কলাম

চাঁদ নিয়ে যন্ত্রণা আর না আর না

মেজর তারিকুল ইসলাম মজুমদার পিএসসি, জি (অব.) : প্রতিবারের মতো এবারও চাঁদ দেখা নিয়ে মতপার্থক্যের কারণে আমাদের দেশের বিভিন্ন স্থানে দুই দিন ঈদুল ফিতর উদযাপিত হয়েছে। অবশ্য রাষ্ট্রীয় ঘোষণা অনুযায়ী ২৬ জুন বাংলাদেশে আনুষ্ঠানিকভাবে ঈদুল ফিতর উদযাপিত হয়েছে। তবে কেউ কেউ অনানুষ্ঠানিকভাবে ২৫ জুন ঈদুল ফিতর পালন করেছে। একটি দল মক্কা-মদিনার দেশ সৌদি আরবের সঙ্গে সঙ্গতি রেখে একদিন আগেই রোজা রাখা শুরু করেছিল, আর সেই হিসাব অনুযায়ী একদিন আগেই ঈদুল ফিতর পালন করে। যতই বলা হচ্ছে হাদিস অনুযায়ী চাঁদ দেখে রোজা রাখতে হয়, আবার চাঁদ দেখেই রোজা ভাঙতে হয়, কিংবা বলা হয় এই রোজা রাখা ও তৎপরবর্তী ঈদ উদযাপন একটি সামাজিক ইবাদত এবং সরকারই এটা শুরু ও শেষ ঘোষণা করবে, ততই যেন পার্থক্য বেড়ে চলেছে। আগে চাঁদপুরের কিছু লোক সৌদি আরবের সঙ্গে সঙ্গতি রেখে রোজা ও ঈদ উদযাপন করত। ইদানীং ঢাকা ও অন্যান্য জেলার অনেকেই এতে যোগ দিয়েছেন। আমি আমার ফেসবুক পেজে দেখলাম, অনেক শিক্ষিত লোকই এ ধারণার বশবর্তী হয়ে তাদের সঙ্গে সংহতি প্রকাশ করে ঈদ উদযাপন করেছেন। অনেকে আবার রোজা একই সাথে শুরু করলেও ঈদ করে ফেলেছেন একদিন আগেই। এতসব মতপার্থক্য সত্যিই এক যন্ত্রণায় ফেলে দিয়েছে এদেশের ধর্মপ্রাণ মুসলমানদের।
একদিন আগে ঈদুল ফিতর উদযাপনকারী দলের কিছু যুক্তির কথা তুলে ধরা যাক। প্রথমত, সৌদি আরব ইসলাম ধর্মের সূতিকাগার এবং মক্কা ও মদিনা মুসলমানদের তীর্থস্থান। ধর্মীয় বিষয়ে তাদের অনুসরণ দোষণীয় তো নয়ই, অবশ্যই পালনীয় কর্তব্য। দ্বিতীয়ত, সৌদি আরবে চাঁদ দেখা গিয়েছে মানে চন্দ্র উদিত হয়েছে। তার অর্থ নিশ্চিতভাবেই চান্দ্রমাস শুরু হয়েছে। পৃথিবীর এক দেশে চন্দ্র দেখা গেলেই হলো, ঈদ উদযাপন করা যাবে, যা হাদিসের বিপরীত নয়। তৃতীয়ত, অক্ষাংশ ও দ্রাঘিমাংশের বিষয়ে সম্মানিত পাঠক নিশ্চয়ই অবগত আছেন। সৌদি আরব ৪৫ ডিগ্রি দ্রাঘিমাংশে অবস্থিত। বাংলাদেশ ৯০ ডিগ্রি দ্রাঘিমাংশে অবস্থিত। পক্ষান্তরে জাপান ১৩৮ ডিগ্রি, অস্ট্রেলিয়া ১৩৩ ডিগ্রি এবং চীন ১০৪ ডিগ্রি পূর্ব দ্রাঘিমাংশে অবস্থিত। কিন্তু এই ৩টি দেশ বাংলাদেশের পূর্বে অবস্থিত হওয়া সত্ত্বেও তারা সৌদি আরবের সঙ্গে একই অর্থাৎ ২৫ জুন ২০১৭ ঈদুল ফিতর উদযাপন করেছে। এটা কিভাবে সম্ভব হলো? তবে কি তারাও সৌদি আরবের মতো ২৪ জুন ২০১৭ তারিখ সন্ধ্যায় চাঁদ দেখেছিল? কিংবা সৌদি আরব কি ২৫ জুন ২০১৭ তারিখে খালি চোখে চাঁদ দেখেছিল? নাকি যন্ত্রের সাহায্যে দেখেছিল। এমনকি পাশের দেশ ভারতেও ২৪ জুন সন্ধ্যায় চাঁদ দেখে ২৫ জুন ঈদুল ফিতর উদযাপিত হয়েছে।
