কলাম

জলমগ্ন ঢাকা-চট্টলা : সমাধান কোন পথে

বিশ্বজিত রায় : ভোগান্তির চরম সীমা অতিক্রম করছে রাজধানী ঢাকা ও বন্দরনগরী চট্টগ্রামের মানুষ। দুর্ভোগ-দুর্গতির অসহনীয় মাত্রা ছুঁয়েছে সেখানকার বসবাসরত জনসাধারণকে। জলজট ও যানজটে মারাত্মক বিপর্যস্ত দেশের বৃহত্তম দুই নগরী ঢাকা ও চট্টগ্রাম। টানা বর্ষণ নামলেই ঢাকা-চট্টলা মহানগরীর মানুষের মনে জলাবদ্ধতার অস্বস্তিসূচক ভোগান্তি বাসা বাঁধে। নিদারুণ কষ্টদায়ক এ ভোগান্তি বছরের পর বছর বাড়ছে বৈ কমছে না। ঢাকা ও চট্টগ্রামে জলাবদ্ধতায় সৃষ্ট দুঃখভোগ এবং তার কারণ ও প্রতিকার সংশ্লিষ্ট সংবাদ ফলাও করে প্রকাশ করছে গণমাধ্যম।
রাজধানী ঢাকা ও বন্দরনগরী চট্টগ্রাম বাংলাদেশের প্রাণশক্তি। একটিতে রাষ্ট্র পরিচালনার সব কাজ সম্পাদিত হয় এবং অন্যটি দেশের বাণিজ্য প্রসারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। এছাড়া বেকারত্ব ঘোচাতে ঢাকা ও চট্টগ্রামের শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলো বৃহত্তম অবদান রেখে চলেছে। অর্থনীতির প্রাণসঞ্চারী এ দুই শহর যদি হয় বসবাসের অনুপযোগী তাহলে আর কী বলব। জীবন ও জীবিকার তাগিদে এ নগরদ্বয়ে বসবাস করা মানুষ সন্তোষশূন্য ত্যক্ত পরিবেশে যেন হাঁফিয়ে উঠছে। অসংখ্য সমস্যার বেড়াজালে বন্দি শহর দুটির প্রধান এবং অন্যতম সমস্যা জলাবদ্ধতা। এ সমস্যায় অন্তহীন ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন রাজধানীবাসী। তারা ুব্ধ দুই মেয়রসহ সংশ্লিষ্ট সবার ওপর। তাদের অভিযোগ সময়মতো কর না দিলে একের পর এক চিঠি আসে, হুমকি আসে মালামাল ক্রোকের। ঠিকই সময়মতো সব ধরনের কর, বিলসহ সরকারের পাওনা আদায় করা হচ্ছে। কিন্তু রহস্যজনক কারণে জলজট ও যানজট নিরসনে নির্বিকার কর্তৃপ। এ সমস্যার সমাধান না করে নগর উন্নয়নের নামে কোন উদ্দেশ্যে শত শত কোটি টাকা অহেতুক ব্যয় করা হচ্ছে। সব অর্থই জলে যাচ্ছে, এমন ােভ জানিয়ে তাদের প্রশ্নÑ এ দুর্ভোগের শেষ কোথায়?
