প্রতিবেদন

জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুটেরেজ-এর অভিমত ‘এসডিজি অর্জনে বাংলাদেশের অগ্রগতি সন্তোষজনক’

স্বদেশ খবর ডেস্ক : ২০৩০ সালের মধ্যে দারিদ্র্যমুক্ত বিশ্ব প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য অর্জন করতে হলে জলবায়ু পরিবর্তন রোধ এবং শান্তি প্রতিষ্ঠার ইস্যুকে সর্বাধিক গুরুত্ব দিতে হবে। সামাজিক শান্তি এবং মানুষের জীবনমান উন্নয়নেও সকলকে ঐক্যবদ্ধ করতে হবে। এসডিজির অনেক বিষয়েই বাংলাদেশের মতো জাতিসংঘের সদস্য রাষ্ট্রগুলোর গত দুই বছরের অগ্রগতি সন্তোষজনক। তারপরও কিছু বিষয়ে হতাশা আছে। এমন অভিমত পোষণ করেছেন জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুটেরেজ।
নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সদর দপ্তরে এসডিজির অগ্রগতি আলোকে ৩ দিনব্যাপী শীর্ষ পর্যায়ের রাজনৈতিক ফোরাম (হাই লেভেল পলিটিক্যাল ফোরাম তথা এইচএলপিএফ)-এর প্রথম দিন ২৪ জুলাই মহাসচিব আরো উল্লেখ করেন, এসডিজির অনেক বিষয়েই গত দুই বছরের অগ্রগতি সন্তোষজনক হলেও বেশ কিছু ইস্যুতে হতাশা রয়েছে। ভাষণে আন্তোনিও গুটেরেজ উল্লেখ করেন, নানা প্রতিবন্ধকতা সত্ত্বেও বাংলাদেশ এসডিজির লক্ষ্য অর্জনে অত্যন্ত আস্থার সাথে কাজ করছে। এসডিজি বিষয়ে বাংলাদেশের অগ্রগতি সন্তোষজনক। ‘ভলান্টারি ন্যাশনাল রিভিউ’ (ভিএনআর) সেশনে ‘ইরাডিকেটিং পোভার্টি অ্যান্ড প্রমোটিং প্রোসপারিটি ইন অ্যা চেঞ্জিং ওয়ার্ল্ড’ শীর্ষক এসডিজি বাস্তবায়নের অগ্রগতি বিষয়ক বাংলাদেশের জাতীয় রিপোর্ট উপস্থাপন করেন বাংলাদেশ সরকারের এসডিজি বাস্তবায়নের মুখ্য সমন্বয়ক আবুল কালাম আজাদ। মন্ত্রী পর্যায়ের এই সেগমেন্টে ৪৪টি দেশ তাদের ন্যাশনাল রিপোর্ট উপস্থাপন করে। এ পর্বে বাংলাদেশের পরিকল্পনামন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল মূলমঞ্চে উপস্থিত ছিলেন অন্যতম প্যানেলিস্ট হিসেবে। তিনি বাংলাদেশের ১৬ কোটি মানুষের পক্ষ থেকে উপস্থিত সকলকে শুভেচ্ছা ও স্বাগত জানিয়ে বাংলাদেশের জাতীয় রিপোর্ট উপস্থাপন করার জন্য প্রধানমন্ত্রীর সাবেক মুখ্যসচিব ও বর্তমানে প্রধান সমন্বয়ক আবুল কালাম আজাদকে আহ্বান জানান।
এ সময় বাংলাদেশের অগ্রগতির সমর্থনে বড় পর্দায় নানা অনুষ্ঠান ও কর্মকা-ের ছবি ভেসে উঠে। অর্থাৎ একটি মাল্টিমিডিয়া প্রেজেন্টেশনের মাধ্যমে গত ২ বছরে এসডিজি অর্জনে বাংলাদেশের অগ্রগতির এই রিপোর্ট অত্যন্ত চমৎকারভাবে উপস্থাপন করেন আবুল কালাম আজাদ।
এ সময় এসডিজি’র ৭টি অভীষ্ট লক্ষ্য যথা : দারিদ্র্য নির্মূল (অভীষ্ট-১), ক্ষুধা (অভীষ্ট-২), সুস্বাস্থ্য ও কল্যাণ (অভীষ্ট-৩), লিঙ্গ সমতা (অভীষ্ট-৫), শিল্প উদ্ভাবন ও অবকাঠামো (অভীষ্ট-৯), জলজ জীবন (অভীষ্ট-১৪) ও বৈশ্বিক অংশীদারিত্ব (অভীষ্ট-১৭) বাস্তবায়নে বাংলাদেশের অর্জনসমূহ উল্লেখ করা হয়। এসডিজিকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সর্বোচ্চ গুরুত্বপূর্ণ এজেন্ডা হিসেবে উল্লেখ করে এর বাস্তবায়নে বাংলাদেশ সরকার গৃহীত বিভিন্ন কৌশল যেমন সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় এসডিজিকে সন্নিবেশিত করা, বার্ষিক কর্মসম্পাদন চুক্তিতে এসডিজিকে অন্তর্ভুক্ত করা, এসডিজি ট্র্যাকার সৃষ্টি, আন্তঃমন্ত্রণালয় এসডিজি বাস্তবায়ন ও মনিটরিং কমিটি গঠন, মন্ত্রণালয়ের ম্যাপিং এবং ডাটাগ্যাপ এনালাইসিস-এর মতো বিষয়গুলোও বিস্তারিতভাবে উপস্থাপন করা হয়।
