রাজনীতি

অনুকূল রাজনৈতিক পরিবেশেও খালেদা-তারেকের অনুপস্থিতিতে অভিভাবকহীন বিএনপি

নিজস্ব প্রতিবেদক : অনির্দিষ্টকালের সফরে লন্ডন গেছেন বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া। তিনি কবে ফিরবেন, জানেন না দলের কোনো নেতা। সফরে যাওয়ার আগে বিএনপির নেতৃত্বে ভারপ্রাপ্ত হিসেবে কাউকে দায়িত্ব দিয়ে যাননি তিনি। বিএনপি থেকে বলা হয়েছে, তাদের গঠনতন্ত্রে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান বা চেয়ারপারসন বলে কোনো ধারা নেই বলেই খালেদা জিয়া কাউকে দায়িত্ব না দিয়ে লন্ডন গেছেন। বিএনপির গঠনতন্ত্র অনুযায়ী চেয়ারপারসন সাময়িকভাবে দায়িত্ব পালন করতে না পারলে বা তার অনুপস্থিতিতে সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান দলীয় প্রধানের দায়িত্ব পালন করবেন। বিএনপির সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান হলেন তারেক রহমান। কিন্তু তিনিও লন্ডনে। এই অবস্থায় কার্যত নেতৃত্বহীন হয়ে পড়েছে বিএনপি।
মতাসীন আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা দেশের বাইরে গেলে ভারপ্রাপ্ত সভাপতি হিসেবে একজনকে মনোনীত করে যান। তবে বিএনপিতে এই রীতি নেই। দলের নেতারা জানান, খালেদা জিয়া ১৯৯১ সালে মতায় থাকাকালে দেশের বাইরে যাওয়ার সময় মির্জা গোলাম হাফিজকে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের দায়িত্ব দিয়েছিলেন। এরপর আর কখনো সাময়িক অনুপস্থিতির সময় কাউকে দায়িত্ব দেয়ার নজির নেই।
বিএনপির গঠনতন্ত্রের ৮ (খ) অনুচ্ছেদে দলের চেয়ারম্যানের কর্তব্য, মতা ও দায়িত্ব সম্পর্কে বলা হয়েছে দলের প্রধান কর্মকর্তা হিসেবে চেয়ারম্যান দলের সর্বময় কার্যাবলি নিয়ন্ত্রণ, তদারক ও সমন্বয় সাধন করবেন এবং তদুদ্দেশ্যে জাতীয় কাউন্সিল, জাতীয় স্থায়ী কমিটি, জাতীয় নির্বাহী কমিটি, বিষয় কমিটিসমূহ এবং চেয়ারম্যান কর্তৃক মনোনীত অন্যান্য কমিটিসমূহের ওপর কর্তৃত্ব করবেন এবং তাদের কার্যাবলির নিয়ন্ত্রণ, তদারক ও সমন্বয় সাধন করবেন।
আর উপধারা গ-তে সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যানের কর্তব্য, মতা ও দায়িত্ব সম্পর্কে বলা হয়েছে, সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান দায়িত্ব পালনে চেয়ারম্যানকে সহযোগিতা করবেন এবং চেয়ারম্যান কর্তৃক অর্পিত যেকোনো দায়িত্ব পালন করবেন। চেয়ারম্যানের সাময়িক অনুপস্থিতিতে তিনি দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান হিসেবে চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করবেন। এছাড়া যেকোনো কারণে চেয়ারম্যানের পদ শূন্য হলে সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান চেয়ারম্যানের অবশিষ্ট মেয়াদের জন্য চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করবেন। কিন্তু খালেদা জিয়া এবং সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমান দুজনই দেশে অনুপস্থিত। তাহলে গঠনতন্ত্র অনুযায়ী দলের নেতৃত্বে কি শূন্যতা বিরাজ করছে?Ñ এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী স্বদেশ খবরকে বলেন, এমনটা হবে কেন? চেয়ারপারসন দেশের বাইরে আছেন ঠিকই কিন্তু দলের নেতৃত্ব দিতে অসুবিধার কিছু নেই। অসুবিধা হচ্ছেও না। কারণ তথ্যপ্রযুক্তির উৎকর্ষতার এই যুগে আপনি চাইলে যখন যাকে প্রয়োজন মুহূর্তের মধ্যে তার সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ কথাবার্তা বলা যায়। সিদ্ধান্ত দেয়া যায়। কিন্তু গঠনতন্ত্র অনুযায়ী চেয়ারপারসনের অনুপস্থিতিতে তো সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালনের কথা। তিনিও তো বিদেশেÑ এমন মন্তব্যে রিজভী বলেন, দলের স্থায়ী কমিটির সদস্যদের যার যার দায়িত্ব তাকে দেয়া আছে। সুতরাং নেতৃত্বে কোনো সমস্যা নেই। দলের কার্যক্রম চলছে। আমরা প্রতিনিয়ত আপনাদের (সাংবাদিক) সঙ্গে কথা বলছি। সুতরাং অসুবিধার কিছু নেই।
