ফিচার

শ্রদ্ধা-ভালোবাসায় সংগীত গবেষক ড. করুণাময় গোস্বামীর চিরবিদায়

নিজস্ব প্রতিবেদক : পরম শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায় চিরবিদায় নিলেন সংগীত গবেষক ড. করুণাময় গোস্বামী। সমাজের বিভিন্ন শ্রেণির-পেশার মানুষ তার মরদেহের প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা জানান। ৩ জুলাই ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জে কয়েক দফা শ্রদ্ধা নিবেদনের পর তার শেষকৃত্য সম্পন্ন হয়। বৃষ্টিস্নাত দিনেও অসংখ্য মানুষ এসেছিলেন সংগীতে নিবেদিতপ্রাণ বরেণ্য এই ব্যক্তিত্বকে শেষ শ্রদ্ধা জানাতে। এসেছিলেন ভালোবাসা জানাতে। তারা বলেছেন, করুণাময় গোস্বামী শরীরীভাবে না থাকলেও আপন কর্ম ও গবেষণার মাধ্যমে মানুষের হৃদয়ে বেঁচে থাকবেন চিরকাল।
৩ জুলাই শমরিতা হাসপাতালের হিমঘর থেকে ড. করুণাময় গোস্বামীর মরদেহ বাংলা একাডেমিতে শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য নেয়া হয়। এরপর কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে বৃষ্টি উপো করে সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট আয়োজিত শ্রদ্ধা নিবেদন পর্বে শিাবিদ, নাট্যজনসহ নানা পেশার মানুষ হাজির হয়েছিলেন। শহীদ মিনারের শ্রদ্ধাঞ্জলি পর্ব শেষে তার মরদেহ নিয়ে যাওয়া হয় নারায়ণগঞ্জে তার দীর্ঘদিনের কর্মস্থল তোলারাম কলেজে। সেখানে শিক-ছাত্রসহ আশপাশের স্থানীয় বাসিন্দারা তাকে শেষ শ্রদ্ধা জানান। এরপর শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য নারায়ণগঞ্জ প্রেসকাব ও নারায়ণগঞ্জ কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে রাখা হয় তার মরদেহ। এ সময় নারায়ণগঞ্জের সাংস্কৃতিক অঙ্গনের প্রাণপুরুষ হিসেবে পরিচিত এই ব্যক্তিত্বকে শ্রদ্ধা জানান নারায়ণগঞ্জের সর্বস্তরের মানুষ। এরপর নারায়ণগঞ্জ সদরের মাসদাইর শ্মশানে তার অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া সম্পন্ন হয়।
শ্রদ্ধা নিবেদনের সময় উপস্থিত ছিলেন করুণাময় গোস্বামীর স্ত্রী শিপ্রা দেবী, ছেলে সায়ন্তন গোস্বামী ও মেয়ে তিথি গোস্বামী। এ সময় তার সন্তান তিথি ও সায়ন্তন সবার কাছে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে বলেন, বাবার আত্মজীবনী প্রকাশের ইচ্ছা ছিল, যা আলোর মুখ দেখেনি। আমরা সেটি প্রকাশের চেষ্টা করব।

