কলাম

সংসদ বিচার বিভাগের মুখোমুখিতা কাম্য নয়

নিজস্ব প্রতিবেদক : সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী বাতিলকে কেন্দ্র করে মুখোমুখি অবস্থানে দাঁড়িয়েছে বাংলাদেশের বিচার বিভাগ এবং জাতীয় সংসদ। ষোড়শ সংশোধনী নিয়ে সুপ্রিমকোর্টের রায়ে সংক্ষুব্ধ সংসদ সদস্যরা তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। তাদের অভিযোগÑ এই রায়ের মাধ্যমে সংসদের সার্বভৌমত্ব ক্ষুণœ করা হয়েছে। এক্ষেত্রে সংবিধান বিশ্লেষকরা বলছেন, ঘটনা যেভাবে ঘটছে তাতে মনে হচ্ছে দেশের বিচার বিভাগ এবং সংসদ একে অপরের পরিপূরক হওয়ার পরিবর্তে পরস্পরের মুখোমুখি অবস্থানে দাঁড়িয়ে গেছে।
প্রসঙ্গত, গত ৩ জুলাই বিচারপতিদের অভিশংসনের ক্ষমতা সংসদের হাতে দিয়ে সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী বাতিল করে দেয়া হাইকোর্টের রায় বহাল রাখে আপিল বিভাগ। বর্তমানে রায়ের পূর্ণাঙ্গ কপি প্রকাশের অপেক্ষায় রয়েছে। এ অবস্থায় ৪ জুলাই সংসদ অধিবেশন শুরু হলে সংসদের সরকারি দল এবং বিরোধী দলের সদস্যরা তীব্র প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন। তারা রিভিউর মাধ্যমে ৯৬ ধারা পুনঃস্থাপনের দাবি জানান এবং অনেকে এই রায়কে গভীর ষড়যন্ত্রের অংশ বলেও আশঙ্কা প্রকাশ করেন।
সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)-এর সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার বলেন, আমি মনে করি ষোড়শ সংশোধনীর রায় নিয়ে সংসদ এবং বিচার বিভাগ মুখোমুখি অবস্থানে দাঁড়িয়ে গেছে। এটা দেশের জন্য অবশ্যই খারাপ। সংসদকে বুঝতে হবে বিচার বিভাগ তার এখতিয়ারের মধ্যে থেকেই কাজ করেছে। কিন্তু সংসদ তার এখতিয়ারের বাইরে কথা বলেছে। সংসদের অবশ্যই স্বাধীনতা আছে। কিন্তু বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিয়ে সংসদ কথা বলতে পারে না।
৪ জুলাই সরকারি ও বিরোধী দলের অনেক সংসদ সদস্য বলেন, পাকিস্তান ছাড়া সুপ্রিমকোর্টের বিচারপতিদের অভিশংসনে জুডিশিয়াল কাউন্সিল পদ্ধতি আর কোথাও নেই। এ সম্পর্কে বদিউল আলম মজুমদার বলেন, এটা মোটেও সত্য নয়। অনেক দেশেই এটা চালু আছে। তবে দেশের গণতন্ত্রকে সুষ্ঠুভাবে এগিয়ে নিতে সংসদ ও বিচার বিভাগের সমন্বয় দরকার বলে মতামত দেন তিনি।
বিশ্লেষকদের মতে, সংসদীয় গণতন্ত্রে সংসদ ও আদালতের কর্তৃত্ব নিয়ে বিতর্ক অনেক পুরনো। নিকট অতীতেও এর আগে সংসদের স্পিকার সম্পর্কে আদালতের একটি বেঞ্চের মন্তব্যকে কেন্দ্র করে আদালত ও সংসদ মুখোমুখি অবস্থানে দাঁড়িয়েছিল। গত ২০১২ সালের ৬ জুন সংসদের বৈঠকে তীব্র প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করা হয়। ওই বেঞ্চের দুই বিচারপতি এ এইচ এম শামসুদ্দিন চৌধুরী মানিক ও জাহাঙ্গীর হোসেনকে নিঃশর্ত ক্ষমা চাওয়ার দাবি জানিয়েছিল সংসদ। তাই এসব ঘটনা প্রবাহ নিয়ে দুশ্চিন্তা বাড়ছে। এটা সুষ্ঠু গণতন্ত্রের পথে অন্তরায়।
তবে অনেক বিশ্লেষকের মতে, সংসদ স্বাধীনভাবে তার মত প্রকাশ করতে পারে। এতে দুই প্রতিষ্ঠানের মুখোমুখি অবস্থান সৃষ্টি হয়েছে এমনটা বলা যাবে না। এটা সুষ্ঠু গণতন্ত্র চর্চার বহিঃপ্রকাশ। এ নিয়ে সমস্যার কিছু নেই।
জাতীয় সংসদে ষোড়শ সংশোধনী নিয়ে আলোচনার সূত্রপাত করে জাসদের মঈনুদ্দিন খান বাদল বলেন, কোনো বিচারক যদি অপরাধের সঙ্গে যুক্ত হয়ে যান তাহলে তার বিচার কে করবে আমরা এখন এর উত্তর জানি না। বিচার বিভাগ সংবিধানের ঊর্ধ্বে কিনা তাও আমার জানা নেই। তিনি প্রশ্ন করে বলেন, সামরিক শাসনকে বিচার বিভাগ অবৈধ ঘোষণা করেছে; কিন্তু তাদের আমলে করা সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল কি বৈধ হয়ে গেল।
জাতীয় পার্টির জিয়াউদ্দিন বাবলু বলেন, পৃথিবীতে এমন কোনো দেশ নেই, যেখানে সংসদ থাকা সত্ত্বেও সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল রয়েছে। জনগণ সব ক্ষমতার উৎস। জনগণ দ্বারা নির্বাচিত এই সংসদ। এই সংসদ স্পিকার, প্রধানমন্ত্রী ও রাষ্ট্রপতিকে ইমপিচ করার ক্ষমতা রাখে, সেখানে বিচারকরা সবকিছুর ঊর্ধ্বে কি করে হয়?