বাংলাদেশের উন্নয়নের পরিমাপক হিসেবে বিভিন্ন আর্থসামাজিক প্রবৃদ্ধির তথ্য প্রদর্শন করা হয়। দেখানো হয় উচ্চ ও নিম্ন দারিদ্র্য রেখা যথাক্রমে ২৪ দশমিক শূন্য ৩ শতাংশ ও ১২ দশমিক শূন্য ৯ শতাংশে নেমে এসেছে; যা ১৯৯১ সালে ছিল যথাক্রমে ৫৬ ও ৪১ শতাংশ। প্রধানমন্ত্রীর প্রাধিকার প্রকল্প একটি বাড়ি একটি খামারের পাশাপাশি উঠে আসে সুবিধাবঞ্চিত মানুষের অধিকার রক্ষা ও কল্যাণ, ডিজিটাল ফিন্যানসিয়াল সার্ভিস এবং জনগণের দোরগোড়ায় সেবা প্রদানের লক্ষ্যে গৃহীত বিশেষ বিশেষ কর্মসূচিগুলো। পদ্মা সেতুসহ মেগা অবকাঠামো প্রকল্পসমূহও এ রিপোর্টে স্থান পায়।
বাংলাদেশকে নিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ৫টি ভিশন : ১. ২০২১ সালের মধ্যে মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত করা, ২. ২০৩০ সালে এসডিজি বাস্তবায়নের মাধ্যমে উন্নয়নের মহাসড়কে উপনীত হওয়া, ৩. ২০৪১ সালের মধ্যে উন্নত-সমৃদ্ধ দেশে পরিণত হওয়া, ৪. ২০৭১ সালে স্বাধীনতার শত বর্ষপূর্তিতে বাংলাদেশকে উন্নয়নের বিস্ময়ে পরিণত করা এবং ৫. ২১০০ সালে ডেল্টা প্ল্যান বাস্তবায়নের মাধ্যমে বাংলাদেশকে নিরাপদ ব-দ্বীপ হিসেবে গড়ে তোলাÑ এ রিপোর্টে সন্নিবেশিত হয়।
এসডিজি বাস্তবায়নে বাংলাদেশ কোন অবস্থানে রয়েছে, চ্যালেঞ্জসমূহ কী এবং এসকল চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার কৌশলসমূহ প্রতিফলনের পাশাপাশি এসকল চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় বৈশ্বিক অংশীদারিত্বের ওপর জোর দেয়া হয়েছে এই রিপোর্টে।
এসডিজি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে ‘কেউ পেছনে পড়ে থাকবে না’Ñ মর্মে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রতিশ্র“তির পুনরুল্লেখ করে পরিকল্পনামন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল এ ইভেন্টে প্রদত্ত বক্তৃতায় বলেন, ‘এসডিজি’র লক্ষ্যসমূহের পূর্ণ বাস্তবায়নে সরকারি ও বেসরকারি উভয় খাতের নিবিড় সম্পৃক্ততা প্রয়োজন। এসডিজি অর্জনে বেসরকারি খাতের অংশগ্রহণ ত্বরান্বিত করতে আমরা ৩টি বিষয়ের ওপর জোর দিয়েছি, তা হলো : ১. ব্যবসাবাণিজ্যকে উৎসাহিত করতে ব্যবসা সহায়ক পরিবেশ তৈরি, ২. ট্যাক্স ও ভর্তুকি নীতিমালার মাধ্যমে বেসরকারি খাতকে প্রণোদনা প্রদান এবং ৩. বহুজাতিক কোম্পানির সামাজিক দায়বদ্ধতার ক্ষেত্র সম্প্রসারণ’। আ হ ম মুস্তফা কামাল আরও বলেন, দেশের মোট বিনিয়োগের প্রায় ৭৭ শতাংশ বেসরকারি খাত থেকে আসে। বিদ্যুৎ সেক্টরে এ খাতের অংশগ্রহণ ৪৫ শতাংশ। আমাদের সরকার বেসরকারি খাতের পূর্ণ বিকাশে প্রতিশ্র“তিবদ্ধ।
অনুষ্ঠানটিতে একটি প্রেজেন্টেশনের মাধ্যমে বাংলাদেশের তথ্য বিপ্লবের (ডিজিটাল বাংলাদেশ) বিষয়টি তুলে ধরা হয় এবং এটি এসডিজি বাস্তবায়নে ও দারিদ্র্য দূরীকরণে কিভাবে সহায়ক ভূমিকা পালন করছে তা অবহিত করা হয়।
এইচএলপিএফ-এর দিনব্যাপী কর্মসূচিতে জাতিসংঘের সমন্বয় করা তথ্যানুযায়ী, ১৯৯৯ সাল থেকে ২০১৬ পর্যন্ত বিশ্বের ১ বিলিয়ন মানুষকে চরম দারিদ্র্যসীমার নিচ থেকে বের করে আনা সম্ভব হলেও ২০১৩ সাল পর্যন্ত ৭৬৭ মিলিয়ন তথা ৭৬ কোটি ৭০ লাখ মানুষ নিদারুণ কষ্টে দিনাতিপাত করছিল। অনূর্ধ্ব ৫ বছর বয়সী অসংখ্য শিশুর জীবনমানের উন্নয়ন ঘটানো সম্ভব হলেও অনেক শিশু এখনও অপুষ্টির শিকার রয়েছে। ২০১৬ সালে এমন শিশুর সংখ্যা ছিল ১৫৫ মিলিয়ন তথা ১৫ কোটি ৫০ লাখ। জাতিসংঘের তথ্যানুযায়ী, ২০০০ সাল থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত ১৫ বছরে বিশ্বে সন্তান প্রসবের সময় মায়ের মৃত্যুর হার ৩৭ শতাংশ হ্রাস করা সম্ভব হয়েছে এবং অনূর্ধ্ব ৫ বছর বয়সী শিশু মৃত্যুর হার কমানো হয়েছে ৪৪ শতাংশ।