প্রতিবেদন

মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের বার্ষিক প্রতিবেদন : জঙ্গি দমনে অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে বাংলাদেশ

স্বদেশ খবর ডেস্ক : মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের এক বার্ষিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০১৬ সালে বাংলাদেশে জঙ্গি কর্মকা- উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। গত বছরের ১ জুলাই ঢাকার গুলশানে হলি আর্টিজান রেস্টুরেন্টে নজিরবিহীন সন্ত্রাসী হামলার দায় আইএস স্বীকার করেছে। এছাড়া বেশ কিছু হামলার ঘটনায় আল-কায়েদার ভারতীয় উপ-মহাদেশীয় শাখা (একিউআইএস) এবং আইএস দায় স্বীকার করলেও বাংলাদেশ সরকার বরাবরই উগ্রবাদী সহিংসতার জন্য স্থানীয় জঙ্গিদের দায়ী করেছে। সন্ত্রাসী সংগঠনগুলো বাংলাদেশে উগ্রবাদী মতাদর্শ বিস্তার ও কর্মী-সমর্থক সংগ্রহের কাজে সোশ্যাল মিডিয়াকে ব্যবহার করেছে। আইএস ও এআইকিউএস সংশ্লিষ্ট ওয়েবসাইট, ভিডিও ও প্রকাশনায় বাংলাদেশ বিভিন্নভাবে উপস্থাপিত হয়েছে। তবে একইসঙ্গে সন্ত্রাস মোকাবিলায় বাংলাদেশ সরকারের তৎপরতা ছিল প্রশংসনীয়, যা অন্যান্য দেশের জন্য অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত হতে পারে।
১৯ জুলাই মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর থেকে প্রকাশিত ‘কান্ট্রি রিপোর্ট অন টেরোরজিম-২০১৬’ শীর্ষক প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে। মার্কিন সরকারের এই প্রতিবেদনটিতে বলা হয়, ২০১৬ সালে বিশ্বজুড়ে মোট জঙ্গি হামলা আগের বছরের তুলনায় ৯ শতাংশ কমেছে। এসব হামলায় নিহতের সংখ্যাও কমেছে ১৩ শতাংশ। একই সময়ে বাংলাদেশে সন্ত্রাসবাদী কর্মকা- আগের বছরের তুলনায় কিছুটা বেড়েছে। দেশটিতে গুলশান-শোলাকিয়া হামলা ২০১৬ সালে ঘটেছে। তবে সরকার এসব হামলা যথাযথভাবে মোকাবিলা করেছে। ফলশ্রুতিতে এই দুটি বড় হামলার পর তেমন কোনো জঙ্গি হামলা বাংলাদেশে দৃশ্যমান হয়নি।
বলা হয়েছে, ২০১৬ সালে মোট ১৮টি সন্ত্রাসী হামলার ঘটনায় আইএস দায় স্বীকার করেছে। এর সবচেয়ে ভয়াবহ হামলা হয় গত বছরের ৩১ জুলাই হলি আর্টিজান রেস্টুরেন্টে। ২০ জন জিম্মি ও ২ পুলিশ কর্মকর্তাকে আগ্নেয়য়াস্ত্র, বিস্ফোরক ও ধারালো অস্ত্র দিয়ে হত্যা করে ৫ বাংলাদেশি হামলাকারী। নিহতদের বেশিরভাগই বিদেশি নাগরিক। একই বছর দুটি সন্ত্রাসী হামলার ঘটনায় দায় স্বীকার করে এআইকিউএস। গত বছরের ৬ এপ্রিল একজন অনলাইন অ্যাকটিভিস্ট ও ২৫ এপ্রিল ঢাকায় মার্কিন দূতাবাসের স্থানীয় এক কর্মী ও তার বন্ধুকে হত্যার দায় স্বীকার করে আল কায়েদার এই শাখা। প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, ২০১৫ সালের শুরু থেকে ২০১৬ সালের মধ্যভাগ পর্যন্ত একের পর এক কুপিয়ে ও গুলি করে মুক্তমনা লেখক, অনলাইন অ্যাকটিভিস্ট, বিদেশি, ধর্মীয় সংখ্যালঘু গোষ্ঠীসহ বিভিন্নজনকে ‘টার্গেট কিলিংয়ের’ ঘটনা। তবে মার্কিন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দাবি, বিরোধী কিংবা স্থানীয় জঙ্গিদের প্রতি সন্দেহ জারি রাখলেও বাংলাদেশ সরকার সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি নিয়েছে। আর আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে সঙ্গে রেখে তারা সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে। বিভিন্ন জঙ্গি আস্তানায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানের বিষয়টি তুলে ধরে প্রতিবেদনে বলা হয়, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সারাদেশে তৃণমূল পর্যায়ে জঙ্গি খোঁজার কাজ চালিয়ে যাচ্ছে।
