প্রচ্ছদ প্রতিবেদন

বর্তমান প্রশাসনের তৎপরতায় বিশ্বমানের চিকিৎসা সেবা দিচ্ছে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল : সারাদেশের সাধারণ মানুষের চিকিৎসার শেষ ভরসাস্থল ঢাকা মেডিকেল


তারেক জোয়ারদার : শিশু সুরাইয়ার কথা মনে আছে? যে শিশুটি মাতৃগর্ভে থাকা অবস্থায় গুলিবিদ্ধ হয় ২০১৫ সালের ২৩ জুলাই। মাগুরার দোয়ারপাড় এলাকায় আধিপত্য বিস্তারে উন্মত্ত দুই পক্ষের সংঘর্ষে গুলিবিদ্ধ হন আট মাসের অন্তঃসত্ত্বা নাজমা পারভীন। ওইদিন রাতেই স্থানীয় হাসপাতালে তার অস্ত্রোপচার হয়, জন্ম নেয় গুলিবিদ্ধ শিশু সুরাইয়া। আশঙ্কাজনক অবস্থায় তাকে স্থানীয় চিকিৎসকরা পাঠিয়ে দেন ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। এখানেই চিকিৎসা নিয়ে পুরোপুরি সুস্থ হয়ে বাড়ি ফেরে বহুল আলোচিত শিশু সুরাইয়া।
একইভাবে সবার মনে থাকার কথা ‘বৃক্ষমানব’ আবুল বাজনদারের কথাও। হাত-পায়ে ‘শিকড়’ গজানো আবুল বাজনদার দেশের বেশ কয়েকটি হাসপাতাল ঘুরে শেষ পর্যন্ত আসেন ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। এখানে বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইউনিটে চিকিৎসার মাধ্যমে সারিয়ে তোলা হয় তাকে।
চিকিৎসা ক্ষেত্রে এমন অসংখ্য সাফল্যের উদাহরণ রয়েছে সাধারণ মানুষের পরম ভরসার স্থল ঢাকা মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের। শয্যা ও অপর্যাপ্ত জনবল সংকটের মধ্যেও এই হাসপাতাল সাধারণ মানুষের শেষ ভরসার স্থল। এ প্রসঙ্গে এক প্রশ্নের জবাবে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মদ মিজানুর রহমান স্বদেশ খবরকে বলেন, সারাদেশে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা বিভিন্ন ক্লিনিক ও সরকারি-বেসরকারি হাসপাতাল থেকে প্রতিদিন জটিল ও দুরারোগ্য নানা ব্যাধিতে আক্রান্ত অসংখ্য রোগীকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে রেফার্ড করা হয়। তাছাড়া রাজধানীর বাইরে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকেও নিয়মিত ছুটে আসেন অসংখ্য রোগী। ফলে এ হাসপাতালে দিন-রাত চব্বিশ ঘণ্টা চিকিৎসা সেবায় ব্যস্ত সময় পার করেন প্রতিষ্ঠানটির চিকিৎসক-নার্স ও কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। ব্রিগেডিয়ায়ার জেনারেল মিজান বলেন, অনেকটা অলিখিত নিয়মের মতোই দেশের সব বিভাগ, জেলা ও উপজেলা থেকে শুরু করে রাজধানীর সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালগুলোও রোগীদের ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠিয়ে দেয়। ঢাকা মেডিকেল সাধারণত কোনো রোগীকে বিনা চিকিৎসায় ফিরিয়ে দেয় না। সিট সংকটের কারণে বেডে না হোক, ফ্লোরে থেকেও চিকিৎসার সুযোগ পান তারা। এমন আস্থা ও নির্ভরতার কারণেই ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে সবসময় ভিড় লেগে থাকে গরিব ও অসহায় সাধারণ রোগীর।
হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মদ মিজানুর রহমান বলেন, মাত্র ৮শ’ শয্যার জনবল দিয়ে ২৬শ’ শয্যার দেশের সর্ববৃহৎ এই চিকিৎসা প্রতিষ্ঠানে চলে দিনরাত চিকিৎসা সেবা। চাহিদার তুলনায় পর্যাপ্ত শয্যা না থাকা এবং জনবল সংকটের কারণে অনেক সময়ই রোগীর মানসম্মত চিকিৎসা নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়ে। তাই এ ধরনের সমস্যা সমাধানে সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালকে ৫ হাজার শয্যায় উন্নীত করার নির্দেশ দিয়েছেন। দরিদ্র রোগীদের চিকিৎসা সেবা আরও মানসম্মত করতে নেয়া হচ্ছে সব ধরনের অত্যাধুনিক উদ্যোগ।
ফলে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বিস্তৃত পরিসরে থাকবে সব ধরনের রোগী বিশেষ করে গরিব-অসহায় রোগীদের অত্যাধুনিক বিশ্বমানের চিকিৎসা সেবা। হৃদরোগীদের সব ধরনের অপারেশনসহ চিকিৎসা, কিডনি সংযোজনসহ সকল সর্বাধুনিক চিকিৎসা ব্যবস্থাও থাকবে এই হাসপাতালে। সম্পূর্ণ বিনামূল্যে দরিদ্র রোগীরা সেবা পাবেন হাসপাতাল থেকে। এ বিষয়ে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মিজানুর রহমান বলেন, জটিল ও দুরারোগ্য নানা ব্যাধিতে আক্রান্ত বিভিন্ন রোগী প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে এই হাসপাতালে ছুটে আসেন। আমরাও দিন-রাত চব্বিশ ঘণ্টা তাদের চিকিৎসায় ব্যস্ত সময় পার করি। প্রতিষ্ঠানটির চিকিৎসক-নার্স ও কর্মকর্তা-কর্মচারীরা আন্তরিক মমতায় চিকিৎসা নিতে আসা ৮৫ ভাগ দরিদ্র রোগীরই সেবা দেন হাসিমুখে। আমাদের অভিজ্ঞতা হচ্ছে এসব গরিব রোগীর পক্ষে বাইরে চিকিৎসা করানো অসম্ভব প্রায়।
তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রীর অনুশাসন মোতাবেক ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালকে আধুনিক বিশ^মানের হাসপাতালে রূপান্তর করার লক্ষ্যে শয্যা সংখ্যা বৃদ্ধিসহ আধুনিক যন্ত্রপাতি, প্রয়োজনীয় জনবল ও সকল সুযোগ সুবিধা সংবলিত বিশ^মানের হাসপাতালে রূপান্তরিত করার মাস্টার প্ল্যান প্রণয়নের কাজ দ্রুত গতিতে এগিয়ে চলছে। শিগগিরই ডিপিপি প্রণয়নের কাজ শেষ হবে। এরপর অচিরেই শুরু হবে নব অবয়বে ঢাকা মেডিকেল হাসপাতালের নির্মাণ কাজ।
ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মিজানুর রহমান স্বদেশ খবরকে জানান, নতুন মাস্টার প্ল্যান অনুযায়ী হাসপাতালটিকে ৫ হাজার শয্যায় উন্নতীকরণসহ একটি আধুনিক বিশ্বমানের হাসপাতালে পরিণত করার লক্ষ্যে বিদ্যমান বিভাগ ছাড়াও আরো নতুন বিভাগ খোলা হবে। আরো বেশি ওয়ার্ড তৈরির জন্য আধুনিক স্থাপত্যশৈলী ও পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধাদিসহ বহুতলবিশিষ্ট ভবন নির্মাণ করা হবে। ওয়ার্ড, আইসিইউ, সিসিইউ, পোস্ট অপারেটিভ, এইচডিইউ, এনআইসিইউ’র শয্যা ও ওটির সংখ্যা বাড়ানো হবে। সকল বিভাগে বিশ্বমানের আধুনিক মেডিকেল সরঞ্জামাদি