সম্মানিত পাঠকদের জ্ঞাতার্থে বলছি, কোনো একটি ঈদ উৎসব কিংবা ইসলামি অন্যান্য উৎসব কিন্তু প্রকৃত দিনের আগের দিন থেকেই শুরু হয়। অর্থাৎ ২৬ জুন ২০১৭ তারিখের ঈদুল ফিতর শুরু হয়েছিল ২৫ জুন ২০১৭ তারিখের সূর্যাস্তের পরপরই। আর তা চলেছে ২৬ জুন ২০১৭ তারিখ সূর্যাস্ত পর্যন্ত। তাহলে এ কথাই প্রতীয়মান হয় যে সৌদি আরবসহ অন্যান্য দেশ যারা ২৫ জুন ঈদ উদযাপন করেছেন, তারা ২৪ জুন ২০১৭ তারিখে সন্ধ্যায় শাওয়াল মাসের চাঁদ দেখেছেন, এটা তা-ই প্রমাণ করে।
যদি তা-ই হয়, তবে আসুন চন্দ্র উদয় নিয়ে কিছু বিশ্লেষণ শুনি এবং ২৪ জুন ২০১৭ তারিখে পশ্চিম আকাশে তাত্ত্বিক ও প্রায়োগিকভাবে চাঁদ দেখা গিয়েছে কি না সে সম্পর্কে অবগত হই।
আমরা জানি, পৃথিবী সূর্যের চারদিকে ঘুরে। আর চাঁদ পৃথিবীর চারদিকে ঘুরে। পৃথিবী একবার সূর্যের চারদিকে ঘুরে আসতে সময় নেয় ৩৬৫ দশমিক ২৪ দিন। আর চাঁদ পৃথিবীর চারদিকে একবার ঘুরে আসতে সময় নেয় ২৯ দশমিক ৫ দিন। পৃথিবী থেকে চাঁদ দেখা কিংবা না দেখা, কিংবা কতটুকু দেখা যাবে তা প্রাথমিকভাবে নির্ভর করে এই সূর্য, পৃথিবী ও চাঁদের ঘূর্ণয়নের খেলার ওপর। আর বাকিটা হলো আবহাওয়ার খেলা। যদি আকাশ পরিষ্কার থাকে তাহলে চাঁদ দেখা যায়ই।
আশ্চর্য হলেও সত্যি যে চাঁদের নিজস্ব কোনো আলো নেই, সূর্যের আলোতেই চাঁদ আলোকিত হয়। আর আমরা চাঁদের যে অংশ দেখি তা সব সময়ই চাঁদের অর্ধাংশ। পুরো চাঁদ আমরা কখনও একসঙ্গে দেখি না। চাঁদের যে অংশ আমরা দেখি না তাকে বলা হয় ‘ডার্ক সাইড অব দি মুন’। সূর্য, পৃথিবী ও চন্দ্রের ঘূর্ণয়নের কাল পৃথিবী থেকে চাঁদকে ৮টি পর্যায়ে দেখা যায়। এগুলো হলোÑ ১. নিউ মুন : এটা এমন একটা সময় যখন সূর্য, চাঁদ ও পৃথিবী একই লাইনে থাকে। ফলে চাঁদের আলো পৃথিবীতে আসে না, আর চাঁদকেও দেখা যায় না। ২. ওয়াক্সিং ক্রিসেন্ট : যে সময় চাঁদের এক থেকে ৪৯ শতাংশ দেখা যায়। ৩. প্রথম কোয়ার্টার : যে সময় চাঁদের ৫০ শতাংশ দেখা যায়। ৪. ওয়াক্সিং স্ফীত অংশ : যে সময় চাঁদের ৫১ থেকে ৯৯ শতাংশ দেখা যায়। ৫. ফুল মুন : যে সময় চাঁদকে সম্পূর্ণ মানে পুরো অর্ধাংশ দেখা যায়। ৬. ওয়ানিং স্ফীত : যে সময় থেকে চাঁদ ক্ষয়প্রাপ্ত হতে থাকে এবং ওই সময়ে চাঁদ ৯৯ শতাংশ থেকে ৫১ শতাংশে নেমে আসে। ৭. তৃতীয় কোয়ার্টার বা