মাত্রাতিরিক্ত বৃষ্টিপাত হলেই মহানগরীতে নেমে আসে মহাদুর্ভোগ-মহাদুর্যোগ। আর এই দুর্যোগের কবলে পড়ে নাস্তানাবুদ হয় সকল শ্রণি-পেশার মানুষ। একদিকে জলজট, অন্যদিকে জলজটের সঙ্গী যানজটের কবলে পড়ে তি হচ্ছে হাজারো কর্মঘণ্টা। তাই বিপাকে অর্থনীতি, বিপর্যস্ত কর্মমুখী মানুষ। এ থেকে পরিত্রাণ কিভাবে সম্ভব, কেন হয় এই জলাবদ্ধতা। এর জন্য একমাত্র দায়ী দায়িত্বহীনতা। এছাড়া দুর্নীতির বিষয়টাও উড়িয়ে দেয়া যায় না। ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন জলাবদ্ধতা নিরসনে গত ৫ বছরে ব্যয় করেছে প্রায় হাজার কোটি টাকা। ২১ কোটি টাকায় দুটি মেশিনও কেনা হয়েছিল। গত দুই যুগে ওয়াসাও ব্যয় করেছে প্রায় ১ হাজার কোটি টাকা। কিন্তু দূর হয়নি জলাবদ্ধতা। একইভাবে চট্টগ্রামের জলাবদ্ধতা নিরসনে নেয়া মাস্টারপ্ল্যান গত ২২ বছরেও বাস্তবায়ন হয়নি। অথচ পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থার নামে ব্যয় হয়েছে ৩৫০ কোটি টাকা। ড্রেনগুলো খোলেনি। ১২টি স্লুইস গেট ও পাম্প স্টেশনের একটিও নির্মাণ হয়নি। বরং অপরিকল্পিত নগরায়ণের ফলে বেড়েছে জলাবদ্ধতা। ইদানীং একটু বৃষ্টিতেই জলাবদ্ধতায় নাকাল এখানকার মানুষ। এমনকি দুই নগরীর ড্রেনগুলো ১০ মিলিমিটার বৃষ্টিপাতের বেশি ধারণ করতে পারছে না। কিন্তু কেন এই জলাবদ্ধতা এবং এর সমাধানই কোন পথে? জলজটের সমাধান হোক বা না হোক, নগর উন্নয়নে বরাদ্দ পাল্লা দিয়ে বাড়ছে; কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হচ্ছে না। জানা গেছে, গত অর্থবছরে সংশোধিত বাজেট অনুযায়ী ঢাকা দণি সিটি করপোরেশনের সড়ক ও ট্রাফিক অবকাঠামো রণাবেণ ও উন্নয়ন বাবদ ৭০১ কোটি ৮৩ লাখ টাকা ব্যয় হয়েছে এবং উত্তর সিটিতে এ বছর প্রায় ৬০০ কোটি টাকার উন্নয়ন প্রজেক্ট বাস্তবায়িত হয়েছে। এছাড়া সড়ক, নালা ও ফুটপাতের জন্য দৈনন্দিন মেরামতের বরাদ্দ আছে ১৮০ কোটি টাকা। তারপরও রাস্তাঘাটে মানুষের দুর্ভোগ তো কমছেই না, বরং বাড়ছে। এখন প্রশ্ন উঠছেÑ নগর উন্নয়নে ব্যয় ও বরাদ্দকৃত এত টাকা যায় কোথায়?
কোটি মানুষের আবাসস্থল বায়ান্ন বাজার তেপ্পান্ন গলির ঢাকা কার্যত অচল হয়ে পড়েছে। এর মধ্যে নানা কারণ বিদ্যমান। যার মধ্যে রয়েছে সড়কজুড়ে ফেলে রাখা নির্মাণসামগ্রী, খোঁড়াখুঁড়ি, কাটাকাটি, নতুন নির্মাণ ও উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে সমন্বয়হীনতার ফলে মৌসুমি বৃষ্টিতে অধিকাংশ রাস্তাঘাট চলাচলে অনুপযোগী হয়ে পড়ে। তাই ঘণ্টার পর ঘণ্টা রাস্তায় কাটাতে হয় নগরবাসীকে। এছাড়া পরিকল্পিত ড্রেনেজ ব্যবস্থা