স্থাপন করা হবে। সকল আধুনিক পরীক্ষা-নিরীক্ষার সুবিধাদিসহ ল্যাবরেটরি স্থাপিত হবে। তৈরি করা হবে স্বয়ংসম্পূর্ণ ক্যাজুয়ালটি বিভাগ ও বহিঃবিভাগ নির্মাণসহ আন্তর্জাতিক মানের গবেষণাগার। আধুনিক লাইব্রেরিও স্থাপন করা হবে। এর বাইরে হাসপাতালের জরুরি শিক্ষক, চিকিৎসক, কর্মকর্তা ও কর্মচারী এবং রোগীর অ্যাটেনডেন্টের জন্য থাকবে বহুতলবিশিষ্ট ডরমেটরি ও কোয়ার্টার, মসজিদ, ক্যাফেটোরিয়া।
সেবার মান ও পরিধি সম্প্রসারণই হাসপাতাল সম্প্রসারণের মূল উদ্দেশ্য বলে জানান ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মিজানুর রহমান। এছাড়া সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় আধুনিক চিকিৎসা সেবার ব্যবস্থাকরণও এর আরেকটি উদ্দেশ্য। তিনি জানান, ঢাকা মেডিকেল সম্প্রসারিত হলে এখানে দক্ষ, শিক্ষানবিশ ও স্নাতকোত্তর পর্যায়ে ডাক্তার-নার্স ও টেকনিশিয়ান তৈরি হবে। তাদের প্রশিক্ষণ দেয়া যাবে এবং বিভিন্ন পর্যায়ে কর্মসংস্থানের সুযোগ বৃদ্ধি পাবে। তিনি বলেন, বর্তমান প্রশাসনের লক্ষ্য হচ্ছে ২০১৭ সালের মধ্যে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালকে বিশ্বে একটি মডেল হাসপাতাল হিসেবে চালু করা। নির্ধারিত সেই লক্ষ্যেই আমরা কাজ করছি। শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন বর্তমান সরকারের ভিশন মোতাবেক হাসপাতালের সম্প্রসারণ, আধুনিকায়ন ও বিশ্বমানের একটি আধুনিক হাসপাতাল প্রতিষ্ঠায় বর্তমানে আমরা আত্মমগ্ন আছি।
ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মিজানুর রহমান বলেন, ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল প্রতিদিনই ২৪ ঘণ্টা জরুরি সেবা প্রদান করে। চিকিৎসা নিতে আসা কোনো রোগীকেই সাধারণত ফেরত পাঠানো হয় না। জনগণের সুচিকিৎসার জন্য প্রতিষ্ঠানটি আস্থা ও বিশ্বাসের প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। আউটডোর ও জরুরি বিভাগে অপারেশনসহ পুরো হাসপাতালে প্রতিদিন প্রায় ১০ হাজার রোগীর চিকিৎসা দেয়া হয়। হাসপাতালে প্রতিদিন দর্শনার্থীসহ প্রায় ৪০-৪৫ হাজার লোকের সমাগম ঘটে। প্রতিদিন চিকিৎসাধীন থাকে ৩ হাজার ৫০০ থেকে ৪ হাজার রোগী। আগত রোগীদের মধ্যে গড়ে ১ হাজারের বেশি রোগীকে স্থানাভাবে অতিরিক্ত বিছানা, মেঝে, করিডোর এমনকি লবিতে রেখেও চিকিৎসা দেয়া হয়।
ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের প্যাথলজি বিভাগটি দুই বেলা খোলা থাকে। চিকিৎসাধীন রোগীরা সবধরনের পরীক্ষা বিনামূল্যে এই বিভাগ থেকে করার সুযোগ পান। বর্তমান সরকার পরীক্ষা-নিরীক্ষার আধুনিক যন্ত্রপাতি দ্বিগুণ বাড়িয়েছে।
