প্রতিবেদন

দুর্নীতির মহানায়ক এশিয়ান ইউনিভার্সিটির আজন্ম ভিসি : ড. সাদেক-এর অনিয়ম রোধে অসহায় ইউজিসি-শিক্ষা মন্ত্রণালয়

নিজস্ব প্রতিবেদক : দেশের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষার্থীর সংখ্যা বাড়লেও মানের বিষয়টি চরমভাবে উপেক্ষিতই রয়ে গেছে। মোটামুটি গ্রহণযোগ্য একটি আইন থাকলেও এর প্রয়োগ সেই অর্থে নেই। আইনটি কার্যকরের চেষ্টা, উদ্যোগ বা সামর্থ্যও নেই শিক্ষা মন্ত্রণালয় বা বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি)। এর বড় দৃষ্টান্ত হচ্ছে প্রায় অর্ধেক বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্য না থাকা। ইউজিসির সর্বশেষ তথ্যানুযায়ী, দেশের ৯৫টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে ৮৯টিতে শিক্ষা কার্যক্রম চলছে। এর মধ্যে ৪৩টিতে ভিসি ও ৫৩টিতে কোষাধ্যক্ষ নেই। এছাড়া প্রো-ভিসি নেই ৭৫টিতে। একটি বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনায় মূল নেতৃত্ব যারা দেন, তাদের ছাড়াই চলছে এসব উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান। কোনো কোনো বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় চলছে আজীবন ভিসি দিয়ে। এই ভিসিরা ভিসির দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি প্রো-ভিসি ও কোষাধ্যক্ষের দায়িত্বও পালন করেন। এর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে এশিয়ান ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ। ১৯৯৬ সালে এশিয়ান ইউনিভার্সিটি প্রতিষ্ঠার পর থেকে সেই যে ড. আবুল হাসান মোহাম্মদ সাদেক এর উপাচার্য হয়ে বসেছেন, সেখান থেকে কেউই তাকে টলাতে পারেনি। দীর্ঘ ২১ বছর ধরে এশিয়ান ইউনিভার্সিটির ভিসি পদে থাকা ড. সাদেক শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও ইউজিসিÑ কাউকেই কোনো কেয়ার না করে একাধারে ভিসি, প্রো-ভিসি ও কোষাধ্যক্ষের পদ দখল করে আছেন। পুরোপুরি একনায়কতান্ত্রিকভাবে তিনি এশিয়ান ইউনিভার্সিটি চালাচ্ছেন।
২০১৬ সালে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের অনিয়ম-দুর্নীতি রোধকল্পে আইন সংশোধন করে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে পর্যবেক্ষক বসানোর সুপারিশ করে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি) বলেছে, দেশের ১৮টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে বৈধ কোনো ভিসি নেই। এই বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে বৈধ ভিসি নিয়োগের ত্বরিত সিদ্ধান্ত নেয়ার পরামর্শ দিয়েছে ইউজিসি। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের নানা অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনার লাগাম টেনে ধরতে এবং ট্রাস্টি বোর্ডে ক্ষমতার ভারসাম্য আনতেই এমন সুপারিশ করেছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীনস্থ প্রতিষ্ঠান ইউজিসি।
