প্রচ্ছদ প্রতিবেদন

এইচএসসির ফল প্রকাশ অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা : পাসের হার নয়, শিক্ষার মানটাই মুখ্য বিবেচ্য বিষয়

নিজস্ব প্রতিবেদক : এবার এইচএসসি পরীক্ষায় সম্মিলিত পাসের হার ৬৮ দশমিক ৯১ শতাংশ। অর্থাৎ ফেল করেছে ৩১ দশমিক শূন্য ৯ শতাংশ। এইচএসসিতে সবচেয়ে বেশি পাস করেছে সিলেট শিক্ষা বোর্ডে ৭২ শতাংশ। সবচেয়ে কম পাস করেছে কুমিল্লা শিক্ষা বোর্ডে, ৪৯ দশমিক ৫২ শতাংশ। কুমিল্লা শিক্ষা বোর্ডে এবার ১ লাখ ৩৭২ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে অর্ধেকেরও বেশি ফেল করেছে। এইচএসসির ফলাফল আগের তুলনায় খারাপ হওয়া নিয়ে আলোচনা চলছে সর্বত্র। অভিযোগ রয়েছে, অতীতে পরীক্ষার খাতা মূল্যায়নে লাগামহীন উদারতার কারণে ফলাফলে রীতিমতো সাফল্যের বিস্ফোরণ ঘটছে। খাতা মূল্যায়নে এ ধরনের দুর্বলতার কারণে প্রতি বছরই অব্যাহতভাবে বাড়তে থাকে পাসের হার ও জিপিএ-৫। এ অবস্থায় সঠিকভাবে খাতা মূল্যায়নে নতুন পদ্ধতি চালু ও কঠোরতা অবলম্বন করলে ফলাফলে তার প্রভাব পড়বে বলেই ধারণা ছিল সকলের। এবারের এসএসসি পরীক্ষাতে প্রথমবারের মতো খাতা মূল্যায়নে নেয়া হয়েছিল নতুন উদ্যোগ। যা কার্যকর করে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীন সেসিপ প্রকল্পের একটি ইউনিট যার নাম বাংলাদেশ এক্সামিনেশন ডেভেলপমেন্ট ইউনিট (বিইডিইউ)। নতুন এ পদ্ধতিতে খাতা যথাযথভাবে মূল্যায়ন হওয়ায় পরীক্ষায় পাসের হার ও জিপিএ-৫ প্রাপ্তি কিছুটা কমেছিল এসএসসিতে। এরই ধারাবাহিকতায় বিইডিইউ’র উদ্যোগ প্রথমবারের মতো কার্যকর করা হয় এবারের এইচএসসি পরীক্ষার খাতা মূল্যায়নের ক্ষেত্রে। তাতেই পাসের হার ও জিপিএ-৫ প্রাপ্তি উভয়ই আগের তুলনায় অনেক কমে যায়।
পরীক্ষার মূল্যায়ন পদ্ধতির পরিবর্তনের কারণে এবার পাসের হার কয়েক বছরের মধ্যে বেশ খানিকটা কমে গেলেও এ পরিবর্তনকে ইতিবাচক হিসেবেই দেখছেন শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ। শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান, পরীক্ষা নিয়ন্ত্রকসহ সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরাও বলছেন, ফলাফল আগের তুলনায় কিছুটা খারাপ হলেও মাধ্যমিকের মতো উচ্চ মাধ্যমিকেও সঠিকভাবে খাতা মূল্যায়ন জরুরি হয়ে পড়েছিল। যুগের পর যুগ ধরে একটি ত্র“টিপূর্ণ খাতা মূল্যায়ন পদ্ধতি ছিল; যার পরিবর্তনের ফলে এখন পরীক্ষার সঠিক ফল পাওয়া যাচ্ছে। ভবিষ্যতে আরও কঠোরভাবে উদ্যোগ কার্যকর হবে বলেও জানিয়েছেন বিইডিইউ কর্মকর্তারা।
২৪ জুলাই এইচএসসির ফলের কপি প্রধানমন্ত্রীর কাছে হস্তান্তর করেন শিক্ষামন্ত্রীসহ শিক্ষা বোর্ডের প্রধানরা। এরপরই জানা যায়, বহু বছর পর ফলের ঊর্ধ্বগতিতে ছেদ পড়েছে। তবে এ নিয়ে উদ্বেগের কিছু নেই এ কথা স্পষ্ট হয় প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যেই। পরীক্ষার খাতা মূল্যায়ন পদ্ধতির পরিবর্তনের কারণে পরীক্ষায় পাসের হার গত কয়েক বছরের মধ্যে বেশ খানিকটা কমে গেলেও এ পরিবর্তনকে সময়োপযোগী বলেছেন প্রধানমন্ত্রী। পাসের হার কমার প্রেক্ষাপটে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, পাসের হার নয়, শিক্ষার মানটাই মুখ্য বিবেচ্য বিষয়।