শেষ কোয়ার্টার : যে সময় চাঁদের সাইজ ৫০ শতাংশে নেমে আসে, অর্থাৎ এ সময়েও চাঁদের অর্ধাংশ দেখা যায়। ৮. ওয়ানিং ক্রিসেন্ট : যে সময় চাঁদের সাইজ ৪৫ শতাংশ থেকে ১ শতাংশে নেমে আসে। তারপর চাঁদ চলে যায় নিউ মুন স্টেজে; যখন চাঁদকে দেখা যায় না। চান্দ্রমাস শুরু হয় নিউ মুন পর্যায় থেকে। আর শেষ হয় ওয়ানিং ক্রিসেন্ট পর্যায়ে। এ হিসাবগুলো সঠিকভাবে নির্ধারণ করতে পারলেই চাঁদ কখনও আকাশ থেকে হারিয়ে যাবে না। শুরুতেই চাঁদ এবং সূর্য প্রায় একই সময় উদিত হয় এবং পরবর্তীতে ঘূর্ণয়নের ফলে চাঁদ সূর্য থেকে আলাদা হতে থাকে।
এখন দেখা যাক সৌদি আরব ও বিশ্বের অন্যান্য দেশ যখন ২০১৭ সালের ঈদুল ফিতর উদযাপন করল তখন চাঁদের অবস্থা কেমন ছিল। আগেই বলেছি ২৪ জুন ২০১৭ তারিখ সূর্যাস্ত থেকে ২৫ জুন ২০১৭ সূর্যাস্ত পর্যন্ত সৌদি আরব ও বিশ্বের অন্যান্য দেশ ঈদুল ফিতর উদযাপন করে। তার মানে ২৪ জুন ২০১৭ তারিখ সন্ধ্যায় শাওয়াল মাসের চাঁদ সৌদি আরবের আকাশে উদিত হয়েছিল। ২৫ জুন ২০১৭ তারিখ ছিল আরবি শাওয়াল মাসের ১ তারিখ। ২৪ জুন ২০১৭ তারিখে সৌদি আরবের আকাশে উদিত শাওয়াল মাসের চাঁদটি কেমন ছিল? সেদিন চাঁদ ছিল ওয়াক্সিং ক্রিসেন্ট অর্থাৎ উদয়নের প্রাথমিক পর্যায়ে। সেদিন চাঁদের দীপন (ইলিউমিনেশন) ছিল ৩ শতাংশ। সূর্য ডোবার সঙ্গে সঙ্গেই চাঁদটি দেখা গিয়েছিল। ওই দিন চাঁদের বয়স ছিল ১ দশমিক ৬১ দিন, চাঁদটি দিগন্ত রেখা থেকে মাত্র দশমিক ৫৪ ডিগ্রি কোণে ছিল, আর পৃথিবী থেকে চাঁদের দূরত্ব ছিল সাড়ে তিন লাখ কিলোমিটারের একটু বেশি। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি ছিল ২৪ জুন ২০১৭ তারিখে সৌদি আরবে সূর্য ডুবে ছিল সন্ধ্যা ৬টা ৪৫ মিনিটে। আর ওই দিন চাঁদ ডুবেছিল রাত ৯ ঘটিকায়। তাহলে ওই দিন চাঁদটি উদীয়মান ছিল ২ ঘণ্টা ১৫ মিনিট। সেই সুবাধে সৌদি আরবসহ অন্যান্য দেশগুলো সন্ধ্যার পর ২ ঘণ্টা ১৫ মিনিটের মধ্যেই খালি চোখে অথবা যন্ত্র ও খালি চোখ এ দু’য়ের সমন্বয়ে চাঁদটি দেখেছিল এবং ২৫ জুন ২০১৭ তারিখে ঈদুল ফিতর ২০১৭ উদযাপন করে।
আর আমরা? আমাদের দেশে গত ২৪ জুন ২০১৭ তারিখে সূর্য অস্ত গিয়েছিল ৬টা ৪৮ মিনিটে। আর চাঁদ ডুবেছিল ৮টা ২ মিনিট ১৭ সেকেন্ডে। এ হিসাবে ১ ঘণ্টা ১৪ মিনিট ১৭ সেকেন্ড আকাশে চাঁদ অবস্থান করছিল। তাহলে আমরা দেখতে পেলাম না কেন? খুব সংক্ষিপ্ত সময় চাঁদটি আকাশে অবস্থান করেছিল বিধায় চাঁদ দেখার জন্য প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি নিয়ে দিনের শুরুতেই প্রস্তুত থাকা উচিত ছিল।
