কলাম

প্রক্রিয়াজাত খাবার কি স্বাস্থ্যসম্মত

মো. সহিদুল ইসলাম : প্রক্রিয়াজাত খাবার ভালো নয়Ñ এ কথা আমরা প্রায়ই শুনে থাকি। কিন্তু প্রক্রিয়াজাত খাবার কী এবং কেনই বা তা এড়িয়ে চলা উচিতÑ এই বিষয়টি অনেকের কাছেই স্পষ্ট নয়। আসলে প্রক্রিয়াজাত খাবার হলো খাবারের প্রাকৃতিক অবস্থার একটি পরিবর্তিত রূপ, যা কাঁচা অবস্থায় সংরক্ষণ করা হয়। তবে সংরক্ষণ, স্বাদবৃদ্ধি ও দৃষ্টিনন্দন করার জন্য এই ধরনের খাবারে প্রায়ই কিছু স্বাস্থ্যহানিকর রাসায়নিক যৌগের সংযোজন করা হয়। অপরপক্ষে প্রাকৃতিক খাবারের সমস্ত উপাদান প্রকৃতি প্রদত্ত হয়ে থাকে। পাশাপাশি প্রকৃতিই এই ধরনের খাবারকে নির্দিষ্ট একটি সময় পর্যন্ত পচনের হাত থেকে সুরক্ষা দিয়ে থাকে। উপরন্তু এ ধরনের খাবার কখনো প্রক্রিয়াজাতও করা হয় না। সঙ্গত কারণেই প্রক্রিয়াজাত খাবারকে আদৌ প্রাকৃতিক খাবারের বিকল্প হিসেবে বিবেচনা করা হয় না।
প্রক্রিয়াজাত খাবারের বিষয়টি আরো স্পষ্ট করার জন্য আমরা জেলেটিন রেসিপিকে উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরছি। ধরুন এ রেসিপির মাধ্যমে আপনি জেলি তৈরি করবেন। এ জন্য আপনি যখনই রেসিপির নির্দেশাবলি ভালো করে পড়তে যাবেন, তখনই তাজা আনারস ব্যবহার করা থেকে বিরত থাকার একটি সতর্কবার্তা আপনার দৃষ্টিগোচর হবে। এ সতর্কতার কারণ হলো তাজা আনারসের মধ্যে পেপেইন নামের একটি এনজাইম থাকে, যা জেলেটিনকে জেলি হওয়া থেকে বাধা দেয়। তবে এ ক্ষেত্রে আপনি ক্যানড আনারস ব্যবহার করতে পারেন, যাতে অনায়াসেই জেলেটিন জেলি হয়। কেননা, ক্যানে পেপেইন এনজাইমটি সক্রিয় থাকে না। ফল প্রক্রিয়াজাত করে ক্যানে ভরতে প্রচুর তাপ প্রয়োগ করার সময়ই সাধারণত এনজাইম নিষ্ক্রিয় হয়ে যায়। বস্তুতপক্ষে প্রকৃতি থেকে প্রাপ্ত তরতাজা খাবার গ্রহণের প্রক্রিয়াকেই অপ্রক্রিয়াজাত বা প্রাকৃতিক খাবারের মূল ভিত্তি হিসেবে বিবেচনা করা হয়। পাশাপাশি এ খাবার বিকিরণ, কৃত্রিম সংরক্ষক রাসায়নিক, জেনেটিক্যালি মোডিফাইড করা বা জিএমও এবং কীটনাশকমুক্ত থাকে। এমনকি এ ধরনের খাবারকে ১১৮ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেডের ওপরে তাপও প্রয়োগ করা হয় না, যাতে খাদ্য হজমকারী প্রাকৃতিক এনজাইমগুলো বিনষ্ট হয়ে যায়। তবে জৈব প্রক্রিয়ায় উৎপাদিত (অরগানিক) খাবার অপ্রক্রিয়াজাত খাবারের আওতাভুক্ত।
খাদ্য হজমকারী প্রাকৃতিক এনজাইম যদি খাবার থেকে বিনষ্ট হয়ে যায়, তবে ওই খাবার গ্রহণের ফলে শারীরবৃত্তীয় পর্যায়ে মারাত্মক কিছু অবনতি ঘটে। এর মধ্যে বিশেষভাবে বুড়িয়ে যাওয়ার প্রক্রিয়াটি অতি মাত্রায় বৃদ্ধি পায়। তাছাড়া অতি তাপে প্রক্রিয়াজাত খাবার অতি মাত্রায় অ্যাসিটিক হয়ে ওঠে, যা গ্রহণের ফলে শরীর যেকোনো রোগে আক্রান্ত হওয়ার পক্ষে যথেষ্ট উপযোগী বলে বিবেচিত হয়। পাশাপাশি তা খনিজ পদার্থগুলোকে সহজেই শোষণ করে অজৈব পদার্থে রূপান্তরিত করে। এসব অজৈব পদার্থগুলো আবার পরবর্তী সময়ে প্রয়োজনীয় খনিজের অভাবে ক্যালসিয়াম পাথরের সৃষ্টি করে। যদিও খনিজ পদার্থসমৃদ্ধ জৈব খাবারগুলো অ্যাসিডিটি দূরকারক ও যথেষ্ট হজম সহায়ক।