রাষ্ট্রপতির নিয়োগ করা ভিসি, প্রো-ভিসি ও কোষাধ্যক্ষ না থাকা ১৮ বিশ্ববিদ্যালয়ের যে তালিকা ইউজিসি প্রকাশ করেছে, তার প্রথমেই এসেছে এশিয়ান ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশের নাম। এই বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়টিতে রাষ্ট্রপতির নিয়োগ করা ভিসি, প্রো-ভিসি ও কোষাধ্যক্ষ নেই। বিশ্ববিদ্যালয়টির প্রতিষ্ঠাতা ড. আবুল হাসান মোহাম্মদ সাদেক; যিনি বিশ্ববিদ্যালয়টির প্রতিষ্ঠাকালীন ১৯৯৬ সাল থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত ভিসি হিসেবে বহাল রয়েছেন।
অথচ ইউজিসি বলেছে, রাষ্ট্রপতি প্রত্যেক বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভিসি, প্রো-ভিসি ও কোষাধ্যক্ষ পদে ৪ বছরের জন্য নিয়োগ দিয়ে থাকেন। কাজেই এসব পদে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ কাউকে ভারপ্রাপ্ত হিসেবে নিয়োগ দিলে তা আইনের পরিপন্থি। ইউজিসির একাধিক নির্দেশনা থাকা সত্ত্বেও এশিয়ান ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ ভিসি, প্রো-ভিসি ও কোষাধ্যক্ষ নিয়োগের জন্য কার্যকর পদক্ষেপ নিচ্ছে না। উল্টো ড. সাদেক শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও ইউজিসিকে চ্যালেঞ্জ করে বলছেন, তিনি এশিয়ান ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশের ভারপ্রাপ্ত ভিসি। কোন ক্ষমতাবলে তিনি ভারপ্রাপ্ত ভিসি, বা ভারপ্রাপ্ত ভিসি পদে রাষ্ট্রপতি তাকে নিয়োগ দিয়েছেন কি নাÑ সে বিষয়ে অবশ্য কোনো পরিপত্র বা চিঠি বা নিয়োগপত্র কিছুই প্রদর্শন করতে পারেননি ড. সাদেক। শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও ইউজিসিকে চ্যালেঞ্জ করে ড. সাদেকের ভিসি পদ আঁকড়ে থাকায় এশিয়ান ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশের শিক্ষার্থীদের সনদের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে মারাত্মক জটিলতা সৃষ্টি হয়েছে। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের অর্জিত ডিগ্রির মূল সনদে উপাচার্য ও পরীক্ষা নিয়ন্ত্রকের সই থাকতে হয়। কিন্তু এশিয়ান ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ থেকে শিক্ষা গ্রহণ শেষে শিক্ষার্থীরা যে সনদ পাচ্ছেন, তাতে রাষ্ট্রপতির নিয়োগ দেয়া কোনো উপাচার্যের সই থাকছে না। তাতে সই থাকছে এশিয়ান ইউনিভার্সিটির ভারপ্রাপ্ত ভিসি ড. সাদেকের। অথচ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইন অনুযায়ী শিক্ষার্থীর মূল সনদে ভারপ্রাপ্ত ভিসির সই দেয়ার কোনো এখতিয়ারই নেই।
উচ্চশিক্ষার বিপুল চাহিদার প্রতি লক্ষ্য রেখে ১৯৯২ সালে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইন প্রণয়নের মাধ্যমে এ দেশে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় যাত্রা শুরু করে। বর্তমানে যার সংখ্যা ৯৭। সরকারি ও বেসরকারি মিলে এখন প্রায় ১৩৪টি বিশ্ববিদ্যালয় বাংলাদেশে উচ্চশিক্ষা ও গবেষণার কাজে নিয়োজিত রয়েছে। বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি) এ সকল বিশ্ববিদ্যালয়ের অভিভাবক হিসাবে ভালো-মন্দের দেখভালের দায়িত্ব পালন করে আসছে।
উদ্যোক্তাদের সদিচ্ছা এবং ইউজিসির যথাযথ নজরদারির ফলস্বরূপ বেশ কয়েকটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় শুধু দেশেই নয়, দেশের সীমা অতিক্রম করে বিদেশেও যথেষ্ট সুনাম কুড়িয়েছে। আবার কিছু বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রচুর সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও শুধু উদ্যোক্তার অর্থলোভ, স্বজনপ্রীতিসহ বিবিধ দুর্নীতির কারণে এখন ডুবতে বসেছে। এমনই একটি প্রতিষ্ঠান ‘এশিয়ান ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ’। এর প্রতিষ্ঠাতা ড. সাদেক একজন উচ্চ শিক্ষিত এবং জ্ঞানী ব্যক্তি হলেও নিজের অর্থলিপ্সার কাছে পরাজিত হয়ে প্রতিষ্ঠানটির বারোটা বাজিয়ে দিয়েছেন। বিশ্ববিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯৯৬ সালে, তার ধনাঢ্য ব্যবসায়ী শ্বশুর আজিজ পাইপসের মালিক প্রয়াত আজিজ উল্লাহর আর্থিক সহায়তার মাধ্যমে। বলা চলে শ্বশুরের কাছ থেকে যৌতুক হিসেবে অবকাঠামোগত খরচ নিয়ে এশিয়ান ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করেন ড. আবুল হাসান মোহাম্মদ সাদেক। শ্বশুর পরিবারকে বিশ্ববিদ্যালয়টির মালিকানার অংশ দেয়ার কথা থাকলেও ড. সাদেক নিজের নামেই বিশ্ববিদ্যালয়ের সবকিছু লিখে নেন।
প্রতিষ্ঠাকালীন সময়ে আইন অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি কর্তৃক বিশ্ববিদ্যালয়টির ভাইস চ্যান্সেলর, প্রো-ভাইস চ্যান্সেলর এবং ট্রেজারার পদে ৪ বছরের মেয়াদে নিয়োগপ্রাপ্ত হন যথাক্রমে ড. সাদেক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষক বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ প্রফেসর ড. কাজী দীন মুহাম্মদ এবং সাদেকের বৃদ্ধ বাবা মাওলানা আবদুল খালেক। শেষোক্ত দু’জন বর্তমানে মৃত। প্রফেসর দীন মুহাম্মদ পুনঃনিয়োগপ্রাপ্ত হয়ে ২০০৪ সাল পর্যন্ত বৈধভাবে প্রো-ভিসির দায়িত্ব পালন করেন। বয়সের বিবেচনায় মাওলানা খালেক পুনঃনিয়োগ আর পাননি। অর্থনৈতিক বিবেচনায় গুরুত্বপূর্ণ এ পদে অন্য কাউকে নিয়োগের মতো রিস্ক নিতে চাননি বলে সুচতুর ড. সাদেক পদটি ২০০০ সালের পর থেকে শূন্য রেখেছেন। সংশ্লিষ্ট বিষয়ে যেহেতু কেউ খোঁজখবর করেনি, সুতরাং সাদেক অর্থনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ পদটি খালি রেখে গত ১৬ বছর ধরে নিজে কখনো ভিসি, কখনো ভারপ্রাপ্ত ভিসি এবং সব সময়ই ট্রেজারার পদটি নিজের দখলে রেখে টাকা-পয়সার হেরফের করছেন শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও ইউজিসিকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে। ড. সাদেক পদ দু’টিতে মাঝে মধ্যে তার অনুগত দু’একজনকে নিয়োগ দিলেও কখনোই রাষ্ট্রপতির অনুমোদন নেয়ার মতো বোকামি করেননি। আর ভাইস চ্যান্সেলর পদটিতে কখনও নিয়মিত, কখনও অনিয়মিত আবার কখনো ভারপ্রাপ্ত পরিচয়ে নিজেই দায়িত্ব পালন করে আসছেন। অথচ নিয়ম অনুযায়ী ড. সাদেক ২০০৭ সাল পর্যন্ত বৈধ ভিসি হিসাবে দায়িত্বরত ছিলেন। এরপর থেকে গত ৯ বছরে মূলত এশিয়ান ইউনিভার্সিটিতে কোনো বৈধ ভাইস চ্যান্সেলর নেই। ড. সাদেক দাবি করছেন ভিসি’র মেয়াদ উত্তীর্ণের পর তিনি বৈধভাবেই ভারপ্রাপ্ত ভিসি’র দায়িত্ব পালন করছেন। তবে ভারপ্রাপ্ত ভিসি হিসেবে কেউ টানা ১০ বছর দায়িত্ব পালন করতে পারেন কি নাÑ সে বিষয়ে ড. সাদেক বরাবরই নিশ্চুপ।