অন্য দিকে ওই দিন চাঁদ না দেখার কিছু কারণতো অবশ্যই আছে। হতে পারে সেদিন ১. আকাশ মেঘাচ্ছন্ন ছিল। ২. খালি চোখে চাঁদ দেখার চেষ্টা করা হয়েছিল, কোনো দূরবীক্ষণ যন্ত্র ব্যবহার করা হয়নি। ৩. হতে পারে আমরা আগে থেকে ধরে নিয়েছি যেহেতু সৌদি আরবের একদিন পর আমরা রোজা শুরু করেছিলাম, সেহেতু সৌদি আরবের একদিন পরই আমাদের ঈদ হবে। তাতে এত আগ্রহ নিয়ে চাঁদ দেখার প্রয়োজন কি? তাই চাঁদ দেখার কোনো আগ্রহই হয়ত সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ দেখাননি।
আমি সেদিন একজন সম্মানিত ইমাম সাহেবকে জিজ্ঞাসা করেছিলাম ঈদের চাঁদ কি খালি চোখে দেখতে হবে? তিনি বলেছিলেন চাঁদকে খালি চোখে দেখতে হবে, কোনো যন্ত্রের সাহায্য নেয়া যাবে না।
এ সম্পর্কে আমি একটি হাদিসের অবতারণা করছি। আসলে কেয়ামত পর্যন্ত ইসলামের হুকুম আহকামগুলো চালু রাখতে হলে ইসলামকে সংকীর্ণ করা চলবে না। আর সে কারণেই হাদিস হলো এরকম। আবু হুরাইরা (রা.) কর্তৃক বর্ণিত নবী (সা.) বলেছেন, ‘আমাকে সংক্ষিপ্ত অথচ ব্যাপক অর্থ সংবলিত কথা বলার ক্ষমতা ও অনুমোদন দেয়া হয়েছে’। (সহিহ মুসলিম ১০৬২-১০৬৭)-এর অর্থ এই যে আল্লাহতাআলা ও তাঁর রাসূলের কথাগুলোর অর্থ বা ব্যাখ্যার কোনো নির্দিষ্ট সীমানা টানতে নেই। দিন দিন ঈদ নিয়ে বিভাজন বাড়ছে। এটা দূর করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। রাষ্ট্রের অবশ্যই এমন শক্তিশালী সংস্থা থাকবে, যারা এ ব্যাপারে সঠিক সিদ্ধান্ত দেয়ার জন্য প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি ও দলিল নিয়ে হাজির থাকবেন। চাঁদকে সারা বছর অনুসরণ করা যায়। আমাদের আবহাওয়া অধিদপ্তর এ কাজটি করতে পারে। শুধু ইসলামিক ফাউন্ডেশন কিংবা জেলা প্রশাসনকে এ ব্যাপারে দায়িত্ব দিলেই চলবে না। গত ২৪ জুন ২০১৭ তারিখে অবশ্যই বাংলাদেশের আকাশে শাওয়ালের চাঁদ উদিত হয়েছিল। কিন্তু আমাদের দেখার ক্ষমতা ছিল না। সেটাই বড় কথা। তবে দেখা না গেলেও ২৫ জুন সন্ধ্যায় চাঁদ দেখে ২৬ জুন ২০১৭ তারিখে আমরা ঈদুল ফিতর উদযাপন করেছি, সেটাও সঠিক ছিল। কারণ সরকার এই সামাজিক উৎসব পালনের ঘোষণা প্রদানের জন্য ক্ষমতা রাখেন, এটা বাদ দিয়ে অন্য দেশের সঙ্গে সঙ্গতি রেখে উৎসব পালন মোটেই সঙ্গতিপূর্ণ নয়। এটা বুঝতে হবে।
লেখক : উপ-পরিচালক (অর্থ ও প্রশাসন)
আর্মি ইনস্টিটিউট অব
বিজনেস অ্যাডমিনিস্ট্রেশন
জালালাবাদ সেনানিবাস, সিলেট