতে এই কেবলের মাধ্যমে আরও ২০০ জিবিপিএস ব্যান্ডউইডথ সরবরাহ বাড়ানো সম্ভব হবে। বর্তমানে দেশে ইন্টারনেট ব্যবহারের পরিমাণ ৪০০ জিবিপিএসের বেশি। এই ৪০০ জিবিপিএসের মধ্যে ১২০ জিবিপিএস বিএসসিসিএলের প্রথম সাবমেরিন কেবলের মাধ্যমে আসছে। বাকি ২৮০ জিবিপিএস ব্যান্ডউইডথ আইটিসির মাধ্যমে ভারত থেকে আমদানি করা হচ্ছে।
বিএসসিসিএল এমডি বলেন, বর্তমানে কুয়াকাটা-ঢাকা ব্যাকহোল লিংক স্থাপন হয়েছে। আর প্রধানমন্ত্রীর উদ্বোধনের পরপরই আনুষ্ঠানিকভাবে দ্বিতীয় সাবমেরিন কেবলের বাণিজ্যিক কার্যক্রম শুরু করা হবে। ঢাকা থেকে কুয়াকাটা ল্যান্ডিং স্টেশনের ট্রান্সমিশন লিংক স্থাপনের কাজও শেষ হয়েছে বলে জানান বিএসসিসিএল এমডি ইঞ্জিনিয়ার মো. মনোয়ার হোসেন।
ইন্টারনেট সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলো (আইএসপি) জানিয়েছে, দ্বিতীয় সাবমেরিন কেবলের সঙ্গে যুক্ত হওয়ায় দেশে ইন্টারনেট সেবার েেত্র আরেক ধাপ এগিয়ে গেল বাংলাদেশ। এতে করে একটি কেবল কোনো কারণে বিকল হলে অন্য কেবলটি ব্যাকআপ হিসেবে কাজ করবে। দেশে নিরবচ্ছিন্ন ইন্টারনেট সুবিধা থাকবে। ফলে ব্যবসাবাণিজ্য থেকে শুরু করে সব ধরনের কাজকর্মে গতি বাড়বে। দেশে বিনিয়োগও বৃদ্ধি পাবে। দ্বিতীয় সাবমেরিন কেবলে যুক্ত হওয়ার ফলে এখন একটা নিশ্চিত ব্যাকআপ তৈরি হলো।
বিএসসিসিএল এমডি ইঞ্জিনিয়ার মো. মনোয়ার হোসেন জানান, প্রতিটি সাবমেরিন কেবলের লাইফ টাইম ১০ থেকে ১৫ বছর। তাই আমাদের এখনই উচিত তৃতীয় সাবমেরিন কেবল স্থাপনের চিন্তা করা। উদাহরণস্বরূপ তিনি বলেন, আমাদের প্রতিবেশী দেশ ভারত অন্তত ২০টি সাবমেরিন কেবলের সঙ্গে যুক্ত রয়েছে।
প্রথম ও দ্বিতীয় সাবমেরিন কেবলের সদস্য দেশগুলো হচ্ছে সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড, বাংলাদেশ, ভারত, শ্রীলঙ্কা, সংযুক্ত আরব আমিরাত, পাকিস্তান, সৌদি আরব, মিশর, ইতালি, তিউনিশিয়া, আলজেরিয়া ও ফ্রান্স। সি-মি-উই-৫ কনসোর্টিয়ামে সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড, ভারত, পাকিস্তান, সংযুক্ত আরব আমিরাত, সৌদি আরবসহ ইউরোপের কয়েকটি দেশ নিয়ে। দ্বিতীয় সাবমেরিন কেবলের মালিকও দ্বিতীয় কনসোর্টিয়ামের সদস্য দেশগুলো।
উল্লেখ্য, বর্তমানে দেশে ব্যবহৃত ব্যান্ডউইডথের পরিমাণ প্রায় ৪২১ জিবিপিএস। এর মধ্যে সরকারি পর্যায়ে ১৬০ ও বেসরকারি পর্যায়ে ২৬০ জিবিপিএসের মতো ব্যান্ডউইডথ ব্যবহৃত হয়ে থাকে। বিএসসিসিএল দেশের একমাত্র সাবমেরিন কেবল অপারেটর, সেইসাথে আইআইজি এবং আইএসপি। সরকারি সংস্থাগুলোর মধ্যে এটি অন্যতম সংস্থা যা একটি লাভজনক কোম্পানি হিসেবে কাজ করছে এবং ২০১২ সাল থেকে বিএসসিসিএল দেশের পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হয়ে শেয়ার মার্কেটে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে চলেছে।