প্রতিবেদন

একনেকে ১১ প্রকল্প অনুমোদন : চট্টগ্রামের জলাবদ্ধতা নিরসনের নির্দেশ প্রধানমন্ত্রীর

নিজস্ব প্রতিবেদক : জলাবদ্ধতা থেকে বন্দরনগরী চট্টগ্রামের মানুষকে পরিত্রাণ দিতে সাড়ে ৫ হাজার কোটি টাকারও বেশি ব্যয়ে একটি প্রকল্প অনুমোদন দিয়েছে সরকার। ৯ আগস্ট রাজধানীর শেরেবাংলা নগরের এনইসি সম্মেলন কে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় ৫ হাজার ৬১৬ কোটি টাকা ব্যয়ে চট্টগ্রামের জলাবদ্ধতা নিরসন সংক্রান্ত প্রকল্পটির অনুমোদন দেয়া হয়। বৈঠকে প্রকল্পটি সুষ্ঠুভাবে বাস্তবায়নের জন্য স্থানীয় সরকার পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী খন্দকার মোশাররফ হোসেনকে সভাপতি করে একটি কমিটি গঠন করা হয়। এ কমিটির কাজ হবে চট্টগ্রামের ৪টি সংস্থার মধ্যে সমন্বয় সাধন করা। এক সংস্থার সঙ্গে যাতে আরেক সংস্থার কাজে দ্বৈধতা তৈরি না হয়, সেটি দেখভাল করা।
একনেক সভায় চট্টগ্রামের জলাবদ্ধতা নিরসনসহ মোট ১১টি প্রকল্প অনুমোদন দেয়া হয়েছে। এসব প্রকল্প বাস্তবায়নে মোট ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ৯ হাজার ৭৬১ কোটি টাকা। সভাশেষে পরিকল্পনামন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল সাংবাদিকদের জানান, মোট প্রকল্প ব্যয়ের মধ্যে সরকারি তহবিল (জিওবি) হতে প্রায় ৮ হাজার ২৬৮ কোটি টাকা, সংস্থার নিজস্ব তহবিল হতে ৭০৩ কোটি এবং বৈদেশিক সহায়তা থেকে পাওয়া যাবে ৭৯০ কোটি টাকা।
পরিকল্পনামন্ত্রী বলেন, চট্টগ্রাম শহরের জলাবদ্ধতা নিরসনে খাল পুনঃখনন, সম্প্রসারণ, সংস্কার ও উন্নয়ন প্রকল্পটি চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপ (চউক) বাস্তবায়ন করবে। তবে দ্বৈধতা ও পুনরাবৃত্তি পরিহার এবং সমন্বয় সাধনের জন্য চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন এবং পানি উন্নয়ন বোর্ডের সঙ্গে পরামর্শ করে প্রকল্প বাস্তবায়নের নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। ২০১৭ সালের জুলাই মাসে শুরু হয়ে ২০২০ সালের জুন মাসের মধ্যে সরকার নিজের টাকায় এই প্রকল্প বাস্তবায়ন করবে।
জানা গেছে, এই প্রকল্পের আওতায় চট্টগ্রামের ৩৬টি খালের ৫ লাখ ২৮ হাজার ঘনমিটার মাটি খনন করা হবে। একই সঙ্গে সোয়া ৪ লাখ ঘনমিটার কাদা অপসারণ করা হবে। অন্যদিকে ৮৫ কিলোমিটার পাকা রাস্তা নির্মাণ করা হবে। অর্ধশতাধিক সেতু ও কালভার্ট তৈরি করা হবে। এর পাশাপাশি বন্যার পানি সংরণের জন্য তিনটি জলাধারও নির্মাণ করা হবে। প্রকল্প প্রস্তাবে বলা হয়েছে, এই প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য হলো শহরের জলাবদ্ধতা দূর করা, খালের পারে রাস্তা নির্মাণের পাশাপাশি খাল পরিষ্কার রাখার স্থায়ী ব্যবস্থা করা এবং বৃষ্টির পানি দ্রুত নিষ্কাশনের জন্য ড্রেনেজ ব্যবস্থা শক্তিশালী করা। এই প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে বৃষ্টি ও জোয়ারের জলাবদ্ধতা থেকে চট্টগ্রাম শহর স্থায়ীভাবে মুক্ত হবে।
পরিকল্পনামন্ত্রী বলেন, প্রধানমন্ত্রী নির্দেশ দিয়েছেন কোনো প্রকল্পের কারণে যদি সাধারণ মানুষের জীবন-জীবিকা প্রভাবিত হয়, সেেেত্র তাদের উপযুক্ত তিপূরণ, পুনর্বাসন এবং তিগ্রস্ত পরিবারের ন্যূনতম একজন সদস্যের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে হবে। মহেশখালী পাওয়ার হাব নির্মাণ প্রকল্পের কারণে তিগ্রস্ত লবণচাষিদের পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করার নির্দেশও দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। সভায় প্রায় ৬৩ কোটি