প্রচ্ছদ প্রতিবেদন

ডিসি সম্মেলন-২০১৭ উদ্বোধনকালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা : জনকল্যাণে মাঠ পর্যায়ে সরকারি সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে জেলা প্রশাসকদের অধিকতর দায়িত্বশীল হওয়ার আহ্বান


নিজস্ব প্রতিবেদক : সরকারের নীতিনির্ধারক ও জেলা প্রশাসকদের মধ্যে সামনা-সামনি মতবিনিময় এবং প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা দেয়ার জন্য প্রতি বছর যে ডিসি সম্মেলনের আয়োজন করা হয় তারই ধারাবাহিকতায় এবারের ৩ দিনব্যাপী জেলা প্রশাসক সম্মেলন শুরু হয় ২৫ জুলাই। সম্মেলন শেষ হয় ২৭ জুলাই। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সম্মেলনের উদ্বোধন করে জনকল্যাণে মাঠ পর্যায়ে সরকারি সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে জেলা প্রশাসকদের অধিকতর দায়িত্বশীল হওয়ার আহ্বান জানান। এবারের সম্মেলনে বিভাগীয় কমিশনার ও জেলা প্রশাসকদের সঙ্গে সরকারের নীতি, দর্শন, প্রাধিকার বিষয়ক প্রস্তাব ছিল ৩৪৯টি। এগুলো ৫২টি মন্ত্রণালয় ও বিভাগ সম্পর্কিত। বিভাগীয় কমিশনার ও ৬৪ জেলা প্রশাসকের কাছ থেকে প্রস্তাবগুলো এসেছে বলে জানা যায়।
সম্মেলনের প্রথম দিন ২৫ জুলাই প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে বিভাগীয় কমিশনার ও জেলা প্রশাসকদের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর মুক্ত আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। মুক্ত আলোচনায় প্রধানমন্ত্রী মাঠ প্রশাসন সংক্রান্ত জনস্বার্থ সংশ্লিষ্ট গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন বিষয়ে শোনেন ও দিকনির্দেশনা দেন। ২৬ জুলাই বঙ্গভবনের দরবার হলে প্রেসিডেন্টের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ ও দিকনির্দেশনা নেন বিভাগীয় কমিশনার ও ডিসিরা। ২৭ জুলাই ডিসিদের উদ্দেশে সমাপনী ভাষণ এবং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সৌজন্যে নৈশভোজে অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে ঢাকায় অনুষ্ঠিত ৩ দিনের ডিসি সম্মেলন শেষ হয়েছে।
৩ দিনে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগের শীর্ষ কর্মকর্তারা ১৮টি অধিবেশনে জেলা প্রশাসকদের সঙ্গে মতবিনিময় করে প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা দেন। সবগুলো অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন মন্ত্রিপরিষদ সচিব শফিউল আলম। তিনি জানান, ডিসি সম্মেলনে মোট ২২টি অধিবেশন ছিল। এর মধ্যে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়সহ অংশগ্রহণকারী ৫২টি মন্ত্রণালয়ের ১৮টি কার্য অধিবেশন ছিল। এতে মন্ত্রী, উপদেষ্টা, প্রতিমন্ত্রী, উপমন্ত্রী, সিনিয়র সচিব ও সচিবরা অংশ নেন। ২৭ জুলাই সচিবালয়ে মন্ত্রিপরিষদ কক্ষে অনুষ্ঠিত হয় সমাপনী অধিবেশন। সমাপনী অধিবেশনে গত বছরের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের হার ৯৩ দশমিক ৩২ শতাংশ বলে জানানো হয়। এ বছর সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের হার শতভাগ অর্জনের আশা প্রকাশ করা হয়।