গত ১৭ নভেম্বর ২০১৬ তারিখে ইউজিসি এক দাপ্তরিক বিজ্ঞপ্তিতে জানিয়েছে, মোট ১৮টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের বৈধ কোনো ভিসি নেই। তার মধ্যে এশিয়ান ইউনিভার্সিটি ১ নম্বর স্থান দখল করার কৃতিত্ব অর্জন করে। ইউজিসি বলছে, প্রতিষ্ঠানটিতে ভিসি নেই ২০০৯ সাল থেকে। বৈধতার সময় উত্তীর্ণ হওয়ার পর থেকে ভিসি দাবিদার কোনো ব্যক্তি ইতোমধ্যে পাস করে যাওয়া ছাত্রছাত্রীদের সনদে স্বাক্ষর করতে পারবেন না, করলে তা অবৈধ হবে। একই সাথে অর্থ সংক্রান্ত কর্মকা- যেমন ব্যাংকের চেক বই এবং অন্য কোনো দলিলপত্রে স্বাক্ষর করাও অবৈধ হবে। তবে বিস্ময়কর ব্যাপার হলো গত ২১ নভেম্বর ২০১৬ তারিখে বিভিন্ন জাতীয় দৈনিকে প্রেস বিজ্ঞপ্তি পাঠানোর মাধ্যমে ড. সাদেক দাবি করেন, তিনি রাষ্ট্রপতি কর্তৃক নিয়োগপ্রাপ্ত হয়ে বৈধ ভিসি হিসেবে ২০১২ সাল পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেছেন। আর এখন দায়িত্ব পালন করছেন বৈধ ভারপ্রাপ্ত ভিসি হিসেবে। এর স্বপক্ষে তিনি তার নাম ও ভিসি পদবি উল্লেখ করে শিক্ষা মন্ত্রণালয়, ইউজিসি, অন্যান্য মন্ত্রণালয় ও জাতীয় সংসদ থেকে প্রেরিত চিঠিপত্রের কথা বলেছেন। এসব চিঠিপত্রে তাকে ভিসি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে; অর্থাৎ তাকে বৈধ ভিসি হিসেবে মেনে নেয়া হয়েছে। এভাবে অত্যন্ত চতুরতার সাথে এশিয়ান ইউনিভার্সিটিতে অধ্যয়নরত ছাত্রছাত্রী এবং তাদের অভিভাবকদের ধোঁকা দিয়ে চলছেন ড. সাদেক।
বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইন ২০১০-এর ৩১ ধারা ৬ উপধারায় বলা হয়েছে, ‘এই ধারার অধীন নিয়োগপ্রাপ্ত কোনো ভাইস চ্যান্সেলর কোনো কারণে তার দায়িত্ব পালনে অসমর্থ হলে, সংশ্লিষ্ট বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রো-ভাইস চ্যান্সেলর সাময়িকভাবে ওই বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলরের দায়িত্ব পালন করবেন; তবে সংশ্লিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রো-ভাইস চ্যান্সেলর-এর পদ শূন্য থাকলে ওই বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্রেজারার সাময়িকভাবে ভাইস চ্যান্সেলরের দায়িত্ব পালন করবেন।’ এই আইন অনুযায়ী একজন মেয়াদোত্তীর্ণ ভিসি আইনগত বাধ্যবাধকতার কারণে ভারপ্রাপ্ত ভিসি হতে পারেন না। ভারপ্রাপ্ত ভিসি হবেন ওই বিশ্ববিদ্যালয়ের বৈধ প্রো-ভিসি অথবা তার অবর্তমানে বৈধ ট্রেজারার এবং সেটাও সাময়িক সময়ের জন্য। এ সময়ের মধ্যে বৈধ ভিসি নিয়োগের প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হবে।
ড. সাদেকের স্বীকারোক্তি এবং বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইন ২০১০-এর বিধি মোতাবেক ‘এশিয়ান ইউনিভার্সিটি ২০০৭ কিংবা ২০০৯ কিংবা ২০১২ সাল থেকে বৈধ ভিসি শূন্য। একইভাবে ২০০০ সাল থেকে বৈধ ট্রেজারার এবং ২০০৪ সাল থেকে বৈধ প্রো-ভিসি’র পদও শূন্য। তাহলে বিশ্ববিদ্যালয়টি চালাচ্ছে কে? শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও ইউজিসির কর্মকর্তারাও রহস্যজনক কারণে এ বিষয়ে আছেন নিশ্চুপ।
