প্রতিবেদন

চলতি বছরই মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি সম্পাদনে হাসিনা-সিরিসেনা ঐকমত্য : শ্রীলংকার প্রেসিডেন্টের বাংলাদেশ সফরে ১৪ চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর

নিজস্ব প্রতিবেদক : দ্বিপক্ষীয় ব্যবসাবাণিজ্য বাড়ানোর লক্ষ্য নিয়ে শ্রীলংকার সঙ্গে এ বছরই মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) করতে যাচ্ছে বাংলাদেশ। এ বিষয়ে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং শ্রীলংকার প্রেসিডেন্ট মাইথ্রিপালা সিরিসেনা একমত হয়েছেন। শ্রীলংকার সঙ্গে এফটিএ হলে এটাই হবে বাংলাদেশের সঙ্গে কোনো দেশের এ ধরনের প্রথম চুক্তি। তিনদিনের সফরে বাংলাদেশে আসা শ্রীলংকার প্রেসিডেন্ট মাইথ্রিপালা সিরিসেনার সঙ্গে ১৪ জুলাই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে এফটিএ নিয়ে এই ঐকমত্য হয়। দুই নেতা চলতি বছরই মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি করার বিষয়ে সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। এ জন্য যে আলোচনা ও পরীক্ষা-নিরীক্ষা দরকার, তা দ্রুত শেষ করারও সিদ্ধান্ত হয়েছে।
এ বিষয়ে পররাষ্ট্র সচিব শহীদুল হক বলেন, এটা একটা অসম্ভব ব্রেক থ্র“। কারণ বাংলাদেশের সঙ্গে কারও এফটিএ নেই। যদি ২০১৭ তে এফটিএ হয়, তাহলে এটাই হবে বাংলাদেশের সঙ্গে কোনো দেশের প্রথম এফটিএ। আমার মনে হয় এটা একটা বড় পলিটিক্যাল প্রোগ্রেস টুয়ার্ডস ট্রেড অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট বিটুইন দ্য টু কান্ট্রিজ।
হাসিনা-সিরিসেনা বৈঠকের পর দুই দেশের কূটনীতিবিদ ও সরকারি কর্মকর্তাদের ভিসাবিহীন যাতায়াতের বিষয়ে একটি চুক্তি এবং বাণিজ্য, বিনিয়োগ, কৃষি, শিক্ষা ও তথ্য বিনিময়সহ বিভিন্ন বিষয়ে ১৩টি সমঝোতা স্মারকে সই হয়। এসব সমঝোতা স্মারকের মধ্যে ৭টিই ব্যবসা ও বিনিয়োগ সংক্রান্ত বিষয়ে। শেখ হাসিনা এবং মাইথ্রিপালা সিরিসেনার উপস্থিতিতে দুই দেশের প্রতিনিধিরা এসব চুক্তি ও সমঝোতা স্মারকে সই করেন।
সিরিসেনা ১৪ জুলাই প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে পৌঁছলে টাইগার গেটে তাকে স্বাগত জানান শেখ হাসিনা। ফুলের তোড়া দিয়ে বরণ করে নেয়া হয় শ্রীলংকার প্রেসিডেন্টকে। দুই নেতা প্রথমে একান্ত বৈঠকে অংশ নেন। তারপর দুই দেশের প্রতিনিধি দলের সদস্যরা প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের চামেলি হলে দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে বসেন। শেষে করবীতে দুই নেতার উপস্থিতিতে দুই দেশের মধ্যে চুক্তি ও সমঝোতা স্মারকগুলো সই হয়।
দুই দেশের কূটনীতিক ও সরকারি কর্মকর্তাদের ভিসাবিহীন চলাচলের বিষয়ে একটি চুক্তিতে সই করেন বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল ও শ্রীলংকার পররাষ্ট্রমন্ত্রী রবি করুনানায়েকে। সমঝোতা স্মারকগুলো হচ্ছে কৃষি খাতে সহযোগিতা, সিলন শিপিং করপোরেশন (সিএসসি) ও বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশনের (বিএসসি) মধ্যে এমওইউ, বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজ (বিআইআইএসএস) ও লক্ষণ কাদিরাগামা ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল রিলেশনস অ্যান্ড স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের (এলকেআইআইআরএসএস) মধ্যে আন্তর্জাতিক ও কৌশলগত সমীক্ষা, উচ্চশিক্ষা খাতে সাহায্য-সহযোগিতা বিষয়ে দুই দেশের বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের মধ্যে এমওইউ, বাংলাদেশ ফরেন সার্ভিস একাডেমি (এফএসএ) ও বন্দরনায়েকে ডিপ্লোমেটিক