প্রতিবেদন

জাতীয় মৎস্য সপ্তাহ-২০১৭ উদযাপন অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা : মৎস্য রপ্তানিতে অর্থনৈতিক সম্ভাবনার নতুন দুয়ার উন্মোচিত

নিজস্ব প্রতিবেদক : বরাবরের মতো এবারও নানা অনুষ্ঠান, সেমিনার, সিম্পোজিয়াম ও মৎস্য অবমুক্তকরণের মধ্য দিয়ে জাতীয় মৎস্য সপ্তাহ-২০১৭ উদযাপিত হয়েছে। ১৮ থেকে ২৪ জুলাই পর্যন্ত পালিত এবারের মৎস্য সপ্তাহের প্রতিপাদ্য ছিলÑ ‘মাছ চাষে গড়ব দেশ, বদলে দেব বাংলাদেশ।’
১৯ জুলাই রাজধানীর কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশন মিলনায়তনে জাতীয় মৎস্য সপ্তাহ-২০১৭ উপলক্ষে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয় কেন্দ্রীয় অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। এতে প্রধান অতিথি ছিলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রী ছায়েদুল হকের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে প্রতিমন্ত্রী নারায়ণ চন্দ্র চন্দ এবং মন্ত্রণালয়ের সচিব মাহমুদুল হাসান খান বক্তব্য রাখেন। প্রধানমন্ত্রী অনুষ্ঠানে ১৩ মৎস্যচাষি এবং প্রতিষ্ঠানকে মৎস্য খাতে বিশেষ অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ স্বর্ণ ও রৌপ্য পদক প্রদান করেন। এদের মধ্যে ৪ জন স্বর্ণ এবং ৯ জন রৌপ্য পদক লাভ করেন। পদক ও সনদপত্রসহ নগদ ৫০ হাজার এবং ৩০ হাজার টাকার চেকও বিজয়ীদের প্রদান করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের পর গণভবনের লেকে প্রধানমন্ত্রী মাছের পোনা অবমুক্ত করেন।
অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাঁর দেয়া ভাষণে বলেন, সরকার প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দ দিয়ে গবেষণা উৎসাহিত করায় দেশে বিভিন্ন জাতের মাছের চাষ ও উৎপাদন ক্রমেই বেড়ে চলেছে। ফলে দেশের চাহিদা মিটিয়ে বিদেশে মৎস্য রপ্তানির পরিমাণও দিন দিন বেড়েই চলছে। এতে করে মৎস্য রপ্তানিতে সম্ভাবনার নতুন দুয়ার উন্মোচিত হয়েছে বলেও মন্তব্য করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। বর্তমানে বছরে প্রায় ৪০ লাখ মেট্রিক টন মাছ দেশে উৎপাদিত হচ্ছে। ১ কোটি ৮২ লাখ মানুষের জীবন-জীবিকা এখন মৎস্য সম্পদের সঙ্গে সম্পর্কিত। জিডিপিতে মৎস্য সম্পদের অবদান প্রায় ৪ শতাংশ। আর আমাদের দেশে প্রাণিজ আমিষের ৬০ ভাগের জোগান আসে মৎস্য খাত থেকে। মিঠা পানির মৎস্য আহরণে বাংলাদেশের অবস্থান বিশ্বে চতুর্থ। সমুদ্র জয়ের ফলে গভীর সমুদ্র থেকে সামুদ্রিক মাছ আহরণের বিরাট সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। ইলিশের চেয়েও দামি ও স্বাদের মাছ হলো টুনা। বঙ্গোপসাগর এই টুনা মাছের বড় চারণক্ষেত্র। এই মাছটি গভীর পানির মাছ। আমাদের জেলেদের জাল অত গভীরে গিয়ে টুনা মাছ আহরণ করতে পারে না। তাই সরকার জেলেদের টুনা মাছ আহরণের প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ ও লজিস্টিক সাপোর্ট দিচ্ছে। মৎস্য বিজ্ঞান ইনস্টিটিউটের মাধ্যমে টুনা মাছ আহরণে ব্যাপক পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। আশা করা যায় সবার প্রচেষ্টায় আমরা আমাদের বঙ্গোপসাগর থেকে শিগগিরই বিপুল পরিমাণ টুনা মাছ আহরণ করতে পারবো।