সকালে বাংলা একাডেমিতে করুণাময় গোস্বামীর প্রতি শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করেন বাংলা একাডেমির সভাপতি প্রফেসর ইমেরিটাস ড. আনিসুজ্জামান ও একাডেমির সচিব আনোয়ার হোসেনসহ বাংলা একাডেমির সর্বস্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা।
বাংলা একাডেমির সভাপতি অধ্যাপক আনিসুজ্জামান বলেন, বাংলা সংগীতের একজন বিশেষজ্ঞ ছিলেন ড. করুণাময় গোস্বামী। সংগীতের ইতিহাস ও এর ভাবসৌন্দর্য বিশ্লেষণে তিনি বিশেষ ভূমিকা রেখে গেছেন, যা তুলনাহীন। তিনি তার গবেষণাকর্মের মধ্য দিয়ে তরুণ প্রজন্মের মাঝে বেঁচে থাকবেন। দেশভাগ নিয়ে তার সম্প্রতি প্রকাশিত দুটি উপস্যাস ‘ভারতভাগের অশ্রুকণা’ ও ‘লাহোরের রহিম খের’ খুব তাৎপর্যপূর্ণ।
কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে শ্রদ্ধা জানান আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের। তিনি আওয়ামী লীগের প থেকেও শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। এ সময় তার সঙ্গে উপস্থিত ছিলেন সংস্কৃতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর, আওয়ামী লীগের সাংস্কৃতিক সম্পাদক অসীম কুমার উকিল। শ্রদ্ধা নিবেদন করেন প্রফেসর ইমেরিটাস ভাষাসংগ্রামী অধ্যাপক রফিকুল ইসলাম, ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের উপাচার্য আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক, রামেন্দু মজুমদার, মামুনুর রশীদ, মফিদুল হক, আবুল হাসনাত, সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের সচিব ইব্রাহীম হোসেন খান, নজরুল ইনস্টিটিউটের পরিচালক আবদুর রাজ্জাক ভূইয়া, সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের সভাপতি গোলাম কুদ্দুছ, সাধারণ সম্পাদক হাসান আরিফ প্রমুখ। শ্রদ্ধাঞ্জলি পর্বটি সঞ্চালনা করেন মানজার চৌধুরী সুইট।
অধ্যাপক রফিকুল ইসলাম বলেন, উপমহাদেশে সংগীত গবেষণা তার হাতে ঋদ্ধ হয়েছে। ড. করুণাময় গোস্বামী শিাবিদ ও গবেষক হিসেবে নিজেকে মেলে ধরেছিলেন। নজরুল ও রবীন্দ্র সংগীত নিয়ে আজীবন গবেষণা করেছেন। তবে তার সবচেয়ে বড় অবদান সংগীতকোষ। এটা উপমহাদেশে সংগীত নিয়ে বড় কাজগুলোর মধ্যে অন্যতম।
সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেন, তার জ্ঞান ও মনীষা আমাদের আলোকিত করে, গর্বিত করে। সংগীতকোষ ড. করুণাময় গোস্বামীর অনন্য এক গবেষণাকর্ম। উপমহাদেশের সংগীত গবেষণায় এই গ্রন্থ নতুন মাত্রা যোগ করেছে।
আসাদুজ্জামান নূর বলেন, গবেষণা ও শিায় অবদানের মধ্য দিয়ে ড. করুণাময় গোস্বামী নিজেকে জ্ঞানতাপস হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন। অন্তর্মুখী এই মানুষটি সাহিত্য ও সংগীতে মৌলিক গবেষণায় যে কাজ করে গেছেন তা খুব কম গবেষকই করতে পেরেছেন।
রামেন্দু মজুমদার বলেন, মৃত্যুর মিছিল শুরু হয়েছে। একে একে গুণী মানুষরা চলে যাচ্ছেন। ড. করুণাময় গোস্বামীকে সংগীতবেত্তা হিসেবে দেখেছি। রবীন্দ্র ও নজরুল সংগীত নিয়ে গবেষণা করেছেন। সর্বশেষ দেশভাগ নিয়ে লেখা তার উপন্যাস আমাদের আলোড়িত করেছে।
আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক বলেন, কিছু কিছু মানুষ থাকেন যাদের মৃত্যু মেনে নেয়া যায় না। যে বয়সেই মৃত্যু হোক না কেন তা অকালমৃত্যু বলে মনে হয়। ড. করুণাময় গোস্বামী তেমনি একজন ব্যক্তিত্ব। তার কাজ আমাদের পথ দেখাবে। অসমাপ্ত যেসব কাজ রয়ে গেল তা আমাদের আরও অনেক কিছু পাওয়া থেকে বঞ্চিত করবে।
মফিদুল হক বলেন, সাতচল্লিশের দেশভাগের বেদনাকে বুকে ধারণ করে তিনি বাংলাদেশের সাহিত্য এবং ইতিহাস-ঐতিহ্যকে প্রতিনিধিত্ব করেছেন। অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনার প্রতিনিধিত্ব করেছেন।
ড. করুণাময় গোস্বামী শেষকৃত্য ৩ জুলাই বিকেলে নারায়ণগঞ্জের মাসদাইর শ্মশানে সম্পন্ন হয়েছে। এর আগে দুপুরে নারায়ণগঞ্জের চাষাঢ়া কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে তার মরদেহে শ্রদ্ধা জানান জেলা প্রশাসনের পে অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট আব্দুল হামিদের নেতৃত্বে জেলা প্রশাসনের কর্মকর্তা-কর্মচারীবৃন্দ। এরপর ড. করুণাময় গোস্বামীর মরদেহে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন নারায়ণগঞ্জ সিটি মেয়র ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভী, নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনের জাপা (এরশাদ) দলীয় সংসদ সদস্য এ কে এম সেলিম ওসমান, আন্তর্জাতিক অপরাধ বিষয়ক ট্রাইব্যুনালের প্রধান তদন্ত কর্মকর্তা আব্দুল হান্নান সরকার।
ড. করুণাময় গোস্বামীর মরদেহ অ্যাম্বুলেন্সে করে ঢাকা থেকে তার দীর্ঘদিনের কর্মস্থল সরকারি তোলারাম কলেজে নেয়া হয়। সেখানে কলেজের শিক, অধ্য, ছাত্রছাত্রী সংসদ ও নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনের আওয়ামী লীগ দলীয় সংসদ সদস্য এ কে এম শামীম ওসমানের পে এলাকার নেতাকর্মীরা মরদেহে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। পরে আনা হয় নারায়ণগঞ্জের চাষাঢ়ায় অবস্থিত সুধীজন পাঠাগারের সামনে। সেখানে লাশবাহী গাড়িতে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন সুধীজন পাঠাগারের পরিচালকসহ কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা। পরে তার লাশ রাখা হয় চাষাঢ়া কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে। দীর্ঘ দুই ঘণ্টা শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে বিকেল ৩টার দিকে মরদেহ নিয়ে যাওয়া হয় নারায়ণগঞ্জের মাসদাইর শ্মশানে। সেখানে ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠান শেষে দাহ করা হয় ড. করুণাময় গোস্বামীকে।