খেলা

আদালতের রায় : বিসিবি’র গঠনতন্ত্রে হস্তক্ষেপ করতে পারবে না এনএসসি

ক্রীড়া প্রতিবেদক : বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিবি) বর্তমান কমিটি নির্বাচিত হয়েছে ২০১২ সালের নভেম্বরে জাতীয় ক্রীড়া পরিষদের (এনএসসি) করা সংশোধিত গঠনতন্ত্রেই। ২৬ জুলাই সুপ্রিমকোর্টের আপিল বিভাগ রায় দিয়েছে গঠনতন্ত্র সংশোধনের ক্ষমতা বিসিবির হাতেই থাকছে। এতে এনএসসি হস্তক্ষেপ করতে পারবে না। এ রায়ের ফলে এখন ২০১২ সালের ১ মার্চে বিসিবি’র ইজিএমে পাস করা গঠনতন্ত্রটিই বৈধ গঠনতন্ত্র বলে মনে করছেন মামলাটির অন্যতম বাদি বিসিবির সাবেক কাউন্সিলর স্থপতি মোবাশ্বের হোসেন চৌধুরী।
এনএসসির করা সংশোধিত গঠনতন্ত্রের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে ২০১২ সালের ডিসেম্বরে হাইকোর্টে আবেদন করেছিলেন বিসিবির এ সাবেক কাউন্সিলর ও বিসিবির নির্বাহী কমিটির সাবেক সদস্য প্রয়াত ইউসুফ জামিল বাবু। গঠনতন্ত্র সংশোধনের ক্ষমতা বিসিবির কাছে ফিরে আসায় খুশি তিনিও। তার মতে, এখন বিসিবির কাছে একটিই বৈধ গঠনতন্ত্র রয়েছে। আর সেটি হলো ২০১২ সালের ১ মার্চে বিসিবি’র এজিএমে পাস করা গঠনতন্ত্র। তিনি বলেন, ‘আজকের রায় অনুযায়ী একটা গঠনতন্ত্রই বৈধ হয়, আমি সেটা পছন্দ করি বা না করি।’
রায়ের পর নিজের প্রতিক্রিয়ায় স্থপতি মোবাশ্বের হোসেন চৌধুরী বলেছেন, ‘কোর্ট খুব সহজভাবে একটি কথা বলেছে, এনএসসির কোনো ক্ষমতা নেই বিসিবির গঠনতন্ত্র সংশোধন করার। তার মানে যে গঠনতন্ত্র এনএসসি সংশোধন করতে পারে না সেই গঠনতন্ত্র স্বাভাবিকভাবেই তাহলে বৈধ না। বৈধ বা অবৈধ বলার প্রয়োজন হয় না। যদি বলা হয় আইনের দৃষ্টিতে এনএসসি এ কাজটি করতে পারে না তাহলে স্বাভাবিকভাবেই এ কাজটি অবৈধ।’
এ রায়ের মাধ্যমে মামলা খারিজ হয়ে গেছে বলে মনে করেন না মোবাশ্বের হোসেন চৌধুরী। তিনি বলেন, ‘সভাপতি সাহেব কয়েকবার বলেছেন মামলাটি খারিজ হয়ে গেছে। অর্থাৎ মামলাটি আমলেই নেয়া হয়নি। খারিজ সেটাই হয় যেটা আমলে নেয়া হয়নি। কিন্তু আমরা মনে করি এটা শেষ করা হয়েছে অর্থাৎ বিচারটি শেষ করা হয়েছে।’ নিজেদের আবেদন সম্পর্কে জানিয়ে তিনি আরো বলেন, ‘আমরা কিন্তু কখনোই নির্বাচন নিয়ে কথা বলিনি। আমাদের মামলা ছিল কোন গঠনতন্ত্রটি বৈধ? অর্থাৎ যে গঠনতন্ত্রে তারা নির্বাচন করেছেন সেটিকে অবৈধ ঘোষণা করতে বলেছিলাম। সেটা কিন্তু হাইকোর্ট করেছে। সুপ্রিমকোর্ট বৈধ-অবৈধ উচ্চারণ করেনি, কিন্তু বলেছে এনএসসি গঠনতন্ত্র সংশোধন করতে পারে না। এর মানে যদি কেউ না বুঝে তাহলে আমার বোঝানোর কোনো দায়িত্ব নেই।’
তারপরও পূর্ণাঙ্গ রায়ের জন্য অপেক্ষা করতে চান ক্রীড়াঙ্গনের সুপরিচিত এই সংগঠক। তিনি বলেন, ‘এখন অপেক্ষা করতে হবে পূর্ণাঙ্গ রায়ের জন্য।’
এদিকে বিসিবির আগামী নির্বাচনও আসন্ন। নির্ধারিত সময় অনুযায়ী অক্টোবরের শুরুতেই হওয়ার কথা নির্বাচন। সে নির্বাচন কোন গঠনতন্ত্রে হতে পারে জানতে চাইলে মোবাশ্বের হোসেন চৌধুরী বলেন, ‘পূর্ণাঙ্গ রায়েই দিকনিদের্শনা আসবে আগামী নির্বাচন কিভাবে করা হবে। এ গঠনতন্ত্র অবৈধ, অবৈধ গঠনতন্ত্রের অধীনে নির্বাচনকেও অবৈধ বলা যায়। এখন এর কতটুকু রাখব, দেশ জাতির স্বার্থে বা আগামী নির্বাচন কিভাবে হবে সেটা আশা করছি পূর্ণাঙ্গ রায়ে আসবে।’
