প্রতিবেদন

নির্বাচন গ্রহণযোগ্য করতে সহিংসতা প্রতিরোধ আবশ্যক

ড. সাব্বীর আহমেদ : রাজনীতি ক্রমশ নির্বাচনমুখী হচ্ছে। ২০১৮ সালের শেষে অথবা ২০১৯ সালের শুরুতেই অনুষ্ঠিত হবে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। এ লক্ষ্যে রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশের ব্যস্ততা চলছে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ এবং অন্যতম বিরোধী দল বিএনপিতে। পাশাপাশি জাতীয় পার্টি ও অন্যান্য ক্ষুদ্র দলও বসে নেই। নির্বাচন কমিশন ইতোমধ্যেই তার রোডম্যাপ নিয়ে এগোচ্ছে। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রেক্ষাপট দশম জাতীয় সংসদের নির্বাচনের মতো একই রকম হবে এমনটা আশা করা যায় না। বাংলাদেশের উন্নয়ন সহযোগীরা চাইছেন এবারের নির্বাচন সকল দলের অংশগ্রহণের ভিত্তিতে অনুষ্ঠিত হোক। কোনো বড় ধরনের কিছু না ঘটলে অন্যতম বিরোধী দল বিএনপির এ নির্বাচন বয়কটের আশঙ্কা খুবই কম। ২০১৪ সালের নির্বাচন বয়কটের মতো আরেকটি রাজনৈতিক ভুল বিএনপির জন্য রাজনৈতিক আত্মহত্যার পর্যায়ে চলে যেতে পারে। উল্লেখ্য, বিএনপির রাজনৈতিক কৌশলের পরিবর্তন আগামী নির্বাচন সুষ্ঠুভাবে অনুষ্ঠিত হতে সহায়ক হতে পারে। দলটি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন অনুষ্ঠানের দাবি থেকে সরে এসে গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য সহায়ক সরকার প্রতিষ্ঠার দাবি করছে। অন্যদিকে নির্বাচন কমিশন সীমানা পুনঃনির্ধারণ, ভোটার তালিকা হালনাগাদকরণের উদ্যোগ গ্রহণ করতে যাচ্ছে। কমিশন ইতোমধ্যেই এর আঞ্চলিক পর্যায়ের প্রতিনিধিদের কাছ থেকে নির্বাচনি সংস্কার বিষয়ে কিছু প্রস্তাব পেয়েছে। এ সকল প্রস্তাবের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো নির্বাচনে প্রার্থীদের ব্যয় এক লাখ টাকার প্রস্তাব এবং নির্বাচনে ভোট গ্রহণ অনুষ্ঠানের সময়সীমা কমিয়ে আনা। বিএনপি এরই মধ্যে সীমানা পুনঃনির্ধারণ সংক্রান্ত তাদের প্রস্তাবে নির্বাচন কমিশনকে ২০০৮-এর পূর্বের সীমানা অনুযায়ী ভোট গ্রহণের কথা জানিয়েছে। গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য উপরোক্ত সকল বিষয়ের বিবেচনার গুরুত্ব রয়েছে। তবে এর সঙ্গে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো নির্বাচনি সহিংসতাকে সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনার মাধ্যমে ঠেকানো। এটি করতে না পারলে গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠানের পরিকল্পনা প্রশ্নবিদ্ধ হবে। নির্বাচনি সহিংসতা ৩টি পর্যায়ে সংঘটিত হয়। নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার দিন থেকে নির্বাচন অনুষ্ঠানের আগের দিন পর্যন্ত হলো এ সহিংসতার প্রথম পর্যায়। এ পর্যায়ে নমিনেশনপত্র জমা দেয়ার সময়ও ব্যাপক সহিংসতা দেখা দিতে পারে। পাশাপাশি নির্বাচন দিনের সহিংসতা এবং নির্বাচন-পরবর্তী সহিংসতা এ ৩টি পর্যায়ে ৩টি প্রধান প্রণোদনা সহিংসতা ঘটানোর পেছনে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করে।
প্রাক-নির্বাচনি সহিংসতার প্রধান লক্ষ্য ভোটার এবং প্রার্থীকে ভয় পাইয়ে দেয়া। এটি শক্তিশালী দল বা প্রার্থী অধিক মাত্রায় করে থাকে। এমনকি প্রাক-নির্বাচনি সহিংসতায় বিরোধী প্রার্থীকে অপহরণ করার ঘটনাও ঘটে। নির্বাচন দিনের সহিংসতার প্রধান লক্ষ্য থাকে ভোটের ফলাফলের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা। এমন অনেক ভোট কেন্দ্র থাকে যেখানে আগের দিনই ব্যালট বাক্স চলে যায়। ভোট কেন্দ্রগুলো অনেক দূরবর্তী এলাকায় থাকে বলে, ভোটের পূর্বরাত্রিতে ভোট কেন্দ্রে নিরাপত্তারও যথেষ্ট ঘাটতি থাকে। ফলে খুব সহজে এ কেন্দ্রগুলো সন্ত্রাসীদের হাতে জিম্মি হয়ে যায়। ভোটের দিনে ভোট চলাকালীন সময়ে