ফিচার

বাংলাদেশের রপ্তানিখাতে নতুন মাত্রায় যুক্ত হচ্ছে সম্ভাবনায় আউটসোর্সিং শিল্প

নিজস্ব প্রতিবেদক : বিশ্বে অনলাইনে শ্রমদাতা (আউটসোর্সিং) দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান দ্বিতীয়। বিশ্ববিদ্যালয়টির ‘অক্সফোর্ড ইন্টারনেট ইনস্টিটিউট (ওআইআই)-এর একটি সমীক্ষা প্রতিবেদনে এই তথ্য পাওয়া গেছে।
অক্সফোর্ড ইন্টারনেট ইনস্টিটিউটের সমীক্ষায় বলা হয়েছে, ভারত অন্যসব দেশের চেয়ে এগিয়ে প্রথম স্থান অধিকার করেছে। তৃতীয় হয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। অনলাইনে শ্রমদান বা অনলাইনে কাজের ক্ষেত্রে ভারত ২৪ শতাংশ অধিকার করেছে। এক্ষেত্রে বাংলাদেশ ১৬ শতাংশ ও যুক্তরাষ্ট্র ১২ শতাংশ অধিকার করেছে। শুধু যুক্তরাষ্ট্রই নয়, পাকিস্তান, ফিলিপাইন, যুক্তরাজ্য, কানাডা, জার্মানি, রাশিয়া, ইতালি ও স্পেন বাংলাদেশের পেছনে অবস্থান করছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, শীর্ষ পেশাদারিত্বের ক্ষেত্রে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে লিখন ও অনুবাদ গুরুত্ব পাচ্ছে। অন্যদিকে, ভারতীয় উপমহাদেশে সফটঅয়্যার উন্নয়ন ও প্রযুক্তি গুরুত্ব পাচ্ছে। অনলাইনে ফ্রিল্যান্স কাজের ক্রেতা-বিক্রেতাদের চারটি বৃহত্তম প্লাটফরম থেকে প্রাপ্ত তথ্য-উপাত্তের ওপর ভিত্তি করে এই প্রতিবেদন তৈরি করা হয়েছে।
অনলাইন লেবার ইনডেক্স ওয়ার্কার সাপ্লিমেন্ট’ চারটি অনলাইন লেবার প্লাটফরম তথা অনলাইন ফ্রিল্যান্সিং বা অনলাইন আউটসোর্সিং প্লাটফরম থেকে সংগ্রহ করা হয়। এগুলো হচ্ছে ফাইবার, ফ্রিল্যান্সার, গুরু ও পিপলপারআওয়ার। শিক্ষক ও সিনিয়র গবেষক ভিলি লেহডনভিরটা লিখিত এই নিবন্ধটি ১ থেকে ৬ জুলাই পর্যন্ত অনলাইন লেবার ইনডেক্স টপ অকুপেশন-এর ভিত্তিতে প্রণয়ন করা হয়।
সফটঅয়্যার ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড টেকনোলজি ক্যাটাগরিতে ভারতীয় উপমহাদেশের কর্মীদের প্রাধান্য দেখা যায়, যা এই খাতের ৫৫ শতাংশ। প্রফেশনাল সার্ভিস ক্যাটাগরিতে যুক্তরাজ্যের কর্মীদের প্রাধান্য দেখা যায়, যা এই খাতের ২২ শতাংশ। সার্বিক বিবেচনায় ‘অনলাইন লেবার-এ ‘সফটঅয়্যার ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড টেকনোলজি, ক্রিয়েটিভ, মাল্টিমিডিয়া, ক্ল্যারিক্যাল, মাল্টিমিডিয়া ও ডাটা অ্যান্ট্রি-এর ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অবদানসহ বিপণন সহায়তায় বাংলাদেশ অন্যসব দেশের চেয়ে এগিয়ে রয়েছে।
আসলে অনলাইন আউটসোর্সিং বিশ্বব্যাপী জনপ্রিয় পেশা। বিশাল সম্ভাবনা নিয়ে এ খাতে এগিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ। বর্তমানে বিশ্বের বিভিন্ন বাজারে (মার্কেট প্লেস) ৫ লাখের ওপরে বাংলাদেশি আউটসোর্সিংয়ের সঙ্গে জড়িত। এতে বছরে তারা প্রায় ২৩ কোটি মার্কিন ডলার আয় করছে। তবে ব্যক্তিগত উদ্যোগে আউটসোর্সিংয়ে বাংলাদেশ বিশ্ববাজারে পরিচিতি অর্জন করলেও আউটসোর্সিংকে মূলধারার রপ্তানি আয় হিসেবে গণ্য করা হয় না। ফলে প্রকৃত অর্থে আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে কী পরিমাণ অর্থ দেশে আসছে তা পরিষ্কারভাবে জানা যাচ্ছে না।
তবে বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যানুযায়ী, আউটসোর্সিং থেকে বাংলাদেশের আয় প্রতিনিয়ত বাড়ছে। ২০১৫-১৬ অর্থবছরে এ খাত থেকে ৯ কোটি ৪৯ লাখ ডলার আয় হয়েছে। আর ২০১৬-১৭ অর্থবছরে আয় হয়েছে ১২ কোটি ২১ লাখ ডলার। অর্থাৎ ১ বছরের ব্যবধানে আউটসোর্সিং থেকে আয় বেড়েছে ২ কোটি ৭২ লাখ ডলার। আয় বাড়ার এ হার ৩০ শতাংশের ওপরে। আউটসোর্সিংয়ের পাশাপাশি প্রতিনিয়ত অন্যান্য কম্পিউটার সেবা থেকেও আয় বাড়ছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্যানুযায়ী, ২০১৬-১৭ অর্থবছরের মে মাস পর্যন্ত কম্পিউটার সেবার মাধ্যমে বাংলাদেশ ১৩ কোটি ৬৪ লাখ ডলার আয় করেছে। আউটসোর্সিং (ডাটা প্রসেসিং অ্যান্ড হোস্টিং সার্ভিস), পরামর্শ সেবা ও কম্পিউটার সফটওয়্যার রপ্তানিÑ এই তিন খাত থেকে এ আয় হয়েছে।