পুষ্টিবিদরা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তাপকে খাবারের পুষ্টিমান ধ্বংসকারক হিসেবে বিবেচনা করেন। কেননা, তাপ খাবার থেকে অধিকাংশ ভিটামিনকে ধ্বংস করে দেয়। উপরন্তু কাঁচা খাদ্য ভক্ষণকারীরা মনে করেন, রান্না করা খাদ্য মানে হলো মৃত খাদ্য। আর মৃত খাদ্য গ্রহণ কখনো ভক্ষণকারীকে পর্যাপ্ত পরিমাণে জীবনী শক্তি প্রদান করতে পারে না। বিষয়টি ভালোভাবে অনুধাবন করতে আপনি একটি কাঁচা বীজের কথাই চিন্তা করুনÑ স্বাভাবিক অবস্থায় এই জাতীয় একটি বীজ অঙ্কুরিত এবং বেড়ে ওঠার সক্ষমতা রাখে। কিন্তু যদি বীজটিকে প্রক্রিয়াজাত বা তাপ দ্বারা সংরক্ষণ বা খাবার উপযোগী করা হয়, তবে তা নিঃসন্দেহে অঙ্কুরিত বা বেড়ে ওঠার সক্ষমতা হারায়। উপরন্তু কাঁচা ফলকে তাপের মাধ্যমে পাকানো হলে তাপের অতি ক্ষুদ্র তরঙ্গ সেই ফল থেকে যাবতীয় ভিটামিন, খনিজ পদার্থ, এনজাইম ও জীবনীশক্তি বিনষ্ট করে দেয়। তথাপি বিশ্বব্যাপী তাপের মাধ্যমে খাবার প্রক্রিয়াজাতকরণ থেমে নেই।
সাম্প্রতিক সময়ে প্রক্রিয়াজাত খাবারে আরেকটি রাসায়নিকের যথেচ্ছ ব্যবহার দেখা যাচ্ছে। তা হলো মনোসোডিয়াম গ্লুটামেট (এমএসজি)। চিপসে এই ক্ষতিকারক রাসায়নিকটির ব্যবহার বিশেষভাবে লক্ষণীয়। শুধু তাই নয়, বহুল ব্যবহারের দরুন বর্তমানে অপ্রক্রিয়াজাত গ্লুটামিক অ্যাসিড বা এমএসজিকে প্রক্রিয়াজাত খাবারে কৃত্রিম সংযোজকগুলোর তারকা হিসেবে বিবেচনা করা হয়। অথচ এই রাসায়নিক সংযোজকটি মাইগ্রেনজনিত মাথা ব্যথা, হৃদস্পন্দন বৃদ্ধি, বলিরেখা, পেটের পীড়া, জ্বর, বিষণœতা ও শারীরিক নানা দুরারোগ্য ব্যাধি সৃষ্টির অন্যতম প্রভাবক।
কম-বেশি পৃথিবীর সর্বত্রই খাদ্য প্রক্রিয়াজাত করা হয়। তবে সকল প্রক্রিয়াজাত খাবারই যে শরীরের জন্য ক্ষতিকর, তা কিন্তু নয়। এই ধরুন ব্যাকটেরিয়াকে ধ্বংস করার জন্য এবং চর্বি আলাদা করার জন্য দুধকে পাস্তুরাইজ ও হোমোজেনিজেড করা হয়। যদিও কিছু কিছু লোক দুধকে কাঁচা খেতেই বেশি পছন্দ করেন। কিন্তু আমরা অনেকেই জানি না যে, কাঁচা দুধ গ্রহণ স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর। এতে বিভিন্ন খাদ্যজাত রোগের সৃষ্টি হয়। তাছাড়া হিমায়িত সবজিও কিন্তু স্বাস্থ্যের পক্ষে বেশ উপকারী। কেননা হিমায়িত সবজিতে বহুদিন যাবৎ ভিটামিন এবং খনিজ পদার্থ সংরক্ষিত থাকে। উপরন্তু তা বছরজুড়ে রান্না করেও খাওয়া যায়। প্রক্রিয়াজাত ফল ও উদ্ভিজ্জ রসও স্বাস্থ্যের পক্ষে যথেষ্ট উপকারী। কিছু কিছু ক্ষেত্রে এই ধরনের জুসের পুষ্টিমান বৃদ্ধি করতে এতে অতিরিক্ত ক্যালসিয়ামও সংযোজন করা হয়। এছাড়া প্রক্রিয়াজাত শস্যের রুটি, ওটমিল এবং হিমায়িত মাছ, গরুর মাংস এবং ফলও স্বাস্থ্যকর খাবার হিসেবে বিবেচিত হয়। তথাপি সুস্বাস্থ্য রক্ষায় কৃত্রিম সংরক্ষক ও রঙমিশ্রিত খাবার বিশেষ করে অতিমাত্রায় মিষ্টিজাতীয় দ্রব্যমিশ্রিত প্রক্রিয়াজাত খাবার অবশ্যই পরিহার করা বা কম পরিমাণে খাওয়া উচিত।
লেখক : সাংবাদিক