খেলা

ইংল্যান্ডে খেলতে গিয়ে তামিম ইকবালের দেশে ফিরে আসার নেপথ্যে

ক্রীড়া প্রতিবেদক : ইংল্যান্ডের এসেক্স কাউন্টিতে খেলতে গিয়ে তামিম ইকবাল মাত্র একটি ম্যাচ খেলে ফিরে আসার সিদ্ধান্তের পরে কিছু গণমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হয় তামিম সেখানে বিদ্বেষপ্রসূত আক্রমণের শিকার হয়েছিলেন। তবে ১২ জুলাই নিজের অফিসিয়াল ফেসবুক পেজ থেকে দেয়া পোস্টে তামিম এই খবর সত্য নয় বলে উড়িয়ে দিয়েছেন।
ইংল্যান্ডের এসেক্স দলে এক মাসের জন্য খেলতে যাওয়া ওপেনার তামিম মাত্র একটি ম্যাচ খেলেন। কেন্টের বিপক্ষে একমাত্র ম্যাচে ৭ রান করার পরে হঠাৎ করেই শোনা যায় তামিম ব্যক্তিগত কারণে দেশে ফিরে আসছেন। এসেক্সের ওয়েবসাইটেও একই কথা বলা হয়। তবে দেশীয় কিছু গণমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হয় এসেক্সে বিদ্বেষপ্রসূত আক্রমণের শিকার হয়েছেন তামিম। তবে তামিমের টুইটার ও ফেসবুক পেজে শোনা গেল এসেক্সের বিবৃতিরই প্রতিধ্বনি।
ফেসবুকে দেয়া পোস্টে তামিম বলেন, আমি আমার ভক্ত ও শুভানুধ্যায়ীদের জানাতে চাই, আমি ব্যক্তিগত কারণে এসেক্স মৌসুম সংক্ষিপ্ত করে দেশে ফিরে এসেছি। কিছু গণমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হয় যে আমাদের উপর বিদ্বেষপ্রসূত আক্রমণ হয়েছে। এটা প্রকৃত সত্য নয়। ইংল্যান্ডকে নিজের অন্যতম প্রিয় খেলার জায়গা উল্লেখ করে তামিম বলেন, এসেক্স থেকে আমার সময়ের আগে চলে আসার পরেও তারা পুরো ব্যাপারটি সৌজন্যের মনোভঙ্গিতে দেখেছে। আমার জন্য চিন্তা ও বার্তার জন্য সমর্থক ও শুভানুধ্যায়ীদের ধন্যবাদ জানাতে চাই এবং ভবিষ্যতে ইংল্যান্ডে খেলতে যাওয়ার জন্য অপেক্ষা করবো।
ফেসবুক স্ট্যাটাসের পরও তামিমের দেশে ফেরা নিয়ে ধোঁয়াশা কাটছে না। যদিও ড্যাসিং ওপেনার নিজের ফেসবুক ফ্যানপেজে পরিষ্কার করে বলে দিয়েছেন, তাকে কেউ হুমকি দেয়নি! কারণ একান্তই ব্যক্তিগত! তবে মিডিয়ায় হুমকির বিষয়টি চলে আসায় সংশয় বেড়ে গেছে। ১৩ জুলাই ইংলিশ মিডিয়ায় তামিমের নিউজটি গুরুত্ব সহকারে ছাপিয়েছে। দ্য ইন্ডিপেনডেন্ট, দ্য সান, ডেইলি মিরর-এর মতো শীর্ষস্থানীয় ইংলিশ পত্রিকাগুলো তাদের প্রতিবেদনে ভিন্ন ইঙ্গিত দিয়েছে।
সত্যিই কি তামিম ও তার স্ত্রীকে ধাওয়া করা হয়েছিল? যে কারণে দ্রুত দেশে ফিরতে বাধ্য হয়েছেন দেশসেরা ব্যাটসম্যান! নাকি তামিমের হুমকি পাওয়ার বিষয়টি বিশেষ কারণে প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা চলছে। এ বিষয়ে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড থেকেও কোনো কিছু জানানো হয়নি। আবার তামিমের পরিবারের কেউও মুখ খুলছেন না।
তবে জানা গেছে, তামিম তার স্ত্রীকে সঙ্গে নিয়ে লন্ডনের একটি রেস্তোরাঁয় রাতের খাবার খেতে গিয়েছিলেন। সে সময় তামিমের স্ত্রী ছিলেন হিজাব পরিহিত। হিজাব পরা অবস্থায় তামিমের স্ত্রীকে দেখে ৩ জন শেতাঙ্গ যুবক এগিয়ে এসে জানতে চায়, তামিমের স্ত্রী আইএস বা অন্য কোনো জঙ্গি সংগঠনের সদস্য কি না। যুবকরা এই প্রশ্নের উত্তর না জেনেই বলতে থাকে, হিজাব খুলে ফেল, নইলে মুখে এসিড নিক্ষেপ করবো। এতে ভড়কে যায় তামিম ও তার স্ত্রী। ওই যুবকদের আক্রমণ থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য তামিম ও তার স্ত্রী দৌড়াতে থাকেন। যুবকরাও পেছনে পেছনে দৌড়াতে থাকে এবং বলতে থাকে, তোমাদের আবার লন্ডনে দেখা গেলে একেবারে শেষ করে ফেলা হবে। এই হুমকির পরপরই তামিম লন্ডন ছাড়ার সিদ্ধান্ত নেন এবং দ্রুতই দেশে ফিরে আসেন।
