ফিচার

শাওয়ালের ৬ রোজার ফজিলত

মোহাম্মদ মুহিব্বুল্লাহ : শাওয়াল আরবি শব্দ। এর অর্থ হলো উঁচু করা, উন্নতকরণ, উন্নত ভূমি, পূর্ণতা, ফলবতী, পাল্লা ভারী হওয়া, গৌরব করা, বিজয়ী হওয়া, প্রার্থনায় হস্ত উত্তোলন করা বা ভিায় হস্ত প্রসারিত করা, পাত্রে অবশিষ্ট সামান্য পানি, ফুরফুরে ভাব, দায়ভারমুক্ত ব্যক্তি, ক্রোধ প্রশমন ও নীরবতা পালন, সিজন করা কাঠ। এসব অর্থের প্রতিটির সঙ্গেই শাওয়ালের সুগভীর সম্পর্ক রয়েছে। এই মাসের আমল দ্বারা উন্নতি লাভ হয়, পূর্ণ ফল লাভ হয়, নেকির পাল্লা ভারী হয়, গৌরব অর্জিত হয় এবং সাফল্য আসে, ফলপ্রার্থী মহান আল্লাহর কাছে হস্ত সম্প্রসারিত করে প্রার্থনা করে, পূর্ণ মাস রোজা পালনের পর আরও কয়েকটি রোজা রাখে, প্রাপ্তির আনন্দে বিভোর হয়, ফরজ রোজা পালন শেষে সুন্নত ও নফল রোজার প্রতি মনোনিবেশ করে, আত্মনিয়ন্ত্রণের শক্তি অর্জন করে, পরিপক্বতা ও স্থিতি লাভ করে। এসবই হলো শাওয়াল মাসের নামের যথার্থতা।
আরবি চন্দ্র বছরের দশম মাস হলো শাওয়াল। এটি হজের ৩ মাস তথা শাওয়াল, জিলকদ, জিলহজের প্রথম মাস। এই মাসের প্রথম তারিখে ঈদুল ফিতর বা রমজানের ঈদ। পহেলা শাওয়াল সাদাকাতুল ফিতর বা ফিতরা আদায় করা এবং ঈদের নামাজ পড়া ওয়াজিব। এই মাসের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতা রয়েছে হজের। এর সঙ্গে সম্পৃক্ততা রয়েছে ঈদের। এর সঙ্গে সম্পর্ক রয়েছে রোজা ও রমজানের এবং এর সঙ্গে সম্পর্ক রয়েছে সাদকা ও জাকাতের। তাই এই মাস আমল ও ইবাদতের জন্য অত্যন্ত উর্বর ও উপযোগী। এক মাস রোজা রেখেই যেন বান্দা রোজাকে ভুলে না যায়, সে জন্য প্রতি চন্দ্র মাসের ১৩ থেকে ১৫ তারিখের রোজা, আশুরার রোজা, ৯ জিলহজ আরাফার দিনের রোজাসহ অন্যান্য নফল রোজার বিধান রেখেছে ইসলাম। ফরজ নামাজের কমতিগুলো পোষাতে যেমন নফল নামাজ রয়েছে, তেমনি ফরজ রোজার পরও শাওয়ালের সুন্নত রোজা রয়েছে। এই নফলগুলো ফরজের ত্র“টিগুলোর তিপূরণের জন্য। রোজাদার যদি অনর্থক বাক্যালাপ, কুদৃষ্টি প্রভৃতি কাজ থেকে সম্পূর্ণ বাঁচতে না পারে, তাহলে তার রোজার পুণ্য কমে যায়। আর কমতি পুণ্যকে পূর্ণ করতেই শাওয়ালের ৬টি রোজা।
শাওয়ালের ৬টি রোজার মাধ্যমে রমজানের রোজার শুকরিয়া আদায় করা হয়। যখন কোনো বান্দার আমল আল্লাহতাআলা কবুল করেন, তখন তাকে অন্য নেক আমলের তাওফিক দেন। সুতরাং এ রোজাগুলো রাখতে পারা রমজানের রোজা কবুল হওয়ারও লণ। রাসূলুল্লাহ (সা.) নিজে এ রোজা রাখতেন এবং সাহাবায়ে কেরামদের রোজা রাখার নির্দেশ দিতেন। হজরত আবু আইয়ুব আনসারি (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন, যে ব্যক্তি রমজানের রোজা রাখল, অতঃপর শাওয়ালের ৬টি রোজা রাখল, সে যেন সারা বছরই রোজা রাখল। (মুসলিম ২/৮২২)