আউটসোর্সিংয়ের অর্থ বাংলাদেশে আসে দুটি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে। প্রতিষ্ঠান দুটি হলো পেজা ও পেওনিয়ার। এই প্রতিষ্ঠান দুটিতে হিসাব খুলে আউটসোর্সিং কাজ করে বিদেশ থেকে বাংলাদেশে অর্থ আনা যায়। এছাড়া সরকারি মালিকানাধীন সোনালী ব্যাংক এই অনলাইনে পেমেন্টের জন্য পেপল নামের আরেকটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তি করেছে। পেপলের সঙ্গে চুক্তি হওয়ায় আউটসোর্সিং থেকে আয় বেশ বেড়েছে বলে মনে করছেন এ খাত সংশ্লিষ্টরা।
এদিকে আউটসোর্সিংয়ের অর্থ বাংলাদেশে ব্যাংকিং চ্যানেলে আনার পরিমাণ বাড়াতে সম্প্রতি একটি প্রজ্ঞাপন জারি করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। ওই প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী সার্কের বাইরের দেশগুলো থেকে বছরে সর্বোচ্চ ৭ হাজার ডলার ট্রানজেকশন করা যায়। এর পাশাপাশি সার্কভুক্ত দেশগুলো থেকে বছরে আরও ৫ হাজার ডলার ট্রানজেকশন করা যায়। অর্থাৎ একটি পাসপোর্টের অধীনে ১ বছরে বাইরের দেশে সর্বোচ্চ ১২ হাজার ডলার ট্রানজেকশন করা যায়। কেউ এর বেশি ট্রানজেকশন করলে মানি লন্ডারিংয়ের আওতায় পড়ে যেতে পারেন। ফলে অনলাইন আয়ের ক্ষেত্রে এ নিয়ম কিছুটা প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করছে।
সংশ্লিষ্টরা জানান, আউটসোর্সিংয়ের অর্থ পেজা ও পেওনিয়ারের মাধ্যমে বিদেশ থেকে বাংলাদেশে আনা গেলেও, বাংলাদেশ থেকে বিদেশে নিয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। যে কারণে আউটসোর্সিং পেশায় জড়িতরা বাংলাদেশ থেকে বাইরের দেশে প্রয়োজনীয় অর্থ পাঠানোর ক্ষেত্রে মানিলন্ডারিং আতঙ্কে ভোগেন। ফলে আউটসোর্সিংয়ের সঙ্গে জড়িত অনেকে তাদের আয় করা সম্পূর্ণ অর্থ বাংলাদেশে আনছেন না। তবে পেপল বাংলাদেশে আসায় বাইরে থেকে বাংলাদেশে যেমন অর্থ আনা যাবে, তেমনি বাইরের দেশে অর্থ পাঠানোর সুযোগও তৈরি হয়েছে। অনলাইনে পেমেন্টের স্বনামধন্য এ প্রতিষ্ঠানটির বাংলাদেশে আসার ক্ষেত্রে চুক্তির প্রধান শর্তই ছিল এটি।
ইন্টারনেটে কাজ করে ডলার আয়ের আউটসোর্সিং ধারণাটি বহির্বিশ্বের সঙ্গে সঙ্গে বাংলাদেশেও ঈর্ষণীয় জনপ্রিয়তা পেয়েছে। রেমিট্যান্স সংগ্রহের অন্যতম সেরা মাধ্যমে পরিণত হয়েছে আউটসোর্সিং। আউটসোর্সিং বলতে বোঝায় মুক্ত পেশা। যারা আউটসোর্সিংয়ের কাজ করে দেন, তাদের বলা হয় ফ্রিল্যান্সার। আউটসোর্সিং সাইট বা অনলাইন মার্কেট প্লেসে কাজগুলো বিভিন্ন ভাগে ভাগ করা থাকে। যেমন ওয়েব ডেভেলপমেন্ট, সফটওয়্যার ডেভেলপমেন্ট, নেটওয়ার্কিং ও তথ্য ব্যবস্থা (ইনফরমেশন সিস্টেম), লেখা ও অনুবাদ, প্রশাসনিক সহায়তা, ডিজাইন ও মাল্টিমিডিয়া, গ্রাহক সেবা (কাস্টমার সার্ভিস), বিক্রয় ও বিপণন, ব্যবসা সেবা ইত্যাদি। এসব কাজ ইন্টারনেট ব্যবস্থার মাধ্যমে করে দিতে পারলেই অনলাইনে আয় করা সম্ভব। বাংলাদেশ এই খাতে এখন প্রচুর আয় করছে।
এ খাতটিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার ব্যাপারে প্রতিশ্র“তির কথা উল্লেখ করে আইসিটি প্রতিমন্ত্রী জুনায়েদ আহমেদ পলক স্বদেশ খবরকে বলেন, ডিজিটাল বাংলাদেশ গঠনের লক্ষ্য বাস্তবায়নের জন্য সরকার কাজ করে যাচ্ছে। বিশ্বমানের প্রশিক্ষণ দেয়ার মাধ্যমে আমরা দক্ষ জনশক্তি তৈরি করছি। বাংলাদেশকে একটি আইসিটিভিত্তিক রাষ্ট্রে রূপান্তরের মাধ্যমে আমরা একটি মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হব।’