প্রতিবেদন

হজ কার্যক্রম-২০১৭ উদ্বোধনকালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা : শান্তির ধর্ম ইসলামের নামে সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদকে প্রশ্রয় দেয়া হবে না

নিজস্ব প্রতিবেদক : প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গত ২২ জুলাই হজ কর্মসূচির আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন করেন। এরপর সৌদি আরবের জেদ্দার উদ্দেশে ঢাকা ছেড়েছে এবারের প্রথম হজ ফ্লাইট। ২৪ জুলাই সকাল ৭টা ৫৪ মিনিটে ৪১৮ জন হজযাত্রী নিয়ে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের ফ্লাইটটি ঢাকা ত্যাগ করে। বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী রাশেদ খান মেনন ও ধর্মমন্ত্রী অধ্যক্ষ মতিউর রহমান এ সময় বিমানবন্দরে উপস্থিত থেকে হজ ফ্লাইটের উদ্বোধন করেন। হজযাত্রীদের পরিবহনের জন্য নিয়মিত ফ্লাইটের পাশাপাশি দুটি অতিরিক্ত ফ্লাইট একই দিন সকাল ১১টা ৫৫ মিনিটে ও বিকেল ৫টা ৫৫ মিনিটে জেদ্দার উদ্দেশে ঢাকা ছাড়ে। এছাড়া রাত ৮টা ৪০ মিনিটের নিয়মিত ফ্লাইটেও আরো কিছু হজযাত্রী জেদ্দার উদ্দেশে ঢাকা ত্যাগ করে। রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন বিমান বাংলাদেশ এয়ার লাইনস হজযাত্রী নেয়ার জন্য মোট ১৭৭টি হজ ফ্লাইট পরিচালনা করছে। এর মধ্যে ১৪৪টি অনিয়মিত ও ৩৩ নিয়মিত ফ্লাইট এবং ফিরতি ফ্লাইট হিসেবে ১৬৯টির মধ্যে নিয়মিত ৩০টি ফ্লাইট এবং অনিয়মিত ১৩৯টি ফ্লাইট পরিচালিত হবে। বিমান আগামী ৬ সেপ্টেম্বর থেকে ফিরতি হজ ফ্লাইট শুরু করবে এবং তা ৫ অক্টোবর শেষ হবে। বাংলাদেশ থেকে এ বছর ১ লাখ ২৭ হাজার ১৯৮ জন হজযাত্রী পবিত্র হজব্রত পালনে সৌদি আরব যাচ্ছেন। এ বছর বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস মোট ৬৩ হাজার ৫৯৯ জন হজযাত্রী পরিবহন করছে, আর অবশিষ্ট হজযাত্রীদের পরিবহন করছে সৌদি এয়ারলাইনস।
এদিকে বাংলাদেশ থেকে ৪১৮ জন যাত্রী নিয়ে হজের প্রথম ফ্লাইট সৌদি আরবের জেদ্দা বিমানবন্দরে পৌঁছেছে। ২৪ জুলাই সৌদি সময় বেলা ১১টা ১২ মিনিট ও বাংলাদেশ সময় বেলা ২টা ১২ মিনিটে জেদ্দার কিং আবদুল আজিজ বিমানবন্দরের রানওয়েতে নামে ফ্লাইটটি। বিমানবন্দরে হজযাত্রীদের স্বাগত জানাতে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত ছাড়াও সৌদি সিভিল অ্যাভিয়েশনের বিভিন্ন কর্মকর্তাসহ দুই দেশের উচ্চ পর্যায়ের কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী রাশেদ খান মেনন জানান, নির্ধারিত সময়ে নির্বিঘেœ হজ ফ্লাইট পরিচালনার জন্য তার মন্ত্রণালয় সব ধরনের প্রস্তুতি গ্রহণ করেছে। হজযাত্রীদের যেকোনো ধরনের হয়রানি বন্ধে তার মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্টরা নিরলসভাবে কাজ করছে। টিকেট বা অন্য কোনো সেবা সংক্রান্ত অনিয়ম দেখা দিলে তার বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেয়া হবে।