পোলিং অফিসারদের কাছ থেকে জোর করে ব্যালট নিয়ে যাওয়াও নির্বাচনি সহিংসতার একটি ধরন। অনেক সময় ভোট কেন্দ্রে ভোট গণনার সময় সন্ত্রাসীরা ব্যালট বাক্স ছিনতাই করে আশপাশের ডোবা-নালায় ফেলে দেয়। ভোট-পরবর্তী সহিংসতার একটি ভয়াবহ দৃষ্টান্ত হচ্ছে ২০০১ সালের সংসদ নির্বাচন, যে নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে ব্যাপক হারে সংখ্যালঘুরা নির্যাতনের শিকার হয়েছিল। এ পর্যায়ে নির্বাচনি সহিংসতার একটি বড় কারণ প্রতিশোধ গ্রহণ। বিজয়ী প্রার্থী পূর্ববর্তী রাগের কারণে পরাজিত প্রার্থীর ওপর হামলা চালায়। শক্তিশালী পরাজিত প্রার্থীও ক্ষেত্রবিশেষে বিজয়ী প্রার্থীর ওপর হামলা চালায়। তবে এই হামলার ব্যাপকতা এত দূর পর্যন্ত গড়ায় যে বিজয়ী পক্ষ পরাজিত প্রতিপক্ষের কর্মী-সমর্থকদের ওপর হামলা চালায়। নষ্ট করে তাদের ফসল, আগুন লাগিয়ে দেয় বাড়ি-ঘরে।
২০০১ সালে নির্বাচন-পরবর্তী সহিংসতায় সংখ্যালঘু নারীদের ওপর নির্যাতন ছিল বাংলাদেশে রাজনৈতিক সহিংসতার ইতিহাসে একটি কালো অধ্যায়। এ ধরনের সহিংসতা রোধ করতে না পারলে মানব নিরাপত্তা চরম হুমকির সম্মুখীন হয়। আলোচিত এই তিন ধরনের সহিংসতা বন্ধে সরকার, নির্বাচন কমিশন, রাজনৈতিক দল, গণমাধ্যম ও সর্বোপরি ভোটাররা মিলে সমন্বিত কর্মসূচি গ্রহণ অত্যাবশ্যক। সরকারের রাজনৈতিক সদিচ্ছা এক্ষেত্রে একটি মৌলিক বিষয়। নির্বাচন কমিশনের সদিচ্ছাও অপরিহার্য। চাইলে নির্বাচন কমিশন দৃঢ় আপসহীন ভূমিকায় অবতীর্ণ হতে পারে। মাঠপর্যায়ে সকল রাজনৈতিক দল সহিংসতা দমনে সম্মিলিত উদ্যোগ নিতে পারে। যে দলটি নির্বাচনকে প্রভাবিত করতে চায় সেটি হয়ত এগিয়ে আসবে না, কিন্তু অন্য দলগুলো নির্বাচনি সহিংসতা প্রতিরোধ কমিটি গঠন করতে পারে। সিভিল সমাজের সংগঠন এবং গণমাধ্যম প্রতিরোধ কমিটির কার্যক্রমে সহায়ক ভূমিকা পালন করতে পারে।
সিভিল সমাজের যে সকল সংগঠনের ৩০০ নির্বাচনি এলাকায় শাখা রয়েছে, তাদের সমন্বিত প্রচেষ্টায় সম্ভাব্য সহিংস এলাকা চিহ্নিত করতে পারে। এ সংগঠনগুলোর দায়িত্ব হচ্ছে সে সকল এলাকায় নিরাপত্তা জোরদার করার জন্য স্থানীয় প্রশাসন ও নির্বাচন কমিশনের ওপর চাপ অব্যাহত রাখা এবং সম্ভাব্য সহিংসতা সৃষ্টিকারীদের বিরুদ্ধে সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তুলতে চেষ্টা করা। নির্বাচনি সহিংসতা প্রতিরোধে গণমাধ্যমও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। শুধু জাতীয় গণমাধ্যম নয়, স্থানীয় গণমাধ্যমও এক্ষেত্রে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। স্থানীয় গণমাধ্যমকর্মীরা সম্ভাব্য সহিংসতা সৃষ্টির বিষয়ে পূর্বেই নিরাপত্তা বাহিনীকে আগাম তথ্য দিতে পারে। নির্বাচনি সহিংসতা প্রতিরোধে ভোটারদের গণ-উদ্যোগ জরুরি। বিশেষ করে প্রাক-নির্বাচন এবং নির্বাচন-পরবর্তী সহিংসতা প্রতিরোধে ভোটারদের এই গণ-উদ্যোগ কার্যকর হতে পারে। প্রাক-নির্বাচন সময়ে, ভোটাররা সম্মিলিতভাবে ভোটারদের হুমকি দেয়া, ভোট কেন্দ্রে না যেতে নিরুৎসাহিত করাÑ এসবের প্রতিরোধে সক্রিয় ভূমিকা রাখতে পারে। নির্বাচন কমিশনের উদ্যোগে ভোটাররা এ ধরনের প্রতিরোধ কমিটি গঠন করতে পারে। প্রতিটি আসনে একাধিক প্রতিরোধ কমিটি গঠিত হতে পারে। এ কমিটি ভোটারদের ভোট কেন্দ্রে যেতে উৎসাহিত করতে পারে।
শেষ কথা হচ্ছে নির্বাচনের সকল আয়োজন এবং এ সম্পর্কিত সকল সংস্কারের পর যদি নির্বাচনি সহিংসতা রোধে কোনো পদক্ষেপ না নেয়, তাহলে গ্রহণযোগ্য নির্বাচন প্রশ্নবিদ্ধ হবে। তাই প্রতিটি নির্বাচনি এলাকায় নির্বাচনি সহিংসতা রোধে কার্যকর উদ্যোগ নেয়া একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য প্রয়োজনীয় এবং অপরিহার্য পূর্বশর্ত।
লেখক : সহযোগী অধ্যাপক
রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়