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, গলদা চিংড়ি বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান রপ্তানি খাত। ইউরোপের দেশে দেশে বাংলাদেশি গলদা চিংড়ির রয়েছে ব্যাপক চাহিদা। সরকার গলদা চিংড়ি রপ্তানিকারকদের সবসময়ই প্রয়োজনীয় সহযোগিতা দিয়ে যাচ্ছে। জাতীয় মাছ ইলিশ আহরণে সরকার পরিকল্পনামাফিক কাজ করায় বর্তমানে মৌসুমে আড়াইশ টাকা কেজিতেও মানুষ ইলিশ মাছ কিনতে পারছে। ইলিশের প্রজনন মৌসুমে নদীতে মাছ আহরণ নিষিদ্ধ করে এবং জেলেদের ভাতা ও খাদ্য সরবরাহ করে সরকার ইলিশের উৎপাদন বাড়িয়েছে। সরকারের নিরলস প্রচেষ্টায় ইলিশ ও গলদা চিংড়ি রপ্তানি বেড়েছে। টুনা মাছও একসময় রপ্তানি হবে।
দেশের মৎস্য সম্পদের বিপুল সম্ভাবনার কথা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমি সবাইকে অনুরোধ করবোÑ সামান্য মুনাফার লোভে নিজের ব্যবসাটা নষ্ট করবেন না, আর দেশের রপ্তানি বা দেশের পণ্যটাও নষ্ট করবেন না। রপ্তানির সময় ‘কোনোমতেই কোনোরকম’ অভিযোগ যেন না আসে সে বিষয়ে সবাইকে সতর্ক থাকতে হবে। সেই সঙ্গে দেশের অভ্যন্তরীণ বাজার ক্রমশ বড় হওয়ায় সেই চাহিদা মেটাতেও ভেজালের বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে। সামান্য মুনাফার লোভে মাছে ভেজাল মিশ্রণের অতীত অভিজ্ঞতার কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে শেখ হাসিনা বলেন, আমাদের বিচিত্র একটা অভিজ্ঞতা আছে। ১৯৯৬ সালে যখন ক্ষমতায় আসি, তখন দেখলাম চিংড়ি রপ্তানি বন্ধ হয়ে গেছে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন বাংলাদেশ থেকে চিংড়ি নেবে না। কারণ জানতে গিয়ে শুনলাম চিংড়ি মাছের ভেতর লোহা ঢুকিয়ে দিয়ে ওজন বৃদ্ধি করে সেটা রপ্তানি করতে গেছে এবং এটা তখনই ধরা পড়েছে। সঙ্গে সঙ্গে কিন্তু রপ্তানি বন্ধ। এ পর্যায়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সবে সরকারে এলেও দ্রুত ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে কথা বলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিয়ে ফের রপ্তানি শুরুর ব্যবস্থা করি। আমরা ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে কথা বলে মৎস্য খাতের উন্নয়নের জন্য সেই সময় ৪০ কোটি টাকা সহায়তা প্রদান করাসহ একটি কমিটি করে দিই। সেই টাকা দিয়ে প্রত্যেকটি হ্যাচারি উন্নত করা হয়। ধীরে ধীরে মানসম্পন্ন রপ্তানির মধ্য দিয়ে আবার মৎস্য রপ্তানি সচল হয়।