উল্লেখ্য, এর আগে প্রধানমন্ত্রী ২২ জুলাই রাজধানী ঢাকার কুর্মিটোলা বিমানবন্দর এলাকার আশকোনা হজ ক্যাম্পে এ বছরের হজ কর্মসূচির উদ্বোধন অনুষ্ঠানে সব ধর্মাবলম্বী মানুষ যাতে শান্তিতে বসবাস করে দেশের উন্নয়নে ভূমিকা রাখতে পারে, সে জন্য দোয়া করতে হজযাত্রীদের প্রতি আহ্বান জানান। শেখ হাসিনা বলেন, আপনারা পবিত্র জায়গায় যাচ্ছেনÑ দোয়া করবেন, যেন এই বাংলাদেশে আমাদের ধর্মে যারা বিশ্বাসী এবং সাথে সাথে অন্য ধর্মে যারা বিশ্বাসী তারা যেন শান্তিপূর্ণভাবে সহাবস্থান করতে পারে। ধর্মের নামে যারা বিভ্রান্তির পথে যাচ্ছে, আল্লাহ যেন তাদের সুপথে আসার পথ করে দেন। আমাদের দেশের মানুষ যেন একটু শান্তিতে বসবাস করতে পারে এবং উন্নয়নের গতিধারাটা যেন আমরা অব্যাহত রাখতে পারি।
শান্তির ধর্ম ইসলামের নামে সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদকে প্রশ্রয় দেয়া হবে নাÑ কঠোর এই হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমাদের দেশের মানুষ শান্তিতে থাকুক, সেটাই আমরা চাই। যারা আগুন দিয়ে পুড়িয়ে মানুষ হত্যা করে, তাদের যেন আল্লাহ রাব্বুল আলামিন বিচার করার শক্তি দেন এবং তাদের মনমানসিকতা যেন পাল্টে দেন। তাদের যেন হেদায়েত করেন, সেটাই আমরা চাই। আমাদের পবিত্র ধর্ম, মানবতার ধর্ম ইসলামের বদনাম যেন কেউ করতে না পারে। জঙ্গি ও সন্ত্রাসবাদ প্রশ্নে তাঁর সরকারের জিরো টলারেন্স নীতির কথা পুনরুল্লেখ করে শেখ হাসিনা বলেন, ধর্মে কোথাও বলে না যে কেউ আত্মঘাতী হলেই বেহেশতে চলে যাবে। কিন্তু এই বিভ্রান্তিটা সৃষ্টি করা হচ্ছে। আমরা চাই না যে আমাদের দেশ কোনো বিভ্রান্তির মধ্যে থাকুক। জাতির পিতার ভাষণের উদ্ধৃতি দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ১৯৭২ সালের ৪ নভেম্বর গণপরিষদে দেয়া ভাষণে জাতির পিতা বলেছিলেন, পবিত্র ধর্মকে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা চলবে না। শেখ হাসিনা বলেন, আওয়ামী লীগ কখনোই ধর্ম নিয়ে রাজনীতি করেনি বরং সবসময় ইসলামের পৃষ্ঠপোষকতা করেছে।
প্রধানমন্ত্রী হজযাত্রীদের উদ্দেশে বলেন, এ দেশের মানুষের একসময় এমন অবস্থা ছিল যে একবেলাও খেতে পারত না। থাকার একটা ঘর ছিল না। বিদেশ থেকে পুরনো কাপড়, মানুষের ব্যবহৃত পুরনো কাপড় এনে তাদের পরতে দেয়া হতো। যে কষ্টটা দেখে আমার বাবা সারাটা জীবন সংগ্রাম করেছেন, এই দুঃখী মানুষের কথা বলেছেন। তাদের কথা যতবার বক্তৃতায় বলতে গেছেন ততবারই তাঁর বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। তাঁকে বারবার কারাগারে যেতে হয়েছে।