ক্যাথল্যাবে রোগীদের করোনারি অ্যানজিওগ্রাম, পেসমেকার সংযোজন এবং স্টেন্টিংসহ অন্যান্য ইনভেসিভ কার্ডিয়াক প্রসিডিউর করা সম্ভব হচ্ছে। খুব শিগগিরই কার্ডিয়াক সার্জারি ও ভাসকুলার সার্জারি বিভাগ চালু করা হবে। এই লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি ক্রয়-প্রক্রিয়া চলমান ও অবকাঠামো সংস্কার প্রক্রিয়াধীন আছে। আইসিইউ শয্যা ২০ থেকে বাড়িয়ে ৪০ শয্যায় উন্নীত করা হচ্ছে। এছাড়া নতুন ৪টি অপারেশন থিয়েটার চালুর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। কিডনি রোগীদের ডায়ালাইসিস ব্যবস্থা সম্প্রসারণ করা হয়েছে। প্রতিদিন অনেক দরিদ্র রোগী এই ব্যয়বহুল চিকিৎসা বিনামূল্যে পাচ্ছেন।
হাসপাতালে রোগীদের জন্য ২২৩ প্রকারের প্রয়োজনীয় ওষুধ বিনামূল্যে সরবরাহের ব্যবস্থা করা হয়েছে। ১৯৪৬ সালে চালু হওয়া ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে শুরুতে ছিল ২৫০ শয্যা। ১৯৭৩ সালে বঙ্গবন্ধু সরকার এই হাসপাতালটি ১ হাজার ৫০ শয্যায় উন্নীত করে। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২০১৩ সালে ১০ তলাবিশিষ্ট একটি নতুন ভবন উদ্বোধন করে হাসপাতালের শয্যা ১ হাজার ৮০০ থেকে বাড়িয়ে ২ হাজার ৬০০তে উন্নীত করেন। ২০১৭ সালের মধ্যে ৫ হাজার শয্যা করতে কার্যক্রম চলমান রয়েছে। দেশে একমাত্র এই হাসপাতালে এখন পর্যন্ত বোনম্যারো ট্রান্সপ্লান্ট সফলভাবে সম্পন্ন হচ্ছে। এ পর্যন্ত ২৭ জন রোগীর সফল বোনম্যারো ট্রান্সপ্লান্ট সম্পন্ন হয়েছে।
বছরে চার লাখেরও বেশি রোগী
ঢাকা মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল-১, ঢাকা মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল-২ এবং বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইউনিট মিলে প্রতিষ্ঠানটিতে বর্তমানে প্রায় ২ হাজার ৭০০ শয্যা রয়েছে। যদিও এখানে প্রতিদিন গড়ে সাড়ে ৩ হাজার রোগী ভর্তি থাকেন। জরুরি বিভাগ এবং বহিঃবিভাগ মিলে আরও সহস্রাধিক মানুষ এ হাসপাতালে প্রতিদিন চিকিৎসা নেন। ঢামেক হাসপাতালের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৬ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত ১ বছরে ৯৯ হাজার ৯৪৭ রোগী এ হাসপাতালে ভর্তি হন। মাসে ভর্তি হন গড়ে প্রায় সাড়ে ৮ হাজার রোগী। একই সময়ে জরুরি বিভাগ ও বহিঃবিভাগে আরও ৩ লাখ ১ হাজার ৬০৬ জন রোগী চিকিৎসা নিয়েছেন। অর্থাৎ গত বছর ৪ লাখেরও বেশি বা প্রতিদিন গড়ে ১ হাজারের বেশি রোগী চিকিৎসা নিয়েছেন এ হাসপাতালে।
চিকিৎসা সেবার মানোন্নয়নে
আধুনিক যন্ত্রপাতি সংযোজন
চিকিৎসা সেবার মানোন্নয়নের লক্ষ্যে গত দুই বছরে হাসপাতালে বিভিন্ন বিভাগে প্রয়োজনীয় আধুনিক যন্ত্রপাতি সংযোজন করা হয়েছে। নতুন সিটি স্ক্যান, এমআরআই, ইকো কার্ডিওগ্রাফি, এক্সরে, আলট্রাসনোগ্রাফি, ইসিজি, এনজিওগ্রাম, ল্যাপরোসকপি মেশিন, মুমূর্ষু রোগীদের ডায়ালাইসিসের জন্য স্লেড মেশিন, ওটি লাইট, ওটি টেবিল, অ্যানেসথেসিয়া মেশিন, ভেন্টিলেটর মনিটর, ডিফিব্রিলেটর, ডায়াথার্মি পালস অক্সিমিটার, অটোএনালাইজার, সেন্ট্রিফিউজ মেশিন, মাইক্রোসকোপসহ নিউরোসার্জারি অপারেশনের জন্য অত্যাধুনিক এন্ড্রোমাইক্রোসক্রোপ মেশিন সংযোজন করা হয়েছে। ফলে হাসপাতালে আগত রোগীদের বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষা এবং অস্ত্রোপচারের সুবিধাদি বহুলাংশে বৃদ্ধি পেয়েছে। আরো একটি নতুন সিটি স্ক্যান মেশিন, ক্যান্সার রোগীদের জন্য কোবাল্ট ৬০ এবং লিনিয়ার এক্সিলারেটর মেশিন সংযোজন প্রক্রিয়াধীন আছে।
