প্রতিবেদন

ভারতের নবনির্বাচিত প্রেসিডেন্ট রামনাথ কোবিন্দের দায়িত্বভার গ্রহণ : বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর অভিনন্দন

স্বদেশ খবর ডেস্ক : শপথ নিয়েই ঐক্যের বার্তা দিলেন ভারতের নতুন রাষ্ট্রপতি রামনাথ কোবিন্দ। দেশটির বিভিন্ন জাতি, ধর্ম, বর্ণ ও গোষ্ঠীর কথা উল্লেখ করে রামনাথ কোবিন্দ বলেন, এসবের মধ্যে ঐক্যই দেশকে এগিয়ে নেয়ার একমাত্র পথ।
২৫ জুলাই ভারতীয় পার্লামেন্টের সেন্ট্রাল হলে এক অনুষ্ঠানে দেশটির ১৪তম রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ নেন ৭১ বছর বয়সী রামনাথ কোবিন্দ। আর এরই মধ্য দিয়ে ভারতের প্রথম বাঙালি রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখোপাধ্যায়ের অধ্যায়ের সমাপ্তি এবং দলিত সম্প্রদায় থেকে দ্বিতীয় রাষ্ট্রপতি রামনাথ কোবিন্দ অধ্যায় শুরু হলো। এর আগে দলিত সম্প্রদায় থেকে দেশটির প্রথম রাষ্ট্রপতি হয়েছিলেন কে আর নারায়ণ।
দেশের সাম্প্রতিক ঘটনাবলির পরিপ্রেক্ষিতে ভারতের অখ-তার মূলে যে বহুত্ববাদিতা চরিত্র আর সহিষ্ণুতা, ২৪ জুলাই জাতির উদ্দেশে দেয়া শেষ ভাষণে আরো একবার সেটাই মনে করিয়ে দিয়েছিলেন প্রণব। বলেছিলেন, ‘বহুত্ববাদিতা আর সহনশীলতাই হচ্ছে ভারতের অন্তরাত্মা।’ ২৫ জুলাই শপথ নেয়ার পর প্রথম ভাষণে সেই একই সুর শোনা গেল কোবিন্দের কণ্ঠেও।
নতুন রাষ্ট্রপতি বলেন, ‘বৈচিত্র্যই আমাদের দেশের বৈশিষ্ট্য। ঐক্যই এগিয়ে যাওয়ার একমাত্র পথ। ভারত শান্তিপূর্ণ দেশ। এখন আমাদের দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার সময়। আমরা আমাদের ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির জন্য গর্বিত। বিশ্বকে দেখাতে হবে, আমরা কী কী পারি।’
পার্লামেন্টে থাকার সময়ের স্মৃতি মনে করে কোবিন্দ বলেন, ‘অনেক বিষয়ে প্রায়ই আমরা একমত হতাম; কখনো দ্বিমত পোষণ করতাম। কিন্তু আমরা একে অন্যকে শ্রদ্ধা করতে শিখেছি। আর এটাই গণতন্ত্রের সৌন্দর্য।’
অভিষেক ভাষণে দেশবাসীর উদ্দেশে ভারতের নতুন রাষ্ট্রপতি রামনাথ কোবিন্দ বলেন, ‘রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব দেয়ায় আমি সবাইকে ধন্যবাদ জানাই। আমি সাধারণ পরিবার থেকে এসেছি। অনেক পথ পাড়ি দিতে হবে।’ তিনি আরো বলেন, ‘আমি ১২৫ কোটি ভারতীয়ের প্রতিনিধি। আমি এই গুরু দায়িত্বের মর্ম বুঝি। রাজেন্দ্র প্রসাদ থেকে শুরু করে প্রণব মুখোপাধ্যায় পর্যন্ত সাবেক সব রাষ্ট্রপতিই মহান নেতা। আমাকেও এই ধারা বজায় রাখতে হবে।’
ভারতের নতুন রাষ্ট্রপতি রামনাথ কোবিন্দ তাঁর ভাষণে ভারতবাসীকে এমন দেশ গড়ার আহ্বান জানান, যে দেশ হবে অর্থনীতির ক্ষেত্রে নেতা, পাশাপাশি নৈতিক দিক থেকেও দৃষ্টান্ত হয়ে উঠবে। তিনি বলেন, ‘রাষ্ট্র হিসেবে আমরা অনেক কিছুই অর্জন করেছি। কিন্তু আরো ভালো কিছু করার, আরো দ্রুত করার তাগিদ কখনোই থেমে যায় না। ভগবান বুদ্ধের দেশ শান্তি, সুস্থিতি ও পরিবেশের ভারসাম্যের সন্ধানে বিশ্বকে নেতৃত্ব দেবেÑ এটাই কাম্য।’
দেশ গঠনে নারীদের ভূমিকার কথাও বিশেষভাবে উল্লেখ করেন নতুন রাষ্ট্রপতি রামনাথ কোবিন্দ। তিনি বলেন, ‘ভারতের প্রতিটি নাগরিক হলেন একেকজন দেশনির্মাতা। যে পুলিশ, আধাসামরিক বাহিনী সন্ত্রাসবাদ, অপরাধ দমন করছে, তারাও দেশ তৈরির কারিগর। যে নারীরা ঘরের দায়িত্ব সামলে সন্তান বড় করে আদর্শ নাগরিক করে তোলেন, তাঁরাও রাষ্ট্র গড়ার কারিগর।’