তাঁর সরকারের সময় হজযাত্রী প্রতি বছর বৃদ্ধি পাচ্ছে উল্লেখ করে শেখ হাসিনা বলেন, ২০০৬ সালে হজযাত্রী ছিলেন ৪৭ হাজার ৯৮৩ জন। এ বছর হজযাত্রী হচ্ছেন ১ লাখ ২৭ হাজার ১৯৮ জন। প্রধানমন্ত্রী বলেন, ইনশাআল্লাহ এবার বাংলাদেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চসংখ্যক হাজি হজ পালন করবেন।
শেখ হাসিনা বলেন, ১৯৮৫ সাল থেকে তিনি একাধিকবার হজ পালন করেছেন। সে জন্য হজ ব্যবস্থাপনায় সমস্যাগুলো নিজেই অনুধাবন করেছেন। তাই যখনই সরকার গঠন করেছেন সে সমস্যাগুলো সমাধানে পদক্ষেপ নিয়েছেন। হজ উইংয়ের অফিস জেদ্দা থেকে মক্কার বাংলাদেশ হজ মিশনে স্থানান্তর করা সংক্রান্ত তাঁর সরকারের পদক্ষেপের উল্লেখ করে শেখ হাসিনা বলেন, আমরা মক্কার হজ মিশনকে শক্তিশালী করেছি।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমরা ২০১০ সালে গৃহীত জাতীয় হজনীতিকে আরো যুগোপযোগী ও তথ্যপ্রযুক্তি নির্ভর করে জাতীয় হজ ও ওমরাহ নীতি-২০১৬ প্রণয়ন করেছি। এই নীতির আলোকেই বর্তমানে হজ ব্যবস্থাপনা পরিচালিত হচ্ছে এবং আমরাই তথ্যপ্রযুক্তির সর্বোচ্চ প্রয়োগ নিশ্চিত করে ডিজিটাল হজ ব্যবস্থাপনার সূচনা করেছি। হজ বিষয়ক ওয়েব পোর্টাল িি.িযধলল.মড়া.নফ-তে ক্লিক করলেই আপনারা সব তথ্য পাচ্ছেন। হজ নিয়ে মোবাইল অ্যাপস চালু করা হয়েছে। মোবাইলে এসএমএসের মাধ্যমেও প্রত্যাশিত তথ্য পাচ্ছেন। হজযাত্রীদের রেজিস্ট্রেশন ডিজিটালাইজড করার পাশাপাশি বছরব্যাপী রেজিস্ট্রেশন সিস্টেম উন্মুক্ত করে প্রাক-নিবন্ধন প্রক্রিয়া চালুর ফলে প্রতারণা বন্ধ হয়েছে।
শেখ হাসিনা বলেন, আমাদের অধিকাংশ হজযাত্রী জেদ্দা হজ টার্মিনালে অবতরণ করে থাকেন। সরকার জেদ্দা হজ টার্মিনালে প্লাজা ভাড়া নিয়েছে। এতে প্রশাসনিক, চিকিৎসা, আইটি সেবাসহ বিভিন্ন প্রয়োজনে হজযাত্রীরা সেবা ও সুবিধা পাচ্ছেন। আগামীতেও হজ ব্যবস্থাপনায় সফলতার ধারা অব্যাহত থাকবে উল্লেখ করে শেখ হাসিনা বলেন, বেসরকারি হজ এজেন্সি এবং তাদের সংগঠন হাবকে (এইচএএবি) সুসংগঠিত করা হয়েছে। আমরা হজে অব্যবস্থাপনার অভিযোগে অভিযুক্ত হজ এজেন্সিগুলোকে আইনের আওতায় এনে শাস্তি প্রদান করেছি। কোনো ব্যত্যয় হলে তাৎক্ষণিকভাবে ব্যবস্থা নিচ্ছি। গত সাড়ে ৮ বছরে আমাদের বহুমাত্রিক পদক্ষেপ ও কর্মকা-ের মাধ্যমে হাজিদের সর্বোচ্চ সেবা প্রাপ্তি নিশ্চিত করেছি।
বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের আমলে হজ ব্যবস্থাপনায় চরম দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনার কথা উল্লেখ করে শেখ হাসিনা বলেন, জোট সরকার হাজিদের দুর্দশা লাঘবে কার্যকরী কোনো উদ্যোগ নেয়নি। ২০০৯ সালে সরকার গঠন করে প্রথমেই হজ ব্যবস্থাপনায় অতীতের সব অনিয়ম ও বিশৃঙ্খলা দূর করা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী ভাষণের শুরুতেই একজন খাঁটি মুসলমান হিসেবে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু ইসলামের কল্যাণে যে অসামান্য অবদান রেখে যান তাঁর একটি খ-চিত্র তুলে ধরে তাঁরই আদর্শের আলোকে দেশ পরিচালনা করছেন বলেও উল্লেখ করেন। শেখ হাসিনা বলেন, জাতির পিতা মুসলিম বিশ্বসহ আরব দেশগুলোর সঙ্গে সুসম্পর্ক স্থাপন করেছিলেন। তাঁর দূরদর্শিতায় বাংলাদেশ ১৯৭৪ সালে ওআইসির সদস্যপদ লাভ করে। মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দিতে শুরু করে।
শেখ হাসিনা বলেন, জাতির পিতা নিজে ইসলামিক ফাউন্ডেশন ও মাদ্রাসা বোর্ড প্রতিষ্ঠা করেন, কাকরাইল মসজিদের জন্য এবং বিশ্ব ইজতেমার জন্য টঙ্গীতে জায়গা প্রদান করেন এবং বিশ্ব ইজতেমা এ দেশে আয়োজনের বন্দোবস্ত করেন। তিনিই প্রথম আইন করে মদ নিষিদ্ধ করেন। ঘোড়দৌড় ও জুয়া বন্ধ করেন। বেতার ও টেলিভিশনে অনুষ্ঠানের শুরু ও সমাপ্তিতে কোরআন তিলাওয়াতের প্রচলন করেন।
শেখ হাসিনা বলেন, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ যখনই সরকার গঠন করেছে জাতির পিতার আদর্শ অনুসরণ করে ইসলামের কল্যাণ ও প্রসারে কাজ করেছে। তাঁর সরকারই প্রথম পবিত্র আল কোরআনের ডিজিটাল ভার্সন চালু, মাদ্রাসা শিক্ষাকে আধুনিকায়ন, কওমি মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের মূলধারার সঙ্গে সম্পৃক্ত এবং মসজিদভিত্তিক শিশু ও গণশিক্ষা কার্যক্রম পুনরায় চালু করে। এতে হাজার হাজার আলেম-ওলামার কর্মসংস্থান হয়েছে। প্রত্যেক জেলা ও উপজেলায় একটি করে মোট ৫৬০টি মডেল মসজিদ ও ইসলামিক সাংস্কৃতিক কেন্দ্র নির্মাণ করা হবে বলেও জানান প্রধানমন্ত্রী।
বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী রাশেদ খান মেনন, স্থানীয় সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট সাহারা খাতুন, ধর্ম মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির চেয়ারম্যান বজলুল হক হারুন, সৌদি দূতাবাসের ডেপুটি কাউন্সিলর সালেহ আল মুতাইরি অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথির বক্তব্য দেন। ধর্মমন্ত্রী অধ্যক্ষ মতিউর রহমান অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন। অর্থ মন্ত্রণালয়ের সচিব আব্দুল জলিল অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য দেন। পরে দেশ ও জাতির বৃহত্তর ঐক্য ও শান্তি কামনা করে অনুষ্ঠানে বিশেষ মোনাজাত করা হয়।