রমজানের ৩০টি রোজার সঙ্গে শাওয়ালের ৬টি রোজা যুক্ত হলে মোট রোজার সংখ্যা হয় ৩৬টি। আর প্রতিটি পুণ্যের জন্য ১০ গুণ পুরস্কারের কথা উল্লেখ রয়েছে কোরআনুল কারিমে। তাহলে ৩৬টি রোজার ১০ গুণ হলে ৩৬০টি রোজার সমান (এটি পুরস্কারের দিক থেকে)। অর্থাৎ সারা বছর রোজার সমান সাওয়াব হবে। হজরত সাওবান (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেন, রমজানের রোজা ১০ মাসের রোজার সমতুল্য আর (শাওয়ালের) ৬ রোজা দুই মাসের রোজার সমান। সুতরাং এ হলো ১ বছরের রোজা। (নাসায়ি : ২/১৬২)
সূরা আনআমের ১৬০ নম্বর আয়াতে ইরশাদ হয়েছে, যে ব্যক্তি একটি সৎ কাজ করল, সে ১০ গুণ সাওয়াব পাবে। এ হিসাবে যে ব্যক্তি রমজানের ১ মাস রোজা রাখল, সে ১০ মাস রোজা রাখার সাওয়াব পাবে। আর ৬টি রোজার ১০ গুণ ৬০ দিন। অর্থাৎ ২ মাস। আর এ দুই মাস মিলে ১২ মাস রোজার সাওয়াব। হজরত উবাইদুল্লাহ (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, একদিন রাসূলুল্লাহ (সা.)-কে জিজ্ঞেস করলাম, ইয়া রাসূলুল্লাহ, আমি কি সারা বছর রোজা রাখতে পারব? তখন রাসূলুল্লাহ (সা.) বললেন, তোমার ওপর তোমার পরিবারের হক রয়েছে। কাজেই তুমি সারা বছর রোজা না রেখে রমজানের রোজা রাখো এবং রমজান-পরবর্তী শাওয়ালের ৬টি রোজা রাখো, তাতেই সারা বছর রোজা রাখার সওয়াব পাবে। (তিরমিজি : ১/১৫৭)
কাজেই হজরত রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর সুন্নত অনুযায়ী রমজান মাসে কারো রোজা ভাঙতি হলে শাওয়াল মাসে সেই ভাঙতি রোজা আগে পূর্ণ করতে হবে। যদি ভাঙতি রোজা পূর্ণ করতে শাওয়াল মাস পুরোটাই লেগে যায় (বিশেষ করে অসুস্থতা, সফর বা মহিলাদের বিশেষ কোনো শারীরিক অবস্থায়), তাহলে তিনি জিলকদ মাসে ওই ৬টি রোজা রাখলেও শাওয়ালের ৬টি রোজার অনুরূপ সওয়াব পাবেন। রমজানের কোনো ফরজ রোজা ভাঙতি হলে প্রথমে সেই ফরজ রোজাই রাখতে হবে। পরে শাওয়ালের ৬টি রোজা করতে হবে। রোজা কাজা করার যথাযথ ও অনুমোদিত ওজর যার রয়েছে, তাকে অবশ্যই কাজা রোজা করতে হবে আগে। কেননা রমজানের রোজা হলো ইসলামের একটি স্তম্ভ। আর শাওয়ালের ৬টি রোজা হলো মুস্তাহাব। যে এই মুস্তাহাব পালন করল না, সে তিরস্কৃত হবে না। কেননা এটা ফরজ ইবাদত নয়। শাওয়ালের ৬টি রোজার ব্যাপারে কিছু ভুল ধারণা সমাজে প্রচলিত। অনেকের ধারণা, এ রোজা শুধু মহিলারা রাখবে। না, তা নয়; এ রোজা পুরুষ-মহিলা সবার জন্যই সুন্নাত। মাসের শুরু এবং শেষ কিংবা মাঝামাঝিÑ সবসময়ই রাখা যায় এ রোজাগুলো। একনাগাড়ে অথবা মাঝে ফাঁক রেখে পৃথকভাবেও রাখা যায়। শাওয়াল মাসে শুরু করে শাওয়াল মাসে শেষ করলেই হলো। তবে ঈদুল ফিতরের পর শাওয়াল মাসের প্রথম দিকে একসঙ্গে ৬টি রোজা রাখাই উত্তম।
লেখক : ইসলামি গবেষক