ভারতের প্রধান বিচারপতি জে এস খেহর রাষ্ট্রপতি রামনাথ কোবিন্দকে শপথবাক্য পড়ান। সংসদে শপথ অনুষ্ঠানে কোবিন্দের পরিবারের ২২ সদস্য উপস্থিত ছিলেন। অনুষ্ঠানে সদ্য বিদায়ী রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখোপাধ্যায়, উপ-রাষ্ট্রপতি হামিদ আনসারি, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি, লোকসভার স্পিকার সুমিত্রা মহাজন, কেন্দ্রীয় মন্ত্রীরা, গভর্নররা, মুখ্যমন্ত্রীরা, এমপিরা, রাষ্ট্রদূতরা ও অন্য কূটনীতিকরা এবং বেসামরিক ও সামরিক বাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
শপথ গ্রহণের আগে রাজঘাটে মহাত্মা গান্ধীর স্মৃতিসৌধে শ্রদ্ধা জানিয়ে দিনটি শুরু করেন রামনাথ কোবিন্দ। এরপর যান রাষ্ট্রপতি ভবনে। সেখানে বিদায়ী রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখোপাধ্যায় তাঁকে স্বাগত জানিয়ে রাষ্ট্রপতি ভবন ঘুরিয়ে দেখান। সেখান থেকে তাঁরা দুজন একসঙ্গে আনুষ্ঠানিক মোটর শোভাযাত্রার মাধ্যমে পার্লামেন্ট ভবনের অনুষ্ঠানস্থলে হাজির হন। এরপর নতুন রাষ্ট্রপতিকে প্রধান বিচারপতি শপথবাক্য পাঠ করান। শপথ পড়ানোর পর প্রণব মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গে আসন অদলবদল করে রাষ্ট্রপতির আসনে বসেন রামনাথ কোবিন্দ। এ সময় নতুন রাষ্ট্রপতির সম্মানে ২১ বার তোপধ্বনি করা হয়, তারপর অভিষেক ভাষণ দেন নতুন রাষ্ট্রপতি। অনুষ্ঠান শেষে রাষ্ট্রপতি ভবনের উদ্দেশে রওনা হন নতুন রাষ্ট্রপতি রামনাথ কোবিন্দ। রাষ্ট্রপতি ভবনে তাঁকে গার্ড অব অনার দিয়ে বরণ করে নেয়া হয়।
দলিত সম্প্রদায়ের মানুষ রামনাথ একজন কৃষকের সন্তান। ১৯৪৫ সালে উত্তর প্রদেশে তার জন্ম । ২০১৫ সালের ৮ আগস্ট বিহারের রাজ্যপাল নিযুক্ত হন তিনি। কানপুর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তিনি বাণিজ্য ও আইন বিষয়ে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। ১৯৯৪ সালের এপ্রিলে এই দলিত নেতা উত্তর প্রদেশ থেকে রাজ্য সভার সদস্য হন। ২০০৬ সালের আগ পর্যন্ত দুই মেয়াদে ১২ বছর তিনি ওই দায়িত্ব পালন করেন। রামনাথ পেশায় আইনজীবী। ১৯৭৭ থেকে ১৯৭৯ সাল পর্যন্ত তিনি দিল্লি হাইকোর্টে কেন্দ্রীয় সরকারের আইনজীবী ছিলেন। ১৯৮০ থেকে ১৯৯৩ সাল পর্যন্ত তিনি সুপ্রিমকোর্টে কেন্দ্রীয় সরকারের স্ট্যান্ডিং কাউন্সিলের দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৯৩ সালের আগ পর্যন্ত তিনি দিল্লি হাইকোর্ট ও সুপ্রিমকোর্টে ১৬ বছর ওকালতি করেন। রামনাথের এক ছেলে ও এক মেয়ে রয়েছে।
এদিকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভারতের নবনির্বাচিত প্রেসিডেন্ট শ্রী রামনাথ কোবিন্দকে অভিনন্দন জানিয়েছেন। রামনাথ কোবিন্দকে পাঠানো এক বার্তায় শেখ হাসিনা বলেন, ভারতের প্রেসিডেন্টের সর্বোচ্চ পদে নির্বাচিত হওয়ায় আমি আপনাকে বাংলাদেশের সরকার ও জনগণ এবং আমার নিজের পক্ষ থেকে আন্তরিক অভিনন্দন জানাচ্ছি। অনেক সাংস্কৃতিক, ঐতিহাসিক ও সভ্যতার অভিন্ন ভিত্তির ওপর বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্ক প্রতিষ্ঠিত। তাঁর সরকার দু’দেশের জনগণের অভিন্ন সমৃদ্ধি অর্জনের লক্ষ্যে বহুমুখী সম্পর্কোন্নয়নে ভারত সরকারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করতে চায়। প্রেসিডেন্ট হিসেবে রামনাথ কোবিন্দের মেয়াদকালে তার সাফল্য কামনা করেন শেখ হাসিনা এবং রামনাথ কোবিন্দকে তাঁর সুবিধাজনক সময়ে বাংলাদেশ সফরেরও আমন্ত্রণ জানান।
ভারতের নবনির্বাচিত প্রেসিডেন্ট রামনাথ কোবিন্দকে অভিনন্দন জানিয়েছেন রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদও।