অর্থনীতি

মুদ্রানীতি ঘোষণা : বাস্তবায়নে রয়েছে কঠিন চ্যালেঞ্জ

নিজস্ব প্রতিবেদক : ২৬ জুলাই চলতি ২০১৭-১৮ অর্থবছরের প্রথমার্ধের মুদ্রানীতি ঘোষণা করা হয়েছে। এ বছরের মার্চে অতি বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে হাওরাঞ্চলে ব্যাপক ফসলহানি ঘটে। জুন-জুলাইতে এসে আবারো বন্যায় আক্রান্ত হয় বেশ কয়েকটি জেলা। অতিবৃষ্টিতে পাহাড় ধসের ঘটনায় প্রাণহানি ঘটে রাঙ্গামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবানে। সেখানকার ফসল ও পাহাড়িদের জুম চাষ ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। মোটকথা ২০১৭ সালের শুরু থেকে বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগে ফসলহানি ঘটতে থাকে। যার প্রভাবে কিছুটা অস্থিতিশীল হয়ে ওঠে খাদ্যপণ্যের বাজার। মোটা চালের মূল্য ৫৫-৬০ টাকায় গিয়ে ঠেকে। এ অবস্থায় খাদ্যপণ্যের দাম জনগণের ক্রয়সীমার মধ্যে রাখতে আন্তর্জাতিক বাজারে খাদ্য মূল্যের নিম্নমুখী প্রবণতার ওপর ভরসা করে মুদ্রার জোগান কমিয়ে অর্থবছরের প্রথমার্ধের (জুলাই-ডিসেম্বর) মুদ্রানীতির ঘোষণা দিল কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ফজলে কবিরের ঘোষিত এ মুদ্রানীতিকে সংকোচনমূলক বলছেন অর্থনীতিবিদরা। আর মুদ্রানীতি উপস্থাপনকালে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর ফজলে কবির বলেন, ‘দেশের উত্তর-পূর্ব হাওরাঞ্চলে গত অর্থবছরের দ্বিতীয়ার্ধে আকস্মিক বন্যায় ফসলহানির কারণে দেশে খাদ্য মূল্যস্ফীতির কিছুটা ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা এখনো বিদ্যমান। তবে প্রতিবেশী দেশ ভারতে ভোক্তা মূল্যস্ফীতি ২ শতাংশের নিচে নেমে আসা এবং ২০১৭ সালের শুরু থেকে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেল ও অন্যান্য প্রধান পণ্যের আন্তর্জাতিক বাজারমূল্য নিম্নমুখী বা স্থিতিশীল থাকায় বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ মূল্যস্ফীতি পরিমিত রাখা যাবে আশা করা যায়।’
গভর্নর ফজলে কবির বলেন, রপ্তানি প্রবৃদ্ধির মন্থরতা এবং রেমিট্যান্স আন্তঃপ্রবাহে নিম্নগামিতার সূত্রে মুদ্রা জোগানের ‘নিট বৈদেশিক সম্পদ’ অংশ সংকুচিত হয়ে তারল্য জোগান পরিমিত করছে। এই পরিপ্রেক্ষিতে রেপো, রিভার্স রেপোর সুদহার পরিবর্তনের প্রয়োজন আপাতত অনুভূত হচ্ছে না। তবে প্রয়োজন হলে তাৎক্ষণিকভাবেই রেপো, রিভার্স রেপোর সুদহারে পরিবর্তন আনা যাবে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
