প্রতিবেদন

জাতীয় পাবলিক সার্ভিস দিবস ও জনপ্রশাসন পদক-২০১৭ প্রদান অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী : সরকারি চাকরিজীবীদের জনকল্যাণে অধিক মনোযোগী হওয়ার আহ্বান শেখ হাসিনার

নিজস্ব প্রতিবেদক : ২৩ জুলাই যথাযোগ্য মর্যাদায় জাতীয় পাবলিক সার্ভিস দিবস উদযাপন করা হয়। দিবস উপলক্ষে ওই দিন জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় আলোচনা অনুষ্ঠান ও জনপ্রশাসন পদক-২০১৭ প্রদান অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। ২টি ক্যাটাগরিতে ১৪ জনকে পদক প্রদান করা হয়। অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিজয়ীদের হাতে পদক তুলে দেন। জনপ্রশাসন মন্ত্রী সৈয়দ আশরাফুল ইসলামের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে প্রতিমন্ত্রী ইসমত আরা সাদেক বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন। মন্ত্রিপরিষদ সচিব মোহাম্মদ শফিউল আলম এবং জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সচিব মোজাম্মেল হক খান অনুষ্ঠানে বক্তৃতা করেন।
প্রধানমন্ত্রী তাঁর ভাষণে সরকারি চাকরিজীবীদের শুধু রুটিন ওয়ার্ক হিসেবে দায়িত্ব পালন না করে জনকল্যাণে অধিক মনোযোগী হওয়ার আহ্বান জানান। উদ্ভাবনী শক্তি কাজে লাগিয়ে জনকল্যাণে নিবেদিত হওয়ার আহ্বান জানিয়ে শেখ হাসিনা বলেন, শুধু রুটিন দায়িত্ব পালনে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না। উদ্ভাবনী শক্তি দিয়ে আরও কী কাজ করলে মানুষের কল্যাণ হয় সেটা চিন্তা করে সেভাবেই পদক্ষেপ নিতে হবে। তাহলেই দেশ এগিয়ে যাবে। সরকারি চাকরি যে একটা রুটিন চাকরি, এলাম, বেতন নিলাম, চলে গেলাম সেটা নয়, নিজের ভেতরে উদ্ভাবনী শক্তি কী আছে সেটাও কাজে লাগাতে হবে। নিজেই নিজেকে আবিষ্কার করতে হবে। যেখানে যে দায়িত্বপ্রাপ্ত তাকে সেখানে ভাবতে হবে এটা তার নিজের দায়িত্ব, কারণ এই দেশটা তার। দেশের মানুষগুলো তার। কাজেই দেশের মানুষের কল্যাণে সরকারি চাকরিজীবীদের কাজ করতে হবে। এ প্রসঙ্গে সমকালীন একটি উদাহরণ টেনে প্রধানমন্ত্রী বলেন, খুলনার জেলা প্রশাসক একটা উদ্যোগ নিয়েছিলেন, সেখানে সকল সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং আমাদের পুলিশ প্রশাসন ১ দিনের বেতন দিয়ে একটি ফান্ড তৈরি করেছেন ভিক্ষুকমুক্ত করার জন্য। এই ভিক্ষুকদের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করেছেন। এই বিষয়টি আমার খুবই ভালো লেগেছে। আমি বলবো একটা উদ্ভাবনী কাজ তারা করেছেন। আমি জানতে চাইলাম এটা তারা করলেন কেন? উত্তর পেয়েছি আপনারা আমাদের এত বেতন বাড়িয়ে দিয়েছেন, সেক্ষেত্রে আমাদেরও জনগণের প্রতি দায়বদ্ধতা রয়েছে। যা থেকে ভাবলাম একটু সেবা করি। শেখ হাসিনা বলেন, কাজেই আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছি যারাই এ ধরনের ফান্ড তৈরি করবেন, সেখানে আমিও প্রধানমন্ত্রীর তহবিল থেকে কিছু অনুদান দেব। যাতে করে তারা এই কর্মসূচি সফলভাবে বাস্তবায়ন করতে পারেন। প্রধানমন্ত্রী বলেন, কাজেই এভাবে আমাদের চিন্তা করতে হবে, কোথায় কী সমস্যা আছে। অথবা প্রতিটি ক্ষেত্রেই কোন কাজটা করলে আমার দেশের মানুষের কাজে লাগবে, এভাবেই কাজ করতে পারলে দেশটা এগিয়ে যাবে।
সরকারের সাফল্যে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অভিনন্দন জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমরা পরিকল্পনা দিয়েছি। আপনারা মাঠ পর্যায়ে যারা এটি বাস্তবায়ন করেছেন তাদের সকলকে আমি আন্তরিক অভিনন্দন জানাই আর এটা অব্যাহত থাকুক সেটাই আমরা চাই। এ সময় জাতির পিতার ভাষণের উদ্ধৃতি দিয়ে শেখ হাসিনা বলেন, সকল সরকারি কর্মচারীকেই আমি অনুরোধ করি যাদের অর্থে আমাদের সংসার চলে, তাদের সেবা করুন। যাদের অর্থে আজকে আমরা চলছি তাদের যেন কষ্ট না হয় সেদিকে খেয়াল রাখুন। যারা অন্যায় করবে তাদের কঠোর হস্তে দমন করুন। কিন্তু সাবধান একটা নিরপরাধ লোকের ওপর যেন অত্যাচার না হয়। অর্থাৎ যে মানুষগুলোর অর্থ দিয়েই সবকিছু চলছে তাদের কল্যাণ করে যেতে হবে। এদিকে কিন্তু জাতির পিতা নির্দেশ দিয়ে গেছেন এবং তার প্রতিটি কথাই দেশের কল্যাণের জন্য একান্ত গুরুত্বপূর্ণ।