ড. সাদেকের স্বীকারোক্তি যদি বিবেচনায় নেয়া হয় তা হলে ২০১২ সাল থেকে এখন পর্যন্ত ‘এশিয়ান ইউনিভার্সিটি’ ইস্যুকৃত যতগুলো সার্টিফিকেটে ড. সাদেকের স্বাক্ষর রয়েছে, যতগুলো চেকের পাতায় তিনি স্বাক্ষর করে বিপুল টাকা উত্তোলন করেছেন কিংবা যতগুলো দলিলে স্বাক্ষর করেছেন তার সবই অবৈধ হয়ে যায়। আইনগতভাবে বিষয়গুলো অবৈধ হওয়ায় জানা গেছে দুদক ও এনবিআর এশিয়ান ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষের বিষয়ে জোর তদন্ত চালাচ্ছে।
এমনিতেই ড. সাদেকের বিরুদ্ধে অবৈধ উপায়ে বিপুল বিত্তবৈভব অর্জন, মুদ্রা পাচার, জাল সনদ বিক্রি, অনৈতিক কর্মকা-ে জড়ানোসহ যুদ্ধাপরাধেরও অভিযোগ রয়েছে। কিন্তু রহস্যজনক কারণে সংশ্লিষ্টরা নির্বিকার থাকায় ড. সাদেক বরাবরই থাকছেন ধরা ছোঁয়ার বাইরে। বরং উল্টো তাকে কেন আবারো ভিসি নিয়োগ দেয়া হলো নাÑ এ জন্য তিনি শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও ইউজিসি’র মতো সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানকে দোষারোপ করার ধৃষ্টতা দেখাচ্ছেন বলে জানিয়েছেন তারই একটি ঘনিষ্ঠ মহল।
শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও ইউজিসি সূত্রে জানা গেছে, ড. সাদেকের বিরুদ্ধে অভিযোগের পাহাড় জমা আছে। তাই এসব উপেক্ষা করে তাকে কিংবা তার মনোনীত কাউকে আর ওই বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি হিসেবে নিয়োগ দেয়া হবে না। এমনকি প্রো-ভিসি ও ট্রেজারার পদেও নয়। সেক্ষেত্রে রাষ্ট্রপতি পদ ৩টিতে সার্চ কমিটির সুপারিশক্রমে যোগ্য ও অভিজ্ঞ ৩ ব্যক্তিকে নিয়োগ দিতে পারেন।
‘এশিয়ান ইউনিভার্সিটি’তে ইতঃপূর্বে কর্মরত ছিলেন এমন কয়েকজন শিক্ষক ও কর্মকর্তার সাথে কথা বলে চাঞ্চল্যকর অনেক তথ্য পাওয়া গেছে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন শিক্ষক আফসোস করে বলেন, আমরা যখন সেখানে কাজ করতাম তখন ওটাকে মিনি আইবিএ বলা হতো। এখন ওটার সার্টিফিকেট দেখলে নিয়োগকর্তারা নাক সিটকায়। ওই কর্মকর্তা আরো বলেন, এক সময় যে বিশ্ববিদ্যালয়টি নর্থ সাউথের সাথে পাল্লা দিত সেটি এখন ড. সাদেকের দুর্নীতি ও অনৈতিক কর্মকা-ের কারণে অনেকটা ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে। তবে এক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ প্রকৃতঅর্থেই নির্বিকার বলে ওই শিক্ষকরা মনে করেন। তাদের একজন এ প্রতিবেদককে প্রশ্ন করে জানতে চানÑ গ্রামীণ ব্যাংকের প্রতিষ্ঠাতা ড. ইউনূসের মতো লোকও যেখানে নিয়মনীতি লঙ্ঘন করে আজীবন প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান বা এমডি পদে থাকতে পারেননি সেখানে ড. সাদেকের মতো দুর্নীতিবাজ লোক কিভাবে একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে আজীবন ভিসি পদে থাকেন এবং একটি প্রাইভেট ইউনিভার্সিটিকে ব্যক্তিগত ও পারিবারিক ব্যবসা প্রতিষ্ঠান হিসেবে যেনতেনভাবে ব্যবহার করে আসছেন?
এসব দুর্নীতির বিষয়ে জানতে এশিয়ান ইউনিভার্সিটির আজন্ম ভিসি ড. আবুল হাসান মোহাম্মদ সাদেকের সাথে যোগাযোগ করলে তিনি রিপোর্ট সংক্রান্ত বিষয়ে কোনো মাতামত না দিয়ে বলেন, আপনার যা মন চায় লিখে দেন। শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও ইউজিসি আমার কিছুই করতে পারবে না।