ট্রেনিং ইনস্টিটিউটের (বিআইডিটিআই) মধ্যে এমওইউ, আর্থিক খাতে সহযোগিতা বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক ও সেন্ট্রাল ব্যাংক অব শ্রীলংকার মধ্যে এমওইউ, বিনিয়োগ-সংক্রান্ত বিষয়ে সহযোগিতার জন্য বাংলাদেশ ইনভেস্টমেন্ট ডেভেলপমেন্ট অথরিটি (বিডা) ও ইনভেস্টমেন্ট অব শ্রীলংকার মধ্যে এমওইউ, বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশন (বিএসটিআই) ও শ্রীলংকা স্ট্যান্ডার্ডস ইনস্টিটিউশনের (এসএলএসআই) মধ্যে এমওইউ, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি খাতে সহযোগিতা, বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা ও শ্রীলংকান ন্যাশনাল নিউজ এজেন্সি লঙ্কাপুভাত লিমিটেডের মধ্যে তথ্য ও সম্প্রচার বিষয়ে এমওইউ, বাংলাদেশ ও শ্রীলংকার মধ্যে রেডিও, চলচ্চিত্র ও টেলিভিশন খাতে সহযোগিতা, চিটাগাং বিজিএমইএ ইনস্টিটিউট অব ফ্যাশন অ্যান্ড টেকনোলজি (সিবিআইএফটি) ও শ্রীলংকা ইনস্টিটিউট ফর অ্যাপারেল অ্যান্ড টেক্সটাইলসের (এসএলআইটিএ) মধ্যে সহযোগিতা এবং বাংলাদেশ ও শ্রীলংকার মধ্যে অর্থনৈতিক সহযোগিতা সংক্রান্ত সমঝোতা স্মারক।
শ্রীলংকার পররাষ্টমন্ত্রী রবি করুনানায়েকে, কৃষি প্রতিমন্ত্রী ওয়াসান্তা আলুউইরা, বন্দর এবং জাহাজ চলাচল বিষয়ক উপমন্ত্রী নিশান্ত মুথুহেট্টিগামা, উচ্চশিক্ষা এবং মহাসড়ক বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী মোহন লাল গ্রিরো, অর্থ এবং গণমাধ্যম বিষয়ক উপমন্ত্রী লাসান্তা আলাইগিয়াওয়ান্না এবং বাংলাদেশে শ্রীলংকার হাইকমিশনার ইয়াসোজা গুনাসেকেরা শ্রীলংকার পক্ষে চুক্তি এবং স্মারকে স্বাক্ষর করেন।
বাংলাদেশের পক্ষে শিল্পমন্ত্রী আমির হোসেন আমু, বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ, কৃষিমন্ত্রী মতিয়া চৌধুরী, পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাহমুদ আলী, নৌপরিবহন মন্ত্রী শাজাহান খান, তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল, আইসিটি প্রতিমন্ত্রী জুনায়েদ আহমেদ পলক, বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের চেয়ারম্যান অধ্যাপক আব্দুল মান্নান, বিডার (বিআইডিএ) নির্বাহী চেয়ারম্যান কাজী আমিনুল ইসলাম এবং বিজিএমইএ সভাপতি সিদ্দিকুর রহমান চুক্তি ও সমঝোতা স্মারকে স্বাক্ষর করেন। বৈঠক শেষে দুই পক্ষই আশা করছে, শ্রীলংকার প্রেসিডেন্টের এই সফর পারস্পরিক সহযোগিতার ক্ষেত্রে নতুন সুযোগ তৈরি করবে।
১৪ জুলাই সন্ধ্যায় বঙ্গভবনে রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন প্রেসিডেন্ট সিরিসেনা। সেখানে তার সম্মানে দেয়া এক নৈশভোজেও অংশ নেন তিনি। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও সেখানে উপস্থিত ছিলেন। এছাড়া শ্রীলংকার প্রেসিডেন্টের সঙ্গে জাতীয় সংসদের স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী, জাতীয় সংসদের বিরোধী দলীয় নেতা বেগম রওশন এরশাদ ও স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মাদ নাসিম সৌজন্য বৈঠক করেন।
শ্রীলংকার প্রেসিডেন্ট মৈত্রীপালা সিরিসেনার সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দ্বিপক্ষীয় বৈঠকের পর পররাষ্ট্র সচিব শহীদুল হক বলেন, বাংলাদেশের সঙ্গে শ্রীলংকার বাণিজ্য বছরে ৮ কোটি ডলারের মতো। এফটিএ চুক্তি হলে দুই দেশের বাণিজ্য আরও বাড়বে। এটা বাড়ানোর জন্যই আমরা ২০১৩ থেকে আলোচনা করে আসছি। দুই দেশের বাণিজ্যে এখন যেসব শুল্ক ও অশুল্ক বাধা রয়েছে, তা মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির মাধ্যমে অপসারণ করা যাবে। তাতে বাংলাদেশ কতটা লাভবান হবে জানতে চাইলে পররাষ্ট্র সচিব বলেন, মিউচ্যুয়ালি উভয় দেশই লাভবান হবে। তবে বাংলাদেশ বেশি লাভবান হবে। বিশ্ববাণিজ্য এখন এক ধরনের রূপান্তরের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। অনেক দেশকেই দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য সম্পর্কের ওপর কিছুটা নির্ভরশীল হতে হচ্ছে।