মাছে ফরমালিন ব্যবহারের বিরুদ্ধে তার সরকারের কঠোর অবস্থানের কথা তুলে ধরে শেখ হাসিনা বলেন, একসময় ফরমালিন সম্পর্কে সবাই খুব উদ্বিগ্ন ছিলেন। আমরা কিন্তু ইতোমধ্যে ফরমালিনের অপব্যবহার নিয়ন্ত্রণ করেছি। ফরমালিন যাতে ব্যবহার না হয়, তার ব্যবস্থা নিচ্ছি।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এলে আন্তর্জাতিকভাবে পুরস্কৃত হয়। বিএনপি যখন ক্ষমতায় ছিল ৫ বছরই বাংলাদেশ দুর্নীতিতে চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল। আন্তর্জাতিকভাবে তারা বাংলাদেশের জন্য তিরস্কার আনে। আর আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকলে পুরস্কৃত হয়। মৎস্য উৎপাদন ও মৎস্য সম্প্রসারণ কার্যক্রম বাস্তবায়নে কৃতিত্বপূর্ণ অবদানের জন্য ১৯৯৭ সালে জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা মৎস্য অধিদপ্তরকে অ্যাডওয়ার্ড ট্রমা পুরস্কারে ভূষিত করে।
বৈশাখে ইলিশ খাওয়া প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বৈশাখ মাসে ইলিশ খাওয়ার ধুম পড়েছিল। কোনো যুক্তি নেই। আমি আহ্বান করেছি, পহেলা বৈশাখে ইলিশ মাছ খেতে হবে এরকম কোনো কথা নেই। এ সকল পদক্ষেপের সুফল আমরা পাচ্ছি। আমি বৈশাখে ইলিশ মাছ খাই না, খাবো না। বর্তমানে দেশে মাছের চাহিদা বৃদ্ধি পাচ্ছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বাড়ছে। আগে একজন রিকশাওয়ালা যেখানে শুধু চাল কিনতে সক্ষম ছিল, সে এখন একটু মাছও সঙ্গে কিনতে পারেন। একজন দিনমজুরের সক্ষমতাও বৃদ্ধি পেয়েছে। এ জন্য চাহিদাও বাড়বে। মানুষের ক্রয় ক্ষমতা যত বাড়বে, আমাদের বাজারও ততটা বৃদ্ধি পেতে থাকবে।
শেখ হাসিনা বলেন, আমি প্রথমবার ক্ষমতায় এসেই বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে অনুরোধ করেছিলাম যেন আমাদের কৈ মাছ, মাগুর মাছসহ দেশি মাছের ওপর গবেষণা করে। আগে দেখতাম তেলাপিয়া ও কার্প জাতীয় মাছ নিয়েই কেবল গবেষণা চলত। কোন মাছটার বাজারে চাহিদা বেশি সেটা নিয়েই আমাদের গবেষণা করা, উৎপাদন বৃদ্ধি করা এবং প্রক্রিয়াজাত করে সেটা বিদেশে রপ্তানি করা প্রয়োজন।
হাওরাঞ্চলে মাছ চাষ বাড়ানোর ওপর গুরুত্বারোপ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বন্যার কারণে সেখানে প্রায়ই ফসল নষ্ট হয়। এ কারণে সেখানে মাছ চাষে বেশি জোর দিতে হবে। হাওরের ভেতরে খালগুলো ড্রেজিং করতে হবে। কিশোরগঞ্জ, নেত্রকোনা ও সিলেট বিভাগের হাওরগুলোর পাশাপাশি উত্তরবঙ্গের বিল ও জলাশয়গুলোতে মাছ উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি প্রক্রিয়াজাতকরণের মাধ্যমে রপ্তানি বাড়াতে হবে। এ জন্য সাভার, চট্টগ্রাম ও খুলনায় ৩টি আধুনিক মাননিয়ন্ত্রণ ল্যাব স্থাপন করার কথা জানিয়ে তিনি সিলেট ও উত্তরবঙ্গে আরও দুটি ল্যাব স্থাপনের প্রয়োজনীয়তার কথাও উল্লেখ করেন।