জেলা প্রশাসকদের উদ্দেশে
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার
২৩ দফা নির্দেশনা
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ডিসি সম্মেলনের প্রথম দিনে জেলা প্রশাসকদের করণীয় হিসেবে ২৩ দফা নির্দেশনা প্রদান করেন। নির্দেশনাগুলো হলো : ১. সরকারি সেবা গ্রহণে সাধারণ মানুষ যাতে কোনোভাবেই হয়রানি বা বঞ্চনার শিকার না হন, সেদিকে লক্ষ্য রাখতে হবে। ২. তৃণমূল পর্যায়ে সুশাসন প্রতিষ্ঠায় জনপ্রতিনিধিদের সঙ্গে একাত্ম হয়ে কাজ করতে হবে।
৩. গ্রামীণ অর্থনীতিকে আরও শক্তিশালী করে নতুন নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে হবে। মানুষ যেন শহরমুখী না হয়। শহরের ওপর জনসংখ্যার চাপ যাতে না বাড়ে সে ব্যবস্থা করতে হবে। ৪. গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়ন, সম্ভাবনাময় স্থানীয় ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের বিকাশ এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির মাধ্যমে দারিদ্র্য বিমোচনে ব্রতী হতে হবে। ৫. ধনী-দরিদ্রের বৈষম্য কমাতে উন্নয়ন কর্মসূচি এমনভাবে গ্রহণ করতে হবে যাতে সর্বোচ্চসংখ্যক মানুষ উপকৃত হয়। বৈষম্যহীন সমাজ বিনির্মাণে সম্পদের সুষম বণ্টন নিশ্চিত করতে হবে। ৬. জঙ্গিবাদ, সন্ত্রাস ও সাম্প্রদায়িকতা দূর করে সমাজজীবনের সর্বক্ষেত্রে শান্তিশৃঙ্খলা ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখার ক্ষেত্রে আরও সতর্কতার সঙ্গে এবং কঠোরভাবে দায়িত্ব পালন করতে হবে। ৭. জঙ্গিবাদ ও সন্ত্রাস নির্মূলে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, স্কুল-কলেজ-মাদ্রাসার শিক্ষক, মসজিদের ইমাম, গ্রামের মুরুব্বি, নেতৃস্থানীয় ব্যবসায়ী, নারী সংগঠক, আনসার-ভিডিপি, গ্রাম পুলিশ, এনজিওকর্মীসহ সমাজের সবাইকে সম্পৃক্ত করতে হবে। ৮. প্রতিবন্ধী, অটিস্টিক ও পিছিয়ে থাকা জনগোষ্ঠীর কল্যাণে বিশেষ পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। ৯. সাধারণ মানুষকে সহজে সুবিচার প্রদান ও আদালতে মামলার জট কমাতে গ্রাম আদালতগুলোকে কার্যকর করতে হবে। ১০. জনগণের দোরগোড়ায় সেবা পৌঁছাতে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির উন্নয়ন ও বিকাশে নেতৃত্ব প্রদান করতে হবে। ১১. শিক্ষার সর্বস্তরে নারী শিক্ষার হার বৃদ্ধি এবং ঝরেপড়া শিক্ষার্থীদের মূলধারায় ফিরিয়ে আনার লক্ষ্যে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। ১২. ভূমি প্রশাসন ও ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা ও দক্ষতা বৃদ্ধি এবং সরকারি ভূমি রক্ষায় আরও সচেষ্ট হতে হবে। ১৩. কৃষি-উৎপাদন বৃদ্ধিতে সার, বীজ, বিদ্যুৎ, জ্বালানি ইত্যাদির সরবরাহ নির্বিঘœ করতে প্রয়োজনীয় সকল ব্যবস্থা নিতে হবে। পরিবেশবান্ধব কৃষি ব্যবস্থাপনাকে জনপ্রিয় করতে উদ্যোগী হতে হবে। ভেজাল খাদ্যদ্রব্য বাজারজাতকরণ প্রতিরোধে ব্যাপক গণসচেতনতা সৃষ্টি করে এসব অনৈতিক কর্মকা- কঠোর হস্তে দমন করতে হবে। ১৪. সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা ও এসডিজির সফল বাস্তবায়নে মেধা, দক্ষতা ও অভিজ্ঞতার যথাযথ প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। ১৫. প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও বিপর্যয় প্রশমনে সঠিক সময়ে সঠিক পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। পরিবেশ রক্ষার জন্য জনসচেতনতা বৃদ্ধি এবং এই সংক্রান্ত আইন ও বিধি-বিধানের যথাযথ প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। ১৬. শিল্পাঞ্চলে শান্তি রক্ষা, পণ্য পরিবহন ও আমদানি-রপ্তানি নির্বিঘœ করা এবং পেশিশক্তি, চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি ও সন্ত্রাস নির্মূল করতে ব্যবস্থা নিতে হবে। ১৭. ভোক্তা অধিকারকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে হবে এবং বাজারে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টির যেকোনো অপচেষ্টা কঠোর হস্তে দমন করতে হবে। ১৮. নারী উন্নয়ন নীতি সুষ্ঠু বাস্তবায়ন করতে হবে। নারীর প্রতি সহিংসতা, নিপীড়ন ও বৈষম্যমূলক আচরণ বন্ধ এবং নারী ও শিশু পাচার রোধে যথাযথ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে। ১৯. শিশু-কিশোরদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশের লক্ষ্যে শিক্ষা, ক্রীড়া, বিনোদন ও সৃজনশীল সাংস্কৃতিক কর্মকা-ের সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে। শিশু-কিশোরদের মধ্যে ইতিহাস চেতনা, জ্ঞানস্পৃহা ও বিজ্ঞানমনস্কতা জাগিয়ে তুলতে হবে। ২০. কঠোরভাবে মাদক ব্যবসা, মাদক চোরাচালান এবং এর অপব্যবহার বন্ধ করতে হবে। ২১. ভূমি প্রশাসন ও ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা ও দক্ষতা বৃদ্ধি করে সরকারি ভূমি রক্ষায় সজাগ থাকতে হবে। ২২. পার্বত্য জেলাসমূহের উন্নয়ন ত্বরান্বিতকরণের পাশাপাশি এ অঞ্চলের ভূ-প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ করতে হবে। এবং ২৩. পর্যটন শিল্প, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প এবং ঐতিহ্যবাহী কুটিরশিল্পের বিকাশে সর্বাত্মক সহযোগিতা করতে হবে।
এসবের বাইরে নিজস্ব জেলাভিত্তিক সমস্যা চিহ্নিত করে এগুলো সমাধানের উদ্যোগ এবং নদী ভাঙনের শিকার ও গৃহহীনদের ঘর-বাড়ি তৈরি করে দিয়ে পুনর্বাসনের ব্যবস্থা গ্রহণেও প্রধানমন্ত্রী ডিসিদের নির্দেশনা প্রদান করেন।
জনপ্রতিনিধিদের সাথে সমন্বয় করে
ডিসিদের উন্নয়ন কর্মকা- এগিয়ে
নেয়ার আহ্বান শেখ হাসিনার
ডিসি সম্মেলনের প্রথম দিনে জনপ্রতিনিধিদের সাথে সমন্বয় করে সরকারের উন্নয়ন কর্মকা- এগিয়ে নেয়ার আহ্বান জানিয়ে সারাদেশ থেকে আগত জেলা প্রশাসকদের উদ্দেশে প্রধানমন্ত্রী বলেন, করাপশন দূর করতে হবে আমাদের। কারণ কোনো কাজ করতে গেলে সেখানে যদি দুর্নীতি হয়, আর সেটুকুই যদি খেয়ে ফেলে তাহলে আমার উন্নয়নের ছোঁয়াটা গ্রাম-বাংলায় বা কোথাও লাগবে না। কাজেই এ ব্যাপারে আপনাদের জনসচেতনতাও সৃষ্টি করতে হবে এবং নিজেদের কঠোর অবস্থানে থাকতে হবে। দুর্নীতির বিরুদ্ধে বঙ্গবন্ধুর বক্তব্য উদ্ধৃত করে শেখ হাসিনা বলেন, ‘এই বাংলার মাটি থেকে করাপশন উৎখাত করতে হবে। করাপশন আমার বাংলার কৃষক করে না। করাপশন আমার বাংলার মজদুর করে না। করাপশন করি আমরা শিক্ষিত সমাজ; যারা তাদের টাকা দিয়ে লেখাপড়া করেছি।’