তামিমের সঙ্গে ইংলিশ কাউন্টি ক্লাব এসেক্সের চুক্তি ছিল ৮ ম্যাচের। কিন্তু তামিম এক ম্যাচ খেলেই দেশে ফিরেছেন। এমনকি এক ম্যাচের টাকাও তিনি ক্লাবের কাছ থেকে নেননি। তাহলে কী এমন কারণে তামিমকে এভাবে দেশে ফিরতে হলো! সব কিছুর মধ্যে কেমন যেন রহস্যের গন্ধ আছে বলে অনেকে মনে করছেন।
ইংলিশ পত্রিকা ইন্ডিপেনডেন্টের দাবি, তামিম চাপের কারণেই তার পরিবারের ওপর হামলার বিষয়টি এড়িয়ে যাচ্ছেন! যদিও ইংলিশ পত্রিকাগুলো প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে বাংলাদেশের নির্দিষ্ট পত্রিকার বরাত দিয়ে। তাই ঘটনার সত্যতা বোঝা যাচ্ছে না। সব কিছু মিলে তৈরি হচ্ছে বিভ্রান্তি! তবে ঘটনা যাই ঘটুক না কেন, ঘটনাটির সঙ্গে নিরাপত্তার বিষয়টি জড়িত বলেই মনে হচ্ছে। সে কারণেই এই স্পর্শকাতর বিষয় নিয়ে কেউ পরিষ্কার করে কিছু বলতে চাচ্ছে না।
ইংল্যান্ড অ্যান্ড ওয়েলস ক্রিকেট বোর্ড (ইসিবি) হচ্ছে বিসিবির বন্ধু! হলি আর্টিজান হামলার পর যখন অন্য দলগুলো নাক সিটকাচ্ছিল, তখন ইংল্যান্ড কিন্তু ঠিকই বাংলাদেশে এসে সফর করে গেছে। শুধু তাই নয়, বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের ভূয়সী প্রশংসাও করেছে তারা। তাই ইংল্যান্ডের প্রতি বাংলাদেশের একটা কৃতজ্ঞতাবোধ আছেই। সে কারণেই সামান্য একটা ঘটনাকে কেন্দ্র করে দুই দেশের ক্রিকেট বোর্ডের মধ্যে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক নষ্ট হয়ে যাক সেটাও কারো কাম্য নয়। তাছাড়া আগামী নভেম্বরেই বাংলাদেশে অনুষ্ঠিত হবে সেলিব্রেটি টি-টোয়েন্টি ক্রিকেট লিগ-বিপিএল। ওই টুর্নামেন্টে অনেক ইংলিশ ক্রিকেটার খেলবেন। তাই এ সময় দুই বোর্ডের মধ্যে সম্পর্ক নষ্ট হয়ে গেলে ইসিবি তাদের ক্রিকেটারদের বাংলাদেশের আসার ছাড়পত্র নাও দিতে পারে। এমনিতেই ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ড তাদের ক্রিকেটারদের বাংলাদেশে খেলার অনুমতি দেয় না। যদি ইংল্যান্ডের ক্রিকেটাররাও না আসে সেক্ষেত্রে কিছুটা রঙ হারাতে পারে বিপিএল।
তাই তামিমের বিষয়টি নিয়ে জল ঘোলা করতে চায় না বিসিবি। তাদের চাওয়া, ঘটনা যাই ঘটুক না তা এখানেই শেষ হয়ে যাক। তবে বিসিবির দাবি, তামিমের এই ঘটনা নাকি বিপিএলের ওপর কোনো প্রভাব পড়বে না। ১৩ জুলাই বিসিবির প্রধান নির্বাহী নিজাম উদ্দীন চৌধুরী সুজন বলেন, এই বিষয়টি নিয়ে বিপিএলে কোনো প্রভাব পড়ার সুযোগ নেই। এটা তো তামিমের ব্যক্তিগত বিষয়। বিসিবির সঙ্গে ইসিবির সম্পর্কে টানাপড়েন ঘটার কোনো কারণ নেই। এদিকে তামিমের বিষয়টি ক্রিকেটপ্রেমীদের মধ্যে তৈরি হচ্ছে উৎকণ্ঠা! তাই বিসিবির উচিত হবে, এখনই তাদের অবস্থান পরিষ্কার করে বিবৃতি দেয়া। যাতে ক্রিকেটপ্রেমীদের মধ্যে আর কোনো উৎকণ্ঠা কাজ না করে। তা না হলে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা চলতেই থাকবে। আর এই আলোচনাটি যতই চলতে থাকবে, সেটা বাংলাদেশের ক্রিকেটের জন্য আদৌ শুভ হবে না।