প্রতিবেশী দেশ ভারত ও মিয়ানমারের সঙ্গে সমুদ্রসীমা বিরোধ নিষ্পত্তির ফলে বিশাল সমুদ্র এলাকা থেকে সম্পদ আহরণের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে উল্লেখ করে শেখ হাসিনা বলেন, ইতোমধ্যে তার সরকার একটি জাহাজ কিনেছে; আরও একটি জাহাজ কেনা হচ্ছে। এ পর্যায়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আসলে বাংলাদেশের মাটি সোনার মাটি। যা কিছু আমরা চেষ্টা করলেই কিন্তু উৎপাদন করতে পারি। তাই কোনটার বাজার চাহিদা বেশি, সেটার ওপর নির্ভর করে গবেষণা করা, উৎপাদন বৃদ্ধি করা এবং প্রক্রিয়াজাত করে রপ্তানি করার দিকেই বেশি নজর দিতে হবে।
শেখ হাসিনা বলেন, তার সরকার মুক্ত জলাশয়ে পোনা অবমুক্ত করা, জলমহালে সমাজভিত্তিক মাছ চাষ ব্যবস্থাপনা, মৎস্য আবাসস্থল উন্নয়ন, প্লাবনভূমিতে মৎস্য চাষ ও অভয়াশ্রম স্থাপনসহ বিভিন্ন অবকাঠামো নির্মাণের ব্যবস্থা, জলমহালগুলোতে প্রকৃত জেলেদের অধিকার নিশ্চিত করার জন্য নতুন জলমহাল নীতিমালা করায় দেশে মাছ উৎপাদন বেড়েছে। সেই সঙ্গে মানসম্পন্ন চিংড়ি সরবরাহ নিশ্চিতের লক্ষ্যে জাতীয় চিংড়ি নীতিমালা উন্নয়ন, মা ইলিশ রক্ষা ও জাটকা নিধন রোধে কার্যকর কর্মসূচি বাস্তবায়নের কথাও বলেন প্রধানমন্ত্রী।
দেশের মৎস্যসম্পদ রক্ষা ও উৎপাদন বৃদ্ধির লক্ষ্যে সরকারের গৃহীত নানা পদক্ষেপের কথা তুলে ধরে শেখ হাসিনা বলেন, জলমহালে সমাজভিত্তিক মাছ চাষ ব্যবস্থাপনা, মৎস্য আবাসস্থল উন্নয়ন, প্লাবনভূমিতে মৎস্য চাষ ও অভয়াশ্রম স্থাপনসহ বিভিন্ন অবকাঠামো নির্মাণ এবং অভ্যন্তরীণ বদ্ধ জলাশয়ে মাছের উৎপাদন বৃদ্ধির উদ্দেশে জনসচেতনতা বৃদ্ধি, গুণগত মানসম্পন্ন মাছের পোনা উৎপাদনের জন্যও যুগোপযোগী কার্যক্রম গ্রহণ করা হয়েছে। সেইসঙ্গে দেশি-বিদেশি ভোক্তাদের মানসম্পন্ন চিংড়ি সরবরাহ নিশ্চিতের লক্ষ্যে জাতীয় চিংড়ি নীতিমালা প্রণয়ন করা হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ২০০৯ সাল থেকে এ পর্যন্ত জেলেদের সহায়তা কর্মসূচিতে খাদ্যশস্য বরাদ্দ দেয়া হয়েছে ১ লাখ ৯৬ হাজার ৫৬৯ মেট্রিক টন, যা ২০০১ থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত ছিল মাত্র ৬ হাজার ৯০৬ মেট্রিক টন। এর ফলে ইলিশ উৎপাদন প্রায় ১ লাখ মেট্রিক টন বৃদ্ধি পেয়ে ৩ লাখ ৮৭ হাজার মেট্রিক টনে দাঁড়িয়েছে। এ ধরনের বহুমুখী পদক্ষেপ গ্রহণ ও কার্যক্রম বাস্তবায়নের মাধ্যমে আমরা মাছের উৎপাদন ও আহরণ বৃদ্ধি করতে সক্ষম হয়েছি। ২০১৫-১৬ অর্থবছরে ৩৮ লাখ ৭৮ হাজার মেট্রিক টন মাছ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হয়েছে। ফলে অভ্যন্তরীণ জলাশয়ে মৎস্য আহরণে বাংলাদেশ বিশ্বে চতুর্থ স্থান অধিকার করার গৌরব অর্জন করতে সক্ষম হয়েছে। সবশেষে প্রধানমন্ত্রী বিপন্নপ্রায় মৎস্য প্রজাতির সংরক্ষণ, প্রজনন ও বংশ বিস্তারের জন্য মুক্ত জলাশয়ে অভয়াশ্রম স্থাপন ও এর সংরক্ষণে দেশের মৎস্য খাতের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সকলকে আরও তৎপর হওয়ার আহ্বান জানিয়ে তাঁর ভাষণ শেষ করেন।