এনএসসির সংশোধিত গঠনতন্ত্রে হওয়া বিসিবির সর্বশেষ নির্বাচন সম্পর্কে মোবাশ্বের হোসেন চৌধুরী বলেন, ‘একটি বিশেষ ব্যবস্থায় এ গঠনতন্ত্রে নির্বাচন করা হয়েছিল। বাংলাদেশের ক্রিকেটের একটি বিশেষ সময়ে, বিশেষ ঘটনায়। তখন বলা হয়েছিল, এ গঠনতন্ত্রে নির্বাচন করো। তবে তোমাদের বৈধতা নির্ভর করবে সুপ্রিমকোর্টের রায়ের ওপর।’
বিসিবি ২০১২ সালের ১ মার্চ বিশেষ সাধারণ সভার (ইজিএম) মাধ্যমে গঠনতন্ত্র সংশোধন করে জাতীয় ক্রীড়া পরিষদে (এনএসসি) পাঠায়। কিন্তু বিসিবি সাধারণ পরিষদের সদস্যদের মতামত উপেক্ষা করে ওই গঠনতন্ত্রে নিজেদের মনগড়া সংশোধনী আনে এনএসসি। এ নিয়ে হাইকোর্টে রিট করে বিসিবি। রিটে বলা হয়, এনএসসি যে সংশোধনী এনেছে তা বিসিবির গঠনতন্ত্রের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। এছাড়া এনএসসি আইন ১৯৭৪-এর ২০ এর (ক) ধারার পরিপন্থি। রিটে বলা হয়, ক্রীড়া পরিষদ মডেল গঠনতন্ত্র প্রণয়ন করতে পারে, কিন্তু বিসিবির এজিএমে অনুমোদিত গঠনতন্ত্র সংশোধনের ক্ষমতা রাখে না। ২০১৩ সালের ২৭ জানুয়ারি হাইকোর্ট এক রায়ে এনএসসির চাপিয়ে দেয়া সংশোধিত গঠনতন্ত্র অবৈধ বলে ঘোষণা দেয়। এই রায়ের বিরুদ্ধে এনএসসি ও বিসিবি আপিল করে।
২৬ জুলাই ওই আপিলের ওপর শুনানি অনুষ্ঠিত হয়। শুনানির এক পর্যায়ে আপিল বিভাগ বলেন, আগামী ৫ বছরে বাংলাদেশের ক্রিকেট বিশ্বে নতুন ইতিহাস সৃষ্টি করবে। তার জন্য বিসিবি এবং বাংলাদেশকে এখনই প্রস্তুত হওয়া প্রয়োজন। এই জন্য বিসিবিকে শক্তিশালী করতে হবে। যাতে তারা অস্ট্রেলিয়া ও ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ডের মতো শক্তিশালী হয়ে উঠতে পারে।
অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম এ বিষয়ে সাংবাদিকদের বলেন, আদালত নির্দেশনা দিয়েছে যে বিসিবি তাদের গঠনতন্ত্র নিজেরাই সংশোধন করতে পারবে। তবে তা গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ বজায় রেখে বিশেষ সাধারণ সভার মাধ্যমে করতে হবে। যেন দেশের ক্রিকেটপ্রেমী মানুষ এবং সব ধরনের ক্রিকেটাররা এর সঙ্গে যুক্ত থাকতে পারেন। ক্রিকেটকে আরও সম্প্রসারিত করার জন্য বিসিবি এবং এনএসসিকে একে অন্যের পরিপূরক হয়ে কাজ করতে বলেছে আদালত।
সুপ্রিমকোর্টের আপিল বিভাগের এ রায়ে খুশি বিসিবি সভাপতি নাজমুল হাসান পাপনও। রায়ের পর সাংবাদিকদের বিসিবি সভাপতি বলেন, ‘আসলে রায় নিয়ে এখন কিছু বলাটা কঠিন। রায়ের কপি এখনো আমাদের হাতে পৌঁছায়নি; ততদিন পর্যন্ত আমাদের অপেক্ষা করতে হবে। যতটুক বুঝতে পেরেছি এবং শুনেছি তা অবশ্যই বাংলাদেশের ক্রিকেটের জন্য অত্যন্ত একটা ভালো রায় হয়েছে। এখন যত তাড়াতাড়ি সম্ভব ইজিএম, এজিএম ডেকে গঠনতন্ত্রে যদি কোনো পরিবর্তন করতে হয় তাহলে আমরা করতে পারবো। এটা একটা যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত, যা ক্রিকেটের জন্য ভালোই হবে। তিনি বলেন, পূর্ণাঙ্গ রায় পাওয়ার সাথে সাথেই আমরা নির্ধারিত সময়ে ইজিএম করবো। আমরা আগে থেকেই প্রস্তুতি নিয়ে নিচ্ছি। তারিখ ঠিক করে ফেলবো। ৩০ জুলাই আমরা বোর্ড মিটিং ডেকেছি। ওই দিন আমরা সব ফাইনাল করে ফেলবো। রায় হাতে পাওয়ার আগে তো কিছু করতে পারবো না। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব রায়টা চলে আসে তার অপেক্ষায় আছি, তারপর বোর্ড সিদ্ধান্ত নেবে।’