প্রধানমন্ত্রী জানান, দেশকে ডিজিটালাইজড করতে তাঁর সরকার যেসব পদক্ষেপ নিয়েছে তার ফলে দুর্নীতিও নিয়ন্ত্রণ হচ্ছে। এখন আর ওই টেন্ডারের বাক্স ছিনতাইয়ের ঘটনা খুব বেশি শোনা যাচ্ছে না। এ প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘ডিজিটালাইজড করার ক্ষেত্রে কয়েকটা মন্ত্রণালয় এখনো একটু পিছিয়ে আছে। কিন্তু প্রতিটি ক্ষেত্রে আমরা ডিজিটালাইজড করে দেয়ার ফলে এখন অনেকটা স্বচ্ছতা চলে এসেছে। কাজেই এটা আমাদের অব্যাহত রাখতে হবে।’
সরকারি কাজের জবাবদিহি ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা এবং নতুন নতুন উপায় উদ্ভাবন করে সরকারি সেবা প্রদান সহজ করতে তাঁর দপ্তরের অধীনে ‘গভর্ন্যান্স ইনোভেশন ইউনিট’ চালু করা হয়েছে জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, তাঁর সরকারের মূল লক্ষ্য তৃণমূল পর্যায় থেকে উন্নয়ন করা। দেশের একটা মানুষও গৃহহীন থাকবে না। দেশের মানুষের মৌলিক অধিকার পূরণে সরকার কাজ করে যাচ্ছে। জেলা প্রশাসকদের উদ্দেশে শেখ হাসিনা বলেন, দেশের মানুষের কল্যাণের জন্য, মানুষের ভাগ্য গড়ার জন্য কাজ করবেনÑ এটাই যেন সবার লক্ষ্য হয়। আমরা যে সিদ্ধান্তই নিই, সেটা মাঠ পর্যায়ে বাস্তবায়নের দায়িত্ব আপনাদের ওপরই বর্তায়। আপনাদের যোগ্যতা, আন্তরিকতা ও কর্মদক্ষতাই পারে এ দেশের মানুষের জীবনযাত্রার মান পাল্টে দিতে। কাজেই আপনারা সেভাবেই কাজ করবেন। প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা চাই দেশকে এগিয়ে নিতে এবং আমরা বিশ্বাস করি গণতন্ত্রের ধারাবাহিকতাই একটি দেশকে উন্নত করতে পারে, সেই অভিজ্ঞা আমরা ইতোমধ্যেই অর্জন করেছি।’
চাপমুক্ত থাকতে চান
জেলা প্রশাসকরা
মাঠ পর্যায়ে চাপমুক্ত থেকে কাজ করার বিষয়ে সরকারের সহায়তা চেয়েছেন জেলা প্রশাসকরা। তারা বলেছেন, জেলা-উপজেলা পর্যায়ে সরকারের উন্নয়নমূলক কর্মসূচি বাস্তবায়নে প্রায়ই স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালীদের চাপে পড়তে হয়। চাপের কারণে সরকারের বরাদ্দের সঠিক ব্যবহার করা সম্ভব হয় না। এতে সরকার জেলা-উপজেলা পর্যায়ে যেসব উন্নয়ন কর্মকা- হাতে নিচ্ছে তা সময়মতো ও মানসম্পন্নভাবে বাস্তবায়ন করা সম্ভব হচ্ছে না। ফলে সরকারি অর্থের অপচয়ের পাশাপাশি উন্নয়নমূলক কর্মকা-ও ব্যাহত হচ্ছে। তাই মাঠ প্রশাসনে রাজনৈতিক চাপমুক্ত হয়ে কাজ করতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সহায়তা চেয়েছেন ডিসিরা। ৩ দিনের জেলা প্রশাসক সম্মেলনের প্রথম দিন ২৫ জুলাই প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে মুক্ত আলোচনায় ডিসিরা এ সহায়তা চান।
প্রধানমন্ত্রী এ সময় জনপ্রতিনিধিদের সঙ্গে সমন্বয় করে উন্নয়ন কার্যক্রম পরিচালনা করার পরামর্শ দেন ডিসিদের। প্রধানমন্ত্রী বলেন, সরকার ২০২১ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত করার পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করছে। এ ক্ষেত্রে সফল হতে হলে মাঠ প্রশাসনকে নির্ভয়ে কাজ করতে হবে।