মূল্যায়ন পদ্ধতি পরিবর্তনের কারণে এবার পাসের হার কমলেও আগামীতে এ অবস্থা কাটিয়ে ওঠা যাবে বলে আশা প্রকাশ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এবার রেজাল্ট হয়ত পার্সেন্টেজের দিক থেকে কিছুটা কম হতে পারে। এর কারণ, যেহেতু পড়াশুনার গুণগত মানের দিকে দৃষ্টি দেয়া হয়েছে, পরীক্ষা পদ্ধতি আরও আধুনিক করা হয়েছে। তাছাড়া খাতা দেখাসহ সব দিকে ভালোভাবে দৃষ্টি দেয়া হয়েছে। সার্বিকভাবে এই ফলকে যথেষ্ট ভালো হিসেবে বর্ণনা করে উত্তীর্ণ শিক্ষার্থীদের অভিনন্দন এবং শিক্ষকদের ধন্যবাদ জানান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
এইচএসসির ফল আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশের সময় শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ বলেন, আগে পরীক্ষার খাতা মূল্যায়ন পদ্ধতি যথাযথ ছিল না। শত বছরের একটা পদ্ধতি ৩ বছর ধরে পরিবর্তনের জন্য আমরা কাজ করেছি। বিশেষজ্ঞ, শিক্ষাবিদরা কাজ করেছেন। এবার নতুন পদ্ধতিতে যথাযথভাবে পরীক্ষার খাতা মূল্যায়ন হওয়ায় উচ্চ মাধ্যমিক ও সমমানের পরীক্ষায় পাসের হার কিছুটা কমেছে। আমাদের কাছে এটা খুবই স্বাভাবিক। কিন্তু যারা পাসের হার কেবল বাড়ছে এ কথা শুনে অভ্যস্ত তাদের কাছে একটু বিস্ময় হতে পারে। যেহেতু এটা একটা আমাদের অগ্রগতি, সেই কারণে জিনিসটা আমি সবাইকে স্বাভাবিকভাবে নিতে অনুরোধ জানাব।
মূল্যায়ন পদ্ধতি পরিবর্তনের কারণ তুলে ধরে শিক্ষামন্ত্রী আরও বলেন, পরীক্ষার পর পরীক্ষকরা খাতা নিয়ে যান এবং ফলাফল জমা দেন। কিন্তু অভিজ্ঞতায় দেখা যায়Ñ তারা ভালো করে খাতা দেখেন না অনেকেই। এ কারণে একটি পরীক্ষা পর্যালোচনা পর্ষদ করে সার্বিক পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করার ব্যবস্থা হয়। একই খাতা ২০টি ফটোকপি করে দেয়া হয় দেশের ২০ জন সেরা পরীক্ষককে। তাদের প্রত্যেকের কাছ থেকে আলাদাভাবে নম্বর নেয়া হয়। দেখা যায়, ২০ জনই ২০ ধরনের নম্বর দিয়েছেন। একজন ছাত্র ৪ পাচ্ছে, আরেকজন ছাত্র সেখানে ৭ পেয়ে যাচ্ছে। তাহলে কত পার্থক্য হয়ে যাচ্ছে।
শিক্ষার গুণগত মান অর্জন করাই বড় চ্যালেঞ্জ বলে মন্তব্য করে শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ বলেন, সবচেয়ে বড় কথা আমরা শিক্ষার মান অর্জনের চেষ্টা করছি। শিক্ষকদের মধ্যে তো সমস্যা আছে। এটি কাটিয়ে উঠতে চেষ্টা করছি। মান বেড়েছে, তবে গুণগত মান বৃদ্ধি করা বড় চ্যালেঞ্জ। এটি শুধু বাংলাদেশের না সারা বিশ্বের চ্যালেঞ্জ। আমরা সেই চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। আগে পরীক্ষা অনিশ্চিত ছিল। আমরা শৃঙ্খলার মধ্যে এনেছি। পরীক্ষা শেষের ৬০ দিনের মধ্যে আমরা ফলাফল দিই। আগে পরীক্ষার খাতা সঠিকভাবে মূল্যায়ন করা হতো না বলে অভিযোগ পেয়েছি। এতে দেখা যেত ভালো ছাত্ররা খারাপ আর খারাপ ছাত্ররা ভালো রেজাল্ট করত। এ জন্য শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে বাংলাদেশ এক্সামিনেশন ডেভেলপমেন্ট ইউনিট গঠন করা হয়। এটি ৩ বছর ধরে কাজ করছে। শিক্ষক ও হেড এক্সামিনার ঠিকমতো খাতা দেখছেন কি নাÑ তা তারা খতিয়ে দেখে। বিইডিইউ কাজ শুরু করার পর থেকে পরীক্ষা ফলাফলে কিছুটা পরিবর্তন এসেছে।
নুরুল ইসলাম নাহিদ আরও বলেন, প্রশ্নপত্র রক্ষা করা একটা কঠিন কাজ। এ কাজে আমরা সফল হয়েছি। প্রশাসন, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর যৌথ উদ্যোগে এ কাজ সম্ভব হয়েছে।
যারা ফেল করছে তাদের হতাশ হওয়ার কিছু নেই। একটি পরীক্ষায় পাস না করলে জীবনের সবকিছু পাল্টে যায় না। আগামীতে আরও পরীক্ষা দেয়ার সুযোগ আসবে। ভেঙে পড়লে চলবে না। চেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে।