প্রতিবেদন

সম্ভাবনার নতুন দিগন্তে বাংলাদেশ-শ্রীলংকা দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক

আবদুল্লাহ হারুন জুয়েল : ‘সবার সাথে বন্ধুত্ব, কারও সাথে বৈরিতা নয়’Ñ এটি কূটনীতির পরিভাষা হলেও কোনো দেশের পররাষ্ট্রনীতির ভিত্তিতে পরিচালিত হয় না। কোনো রাষ্ট্র কতটা প্রজ্ঞা ও দূরদর্শিতার সাথে নীতি নির্ধারণ করে তার ওপরই নির্ভর করে দেশের উন্নয়ন এবং আন্তর্জাতিক ও অভ্যন্তরীণ রাজনীতি তথা সামগ্রিক প্রেক্ষাপট।
স্বাধীনতার পর বঙ্গবন্ধু তাঁর হিমালয়সম ব্যক্তিত্বের কারণে নিজেই একটি প্রতিষ্ঠানে রূপান্তরিত হয়েছিলেন। স্বাধীনতার ৩ মাসের মধ্যে মিত্রবাহিনীর দেশ ত্যাগের দৃষ্টান্ত ইতিহাসে নেই। তিনি দ্ব্যর্থহীনভাবে কোনো নির্দিষ্ট বলয়ে যুক্ত না হয়ে জোট নিরপেক্ষ অবস্থান নিয়েছিলেন। ’৭৫ পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশে মূলত পাকিস্তানের প্রভাব পরিলক্ষিত হয়, সম্পর্কের অবনতি হয় পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতের সাথে। দক্ষিণ এশীয় দেশগুলোর সাথে সম্পর্কের অগ্রগতি হয়েছে নামমাত্র।
১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর ভারতের সাথে সম্পর্কের অগ্রগতি পুনরায় শুরু হয়। দ্বিতীয় মেয়াদে ২০০৯ সাল থেকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যে কৌশল, আত্মবিশ্বাস ও প্রজ্ঞার সাথে পররাষ্ট্রনীতি নির্ধারণ করেন, ২০১৭ সালে এসে তা দূরদর্শিতার সাক্ষ্য দিচ্ছে। বাংলাদেশ ধাবিত হচ্ছে উন্নয়নের ঊর্ধ্বমুখী পথে। বিশ্বে অর্থনৈতিক মন্দাকালীন সময়ে ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়ে ২০১৬ পর্যন্ত মানব উন্নয়ন সূচকের যে উন্নয়ন ঘটেছে তা ১৯৯০ সালের সূচককে দ্বিগুণ করেছে। পার্শ্ববর্তী দেশের সাথে অগ্রগতির তুলনামূলক দৃষ্টান্ত দেয়া যায়; যেমন বাংলাদেশের গড় আয়ু ৭২ ছাড়িয়েছে, যা ভারত ও পাকিস্তানে ৬৬। শিশু মৃত্যুর হার বাংলাদেশে হাজারে ৩৭, অন্যদিকে ভারতে ৪৫ এবং পাকিস্তানে ৮১। বিশ্বমন্দার মধ্যে বিশ্বের গড় প্রবৃদ্ধি যেখানে ছিল ৫ দশমিক ৪ তা বাংলাদেশের ক্ষেত্রে ৬ থেকে ৭ এর মধ্যে স্থির ছিল, যা যুক্তরাষ্ট্রের প্রবৃদ্ধির চেয়েও বেশি। এভাবে শিক্ষা, মৃত্যুর হার, জন্মহার, লিঙ্গ বৈষম্য ও নারীর অধিকার, সুপেয় পানি, কৃষি খাতসহ সকল ক্ষেত্রে বাংলাদেশ সরকারের সাফল্য প্রশ্নাতীত ও বিশ্বের পর্যবেক্ষক সংস্থাগুলো দ্বারা স্বীকৃত।
উন্নয়নের ধারাবাহিকতায় গত কয়েক বছরে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর সাথে পারস্পরিক সম্পর্কের অগ্রগতি হয়েছে লক্ষণীয় মাত্রায়, তন্মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে শ্রীলংকা। ২০১০ সালে প্রথমবারের মতো ঢাকা-কলম্বো সরাসরি ফ্লাইট চালু হয়। ২০১১ সালের জানুয়ারিতে ঢাকায় ও ২০১৩-এর এপ্রিলে কলম্বোতে কূটনৈতিক পর্যায়ের এবং ২০১২-এর ফেব্র“য়ারিতে যৌথ অর্থনৈতিক কমিশনের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২০১৩-এর নভেম্বরে রাষ্ট্রীয় সফরে শ্রীলংকা সফর করেছিলেন। অন্যদিকে যে সিরিসেনাকে ২০১৩ ও ২০১৪ সালে স্বাস্থ্যমন্ত্রী থাকাকালে বাংলাদেশে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল, তিনি এ মাসে বাংলাদেশে এলেন শ্রীলংকার রাষ্ট্রপতি হিসেবে। বলার অপেক্ষা রাখে না যে, বাংলাদেশ-শ্রীলংকা দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের উন্নয়ন আরও শক্তিশালী হবে। ২০০৬-০৭ অর্থবছরে দু’দেশের বাণিজ্য ছিল প্রায় ২ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলার, বর্তমানে এর পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৮ বিলিয়ন ডলারে। শ্রীলংকার সাথে অনেক দেশের মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি থাকলেও বাংলাদেশের সাথে নেই। এ চুক্তি সম্পাদনে হাসিনা-সিরিসেনা ঐকমত্যে পৌঁছেছেন এবং এর ফলে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য ৬৭ শতাংশ বাড়বে বলে পর্যবেক্ষকদের ধারণা।