এছাড়া অপরাধ দমনে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটদের দিয়ে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনার এখতিয়ার নিশ্চিত করার প্রস্তাব করেছেন কয়েকজন জেলা প্রশাসক। এ জন্য মোবাইল কোর্ট আইন সংশোধন করে ভ্রাম্যমাণ আদালতের ক্ষমতা বাড়ানোর পক্ষে জোর দিয়েছেন তারা। না হলে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখাসহ প্রশাসনিক কার্যক্রম পরিচালনা করা কঠিন হয়ে পড়ছে বলে উল্লেখ করেন তারা। ফৌজদারি কার্যবিধির (সিআরপিসি) অন্তত ৮টি ধারা সংশোধনেরও প্রস্তাব করেছেন ডিসিরা।
বেশ কয়েকজন ডিসি নিজ জেলার সমস্যা সমাধানের পাশাপাশি প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তাদের সুযোগ-সুবিধা বাড়ানোরও সুপারিশ করেছেন। নারায়ণগঞ্জের ডিসি প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তাদেরও বিদেশে শান্তি রক্ষা মিশনে পাঠানোর প্রস্তাব করেছেন। কিশোরগঞ্জের ডিসি বলেছেন, হাওরাঞ্চলে কর্মরত সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য ‘হাওর ভাতা’ নামে বিশেষ ভাতা চালু করার কথা।
মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীদের সঙ্গে হওয়া অধিবেশনগুলোতে ডিসিরা বলেন, অনেক রাজনৈতিক নেতা এমন সব প্রকল্প মন্ত্রণালয়ে পাঠানোর জন্য চাপ দেন, যেটা গুরুত্বহীন হলেও না পাঠিয়ে কোনো উপায় থাকে না। এ অবস্থায় টিআর, কাবিখা বা জিআর বরাদ্দের যেসব প্রস্তাব পাঠানো হয় তা ভুয়া বা অস্তিত্বহীন প্রকল্প কি না তা যাচাই-বাছাইয়ের জন্য ডিসিদের নির্দেশ দেন দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণমন্ত্রী মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া। তিনি বলেন, দেখেশুনে যেন প্রকল্প মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়। প্রকল্পগুলো সঠিকভাবে বাস্তবায়িত হচ্ছে কি না তাও যাচাই-বাছাই করার নির্দেশ দিয়ে ডিসিদের ত্রাণমন্ত্রী বলেন, বন্যাকবলিত এলাকায় নতুন আশ্রয়কেন্দ্র খোলা হবে। এ ক্ষেত্রে কোথায় আশ্রয়কেন্দ্র করা যায় সে বিষয়ে পূর্ব-অভিজ্ঞতা কাজে লাগাতে হবে।
ঝালকাঠির ডিসি হামিদুল হক বলেন, অর্থবছরের শেষ মাসে টিআর, কাবিখা ও জিআর-এর অর্থ ছাড় করায় সময় স্বল্পতার কারণে তা বরাদ্দের ক্ষেত্রে প্রকল্প যাচাই-বাছাই করা সম্ভব হয় না। এই সুযোগে ভুয়া প্রকল্প দেখিয়ে অনেকে বরাদ্দ তুলে নিয়ে আত্মসাৎ করেন। সরকারি বরাদ্দের এই অপচয় ও আত্মসাৎ বন্ধে অন্তত ৩০ মার্চের মধ্যে বরাদ্দ ছাড়করণের প্রস্তাব করেন তিনি। তার এই প্রস্তাবে দুর্যোগ সচিব শাহ কামাল বলেন, আপনারা প্রথম ও দ্বিতীয় পর্যায়ের প্রকল্প তালিকা নির্ধারিত সময়ে দেন না। এ কারণে প্রকল্প বাস্তবায়নে সমস্যা হয়। তিনি নির্ধারিত সময়ে প্রকল্পের তালিকা দেয়ার আহ্বান জানান।
সুরক্ষা চান জেলা প্রশাসকরা
রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত প্রশাসন গড়তে সরকারের সহযোগিতা চেয়েছেন জেলা প্রশাসকরা। পাশাপাশি মোবাইল কোর্টের বিষয়েও নির্দেশনা জানতে চেয়েছেন তারা। অ্যাটর্নি সার্ভিস এবং মাঠ পর্যায়ে উন্নয়ন কাজের জন্য প্রত্যেক ডিসি জেলা পর্যায়ে ১ কোটি টাকা করে বরাদ্দ চেয়েছেন। একই সঙ্গে সরকারের বিভিন্ন উন্নয়ন কর্মসূচি বাস্তবায়নে ডিসি, এডিসি, ইউএনও, সহকারী কমিশনার (ভূমি), উপজেলা প্রকল্প কর্মকর্তা এবং উপজেলা প্রকৌশলীরা প্রায়ই মামলা ও হয়রানির শিকার হচ্ছেন। এসব কর্মকর্তার বিরুদ্ধে মামলার ক্ষেত্রে আইনি সুরক্ষা দেয়ার দাবি করেছেন জেলা প্রশাসকরা। পাশাপাশি সরকারের বিভিন্ন উন্নয়ন কর্মসূচি বাস্তবায়নে সরকারি দলের রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ বন্ধের দাবি জানান জেলা প্রশাসকরা। স্থানীয় পত্রিকার ডিক্লারেশন প্রদানের ক্ষেত্রে দৈনিক, পাক্ষিক, মাসিক পত্রিকার সম্পাদক ও প্রকাশকের শিক্ষাগত যোগ্যতা সম্পর্কে সুস্পষ্ট বিধান রাখার দাবি জানান অনেক ডিসি।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে মুক্ত আলোচনায় বিভাগীয় কমিশনার ও জেলা প্রশাসকরা মাঠ পর্যায়ে কাজ করতে গিয়ে যে ধরনের সমস্যার সম্মুখীন হন সেসব বিষয়ে তাদের বক্তব্য তুলে ধরেন। এ সময় বরগুনা সদরের ইউএনও তারিক সালমানের পক্ষে প্রধানমন্ত্রী অবস্থান নেয়ায় তাকে কৃতজ্ঞতা ও ধন্যবাদ জানান প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব ড. কামাল আবদুল নাসের চৌধুরী। ইউএনও হেনস্তার ঘটনায় ২৪ জুলাই বরিশাল ও বরগুনার প্রত্যাহার হওয়া ডিসি সম্মেলনে যোগ দেননি। তাদের পরিবর্তে নতুন নিয়োগ পাওয়া দুই ডিসি অংশ নেন। সবমিলিয়ে ৬৪ জেলা প্রশাসক এবং সব বিভাগীয় কমিশনার ৩ দিনব্যাপী ডিসি সম্মেলনে অংশ নেন।
মুক্ত আলোচনায় জেলা প্রশাসকদের বিভিন্ন বক্তব্যের জবাবে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, মাঠ পর্যায়ে জনপ্রতিনিধিদের সঙ্গে মিলেমিশেই কাজ করতে হবে। এগিয়ে নিতে হবে উন্নয়ন কাজ। কাজ করলে ঝামেলা আসবে। এই ঝামেলাও মেটাতে হবে। দুর্নীতি দূর করতে হবে। না হলে উন্নয়নের ছোঁয়া গ্রাম বাংলার কোথাও লাগবে না। আপনাদেরই জনসচেতনতা তৈরি করতে হবে। নিজেদেরও সচেতন থাকতে হবে। আপনারা জেলা প্রশাসকরা মাঠ পর্যায়ে কাজ করেন। আমরা প্রতি বছর জেলা প্রশাসকদের একটা সম্মেলন করি। এই একটা সুযোগ হয় মাঠ পর্যায়ের বিষয়ে আলোচনা করার, সমস্যা জানার।
সংশ্লিষ্টরা বলেছেন, জাতীয় নির্বাচন সামনে রেখে এবারের ডিসি সম্মেলনকে সরকার আলাদা গুরুত্ব দিচ্ছে। সরকারের ৪ বছরের উন্নয়ন কর্মকা- তুলে ধরার পাশাপাশি ২৩ দফা দিকনির্দেশনা দেয়া হয়েছে জেলা প্রশাসকদের জন্য। কারণ নির্বাচনের আগের বছরে দেশের সব জেলা প্রশাসকের এটিই সবচেয়ে বড় মিলনমেলা। সম্মেলনে অংশ নিয়ে বিভিন্ন দাবি এবং সমস্যার কথা তুলে ধরেন ডিসিরা।
জেলা প্রশাসকরা প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে মুক্ত আলোচনায় বলেছেন, বিচার বিভাগ পৃথকীকরণের পর মাঠ প্রশাসনের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখাসহ বিভিন্ন প্রশাসনিক কার্যক্রম সুষ্ঠু ও সুচারুরূপে সম্পন্ন করার ক্ষেত্রে বাধা ঘটছে। এ জন্য তারা জেলা ম্যাজিস্ট্রেসিতে কর্মরত নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটদের ক্ষমতা বাড়াতে ফৌজদারি কার্যবিধির ধারায় পরিবর্তন এনে প্রয়োজনীয় ক্ষমতা প্রয়োগের এখতিয়ার