আধুনিক ক্যাথ ল্যাব স্থাপন : গত বছর হাসপাতালের কার্ডিওলজি বিভাগে স্থাপন করা হয়েছে নতুন ক্যাথ ল্যাব। এই ক্যাথ ল্যাবে রোগীদের করোনারি অ্যানজিওগ্রাম, পেস মেকার সংযোজন এবং স্টেন্টিংসহ অন্যান্য ইনভেসিভ কার্ডিয়াক প্রসিডিউর সম্পন্ন করা হচ্ছে। ফলে দেশের আপামর জনসাধারণ তথা দরিদ্র রোগীদের হৃদরোগের চিকিৎসা এবং ইনভেসিভ প্রসিডিউরসমূহ বিনা মূল্যে অথবা অত্যন্তÍ স্বল্প মূল্যে সম্পন্ন করা সম্ভব হবে।
কার্ডিয়াক সার্জারি ও ভাসকুলার
সার্জারি ইউনিট চালু
ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে শিগগিরই চালু হতে যাচ্ছে কার্ডিয়াক সার্জারি ও ভাসকুলার সার্জারি ইউনিট। এই লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি ক্রয়-প্রক্রিয়া চলমান ও অবকাঠামো সংস্কার প্রক্রিয়াধীন আছে। ইউনিটগুলোর জন্য প্রয়োজনীয় জনবলের পদ সৃষ্টির বিষয়টি মন্ত্রণালয়ে প্রক্রিয়াধীন আছে।
আইসিইউ’র শয্যা সংখ্যা ২০
থেকে ৪০-এ উন্নীত
কর্তৃপক্ষের যথাযথ তদারকির কারণে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে বর্তমানে আইসিইউতে ২০টি মেশিনের মধ্যে ২০টিই চালু রেখে রোগীদের জরুরি আইসিইউ সেবা প্রদান করা সম্ভব হচ্ছে। তবে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের রোগীদের চাহিদার তুলনায় এ সংখ্যা খুবই অপ্রতুল বিধায় আইসিইউ’র শয্যা সংখ্যা ২০ থেকে বাড়িয়ে ৪০ শয্যায় উন্নীত করা হচ্ছে।
অপারেশন থিয়েটার ৩৩ থেকে ৩৭-এ উন্নীত
ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে বর্তমানে ১২টি জরুরি অপারেশন থিয়েটারসহ মোট ৩৩টি অপারেশন থিয়েটার রয়েছে। শিগগিরই আরো ৪টি নতুন অপারেশন থিয়েটারের কার্যক্রম চালু হওয়ার পথে রয়েছে। বর্তমানে ১২টি অপারেশন থিয়েটার সার্বক্ষণিক চালু রেখে জরুরি অস্ত্রোপচারসহ প্রতিদিন গড়ে ১৫০-২০০ জন রোগীর অস্ত্রোপচার সম্পন্ন করা হচ্ছে। অপারেশনের জন্য অপেক্ষার সময় কমানোর জন্য সম্প্রতি ৩টি বিভাগে ২ শিফটে রুটিন ওটি চালু করা হয়েছে।
আগত সকল বিভাগে ভর্তিকৃত রোগীদের বিনা মূল্যে চিকিৎসা ও অপারেশনের জন্য প্রয়োজনীয় সামগ্রী সরবরাহ করা হচ্ছে।
হাসপাতালের প্যাথলজিক্যাল পরীক্ষা