মুদ্রানীতির ঘোষণাপত্রের একটি অংশে রেমিট্যান্স কমে যাওয়াকে নতুন মুদ্রানীতির সফল বাস্তবায়নের সম্ভাব্য দুটি ঝুঁকির একটি বলে উল্লেখ করে গভর্নর ফজলে কবির বলেন, রেমিট্যান্সের আন্তঃপ্রবাহ প্রবৃদ্ধির ধারায় ফেরানোর বিভিন্নমুখী উদ্যোগের পাশাপাশি স্থানীয় ব্যাংকগুলোকে বৈধ চ্যানেলে নিরাপদ ও দ্রুততার সঙ্গে রেমিট্যান্স আনয়নে আরো উদ্যোগী হওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা দেয়া হয়েছে।
সম্ভাব্য অন্য ঝুঁকিটি হলো সঞ্চয়পত্র। গভর্নর বলেন, জাতীয় সঞ্চয়পত্রের স্কিমগুলোর বাজার সুদহারের সঙ্গে সঙ্গতিহীন, উচ্চমুনাফা হার সরকারের জন্য অতিরিক্ত সুদ ব্যয়ভার সৃষ্টি ছাড়াও মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি সরকারি-বেসরকারি প্রকল্পের অর্থায়নের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বন্ড বাজারের বিকাশ বিশেষভাবে বাধাগ্রস্ত করছে; এর ফলে মুদ্রানীতির কার্যকারিতার জন্য দরকারি সুষ্ঠু ‘ট্রান্সমিশন চ্যানেল’ বিকাশও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
মুদ্রানীতি ঘোষণার শুরুতে গভর্নর বলেন, বরাবরের মতোই মূল্যস্ফীতি পরিমিতির পাশাপাশি দেশজ উৎপাদনে অন্তর্ভুক্তিমূলক, পরিবেশবান্ধব গতিশীল প্রবৃদ্ধির সরকারি অভীষ্ট লক্ষ্য অর্জনে সহায়ক ভূমিকা রাখার লক্ষ্যে অভ্যন্তরীণ ও বৈশ্বিক অর্থনীতির চলমান প্রেক্ষাপটে নতুন অর্থবছরের জন্য মুদ্রানীতি কার্যক্রম এবং অর্থবছরের প্রথমার্ধের জন্য মুদ্রানীতিভঙ্গি প্রণয়ন করা হয়েছে।
নতুন ভঙ্গি বিষয়ে অবতারণার আগে সদ্য শেষ হওয়া অর্থবছরের মুদ্রানীতির লক্ষ্যগুলোর বিপরীতে প্রকৃত অর্জনগুলোও সংক্ষেপে তুলে ধরেন ফজলে কবির। তিনি বলেন, গড় বার্ষিক ভোক্তা মূল্যস্ফীতি আগের অর্থবছরান্তের ৫ দশমিক ৯২ শতাংশ থেকে কমে জুন ২০১৭ তে ৫ দশমিক ৪৪ শতাংশে নেমে আসে, যা নির্ধারিত ৫ দশমিক ৮০ শতাংশ ঊর্ধ্বসীমার বেশ কিছুটা নিচে।
বিদায়ী অর্থবছরে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি গতিশীল রেখেও অভ্যন্তরীণ ঋণের প্রবৃদ্ধি নির্ধারিত ঊর্ধ্বসীমার অনেকটা নিচে ছিল। এর মূল কারণ হিসেবে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর বলেন, ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে সরকারি খাতের ঋণ বৃদ্ধি না পেয়ে বরং কমে যাওয়ার কারণে বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবৃদ্ধি বার্ষিক ১৬ দশমিক ৫ শতাংশ ঊর্ধ্বসীমার বিপরীতে মে ২০১৭ নাগাদ ১৬ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়। মূলত জাতীয় সঞ্চয় স্কিমের সঞ্চয়পত্রগুলোর বিক্রির সূত্রের সরকারি অর্থায়নের কারণে ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে সরকারের ঋণের পরিমাণ কমে যায়। মূল্যস্ফীতির ওপর যার প্রভাব ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে নেয়া ঋণের চেয়ে কম।