মার্কিন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মতে, বিদেশি জঙ্গিদের ধরতে প্রয়োজনীয় আইন না থাকলেও বাংলাদেশ সন্ত্রাসী সন্দেহে কয়েকজন বিদেশি সন্ত্রাসীকে গ্রেপ্তার করেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যৌথভাবে বাংলাদেশ স্থল, জল ও আকাশ সীমারেখা শক্তিশালী করেছে। সামনে এই নিরাপত্তা ব্যবস্থা আরও জোরদার করার পরিকল্পনা রয়েছে। বাংলাদেশের সীমান্তে অবকাঠামো নির্মাণে যুক্তরাষ্ট্র সহায়তা করছে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় বাংলাদেশে আকাশপথে নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে সজাগ হয়েছে। নিরাপত্তা উদ্বেগের কারণে যুক্তরাজ্য ও অস্ট্রেলিয়া বাংলাদেশ থেকে সরাসরি কার্গো বিমান যাওয়া নিষিদ্ধ করেছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশ ইন্টারপোলের সঙ্গে তথ্য বিনিময় করলেও তাদের সন্ত্রাসী নজরদারি তালিকা নেই। জঙ্গিবাদে অর্থায়ন বন্ধে সন্দেহজনক লেনদেন আটকানোসহ ব্যাংকিং ও অন্যান্য খাতে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা বাস্তবায়নের তাগিদ দেয়া হয়েছে প্রতিবেদনে।
মার্কিন এই প্রতিবেদনটি তৈরি করা হয়েছে ২০১৬ সালে ঘটে যাওয়া জঙ্গি ঘটনা নিয়ে। সন্দেহ নেই, ওই বছর বাংলাদেশে জঙ্গি হামলাজনিত ঘটনা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়। যার ফলশ্রুতিতে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের বার্ষিক প্রতিবেদনে বাংলাদেশে জঙ্গি হামলার ঘটনা বেড়ে গেছে বলা হয়। তবে একই সঙ্গে ওই প্রতিবেদনে বাংলাদেশ যে জঙ্গি দমনে বিশ্বের মধ্যে অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেÑ সে কথাটিও বলা হয়েছে।
এ কথা ঠিক যে, আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর সন্ত্রাস দমনে জিরো টলারেন্স নীতির ভিত্তিতে কার্যকর পদক্ষেপ ও পরিকল্পনা গ্রহণ করে জঙ্গি দমনে বিশ্বে বাংলাদেশ আজ রোল মডেল হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। সাম্প্রতিক সময়ে গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সফল অভিযানে শীর্ষ স্থানীয় জঙ্গি নেতাসহ গুরুত্বপূর্ণ সদস্য গ্রেপ্তার ও নিহত হয় এবং বিপুল পরিমাণ অস্ত্র ও গোলা-বারুদ উদ্ধার করা হয়। হলি আর্টিজান হামলার পর এ পর্যন্ত যতগুলো অপারেশন পরিচালিত হয়েছে তার সবগুলো থেকেই জঙ্গিগোষ্ঠী আঘাত হানার পূর্বে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তাদের পরিকল্পনা নস্যাৎ করে জঙ্গি আস্তানাসমূহ গুঁড়িয়ে দিয়েছে। জঙ্গি দমনে বাংলাদেশ প্রো-অ্যাক্টিভ পুলিশিংয়ের একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। ফলে বর্তমানে জঙ্গি তৎপরতা বহুলাংশে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হয়েছে এবং জঙ্গি দমনে এ সাফল্য আন্তর্জাতিক পরিম-লে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করেছে।
জঙ্গি ও সন্ত্রাসী কর্মকা- দমনে সরকারের তরফ থেকে এলিট ফোর্স র‌্যাব, বিশেষায়িত ইউনিট সোয়াতসহ পুলিশের সকল ইউনিট ও গোয়েন্দা সংস্থাকে জঙ্গিবিরোধী কার্যক্রম জোরদার করার জন্য প্রয়োজনীয় নির্দেশনা প্রদান করা হয়েছে। জাতীয় পর্যায়ে জঙ্গি দমনে কাজ করার জন্য পুলিশ হেডকোয়ার্টাসের অধীনে একটি পূর্ণাঙ্গ অ্যান্টি টেরোরিজম ইউনিট গঠন করা হয়েছে। জঙ্গি নির্মূলের লক্ষ্যে পুলিশ বাহিনীতে ডিএমপির অধীনে কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম নামে পুলিশের নতুন একটি জঙ্গি দমন ইউনিট চালু করা হয়েছে। ইসলামিক ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে জঙ্গিবাদ ও সন্ত্রাস দমন শীর্ষক সমাবেশের আয়োজন ও জঙ্গিবাদবিরোধী পুস্তক প্রকাশ করা হয়েছে।
এসব কর্মকা- পরিচালিত হওয়ার কারণে বাংলাদেশে দেশীয় বিভিন্ন জঙ্গিগোষ্ঠী তাদের কার্যক্রম বন্ধ করে দিতে বাধ্য হয়েছে। সবচেয়ে বড় কথা হলো, বাংলাদেশে যে আইএস নেই, বহির্বিশ্বের কাছে এই বিষয়টি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।