হাসপাতালে বর্তমানে প্যাথলজিক্যাল পরীক্ষা ১ শিফটের পরিবর্তে ২ শিফটে এবং জরুরি পরীক্ষাসমূহ সার্বক্ষণিকভাবে সম্পন্ন করার ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। অন্যদিকে ঐইঅ১ঈ, ঞৎড়ঢ়ড়হরহও এবং ঝবৎঁস অসুষধংব সহ নতুন নুতন পরীক্ষার সুবিধাদি সংযোজিত হওয়ায় রোগীদের দুর্ভোগ বহুলাংশে হ্রাস পেয়েছে। হাসপাতালের প্যাথলজি বিভাগে পরীক্ষা-নিরীক্ষার সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ার ফলে এই খাতে সরকারের রাজস্ব আয় অনেকাংশে বৃদ্ধি পেয়েছে। যেখানে পূর্বে এ খাতে প্রতিদিন রাজস্ব আয়ের পরিমাণ ছিল সাড়ে ৩ থেকে ৪ হাজার টাকা সেখানে বর্তমানে প্রতিদিন রাজস্ব আয়ের পরিমাণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৩ থেকে ১৪ হাজার টাকা।
রেডিওলজি ও ইমাজিং পরীক্ষা : রেডিওলজি এবং ইমাজিং বিভাগে নতুন সিটি স্ক্যান, এমআরআই, এক্সরে মেশিন ও আলট্রাসনোগ্রাম মেশিন সংযোজন করা হয়েছে। ফলে ২টি সিটি স্ক্যান, ২টি এমআরআই, ৬টি এক্সরে মেশিন ও ৬টি আলট্রাসনোগ্রাম মেশিন দ্বারা সার্বক্ষণিকভাবে রেডিওলজি ও ইমাজিং সেবা প্রদান সম্ভব হচ্ছে।
হেমাটোলজি বিভাগের কার্যক্রম সম্প্রসারণ
হাসপাতালে হেমাটোলজি বিভাগে সফলভাবে বোনম্যারো ট্রান্সপ্লান্ট শুরু হয়েছে। এ পর্যন্ত ২৭ জন রোগীর বোনম্যারো ট্রান্সপ্লান্ট সফলভাবে সম্পন্ন করা হয়েছে।
দেশের সর্বাপেক্ষা নির্ভরযোগ্য হেমাটোলজিক্যাল পরীক্ষা-নিরীক্ষা হেমাটোলজি বিভাগে সম্পন্ন হচ্ছে।
বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইউনিটে
আধুনিক সুযোগ সুবিধা
দেশের পোড়া ও প্লাস্টিক সার্জারি রোগীদের নির্ভরযোগ্য আধুনিক চিকিৎসা সেবা প্রদানের জন্য বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইউনিটে প্রধানমন্ত্রীর অনুদানে হাইপারবারিক চেম্বার, বার্ন ট্যাংক ও স্ক্রিন ল্যাব সংযোজন করা হয়েছে। ফলে পোড়া রোগীসহ প্লাস্টিক সার্জারি রোগীদের আধুনিক সেবা প্রদান করা সম্ভব হচ্ছে।
কিডনি ও ডায়ালাইসিস বিভাগের
সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধিকরণ
১টি শ্লেড মেশিন, নতুন ৫টি ও মেরামতকৃত ৫টিসহ সর্বমোট ২১টি ডায়ালাইসিস মেশিন সার্বক্ষণিকভাবে চালু রেখে ২৪ ঘণ্টা চার বেলা ডায়ালাইসিস সেবা প্রদান করা হচ্ছে।
গাইনি বিভাগের কার্যক্রম বৃদ্ধি
গাইনি বিভাগে ১টি নতুন ইউনিটসহ ৩টি সাব স্পেশালিটি ইউনিট খোলা হয়েছে।
ক. ইনফারটিলিটি, খ. অনকোলজি, গ. ফিটোম্যাটারনাল মেডিসিন। ফলে এখানে গরিব বন্ধ্যা রোগীরা স্বল্প মূল্যে চিকিৎসা গ্রহণের সুযোগ পাচ্ছেন। গাইনি বিভাগে প্রতিদিন ২৫টি জরুরি অপারেশন সম্পন্ন করা হচ্ছে।
নিউরোসার্জারি ও অর্থোপেডিক
বিভাগের কার্যক্রম বৃদ্ধি
নিউরোসার্জারি বিভাগে অ্যান্ডোমাক্রোস্পোপ মেশিন সংযোজন এবং ২ শিফটে রুটিন ওটি চালু করার ফলে নিউরোসার্জারি বিভাগে কার্যক্রম বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। মাইক্রোস্পকপি সার্জারিসহ গড়ে প্রতিদিন ১০-১২টি নিউরোসার্জারিক্যাল অপারেশন সম্পন্ন হচ্ছে। ফলে অপারেশনের জন্য অপেক্ষার সময় অর্ধেকের নিচে নেমে এসেছে। একইভাবে অর্থোপেডিক এবং নাক, কান ও গলা বিভাগে ২ শিফটে রুটিন অপারেশন চালু করার ফলে এই দুই বিভাগের কার্যক্রম বহুলাংশে বৃদ্ধি পেয়েছে। ফলে অপারেশনের জন্য অপেক্ষার সময় অর্ধেকের নিচে নেমে এসেছে।
