রাজনীতি

মামলায় খালেদা জিয়ার কারাবরণের আশঙ্কায় উদ্বিগ্ন বিএনপির নেতাকর্মীরা

নিজস্ব প্রতিবেদক : বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে দায়ের করা জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট ও জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলা দুটির বিচার কাজ শেষ পর্যায়ে রয়েছে। মামলা দুটি চলমান অবস্থায় খালেদা জিয়া আদালতের অনুমতি না নিয়ে অনির্দিষ্ট কালের জন্য লন্ডন চলে যান। দুটি মামলার রায় হোক বা না হোক আদালতের অনুমতি না নিয়ে লন্ডন যাওয়ায় তার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি হওয়ারও আশঙ্কা রয়েছে। তাছাড়া চলমান মামলা দুটির রায়ে যেকোনো মুহূর্তে খালেদা জিয়ার সাজা হতে পারে। আর খালেদা জিয়া কারাগারে গেলে নির্বাচনে অযোগ্য হতে পারেন এমন আশঙ্কাও রয়েছে। এতে বিএনপির নির্বাচনি পরিকল্পনা ভেস্তে যেতে পারে। দল পড়তে পারে নেতৃত্ব সংকটে। এমনকি খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানের অনুপস্থিতিতে দলে বিভাজন ও বিশৃঙ্খলা দেখা দিতে পারে। বিএনপির অধিকাংশ নেতাকর্মীই মনে করেন এর আগে খালেদা জিয়া কারাগারে থাকাকালে দলে যৌথ নেতৃত্ব দেখা গেলেও বর্তমানে দলের নেতাকর্মীদের ভেতরকার অভ্যন্তরীণ কোন্দলের কারণে যৌথ নেতৃত্বে দল পরিচালনা অসম্ভব। বিএনপির অনেক নেতাই মনে করেন, খালেদা জিয়ার অবর্তমানে জোড়াতালি দিয়ে দলটি পরিচালিত হলেও বেশিদিন টিকতে পারবে না। খালেদা জিয়ার লন্ডন গমন, সেখান থেকে ফিরে না আসা এবং জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট ও জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতির মামলায় খালেদা জিয়ার কারাবরণের আশঙ্কা, নির্বাচনে অযোগ্য হওয়ার সম্ভাবনা, আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপির অংশ নেয়া অথবা না নেয়ার আশঙ্কাসহ নানাবিধ শঙ্কায় শঙ্কিত-উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছেন বিএনপির নেতাকর্মীরা।
চিকিৎসার কথা বলে গত ১৫ জুলাই অনির্দিষ্ট সময়ের জন্য বিএনপি চেয়ারপারসন লন্ডন সফরে যান। তিনি লন্ডন যাওয়ার সময় কোনো নেতার কাছে দলের দায়িত্ব দিয়ে যাননি, এমনকি তিনি কবে ফিরে আসবেন তাও বলে যাননি অথবা দলের কেউ জানেন না কবে তিনি ফিরে আসবেন। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, মামলা দুটির রায় তার বিপক্ষে গেলে খালেদা জিয়াকে জেলে যেতে হবে। সেক্ষেত্রে তিনি সাজাপ্রাপ্ত আসামি হিসেবে নির্বাচনে অংশ নেয়ার যোগ্যতা হারাবেন। অবশ্য অনেক আইন বিশেষজ্ঞ বলছেন, সাজার রায় হলেও খালেদা জিয়া রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করে কারাগারে থেকেই নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে পারবেন।
ইদানীং আদালত ও রাজনৈতিক অঙ্গনের নানা জটিলতার কারণে খালেদা জিয়া একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে দেশে ফিরবেন নাÑ এমন একটি কানাঘুষা রাজনৈতিক অঙ্গনে বেশ প্রবহমান। কানাঘুষার রেশ ধরে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের প্রথমে বিষয়টি সামনে এনে বলেন, ‘এত বেশি সময়ের জন্য একটি বড় দলের চেয়ারপারসন বিদেশে যাচ্ছেন। এখন তো লোকে বলাবলি করছে, তিনি কি মামলার ভয়ে পালিয়ে গেলেন? আর কি ফিরে আসার সম্ভাবনা আছে? মামলায় ১৫০ বার আদালতে সময় চাওয়ার পর এই সন্দেহটা ঘনীভূত হচ্ছে, জনগণের মধ্যে এই গুঞ্জনটা শাখা-প্রশাখা বিস্তার করছে।’ আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও মন্ত্রপরিষদের বৈঠকে এ নিয়ে আলোচনা উঠলে মন্তব্য করেন, ‘দেখেন ফিরে আসে কি না?’
