আন্তর্জাতিক

রাশিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের নতুন নিষেধাজ্ঞা : হুমকির মুখে পুতিন-ট্রাম্প সম্পর্ক!

নিজস্ব প্রতিবেদক : যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধি পরিষদে রাশিয়ার বিরুদ্ধে আরো নতুন নিষেধাজ্ঞা আরোপের একটি বিল পাস হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের আপত্তি সত্ত্বেও ২৫ জুলাই প্রতিনিধি পরিষদের সদস্যরা বিলটির পক্ষে ভোট দেন। এবারের নিষেধাজ্ঞার আওতায় রাশিয়ার বেশ কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি আছেন, যাদের বিরুদ্ধে ২০১৬ সালের মার্কিন নির্বাচনে হস্তক্ষেপের অভিযোগ রয়েছে। মূলত ওই নির্বাচনে মস্কোর কথিত হস্তক্ষেপের পাল্টা ব্যবস্থা হিসেবে এবং ২০১৪ সালে ক্রিমিয়াকে রাশিয়ায় অন্তর্ভুক্ত করার শাস্তি হিসেবেই এ ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে। নতুন এ বিল রাশিয়ার সঙ্গে ট্রাম্পের সম্পর্ক উন্নয়নের আশাকে জটিলতায় ফেলবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। বিলটিতে ইরান ও উত্তর কোরিয়ার ওপরও আরো নিষেধাজ্ঞা আরোপের কথা বলা হয়েছে।
রাশিয়া, ইরান ও উত্তর কোরিয়ার ওপর নতুন করে আরো নিষেধাজ্ঞা আরোপের পক্ষে প্রতিনিধি পরিষদের মতো মার্কিন পার্লামেন্টের উচ্চকক্ষ সিনেটও অবস্থান নিয়েছে। যদিও দেশটির প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এখনো এ ব্যাপারে নীরব ভূমিকা পালন করছেন। এদিকে গত ২৫ জুলাই এ ধরনের একটি বিল বিপুল সমর্থন নিয়ে মার্কিন সিনেটের নিম্নকক্ষ বা প্রতিনিধি পরিষদে পাস হয়ে যায়। এবার বিলটি আইনে পরিণত হতে প্রেসিডেন্টের স্বাক্ষরের অপেক্ষায় রয়েছে। তবে বিলটিতে ডোনাল্ড ট্রাম্প ভেটো দিতে পারেন বলে কেউ কেউ ধারণা করছেন। এতে ভেটো দিলেও সিনেটে তা বাতিল হওয়ার সম্ভাবনা প্রবল বলে ধারণা করছেন অনেকে।
মার্কিন সিনেটের নিম্নকক্ষে বিলটি পাস হওয়ার পরপরই সবার নজর চলে যায় রাশিয়ার দিকে। এ কারণে ইরান আর উত্তর কোরিয়া তাদের ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি নিয়ে আরও চাপের মধ্যে পড়বে বলে অনেকেই মত দিয়েছেন। যদিও এর আগে, ২০১৪ সালে ক্রিমিয়াকে ইউক্রেন থেকে বিচ্ছিন্ন করে রুশ ফেডারেশনে যুক্ত করার পর রাশিয়াকে সাজা দেয়ার অংশ হিসেবে দেশটির ওপর অবরোধ আরোপ করে মার্কিন প্রশাসন। এছাড়া ২০১৬ সালে মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে রুশ হস্তক্ষেপ সংক্রান্ত তদন্ত চলার মধ্যেই নতুন নিষেধাজ্ঞা আরোপ নিয়ে বিতর্ক চলছে মার্কিন কংগ্রেসে। অবশ্য মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে তাকে সহায়তা করার জন্য রাশিয়ার হস্তক্ষেপের অভিযোগটি বরাবরই অস্বীকার করে আসছেন ট্রাম্প। রাশিয়াও এ ধরনের অভিযোগ উড়িয়ে দিয়েছে।
রাশিয়া ওই নিষেধাজ্ঞা বিলের প্রতিক্রিয়ায় বলেছে, দুই দেশের মধ্যে সম্পর্ক স্বাভাবিক হওয়ার যে প্রচেষ্টা চলছে হাউজ অব রিপ্রেজেন্টেটিভসের ওই ভোটে তা ক্ষতিগ্রস্ত হবে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন বলেছে, যুক্তরাষ্ট্রের সিদ্ধান্ত নেয়ার সময় ইইউয়ের স্বার্থকে মাথায় রাখা হয়নি বলে মনে করছে তারা।
২৫ জুলাই কংগ্রেসের নিম্নকক্ষ হাউজ অব রিপ্রেজেন্টেটিভসে ওই নিষেধাজ্ঞা বিল ডাকা হলে তার পক্ষে ভোট দেন ৪১৯ জন সদস্য। বিপক্ষে ভোট দেন ৩ জন। বিলটি পাস হওয়ার পর হাউজ অব রিপ্রেজেন্টেটিভসের স্পিকার পল রায়ান বলেন, ‘এ নিষেধাজ্ঞার প্রস্তাব বিপজ্জনক প্রতিপক্ষদের দুর্বল করে আমেরিকাকে নিরাপদ রাখবে।’ রাশিয়ার পাশাপাশি ইরান ও উত্তর কোরিয়ার ওপরও নিষেধাজ্ঞা দিতে ভোট দেন হাউজ অব রিপ্রেজেন্টেটিভসের সদস্যরা। চূড়ান্ত স্বাক্ষরের জন্য বিলটি প্রেসিডেন্টের কাছে যাওয়ার আগে কংগ্রেসের উচ্চকক্ষ সিনেটেও পাস হওয়ার নিয়ম রয়েছে। ২৭ জুলাই সে কাজটিও সম্পন্ন হয়ে যায়। ৯৮-২ ভোটে সিনেটে বিলটি পাস হয়ে যায়। বিলটি সিনেটে পাস হওয়ায় তা ট্রাম্পের জন্য যথেষ্ট মাথা ব্যথার কারণ হয়েছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। কারণ বিলটিতে প্রেসিডেন্ট হিসেবে ট্রাম্প যদি ভেটো দেন, তাহলে ‘রাশিয়ার অতি সমর্থক’ হিসেবে তার বিরুদ্ধে মার্কিন জনগণের যে সন্দেহ ও অভিযোগ রয়েছে সেটি আরো ঘনীভূত হবে। তবে হাউজ অব রিপ্রেজেন্টেটিভস ও সিনেটে পাস হওয়া নিষেধাজ্ঞা বিলে ট্রাম্প ভেটো দেবেন কি না তা পরিষ্কার হয়নি। হোয়াইট হাউজ জানিয়েছে, তারা বিলটি পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে দেখছে। হোয়াইট হাউজের মুখপাত্র সারাহ স্যান্ডার্স এক বিবৃতিতে বলেছেন, ‘যদিও প্রেসিডেন্ট উত্তর কোরিয়া, ইরান ও রাশিয়ার ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপের পক্ষে, তার পরও হোয়াইট হাউজ প্রতিনিধি পরিষদে পাস হওয়া বিলটি পরীক্ষা করে দেখবে এবং চূড়ান্ত যে বিলটি প্রেসিডেন্টের ডেস্কে আসবে তার জন্য অপেক্ষা করবে।’
রাশিয়া ওই নিষেধাজ্ঞা বিলের প্রতিক্রিয়ায় বলেছে, হাউজ অব রিপ্রেজেন্টেটিভস ও সিনেটের এই ভোটে ‘দুই দেশের মধ্যে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার যে প্রচেষ্টা চলছে’ তা ক্ষতিগ্রস্ত করবে। রাশিয়ার উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই রিয়াকভ বলেন, ‘তারা যা করেছে তা একেবারেই স্বাভাবিক বিবেচনাবোধের বাইরে। ওয়াশিংটনকে বহুবার বলা হয়েছে যে নতুন অবরোধ আরোপ করা হলে রাশিয়া চুপ করে থাকবে না। এই বিল রচনাকারী ও তাতে উৎসাহদাতারা অত্যন্ত গুরুতর একটি পদক্ষেপ নিয়েছেন, যা দুই দেশের সম্পর্ক স্বাভাবিক হওয়ার পথকেই ক্ষতিগ্রস্ত করবে।
আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, রাশিয়ার বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন নিষেধাজ্ঞা প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের জন্য শাখের করাত হয়েছে। প্রেসিডেন্ট এই বিলটিতে ভেটো দিলে রাশিয়ার অতি সমর্থক হিসেবে মার্কিন জনগণের মধ্যে ট্রাম্পের যে পরিচিতি আছে, তা আরো বিস্তৃত হবে। আর প্রেসিডেন্ট বিলটিতে ভেটো না দিলে রাশিয়ার বিরুদ্ধে নতুন নিষেধাজ্ঞা জারি হয়ে যাবে এবং তাতে পুতিনের সঙ্গে ট্রাম্পের যে অঘোষিত বন্ধুত্ব ছিল তা ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এখন প্রশ্ন হলো প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প আসলে কী করবেন? পর্যবেক্ষকরা ধারণা করছেন, ট্রাম্প বিলটিতে ভেটো দেবেন না। কারণ ট্রাম্প ভেটো দিলেও মার্কিন সিনেট তা গ্রাহ্য করবে না। তখন মার্কিন সিনেট হয়ত প্রেসিডেন্টের ভেটো ক্ষমতা বিলুপ্ত করার বিল আনবে এবং সঙ্গত কারণে বিলটি পাসও হয়ে যাবে। বিলটি পাস হলে ট্রাম্প ভেটো প্রদানের ক্ষমতা হারাবেন এবং তার ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত হয়ে যাবে। এর চেয়ে বড় কথা হলো ট্রাম্প এই বিলে ভেটো দিলে মার্কিন সিনেট প্রেসিডেন্টের বিরুদ্ধে ইমপিচমেন্টের বিলও আনতে পারে। ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা যে হারে কমছে তাতে মার্কিন সিনেটে রিপাবলিকানদের ভোটেই ট্রাম্পকে পদত্যাগ করতে হতে পারে। ট্রাম্প নিশ্চয়ই তা চাইবেন না। সেক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকরা বলছেন, পুতিনের সাথে সম্পর্ক যেখানেই গিয়েই ঠেকুক রাশিয়ার ওপর নতুন নিষেধাজ্ঞা প্রশ্নে আনীত বিলে ট্রাম্প যে ভেটো দিচ্ছেন না, তা অনেকটাই নিশ্চিত। এদিকে আমেরিকার নেয়া পদক্ষেপের জবাবে ২৮ জুলাই মার্কিন কূটনীতিকের সংখ্যা কমানোর পাশাপাশি কয়েকটি কূটনৈতিক সম্পত্তি জব্দ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে রাশিয়া।