নতুন শয্যা সংখ্যা বৃদ্ধি ও
লিনেন সামগ্রী সরবরাহ
হাসপাতালে রোগীদের চিকিৎসার সুবিধার্থে ১ হাজার নতুন শয্যা স্থাপন করাসহ বেড সাইড লকার, স্যালাইন স্ট্যান্ড, হুইল চেয়ার ও পর্যাপ্ত সংখ্যক ট্রলির ব্যবস্থা করা হয়েছে। রোগীদের জন্য বিছানার চাদর এবং পর্যাপ্ত লিনেন সামগ্রী সরবরাহের ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হয়েছে।
হাসপাতালে আগত সকল রোগীর জন্য প্রয়োজনীয় স্যালাইন, গজ ব্যান্ডেজ, তুলা এবং ইনজেকশনসহ ২১৮ প্রকারের ওষুধ বিনা মূল্যে সরবরাহের ব্যবস্থা করা হয়েছে। অস্ত্রোপচারের রোগীদের জন্য প্রয়োজনীয় সামগ্রী বিনা মূল্যে সরবরাহ করা হচ্ছে।
নতুন অ্যাম্বুলেন্স সংযোজন
হাসপাতালে রোগীদের দুর্ভোগের কথা বিবেচনা করে সম্প্রতি স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম কর্র্তৃক ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের জন্য ২টি নতুন অ্যাম্বুলেন্স প্রদান করা হয়েছে।
হাসপাতাল রোগী কল্যাণ
সমিতির কার্যক্রম বৃদ্ধি
হতদরিদ্র, অসহায়, দুস্থ রোগীদের সুচিকিৎসা নিশ্চিতকল্পে রোগী কল্যাণ সমিতির কার্যক্রম নামে বিশেষ ব্যবস্থা রয়েছে। সম্প্রতি হাসপাতাল রোগী কল্যাণ সমিতির কার্যক্রম বহুগুণে বৃদ্ধি করা হয়েছে। এই সমিতির মাধ্যমে দরিদ্র রোগীসহ অজানা বেওয়ারিশ রোগীদের পরীক্ষা-নিরীক্ষার খরচ বহন করাসহ সব ধরনের (ওষুধপত্র, কাপড়-চোপড়, যাতায়াত ভাড়া, দাফন-কাফন)-এর ব্যয় নির্বাহ করা হচ্ছে।
পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম
হাসপাতালের কর্মপরিবেশ উন্নয়ন কল্পে হাসপাতালের চিকিৎসক, নার্স, কর্মকর্তা ও কর্মচারীগণের সমন্বয়ে গঠন করা হয়েছে ১০৬টি কর্মপরিবেশ উন্নয়ন টিম এবং ৮টি মনিটরিং টিমসহ পরিচালকের নেতৃত্বে একটি সেন্ট্রাল কোয়ালিটি ইমপ্রুভমেন্ট কমিটি। যারা হাসপাতালের কর্মপরিবেশ উন্নয়নে নিরন্তর ভূমিকা রেখে চলেছেন। যার ফলে অত্যন্ত সীমিত জনবল সত্ত্বেও সকলের আন্তরিকতা ও নিষ্ঠার ফলে বর্তমানে অতীতের যেকোনো সময়ের তুলনায় হাসপাতালের পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা এবং সার্বিকভাবে রোগীদের সেবার মান উন্নত করা সম্ভব হয়েছে।
বর্জ্য ব্যবস্থাপনা আধুনিকীকরণ
হাসপাতালের আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা উন্নত করা লক্ষ্যে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, ঢাকা সিটি করপোরেশন ও প্রিজমের মধ্যে একটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে।
শিগগিরই ৪র্থ শ্রেণির ১৭৬টি পদে আউট সোর্সিং খাতে জনবল নিয়োগের মাধ্যমে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার মান আরো উন্নতি করা সম্ভব হবে।
নিরাপত্তা সংক্রান্ত