ইতঃপূর্বে দুই দেশের কূটনীতিক ও সরকারি কর্মকর্তাদের ভিসাবিহীন চলাচলের জন্য একটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল। সম্প্রতি শ্রীলংকার প্রেসিডেন্ট সিরিসেনার বাংলাদেশে ৩ দিনের রাষ্ট্রীয় সফরে দ্বিপাক্ষিক সহযোগিতা প্রসারে ১৪টি চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়। সহযোগিতার নতুন দিগন্ত উন্মোচনে দুদেশের যৌথ বিবৃতিতে যে চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয় তন্মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে কৃষি সহায়তা সমঝোতা স্মারক, সিলন শিপিং করপোরেশন ও বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশনের মধ্যে সমঝোতা স্মারক; বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড স্ট্র্যাটেজিক অ্যাফেয়ার্স (ইওওঝঅ) এবং লক্ষণ কাদিরাগামা ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল রিলেশনস অ্যান্ড স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজ (খকওওজঝঝ)-এর মধ্যে সমঝোতা স্মারক ইত্যাদি।
এছাড়া চলতি বছরের মধ্যে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি সম্পাদন, যৌথ অংশীদারিত্বে বিনিয়োগ, বিনিয়োগ সুরক্ষা, কর ও শুল্কসহ বাণিজ্যিক সম্পর্ক সহজীকরণে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার লক্ষ্যে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে শ্রীলংকা সফরের আমন্ত্রণ জানানো হয়।
উল্লেখ্য, বিনিয়োগ ও ব্যবসাবাণিজ্য প্রসারে ২০১১ সালে গঠিত হয় শ্রীলংকা বাংলাদেশ বিজনেস কো-অপারেশন কাউন্সিল। এরই ধারাবাহিকতায় উভয় দেশের ব্যবসায়ী ফোরামের প্রতিনিধিরা বৈঠক, আলোচনা ও সহযোগিতা অব্যাহত রেখেছেন। শ্রীলংকার ৪৫টি কোম্পানি বাংলাদেশে প্রায় ৩০০ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করে এবং বাংলাদেশের ৬টি কোম্পানি শ্রীলংকায় ২০ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করেছে।
শ্রীলংকা থেকে বাংলাদেশে আমদানি পণ্যগুলোর মধ্যে নারিকেল থেকে তৈরি দ্রব্য, প্রাকৃতিক রাবার, পশু, ভোজ্যপণ্য ও তেল, প্লাস্টিক, শিল্প প্রতিষ্ঠানে ব্যবহৃত কেমিক্যাল, ব্যাগ, পাটের ফেব্রিকস ও পেট্রোলিয়াম দ্রব্য অন্যতম। বাংলাদেশ অ্যাপারেল সামগ্রী ও ফার্মাসিউটিক্যালসের মাধ্যমে রপ্তানি শুরু করেছিল। বর্তমানে রপ্তানি পণ্যের মধ্যে নিটওয়্যার, ওভেন গার্মেন্টস, টেক্সটাইল, কৃষিপণ্য, হিমায়িত খাদ্য, চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, কটন, কাঁচাপাট ও পাটজাত দ্রব্য, বাইসাইকেলসহ আরো কিছু পণ্য রপ্তানি করছে। শ্রীলংকার বাজারে বাংলাদেশের ফার্মাসিউটিক্যালস ও গার্মেন্টস শিল্পের ভবিষ্যৎ সম্ভাবনাময়।
দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলো ভৌগোলিক সীমারেখায় আলাদা হলেও ইতিহাস-ঐতিহ্য, সংস্কৃতি, ভাষা, গণতন্ত্র ও আঞ্চলিক মৈত্রী এবং আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে পারস্পরিক সহযোগিতার সামগ্রিক বিবেচনায় একটি শক্তিশালী সম্পর্কের ভিত্তি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। ১৯৭২ সালে স্বাধীনতার স্বীকৃতি ও ১৯৭৫ সালে এশিয়া প্যাসিফিক ট্রেড অ্যাগ্রিমেন্টের মাধ্যমে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের যে সূচনা হয় তা পরবর্তীতে বিভিন্ন আঞ্চলিক জোট যেমন সার্ক, সাপটা ও সাফটা, ইন্ডিয়ান ওশ্যান রিম কো-অপারেশন, এশিয়া কো-অপারেশন ডায়ালগ, বিমসটেক এবং আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে কমনওয়েলথ, জাতিসংঘসহ বিভিন্ন সংস্থায় সহযোগী হিসেবে ক্রমে আজ একটি দৃঢ়তর বন্ধুত্বের বন্ধনে আবদ্ধ হয়েছে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে নির্দিষ্ট কয়েকটি দেশের সাথে পারস্পরিক স্বার্থ সংশ্লিষ্ট বিষয়ে সম্পর্ক সীমাবদ্ধ না রেখে আরও বেশি সংখ্যক দেশের সাথে সম্পর্কোন্নয়ন ঘটলে বিভিন্ন ক্ষেত্রে নির্ভরশীলতা ও সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে তুলনামূলকভাবে বেশি সুযোগ-সুবিধা আদায় করা সহজতর হয়। আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে এ সম্পর্ক কিভাবে, কোন উপায়ে এবং বিশ্বের কূটনৈতিক মেরুকরণের সমীকরণে কোন কৌশলে পররাষ্ট্রনীতি পরিচালিত হবে তা একটি সরকারের যোগ্যতা ও সাফল্যের অন্যতম মাপকাঠি। আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে যে লক্ষ্য নিয়ে বাংলাদেশ এগিয়ে যাচ্ছে নিঃসন্দেহে তা প্রগতি, সমৃদ্ধি ও উন্নয়ন তথা সফল কূটনীতির বার্তা বহন করছে।