চেয়েছেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, নির্বাচনের সময় দেশের জনগণের সামনে আমরা একটা ইশতেহার ঘোষণা করি। এছাড়া আওয়ামী লীগের একটা ঘোষণাপত্র আছে। সেখানে লেখা আছে আমরা কিভাবে দেশটাকে গড়ে তুলব, জনগণের কল্যাণ করবো। তাই জনকল্যাণে মাঠ পর্যায়ে সরকারি সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে জেলা প্রশাসকদের আরো আন্তরিক ও দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করার আহ্বান জানান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

ডিসি পদকে যুগ্ম সচিব এবং বিভাগীয়কমিশনার পদকে সচিব পদে উন্নীত করার দাবি

স্বদেশ খবর ডেস্ক
ডিসি সম্মেলনে ডিসি পদকে যুগ্ম সচিব এবং বিভাগীয় কমিশনারের পদকে সচিব পদে উন্নীত করার দাবি উঠেছে। নিজেদের দাবির পক্ষে মাঠ প্রশাসনের সর্বোচ্চ কর্মকর্তাদের যুক্তি হলো প্রায় সব জেলায় ডিসি উপসচিব পর্যায়ের হলেও বর্তমানে অনেক জেলায় এডিসি ও স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের অধীনে জেলা পর্যায়ে থাকা উপ-পরিচালকরা উপসচিব পর্যায়ের কর্মকর্তা। এছাড়া জেলা পরিষদের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তারাও উপসচিব পদমর্যাদার।
সংশ্লিষ্টরা বলেছেন, জেলা পর্যায়ে সর্বোচ্চ কর্মকর্তা ডিসি। তিনি উপসচিব পদের। কিন্তু এখানে উপসচিব পদের কর্মকর্তা বেশি হওয়ায় অনেকেই ডিসি’র কথা শুনতে চান না। এতে মাঝে মাঝে বিশৃঙ্খলা দেখা দেয়। একই পদের একাধিক কর্মকর্তা হওয়ায় কেউ কারো কথা শুনতে চান না। ফলে ডিসি পদটি যুগ্ম সচিব হওয়া দরকার। পাশাপাশি বিভাগীয় কমিশনারের পদ অতিরিক্ত সচিবের। কিন্তু অনেক বিভাগীয় সদরে বিভিন্ন দপ্তরে অতিরিক্ত সচিবের ওপরেও পদ রয়েছে। ফলে এসব জায়গায় বিভাগীয় কমিশনাররা যথাযথভাবে সমন্বয় করতে পারেন না। এ জন্য তাদের পদটি গ্রেড-১ এ নিয়ে সচিবের সমমান করা দরকার। নিকট অতীতে বিভাগীয় কমিশনার পদে পদায়ন করা হতো যুগ্ম সচিব পর্যায়ের কর্মকর্তাদের। কিন্তু গত কয়েক বছরে পদের চেয়ে বেশিসংখ্যক কর্মকর্তাকে পদোন্নতি দেয়ায় সরকারের প্রশাসনের উপসচিব, যুগ্ম সচিব ও অতিরিক্ত সচিব পর্যায়ে অনেক ক্ষেত্রে এলোমেলো অবস্থা সৃষ্টি হয়। এতে অনেক ক্ষেত্রে যুগ্ম সচিবরা ডিসির দায়িত্বে এবং অতিরিক্ত সচিবরা বিভাগীয় কমিশনারের দায়িত্বে আছেন। মাঠ প্রশাসনের কর্মকর্তারা এখন স্থায়ীভাবে যুগ্ম সচিব পর্যায়ের কর্মকর্তারা ডিসি এবং গ্রেড-১ এর কর্মকর্তারা বিভাগীয় কমিশনার হতে চান।
এ বিষয়ে বর্তমানে কর্মরত একজন জেলা প্রশাসক বলেন, একই র‌্যাংকের একাধিক কর্মকর্তা মাঠ প্রশাসনে থাকায় ‘চেইন অব কমান্ডে’ সমস্যা হচ্ছে। এ জন্য ডিসি পদটি আপগ্রেড হওয়া দরকার। তাছাড়া সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিভাগীয় কমিশনারের পদটি গ্রেড-১ হওয়া প্রয়োজন। নতুবা মাঠ পর্যায়ে বিভিন্ন অফিসের সঙ্গে সমন্বয়ে সমস্যা হচ্ছে এবং ভবিষ্যতে এ সমস্যা আরো প্রকট হবে। এ বিষয়ে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের জনৈক শীর্ষ পর্যায়ের কর্মকর্তা স্বদেশ খবরকে বলেন, এ প্রস্তাবটি সরকারের সক্রিয় বিবেচনাধীন রয়েছে।