সার্বিকভাবে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের নিরাপত্তা ঝুঁকিপূর্ণ বিধায় নিরাপত্তা বৃদ্ধির জন্য স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়, পুলিশ কমিশনার ও র‌্যাবের মহাপরিচালক বরাবর পত্র প্রেরণ করা হয়েছে।
নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় সিসি ক্যামেরার মাধ্যমে মনিটরিং এবং নিরাপত্তা প্রহরীর টহল ও তল্লাশি মাধ্যমে শিশু চুরির ঘটনা প্রতিরোধ করা সম্ভব হয়েছে।
শেষ কথা
ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের চিকিৎসা সেবার বর্তমান হালচাল ও জনপ্রত্যাশা শীর্ষক এক প্রশ্নের জবাবে হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মদ মিজানুর রহমান স্বদেশ খবরকে বলেন, বিচ্ছিন্ন কিছু সমালোচনা সত্ত্বেও নানা সীমাবদ্ধতা ও প্রতিকূলতার মধ্যেও দিনরাত ২৪ ঘণ্টা বিরতিহীনভাবে যে চিকিৎসা সেবা দেয়া হচ্ছে তা দেশের সরকারি-বেসরকারি হাসপাতাল এমনকি বিদেশেও এ ধরনের সেবা প্রদানের দৃষ্টান্ত নেই। বিপুল সংখ্যক রোগীকে সেবা দেয়ার বিশ্ববিরল সক্ষমতা রয়েছে ঢাকা মেডিকেলেরই। অনেক চিকিৎসক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীর ব্যক্তিগত ত্যাগের অনন্য চিত্র দেখা যায় এখানে। তাদের নিরলস পরিশ্রমের কারণে ক্রাইসিস মোকাবিলায় এ প্রতিষ্ঠান চিকিৎসা সেবায় ব্যতিক্রমী ইতিহাস সৃষ্টি করেছে বলা যায়। আমরা নিজেদের সাধারণ চিকিৎসাকর্মী ভাবতেই স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করিÑ যাদের একমাত্র ব্রত মানুষের সেবা করা। সরকার এক্ষেত্রে সর্বাত্মক সহযোগিতা দিচ্ছে। তিনি বলেন, জনপ্রত্যাশার প্রতি সম্মান রেখে চিকিৎসা সেবার মানোন্নয়নের লক্ষ্যে এবং জনগণের চিকিৎসা সেবা প্রাপ্তি নিশ্চিতকরণের জন্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দৃঢ়তা ও আন্তরিক সদিচ্ছায় দ্রুত আধুনিকতার পথে হাঁটছে এ হাসপাতালটি। পাশাপাশি বর্তমান স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিমের সমর্থন ও সহযোগিতার কারণে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের চিকিৎসা সেবার আধুনিকায়নের কাজটি এগিয়ে নেয়া অনেক সহজ হচ্ছে। শেষ বাক্যে ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মদ মিজানুর রহমান বলেন, যেকোনো প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ নির্বাহী যদি রাষ্ট্র বা সরকারের কাছে জনগণের কল্যাণ তথা মানুষের প্রয়োজনে ওই প্রতিষ্ঠানের সঠিক চাহিদাটি যৌক্তিকভাবে উপস্থাপন করতে সক্ষম হন, তাহলে ঢাকা মেডিকেলের মতো একদিন ওই প্রতিষ্ঠানের সীমাবদ্ধতা-সংকটও কেটে যাবে। তাই শুধু প্রয়োজনÑ প্রতিষ্ঠানের প্রয়োজনটি যথাসময়ে যথাযথভাবে প্রকৃত কর্তৃপক্ষের নিকট উপস্থাপন করা এবং ফলোআপ করা। তিনি বলেন, স্বাস্থ্য সেবার মানোন্নয়নে সরকারের সদিচ্ছা থাকার কারণে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল পরিচালনাকালীন যাবতীয় সংকট উত্তরণে কাজ করাটা অনেক সহজ হচ্ছে।