রায় পুনর্বিবেচনার আহ্বান জানিয়ে বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ বলেন, প্রধান বিচারপতি যদি কোনো অপরাধ করেন তার বিচার অন্য বিচারপতিরা করবেন। আমরা ’৭২-র সংবিধান পুনঃস্থাপন করেছি মাত্র।
বাণিজ্যমন্ত্রী অ্যামিকাস কিউরির সমালোচনা করে বলেন, ড. কামাল, ব্যারিস্টার আমির-উল ইসলামরা মিথ্যা কথা বলেছেন। তারা বলেছেন পৃথিবীতে নাকি এটা নেই। কিন্তু আমরা জানি যুক্তরাষ্ট্র, অস্ট্রেলিয়া, ভারত, শ্রীলংকা, নেপাল, সুইডেন, দক্ষিণ আফ্রিকাসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে সংসদ বিচারপতিদের ইমপিচ করে থাকে। একমাত্র পাকিস্তানের সংবিধানে বিচারপতিদের অভিশংসনের ক্ষমতা সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলের হাতে দেয়া হয়েছে। সেই আইন আমাদের দেশের এমিকাস কিউরিদের পছন্দ! রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী ও স্পিকারকে এই সংসদ ইমপিচমেন্ট করতে পারলে বিচারপতিদের পারবে না কেন? আইনমন্ত্রীকে এ বিষয়ে বাস্তবসম্মত সিদ্ধান্ত নেয়ার দাবি জানান তিনি।
প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহার বিরুদ্ধে ন্যায় বিচারে প্রতিবন্ধকতা, বাধা সৃষ্টি ও অসদাচরণের অভিযোগ করে কৃষিমন্ত্রী বেগম মতিয়া চৌধুরী বলেন, বিএনপির মেয়াদে নিযুক্ত কয়েক বিচারপতির বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ থাকলেও বর্তমান বিচারপতি কোনো ব্যবস্থা নেননি।
জাসদ সভাপতি ও তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু বলেন, বিচার বিভাগের অনেক ক্ষমতা। নির্বাহী বিভাগ ও আইন বিভাগের ওপর খবরদারির ক্ষমতাও রয়েছে। এই অসীম ক্ষমতা পেয়ে বিচারপতিরা ভুল করতে পারেন। সেদিকটি লক্ষ্য রেখেই বাহাত্তরের সংবিধানে বিচারপতিদের অপসারণের ক্ষমতা সংসদের ওপর ন্যস্ত করা হয়েছিল। শেখ ফজলুল করিম সেলিম বলেন, ষোড়শ সংশোধনী কোনোভাবেই অবৈধ হতে পারে না, বরং অবৈধ বিষয়টিকেই পুনর্বহাল করে সংবিধান পরিপন্থি রায় দেয়া হয়েছে কি না সেটি নিয়েই প্রশ্ন উঠেছে। বঙ্গবন্ধু হত্যার পর থেকে অনেক বিচারপতি সংবিধান পরিপন্থি কাজ করেছেন। আপনারা কয়জন বিচারপতির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়েছেন?
রাশেদ খান মেনন বলেন, স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের মূল চেতনাই হচ্ছে আমাদের বাহাত্তরের মূল সংবিধান। এই সংবিধানকে অবজ্ঞা করার অধিকার কারো নেই। ষোড়শ সংশোধনী বাতিল করলেন, কিন্তু সংবিধানের সঙ্গে কোথায় সাংঘর্ষিক তা আদালত স্পষ্ট করে কিছু বলেননি। বরং আদালত রায়ের মাধ্যমে নিজেদের স্বার্থ রক্ষা করেছেন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, জাতীয় সংসদের সঙ্গে বিচার বিভাগের মুখোমুখিতা কোনোভাবেই কাম্য নয়। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিষয়টি উপলব্ধি করে মন্ত্রিপরিষদ বৈঠকে মন্ত্রীদের উদ্দেশে স্পষ্ট করে বলেছেন, ‘এই রায় নিয়ে কোনো মন্তব্য নয়। বিচারপতিরা যা ভালো মনে করেছেন, তা-ই করেছেন। বাংলাদেশের বিচার বিভাগ যে স্বাধীন, এই রায়ের মাধ্যমে তা প্রমাণিত হলো।’ কিন্তু প্রধানমন্ত্রীর এই নির্দেশনায় কর্ণপাত না করে সংসদ সদস্যরা বিচারপতিদের বিরুদ্ধে সমানে বিষোদ্গার চালিয়ে যেতে থাকেন; যা এখনো অব্যাহত আছে। তবে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এর একটি গ্রহণযোগ্য ও সম্মানজনক সমাধান দ্রুত খুঁজে বের করতেই হবে; যা দেশের জন্য আশু কল্যাণ বয়ে আনবে।