না থাকায় বৃষ্টির পানিতে তলিয়ে যায় ঢাকা ও চট্টগ্রাম মহানগরীর বেশিরভাগ এলাকা। একটু ভারী বৃষ্টিপাতের পর ইদানীং ঢাকার বাণিজ্যিক এলাকা মতিঝিলে হাঁটু থেকে কোমর পানি। ধানমন্ডি ২৭ নম্বরে পানিতে ভাসছে প্রাইভেট কার, মোটরসাইকেল, সিএনজিচালিত যান। মানুষের বসতবাড়ি ও অফিসে ঢুকে পড়ছে বৃষ্টির পানি। মালিবাগ-মৌচাক সড়কে জমাট বাঁধা কালো পানিতে ভেসে বেড়াচ্ছে বাসাবাড়ির বর্জ্য। বাসাবাড়ির স্যুয়ারেজের লাইন ফেটে মনুষ্যবর্জ্য পানিতে মিলেমিশে একাকার। বাড়ি থেকে বের হওয়ার উপায় নেই কর্মজীবী মানুষের। আর এত দুর্ভোগ পাড়ি দিয়ে রাস্তায় পৌঁছালেও দীর্ঘ যানজটে অতিষ্ঠ মানুষ। আবহাওয়া অধিদপ্তরের পূর্বাভাস অনুযায়ী বর্ষাকালের এই বৃষ্টিপাত চলবে প্রায় আরও দেড়-দুই মাস। তাই মহানগরীর কী অবস্থা হবে, তা নিয়ে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন এসে যায়। এেেত্র ঢাকা-চট্টগ্রাম প্রতি বছর বৃষ্টিতে এভাবে নিমগ্ন থাকলেও সরকার ও নগর কর্তৃপরে চরম উদাসীনতা ল্য করা যাচ্ছে।
ঢাকা-চট্টগ্রামের মতো বড় শহরকে নিয়ে সংশ্লিষ্ট সবার খামখেয়ালিপনায় ুব্ধ সাধারণ মানুষসহ নগর বিশেষজ্ঞরা। শহরের জলাবদ্ধতা নিরসনে নগর পরিকল্পনাবিদরা বারবার তাগাদা দিলেও কোনো সন্তোষজনক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে না। বুয়েটের পানি ও বন্যা ব্যবস্থাপনা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ড. একেএম সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘ঢাকায় দৈনিক যে আবর্জনা তৈরি হয়, তার ৪০ শতাংশ চলে যায় গভীর-অগভীর ড্রেন ও নালায়। ফলে পানি নামতে পারছে না। এটাই নগরের জলাবদ্ধতার মূল কারণ। এছাড়া জলাভূমি ভরাট করে নির্বিচারে নগরায়ণ হয়েছে। খোদ রাজউক নিম্নভূমিতে প্রজেক্ট করছে। নগরের কোথায় জলাভূমি থাকবে কিংবা পুকুর-নিম্নভূমি, খাল ইত্যাদি থাকবে, তার পরিকল্পনা কেতাবে আছে, বাস্তবে নেই।’ এছাড়া উদ্বিগ্ন নগর ও পরিকল্পনা বিশেষজ্ঞরা নগরজুড়ে এই জলাবদ্ধতার জন্য বৃষ্টিপাত বা জোয়ারের পানিকে কোনোভাবেই দায়ী করতে রাজি নন। তাদের মতে, শ্রাবণের শুরুতে বৃষ্টি হবেÑ এটাই স্বাভাবিক। মূল সমস্যা দুটিÑ ড্রেনগুলোর পানি ধারণমতা কমে গেছে ও নগরে জমা হওয়া পানি (বৃষ্টি ও জোয়ারের) বের হতে পারছে না। পানি নেমে যাওয়ার জন্য যে নালা ও খালের দরকার, তা না থাকার কারণে অর্থাৎ ড্রেনেজ সিস্টেম ফল্টের কারণেই পানি জমছে। এক্ষেত্রে বৃষ্টিপাত কোনো ফ্যাক্টর নয়। মূল সমস্যা হলো বৃষ্টিপাত ও জোয়ারের পানি ঠেকানোর মতো কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেই।