বিএনপি চেয়ারপারসন লন্ডন যাওয়ার আগে দলের পক্ষ থেকে বলা হয়, খালেদা জিয়া লন্ডন গিয়ে চিকিৎসা নেয়ার পাশাপাশি দলের ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সঙ্গে আলোচনা করে আগামী নির্বাচনকালীন ‘সহায়ক সরকার’ ব্যবস্থার রূপরেখা চূড়ান্ত করবেন এবং দেশে ফিরে সহায়ক সরকারের রূপরেখা ঘোষণা করবেন। এছাড়া দলের পক্ষ থেকে অনানুষ্ঠানিকভাবে বলা হয়, তিনি দলের ইশতেহার ও প্রার্থী মনোনয়ন নিয়ে পুত্র তারেক রহমানের সঙ্গে একান্তে আলোচনা করবেন। কিন্তু বিএনপির অনেকেই এখন আশঙ্কা করছেন, খালেদা জিয়া ফিরে এসে যদি সহায়ক সরকারের রূপরেখা ঘোষণাই করবেন, তাহলে তিনি আদালতের অনুমতি না নিয়ে বিদেশ গেলেন কেন? মূলত খালেদা জিয়া আদালতের অনুমতি না নিয়ে বিদেশ যাওয়ায় এখন অনেকেই আশঙ্কা করছেন, সরকার পরিবর্তন না হওয়া পর্যন্ত তিনি আর দেশে ফিরবেন না। সেক্ষেত্রে তিনি লন্ডন বসে দুইটি চেষ্টা চালিয়ে যাবেন। এর একটি হলো দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মতো একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনও ভ-ুল করার চেষ্টা করবেন। অন্যটি হলো তিনি ও তার পুত্র তারেক রহমান লন্ডনে অবস্থান করে তৃতীয় কোনো শক্তিকে ক্ষমতায় বসানোর চেষ্টা করবেন। কিন্তু অনেকেই ভাবছেন এই দুটি কাজ সম্পন্ন করা খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানের পক্ষে ২০১৪ সালের মতোই অসম্ভব হয়ে দাঁড়াবে। খালেদা জিয়া দেশে অবস্থান করে ওই সময় দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন ভ-ুল করার সর্বাত্মক চেষ্টা চালিয়েও সফল হননি। আওয়ামী লীগ ঠিকই নির্বাচনটি করিয়ে নিয়েছে। ওই সময় নির্বাচন ভ-ুলের চেষ্টা এ জন্যই চালানো হয়েছিল যে, নির্বাচনটি ভ-ুল হলে সাংবিধানিক সংকট দেখা দেবে এবং সেই সুযোগে তৃতীয় শক্তি রাষ্ট্র ক্ষমতায় চলে আসবে। এবার খালেদা জিয়া দেশে অনুপস্থিত থেকে লন্ডনে বসে একই চেষ্টা চালালে ২০১৪ সালের থেকেও করুণ পরিণতি হবে বিএনপির। সেটা যা-ই হোক, বিএনপির যেসব নেতা একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নেয়ার জন্য ছিলেন উন্মুখ, তারা একটি বড় রকমের হোঁচট খেয়েছেন আদালতের অনুমতি না নিয়ে খালেদা জিয়ার লন্ডন গমনে। তাদের অনেকেই মনে করছেন আগামী জাতীয় নির্বাচনের আগে খালেদা জিয়া আর দেশে ফিরছেন না। তাছাড়া খালেদা জিয়া নির্বাচনে অংশ নেয়ার যোগ্যতা হারালে অথবা কারাবরণ করলে বিএনপি নির্বাচনে অংশগ্রহণ নাও করতে পারে। আর বিএনপি নির্বাচনে অংশ না নিলে নির্বাচন প্রতিহত করার সামর্থ্যও দলটির নেই। সেক্ষেত্রে জাতীয় পার্টিকে শক্তিশালী বিরোধী দল বানিয়ে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের বৈতরণীও পার হয়ে যাবে আওয়ামী লীগ। বিএনপির আরো ৫ বছরের জন্য ক্ষমতার বাইরে থাকা নিশ্চিত হয়ে যাবে। এতে যা হবে, খালেদা জিয়া ও তারেক রহমান লন্ডনে ভালোই থাকবেন। কিন্তু দেশে বিএনপি নেতাকর্মীদের দুর্গতি আরো বাড়তে থাকবে। খালেদা জিয়া লন্ডনে বসে নির্বাচন প্রতিহত করার যে অপচেষ্টা চালাবেন, তাতে নির্বাচনটি সম্পন্ন হয়ে যাওয়ার পর নির্বাচন প্রতিহতের জন্য ভাঙচুর, জ্বালাও-পোড়াও, হত্যা, খুন ও সরকারি সম্পত্তি বিনষ্টের অভিযোগে একের পর এক মামলা হতে পারে বিএনপির নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে। এমনিতেই দলের স্থায়ী কমিটির ১২ জন সদস্যসহ বিএনপির শতাধিক নেতার মামলার রায় ঘোষণার পর্যায়ে রয়েছে। তারা নিজেরাই সাজা আতঙ্কে ভুগছেন। সে জায়গায় নতুন করে আবার মামলার খড়গে পড়লে ভবিষ্যৎ অবস্থা কী হবে তা ভেবে শঙ্কিত-উদ্বিগ্ন বিএনপির সর্বস্তরের নেতাকর্মী। এমতাবস্থায়, বিএনপির অনেক নেতাকর্মী আওয়ামী লীগ ও জাতীয় পার্টিতে যোগ দিয়ে নিজেদের সুরক্ষা করার কথাও ভাবছেন। আর শোনা যাচ্ছে নিজেদের ভবিষ্যৎ বিপদের কথা ভেবে বিএনপির অনেক নেতা এখনই ক্ষমতাসীনদের সাথে যোগাযোগ রক্ষা করে চলছেন।