সমালোচকরা বলছেন, সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বললেই যদি একটি দলের চলে তাহলে তেমন কথা নেই। বিএনপি নেতাদের কার্যক্রম তাদের কথার মতোই প্রেসনোট নির্ভর হয়ে পড়েছে। খালেদা জিয়াও হয়ত মনে করেন, গণমাধ্যমে নিয়ম করে প্রেসনোট পাঠালেই হলো। চেয়ারপারসন, ভাইস চেয়ারম্যান কারোরই দেশে থাকার কোনো প্রয়োজন নেই। আর সে জন্যই তিনি দলকে নেতৃত্বশূন্য রেখে নিশ্চিন্তে লন্ডন চলে গেছেন।
খালেদা জিয়া নিশ্চিন্তে লন্ডন গেলেও দলীয় নেতাকর্মীরা আছেন চরম অনিশ্চয়তায়। তৃণমূলের নেতাকর্মীরা ভাবছেন, তারা এখন অভিভাবকহীন। আবার অনেকে দেখছেন, বিএনপিতে এখন অভিভাবকের ছড়াছড়ি। বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতাদের আচরণ দেখে মনে হয়, খালেদা জিয়া যেন তাকেই অঘোষিতভাবে দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারপারসনের দায়িত্ব দিয়ে গেছেন। বিএনপির তৃণমূলের নেতারা দেখছেন, বিএনপির স্থায়ী কমিটির সবাই যেন একেকজন ভারপ্রাপ্ত ভাইস চেয়ারম্যান। এসব দেখে তারা যতটা না অবাক হচ্ছেন, তার চেয়ে বেশি হচ্ছেন হতাশ। কারণ তারা মোটামুটি নিশ্চিত হয়ে গেছেন সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যানের মতো দলের চেয়ারপারসনও অনির্দিষ্টকালের জন্য দেশত্যাগ করেছেন।
খালেদা জিয়ার অনুপস্থিতিতে তৃণমূলের অনেক নেতাকর্মীই সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে অভিভাবক হিসেবে দেখছিল। কিন্তু তারেক রহমানকে নিয়ে তারা আছেন ধাঁধার মধ্যে। বিএনপির একটি অংশের কাছে তারেক রহমান জনপ্রিয় নেতা। কিন্তু দলটির নীতিনির্ধারকদের কেউ কেউ এবং কেন্দ্রীয় ও মাঠ পর্যায়ের কিছু জ্যেষ্ঠ নেতা তাকে পছন্দ করেন না। এই নেতারা মনে করেন, তাদের সঙ্গে তারেক রহমান রাজনীতি করতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করবেন না। সে েেত্র হয় তাদের রাজনীতি থেকে সরে দাঁড়াতে হবে, নয়তো আত্মসম্মান বিসর্জন দিয়ে কোনোমতে দলে টিকে থাকতে হবে। বিএনপির এই বলয়ের নেতাদের কেউ কেউ অবসরে যাওয়ার কথাও ভাবছেন। বিএনপির ১৯ সদস্যবিশিষ্ট স্থায়ী কমিটির কয়েকজন সদস্যের তারেক রহমানের নেতৃত্বে রাজনীতি করা নিয়েও অস্বস্তি আছে। এছাড়া ঢাকা মহানগর ও কেন্দ্রীয় কিছু নেতাও বিভিন্ন সময়ে এমন অস্বস্তি প্রকাশ করেছেন। তারেক নিজেও এই নেতাদের এড়িয়ে চলেন। জেলা পর্যায়ের কিছু প্রবীণ নেতাকে ইতোমধ্যে জেলা কমিটি থেকে সরিয়ে দেয়া হয়েছে। তাদের কমিটির উপদেষ্টা করা হয়েছে।
তারেক রহমানকে অপছন্দ করার কারণ হিসেবে কয়েকজন নেতা বলেছেন, তারেকের বন্ধুমহলটা ভালো নয়। কিন্তু তারেক রহমান এদের প্রতি খুবই আকৃষ্ট ও উদার। তারেকের এই বন্ধুমহল বলতে তৎকালীন হাওয়া ভবনের লোকদের প্রতিই ইঙ্গিত করেছেন তারা। পাশাপাশি ছোট ছোট ইসলামি সংগঠনকে পাশে রাখার ব্যাপারটিও এই নেতাদের মধ্যে অস্বস্তি তৈরি করে। আর তারেক রহমানকে যারা পছন্দ করেন, তাদের বেশিরভাগই অপোকৃত তরুণ। আর্থিক সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত হওয়া এবং সর্বোপরি জ্যেষ্ঠ নেতাদের হটিয়ে দলের গুরুত্বপূর্ণ পদে যাওয়ার সুযোগ পাওয়ার সমূহ সম্ভাবনা থাকায় এ অংশটি তারেক রহমানকে পছন্দ করেন।
তবে সে যা-ই হোক, চেয়ারপারসনের অনুপস্থিতিতে বিএনপির তৃণমূলের নেতাকর্মীরা এতদিন দলের হাল ধরার জন্য সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যানের কথা ভাবলেও দুজনের অনুপস্থিতিতে দলের হাল কে ধরবে, তা নিয়ে এখন শঙ্কিত। তাছাড়া দলের তৃণমূলের অনেকেই মনে করেন দেশে বর্তমানে অনুকূল রাজনৈতিক পরিস্থিতি বিরাজ করলেও শীর্ষ নেতৃত্বের অভাবে বিএনপি সমসাময়িক রাজনৈতিক দৌড়ে বেশ পিছিয়ে পড়ছে।