টাকা ব্যয়ে ‘আগারগাঁওস্থ শেরেবাংলা নগরে পর্যটন ভবন নির্মাণ প্রকল্প’ অনুমোদন পেয়েছে। এ প্রসঙ্গে আ হ ম মুস্তফা কামাল বলেন, বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশন এবং বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ডের জন্য ১৩তলা বিশিষ্ট একটি দৃষ্টিনন্দন ভবন গড়ে তোলা হবে। দেশের পর্যটন শিল্পের বিকাশে এ দুটি প্রতিষ্ঠান আরও বেশি ভূমিকা রাখতে পারবে। সভায় যমুনা নদীর তীর সংরণের জন্য দুটি নতুন প্রকল্পে অনুমোদন দেয়া হয়েছে। এগুলো হলোÑ জামালপুর জেলার ইসলামপুর উপজেলাধীন বেলগাছা ইউনিয়নের কুলকান্দি ও গুঠাইল হার্ডপয়েন্টের মধ্যবর্তী যমুনা নদীর বাম তীর রা প্রকল্প এবং জামালপুর জেলার সরিষাবাড়ী উপজেলাধীন যমুনা নদীর বামতীর সংরণের মাধ্যমে ভুয়াপুর-তারকান্দি সড়ক রা প্রকল্প। ইসলামপুরে প্রস্তাবিত প্রকল্পটির মেয়াদ ধরা হয়েছে জুলাই ২০১৭ থেকে জুন ২০২০ পর্যন্ত।
সভায় অনুমোদিত অন্য প্রকল্পগুলো হলোÑ ‘মহেশখালী পাওয়ার হাব-এর ভূমি অধিগ্রহণ প্রকল্প, এর ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ১ হাজার ৩২৫ কোটি টাকা। ফেরি ও পন্টুন নির্মাণ প্রকল্প (২য় পর্যায়), এর ব্যয় ধরা হয়েছে ৩৯৯ কোটি ৭১ লাখ টাকা। রাজাপুর-কাঁঠালিয়া-আমুয়া-বামনা-পাথরঘাটা মহাসড়ক উন্নয়ন প্রকল্প, এর ব্যয় ধরা হয়েছে ১১৪ কোটি ৪১ লাখ টাকা। কেরানীহাট-সাতকানিয়া-গুনাগরী জেলা মহাসড়ক প্রশস্তকরণ ও উন্নয়ন প্রকল্প, এর ব্যয় ধরা হয়েছে ৭৯ কোটি ১৯ লাখ টাকা। প্রথম সংশোধিত পল্লী জীবিকায়ন প্রকল্প (২য় পর্যায়), এর ব্যয় ৫৬৯ কোটি ৫১ লাখ টাকা। সৌরশক্তি ও পানিসাশ্রয়ী আধুনিক প্রযুক্তি সম্প্রসারণের মাধ্যমে ফসল উৎপাদন বৃদ্ধি প্রকল্প, এর ব্যয় ধরা হয়েছে ৬৫ কোটি ৭০ লাখ টাকা। এক্সপোর্ট কম্পিটিটিভনেস ফর জবস প্রকল্প, এর ব্যয় ধরা হয়েছে ৯৪১ কোটি টাকা।
২ আগস্ট অনুষ্ঠিত এর আগের একনেক সভায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সংশ্লিষ্টদের নদীভাঙন রোধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দেন। সংশ্লিষ্টদের কাছে সারাদেশে নদীভাঙন ও নদী রা বাঁধের হিসাব চান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। সাম্প্রতিক সময়ে বন্যায় দেশের বিভিন্ন জেলায় নদীভাঙনের কারণে য়তির পুরো তথ্যচিত্র জমা দিতে পানিসম্পদমন্ত্রী ব্যারিস্টার আনিসুল ইসলাম মাহমুদকে নির্দেশ দেন প্রধানমন্ত্রী।
ওই একনেক সভায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, শুধু নদীর পাড় বেঁধে ব্লক দিয়ে সুফল মিলবে না। ভাঙন রোধে নদীগুলোয় নিয়মিত ড্রেজিং করতে হবে। ভবিষ্যতে পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন নদীভাঙন রোধ ও শহর রা বাঁধ নির্মাণ সংক্রান্ত যত প্রকল্প নেয়া হবে, তাতে মোট বিনিয়োগের অর্ধেকেরও বেশি ড্রেজিং খাতে বরাদ্দ রাখার নির্দেশ দেন প্রধানমন্ত্রী। ২ আগস্টের একনেক সভায় মোট ৮টি প্রকল্প উত্থাপন করা হয়, যার মধ্যে ৪টিই ছিল নদীর তীর সংরণ, শহর বাঁধ রা ও নদীভাঙন রোধসংক্রান্ত। প্রকল্প ৪টি অনুমোদন দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘যেকোনো স্থানে নদীর তীর সংরণ, শহর রা বাঁধ কিংবা নদীভাঙন রোধে কাজ করতে গেলে একসঙ্গে করতে হবে। কাজ বাকি রাখা যাবে না। পুরো সমস্যার সমাধান করতে হবে একসঙ্গে। দেখা গেল, এক কাজ রেখে আরেকটি করতে গিয়ে আগের অংশটি নষ্ট হয়ে যায় অথবা বিলীন হয়ে যায়। তাই যত টাকা লাগে, নদীর ভাঙন রোধে পুরো কাজ একসঙ্গে শেষ করতে হবে। অর্থ বরাদ্দও দেয়া হবে একসঙ্গে।’