শেখ হাসিনা তাঁর ভাষণে বলেন, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে ২০১২ সাল থেকে গভর্ন্যান্স ইনোভেশন ইউনিট নামে একটি আলাদা শাখা খোলা হয়েছে। এই ইউনিটের প্রধান উদ্দেশ্য হচ্ছে নতুন নতুন উপায় উদ্ভাবন করে সরকারি সেবা প্রদান পদ্ধতি সহজ করা। পাশাপাশি সরকারি কাজের জবাবদিহিতা এবং স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা। আপনাদের মনে রাখতে হবে বিশ্বায়ন এবং প্রযুক্তিগত উৎকর্ষের ফলে একদিকে মানুষের আচরণ এবং রুচিতে যেমন পরিবর্তন এসেছে, তেমনি মানুষের অর্থনৈতিক, সামাজিক, রাজনৈতিক চিন্তাভাবনাসহ সবকিছু বদলে গেছে। গভর্ন্যান্স ইনোভেশন ইউনিট এ পর্যন্ত ১৩১টি বিভিন্ন ধরনের উদ্ভাবন প্রস্তাব বাস্তবায়নের জন্য সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় এবং বিভাগে পাঠিয়েছে। এগুলোর মধ্যে ৬৮টি প্রস্তাব বাস্তবায়ন করা হয়েছে এবং ৬৩টি প্রস্তাব বাস্তবায়নাধীন আছে। এগুলো কিন্তু আপনাদেরই উদ্ভাবিত ধারণা। তিনি বলেন, ইউনিয়ন ডিজিটাল সেন্টার, কমিউনিটি ক্লিনিক, মোবাইল ব্যাংকিং ইত্যাদি সেবা চালু করা হয়েছে। সারাদেশে ৫ হাজার ২৭৫টি ডিজিটাল সেন্টার স্থাপন করা হয়েছে। এ সকল সেন্টারে ১১৬ ধরনের সরকারি-বেসরকারি সেবা প্রদান করা হয়ে থাকে। কৃষি কার্ড ও ফেয়ার প্রাইস কার্ডের মাধ্যমে কৃষিপণ্য এবং খাদ্যপণ্যের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা হয়েছে। মোবাইলের মাধ্যমে স্বাস্থ্যসেবা ও ডাক্তারি পরামর্শ প্রদান করা হচ্ছে। এসএমএসের মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি থেকে শুরু করে সকল পাবলিক পরীক্ষার ফল প্রকাশ, কৃষিতথ্য প্রেরণ, ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খোলা, বিদেশ থেকে প্রবাসীদের অর্থ প্রেরণসহ অসংখ্য সুযোগ-সুবিধা দ্রুততম সময়ে জনগণের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেয়ার কাজ শুরু হয়ে গেছে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, সকল মন্ত্রণালয়ে ডিজিটাল নথি নম্বর ও ই-ফাইলিং চালু করা হয়েছে। জনগণের অধিকার রক্ষার্থে সকল দপ্তরে দ্বিতীয় প্রজন্মের সিটিজেন চার্টার প্রবর্তন করা হয়েছে। এর আওতায় মাঠ পর্যায়ের অফিসসমূহে হেল্প ডেস্ক স্থাপন করা হয়েছে। প্রত্যেক মন্ত্রণালয় মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সঙ্গে বার্ষিক কর্মসম্পাদন চুক্তি স্বাক্ষর করছে। সে চুক্তিতে কোন কোন বিষয়ে আগামী বছর ওই মন্ত্রণালয় কাজ করবে তার বিবরণ থাকে এবং কার্যক্রমগুলো বছর শেষে মূল্যায়ন হবে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে ২৩ বছরের নিরন্তর আন্দোলন-সংগ্রাম আর ৯ মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মাধ্যমে আমরা স্বাধীনতা অর্জন করেছি। জাতির পিতা স্বাধীনতার ডাক না দিলে আজও হয়ত আমাদের পরাধীনতার গ্লানি বহন করতে হতো। স্বাধীনতার পর থেকেই বাংলাদেশকে নানামুখী সংকট মোকাবিলা করতে হয়েছে। দেশি-বিদেশি ষড়যন্ত্র, অপশাসন ও দুঃশাসন, দীর্ঘ সময় ধরে গণতন্ত্রহীনতা, দারিদ্র্য, নিরক্ষরতা, সন্ত্রাস, প্রাকৃতিক দুর্যোগ ইত্যাদি বাংলাদেশের অগ্রযাত্রাকে ব্যাহত করেছে। এ সকল প্রতিকূলতা মোকাবিলা করে বাংলাদেশ আজ নিম্ন-মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত হয়েছে। সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা দিকনির্দেশনা অনুযায়ী কাজ করলে অবশ্যই বাংলাদেশ ২০২১ সাল নাগাদ মধ্যম আয়ের দেশ এবং ২০৪১ সাল নাগাদ উন্নত দেশের কাতারে নিজেকে শামিল করবে।