রাজনীতি

জাপা আওয়ামী লীগে না একক নির্বাচনে : দ্বিধাদ্বন্দ্বে নেতাকর্মীরা

নিজস্ব প্রতিবেদক : জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ বেশ অনেকদিন যাবৎ বলে আসছেন একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তার দল এককভাবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবে; অর্থাৎ ৩০০ আসনে প্রার্থী দেবে জাপা। জাতীয় পার্টির তৃণমূলের নেতাকর্মীরা তাদের চেয়ারম্যানের এই কথাটিতে তেমন একটা আস্থা রাখতে পারছেন না। কারণ ১৯৯০ সালের পর থেকেই তারা দেখে এসেছেন, এরশাদ প্রতিবারই একক নির্বাচনের কথা বলে এলেও দু’একটি ব্যতিক্রম ছাড়া একেবারে শেষ মুহূর্তে এসে তিনি কোনো না কোনো একটা বড় দলে যোগ দিয়ে জোটবদ্ধ নির্বাচন করেছেন। ফলে দেখা গেছে, যে নেতার নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা নিশ্চিত, একেবারে শেষ মুহূর্তে তাকে শরিক দলের জন্য আসন ছেড়ে দিতে হয়েছে। আবার যার নির্বাচন করারই কথা না, তিনি জোটের মনোনয়ন পেয়ে নির্বাচন করছেন। এতে দেখা যায়, একেবারে শেষ মুহূর্তে এসে অনেক নেতারই অনেক চিন্তাভাবনায়ই বিঘœ ঘটে। এ জন্য জাতীয় পার্টির তৃণমূলের নেতাকর্মীদের কথা হলো, একক নির্বাচন করেই জাতীয় পার্টির সক্ষমতা যাচাই করা উচিত। কিন্তু কোনো জাতীয় সংসদ নির্বাচনেই চেয়ারম্যান এরশাদ তার পূর্বের দেয়া কথা ঠিক রাখতে পারছেন না। একেবারে মনোনয়নপত্র জমাদানের শেষ দিনে এসে তিনি কোনো একটি জোটে যোগ দিয়ে তৃণমূলের নেতাকর্মীদের হিসাব-নিকাশকে এলোমেলো করে দিচ্ছেন। এবারেও একই দ্বিধাদ্বন্দ্বে আছে জাতীয় পার্টির তৃণমূলের নেতাকর্মীরা। কারণ সিম্পটম যা দেখা যাচ্ছে, তাতে খোদ জাতীয় পার্টিরই অনেকে বিশ্বাস করতে পারছেন না, এরশাদ একক নির্বাচন করবেন।
এর অন্যতম কারণ হলো একাদশ সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের কাছে ১০০ আসন চেয়ে প্রার্থী তালিকা দিয়েছে দশম জাতীয় সংসদের বিরোধী দল জাতীয় পার্টি। সম্প্রতি আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরের কাছে এ তালিকা দেয়া হয়। বর্তমান তালিকায় জাপার ৩৪ সংসদ সদস্যের নাম রয়েছে। জাতীয় পার্টির দলীয় একটি সূত্র বলছে, দশম সংসদ নির্বাচনের সময় জাপার পক্ষ থেকে আওয়ামী লীগের কাছে জমা দেয়া ৭০ প্রার্থীর নাম এবারও বহাল আছে। বাকি ৩০ জনের নাম জাপার জোটের শরিক নেতাদের থেকে নেয়া হয়েছে।
জাতীয় পার্টির শীর্ষ নেতারা জানিয়েছেন, এককভাবে ৩০০ আসনের প্রার্থী তালিকা তারা অবশ্য ইতোমধ্যে চূড়ান্ত করেছেন। এর মধ্যে সম্ভাবনাময় প্রার্থী হিসেবে ৭০ জনের নাম প্রথম তালিকায় যুক্ত করা হয়েছে। এছাড়া বিএনপি যদি নির্বাচনে অংশ নেয় তাহলে ১৪ দল ও জাতীয় পার্টির মধ্যে সমঝোতায় আসন ভাগাভাগি হবে। আওয়ামী লীগের সঙ্গে গাঁটছড়া বেঁধে সরকার গঠন করবে এরশাদের জাপা। যদি বিএনপি নির্বাচনে অংশ না নেয় তাহলে প্রধান প্রতিপক্ষ হিসেবে ১৪ দলের সঙ্গে লড়বে দলটি। শক্তিশালী বিরোধী দলের জায়গায় নিজেদের অবস্থান তৈরি করতে চায় জাতীয় পার্টি।
জাতীয় পার্টির অপর একটি সূত্র বলছে, বিএনপি অংশ না নিলেও আওয়ামী লীগের সঙ্গে আলোচনা সাপেক্ষে জাতীয় পার্টি প্রার্থী ঠিক করবে। যেসব এলাকায় জাপার শক্তিশালী অবস্থান সেখানে তাদের প্রার্থী থাকবে। যেখানে আওয়ামী লীগের প্রার্থীর বদনাম রয়েছে সেখানেও জাপার পক্ষ থেকে ক্লিন ইমেজের প্রার্থী দেয়া হতে পারে। অর্থাৎ নিশ্চিত বিজয় হবে এমন পরিকল্পনা থেকেই প্রার্থী চূড়ান্ত করবে আওয়ামী লীগ ও জাতীয় পার্টি। এক্ষেত্রে উভয় দলই জোট গঠন করে নির্বাচনি জোয়ার সৃষ্টি করতে চায়।
যদিও বার বার একক নির্বাচন করার কথা বলছেন ক্ষণে ক্ষণে মত পাল্টানো নেতা এরশাদ। কিন্তু ভেতরে ভেতরে আওয়ামী লীগের সঙ্গে ফের মহাজোট করে নির্বাচনের প্রস্তুতিও নিচ্ছেন। লড়বেন ভোটযুদ্ধে; তবে যেকোনোভাবেই হোক, বাকি জীবন তিনি ক্ষমতার সঙ্গেই থাকতে চান। রাজনীতিতে একা হয়ে ফের কোনো বিপদের মুখে নিজেকে ঠেলে দিতে চান না। অবশ্য এরশাদের দলের সকল স্তরের অনেক নেতা বলছেন, এককভাবে নির্বাচন করলে এরশাদ ছাড়া কারও জয়লাভের সম্ভাবনা নেই। আওয়ামী লীগের সঙ্গে জোট করলে বিপুলসংখ্যক প্রার্থী যেমন বিজয়ী হবে তেমনি আওয়ামী লীগ প্রার্থীদের বিজয়েও ভূমিকা রাখতে পারবে। এমন চিন্তা থেকেই এরশাদ এরই মধ্যে তার পার্টির ১০০ প্রার্থীর তালিকা আওয়ামী লীগকে দিয়েছেন।
জাতীয় পার্টি সূত্র জানায়, এরশাদ আশা করেন ন্যূনতম ৭০টি আসন আওয়ামী লীগ জাতীয় পার্টিকে ছাড় দেবে। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনে আওয়ামী লীগ জাতীয় পার্টিকে ৭০টি আসনে ছাড় দিতে চেয়েছিল। কিন্তু নির্বাচনের আগ মুহূর্তে এসে এরশাদ আকস্মিক সরে যাওয়ায় জাতীয় পার্টি এটি অর্জন করতে পারেনি। অনেকেই দলপ্রধানের নির্দেশ অমান্য করে নির্বাচনে অংশ নেন। শেষ পর্যন্ত ৩৪টি আসন পায় জাপা। সংরক্ষিত আসন মিলিয়ে এখন জাপা ৪০ এমপি নিয়ে সংসদের বিরোধী দল।
এরশাদের প্রেস সচিব ও প্রেসিডিয়াম সদস্য সুনিল শুভ রায় এ বিষয়ে স্বদেশ খবরকে বলেন, কোন কোন আসনে কারা প্রার্থী হতে চান, শক্তিশালী প্রার্থী কারা সে তালিকা জাপার পক্ষ থেকে চূড়ান্ত করা হয়েছে। আওয়ামী লীগের কাছে প্রার্থী তালিকা দেয়ার বিষয়ে তিনি কিছু না বললেও দলের পক্ষ থেকে প্রার্থী বাছাই ও তালিকা তৈরির কথা জানান তিনি।
তবে নাম প্রকাশ না করার শর্তে জাপার কয়েকজন শীর্ষ নেতা স্বদেশ খবরকে বলেন, এরশাদ যে ১০০ নাম আওয়ামী লীগের কাছে জমা দিয়েছেন, তাদের মধ্যে বেশির ভাগ নেতাকে মাঠ পর্যায়ে কাজ করার নির্দেশ দিয়েছেন। অনেককে অফিসে ডেকে এনে নির্বাচনি কৌশলও বুঝিয়ে দিয়েছেন। নির্দেশ অনুযায়ী সম্ভাব্য প্রার্থীরা এলাকায় পোস্টার করাসহ সামাজিক বিভিন্ন কর্মকা-ে নিজেদের যুক্ত করেছেন। ঘন ঘন এলাকায় যাচ্ছেন। অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছেন।
জাতীয় পার্টির আরেকটি সূত্র জানায়, এরশাদ এখনই তার নেতাকর্মীদের কাছে ১০০ জনের নাম প্রকাশ করতে চাচ্ছেন না। কারণ তিনি এখনো ৩০০ আসনে প্রার্থী দেবেন বলে বক্তৃতা-বিবৃতি দিয়ে চলেছেন। ফলে তালিকায় যে ১০০ জনের নাম আছে, তারা যেমন মাঠ পর্যায়ে কাজ করছেন, যাদের নাম তালিকায় নেই, তারাও নিজ নিজ এলাকায় কাজ করছেন। ফলে জাতীয় পার্টিতে সাংগঠনিক কাজ এগোলেও নেতাকর্মীদের মধ্যে দ্বিধা-দ্বন্দ্ব কাটছে না। কারণ তারা জানেন তাদের নেতা এরশাদের সিদ্ধান্ত যেকোনো সময়েই পরিবর্তিত হতে পারে। জাতীয় পার্টির নেতাকর্মীদের এই দ্বিধাদ্বন্দ্ব ভোটের মাঠেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে বলে অনেক রাজনৈতিক বিশ্লেষক মনে করেন।