শ্রীলংকার সঙ্গে প্রথমবারের মতো এফটিএ চুক্তি হলে বাংলাদেশে এ বিষয়ে যাচাই-বাছাই ও পরীক্ষা-নিরীক্ষার মধ্য দিয়ে দক্ষতা বাড়াতে পারবে বলে মনে করেন পররাষ্ট্র সচিব। আরও কয়েকটি দেশের সঙ্গে আমরা এফটিএ আলোচনা করছি। সেগুলো করতেও এটা সহায়তা করবে।
হাসিনা-সিরিসেনা বৈঠকের এক পর্যায়ে শ্রীলংকার প্রেসিডেন্ট এই সফরকে একটি ঐতিহাসিক সফর হিসেবে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, তার এই সফরের মধ্য দিয়ে দুই দেশের সম্পর্কের নবযাত্রা হলো। সিরিসেনার এই সফরে দুই দেশের ব্যবসাবাণিজ্য ও বিনিয়োগই সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পেয়েছে বলে মনে করেন পররাষ্ট্র সচিব শহীদুল হক।
কৃষি ক্ষেত্রে সমঝোতা স্মারক প্রসঙ্গে পররাষ্ট্র সচিব বলেন, আমাদের এখানে কৃষির যে অগ্রগতি হয়েছে, বিশেষ করে ধানের ক্ষেত্রে যে গবেষণা হয়েছে এবং তার যে সুফল, পৃথিবীর সর্বত্র সে সংবাদটা গেছে। ওইটা থেকে শ্রীলংকা শিক্ষা নিয়ে তাদের বীজ উৎপাদনে একটা বিপ্লব আনতে চায়।
আর উচ্চশিক্ষা খাতে সহযোগিতার বিষয়ে শ্রীলংকা ও বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) মধ্যে সমঝোতা স্মারকের বিষয়ে পররাষ্ট্র সচিব জানান, চিকিৎসা ক্ষেত্রে শ্রীলংকার বড় অংকের শিক্ষার্থী বাংলাদেশে পড়ে বলে ওখানে তারা আরেকটু সুবিধা চান। দুই দেশের কূটনীতিবিদ ও সরকারি কর্মকর্তাদের জন্য ভিসা ছাড়া যাতায়াতের জন্য চুক্তির বিষয়টিকেও একটি বড় অর্জন বলে মনে করেন শহীদুল হক।
শ্রীলংকার প্রেসিডেন্ট ৩ দিনের সফরে ১৩ জুলাই ঢাকায় পৌঁছলে শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে তাকে স্বাগত জানান রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ। এই সফরে প্রেসিডেন্ট সিরিসেনা অবস্থান করেন ঢাকার সোনারগাঁও হোটেলে। তার সফর উপলক্ষে রাজধানীর বিভিন্ন সড়ক সাজানো হয়েছে বর্ণিল সাজে। রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে বাংলাদেশে এটা তার প্রথম সফর হলেও এর আগে ২০১৩ ও ২০১৪ সালে স্বাস্থ্যমন্ত্রী হিসেবে ঢাকা ঘুরে গেছেন মৈত্রীপালা সিরিসেনা। ১৩ জুলাই ঢাকা পৌঁছানোর পর বিকেলে সাভারের জাতীয় স্মৃতিসৌধে গিয়ে বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধের শহীদদের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করেন শ্রীলংকার প্রেসিডেন্ট। পরে তিনি ধানমন্ডি ৩২ নম্বরে বঙ্গবন্ধু স্মৃতি জাদুঘর পরিদর্শন করে সেখানে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানান। জাদুঘরে তাকে স্বাগত জানান বঙ্গবন্ধুর নাতনি সায়মা ওয়াজেদ হোসেন পুতুল। এই সফরে ৭৩ সদস্যের একটি প্রতিনিধি দল শ্রীলংকার প্রেসিডেন্টের সঙ্গে ছিল। ১৫ জুলাই ঢাকা ছাড়ার আগে একটি বাণিজ্য সংলাপে অংশ নেন সিরিসেনা। এদিন ঢাকা-কলম্বোর পক্ষ থেকে একটি যৌথ বিবৃতিও প্রকাশ করা হয়। এই প্রথম বাংলাদেশ ও শ্রীলংকার মধ্যে একটি যৌথ বিবৃতি প্রকাশ পেল। এর মধ্যে দিয়ে দুই দেশের সম্পর্ক একটি কাঠামো (ফ্রেমওয়ার্ক) পেল বলে কূটনীতিকরা মনে করছেন। যৌথ ঘোষণায় দুই দেশের বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক আরও জোরদার করার অঙ্গীকারের পাশাপাশি রাজনৈতিক সম্পর্কের রূপরেখা আরও স্পষ্ট করা হয়েছে।