নতুন অর্থবছরের জন্য গড় বার্ষিক ভোক্তামূল্যস্ফীতি ৫ দশমিক ৫ শতাংশে পরিমিত রাখার এবং ৭ দশমিক ৪ শতাংশ প্রকৃত দেশজ উৎপাদন বৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রাগুলোর আলোকে প্রণীত মুদ্রানীতি কার্যক্রমে ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে অভ্যন্তরীণ ঋণের ১৫ দশমিক ৮ শতাংশ প্রবৃদ্ধি সংকুলান ধরা হয়েছে। এর মধ্যে বেসরকারি ও সরকারি খাতের জন্য ঋণ প্রবৃদ্ধি প্রাক্কলন যথাক্রমে ১৬ দশমিক ৩ ও ১২ দশমিক ১ শতাংশ। প্রসঙ্গত, গত অর্থবছরের মুদ্রানীতি কার্যক্রমে বেসরকারি ও সরকারি খাতের জন্য ঋণ প্রবৃদ্ধি প্রাক্কলন ছিল যথাক্রমে ১৬ দশমিক ৫ ও ১৬ দশমিক ১ শতাংশ। সরকারি রাজস্ব আহরণে গত অর্থবছরের ১৯ শতাংশ প্রবৃদ্ধির গতিবেগ চলতি অর্থবছরেও বজায় থাকবে বলে আশা প্রকাশ করে গভর্নর ফজলে কবির বলেন, নতুন ভ্যাট আইন প্রবর্তন বিলম্বিত হওয়ায় নতুন মুদ্রানীতি কার্যক্রমে তেমন কোনো বিঘœ সৃষ্টি হবে না।
এবারের মুদ্রানীতির ভঙ্গি অনেক বেশি সংকোচনমূলক হয়েছে বলে মনে করেন বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ। তিনি বলেন, প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের তুলনায় বেশি জোর দেয়া হয়েছে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের ওপর। অনেকটা উন্নত বিশ্বের আদলে মুদ্রা জোগানের লক্ষ্যমাত্রার প্রাক্কলন করা হয়েছে। বাংলাদেশের বর্তমান বাস্তবতায় মুদ্রানীতির ভঙ্গি আরো সম্প্রসারণমূলক হওয়া উচিত ছিল।
তিনি বলেন, বাংলাদেশের জন্য এখন বেশি প্রয়োজন মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি। মুদ্রানীতি ভঙ্গির ঘোষণাপত্রে বেসরকারি খাতে ঋণ জোগানের প্রাক্কলনের ক্ষেত্রে অনেক বেশি সতর্কতা দেখানো হয়েছে। আগের বছরের প্রাক্কলনের তুলনায় নতুন মুদ্রানীতিতে এ খাতের ঋণ প্রবৃদ্ধির ঊর্ধ্বসীমা না বাড়িয়ে উল্টো কমানো হয়েছে। বেসরকারি খাতে ঋণ বাড়ানোর মাধ্যমে বেশি কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টির ওপর গুরুত্বারোপ করা উচিত ছিল। কেননা কর্মসংস্থানমূলক প্রবৃদ্ধি অনেক টেকসই হয়। এ ধরনের প্রবৃদ্ধি বাংলাদেশে অনেক বেশি দরকার।
সাবেক গভর্নর ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ আরো বলেন, দেশের সামগ্রিক বিনিয়োগ বাড়ানোর জন্য সঞ্চয় প্রবণতা বাড়াতে হবে। সঞ্চয় প্রবণতা গড়ে তোলার ক্ষেত্রে সঞ্চয়পত্র বড় ভূমিকা রাখছে। আবার সঞ্চয়পত্র প্রকল্পটি চালুই হয়েছে সামাজিক নিরাপত্তার লক্ষ্য নিয়ে। সঞ্চয়পত্রের সুদহারের ওঠানামার ওপর পণ্যের দাম ওঠানামার বিষয়টি অনেকটাই নির্ভরশীল। তাই সঞ্চয়পত্রে সুদহার কমানোর ধারণা একেবারেই ঠিক নয়।