সিটি নির্বাচনের পূর্বমুহূর্তে নির্বাচিত মেয়রদের প্রধান প্রতিশ্রুতি ছিল যানজট ও জলজটমুক্ত নির্ভেজাল নগরী গড়ে তোলা। এখন জলমগ্ন বাস্তবতায় নগরপিতা তিনজনের মুখে ভিন্ন সুর শোনা যাচ্ছে। রাজধানীর জলাবদ্ধতা সম্পর্কে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের মেয়র আনিসুল হক বলেন, ‘জলাবদ্ধতা কমবে কিভাবে? খাল দিয়ে পানি যাচ্ছে না। ৪০ বছরের বর্জ্য, অপরিকল্পনা, অচল ড্রেন, দখল, দূষণে সবকিছু বিপর্যস্ত হয়ে আছে।’ কিভাবে ওয়াসার অবহেলায় জলজট তৈরি হয় সে বর্ণনা দিতে গিয়ে ঢাকা দণি সিটি করপোরেশনের মেয়র সাঈদ খোকন বলেন, ‘নগরীতে মানুষের সেবায় নিয়োজিত আছে অর্ধশতাধিক সেবা সংস্থা। কিন্তু সমন্বয়, নজরদারি ও জবাবদিহিতার অভাবে মানুষের দুর্ভোগের সমাধান হচ্ছে না।’ এছাড়া চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের (চসিক) মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দীন বলেছেন, ‘প্রকৃতির বৈরী আচরণ, জলবায়ু পরিবর্তন, সমতলে পানির ধারণমতা কমে যাওয়ায় চট্টগ্রাম নগরীতে বারবার জলাবদ্ধতা সৃষ্টিসহ প্রতিদিন জোয়ারের পানি ঢুকে জলাবদ্ধতা হচ্ছে।’ তিন মেয়রের সহজ-সরল স্বীকারোক্তিমূলক কথায় বোঝা যায়, যেন তাদের কিছুই করার নেই।
গ্রাম্য পরিবেশে বেড়ে ওঠা। সেখানকার কাদামাটির গন্ধ এখনো শরীরে বহমান। ছোটবেলায় শহরের কথা যখন শুনতাম, তখন মনে হতো শহর যেন ভিন্ন কিছুর আবরণে তৈরি। ইট, বালি, পাথরের আস্তরণে গড়া এ নগরী কাদামাটি, পানি ও বর্জ্যরে দূষিত পরিবেশ দূরে থাক; সেখানে স্বর্গীয় সুখ আর স্বাচ্ছন্দ্যময় জীবন পরিচালিত হয়। ভাবনা সীমানায় এমন ধারণাই সর্বণ বিচরণ করত। কিন্তু সিলেটে দীর্ঘ এক যুগেরও বেশি সময়ের বসবাসের অভিজ্ঞতা এবং ঢাকা-চট্টগ্রামের জলজট ও যানজটের বিরক্তিকর খবর শহর সম্পর্কে পুরো ভাবনাটাই পাল্টে দিয়েছে। এখন মনে হয় গ্রামে বসবাস করাই অতি উত্তম ও আরামদায়ক।
ঢাকা ও চট্টগ্রামের মতো অত্যাধুনিক শহরের রাজপথ ও অলিগলিতে যেভাবে পানিতে থৈ থৈ তাতে সব চিন্তা-চেতনা উবে গেছে। বর্ষার জলে নৌকা চড়ার দৃশ্য কেবল গ্রামের পরিবেশে কল্পনা করা যায়। কিন্তু সেই গেঁয়ো বাস্তবতা এখন শহরের সঙ্গে মিলে গেছে। ঢাকা-চট্টলা মহানগরীর রাজপথে চলছে নৌকা। কোথাও হাঁটুপানি আবার কোথাও কোমরপানি। পানিতে নিমজ্জিত এ শহরদ্বয়ের মানুষ নানাভাবে তির সম্মুখীন হচ্ছে। বাসাবাড়ি, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও অফিস-আদালতে পানি ঢুকে ব্যাপক বিপদের মুখে দাঁড় করিয়েছে সবাইকে। এমন পরিস্থিতিতে রাজধানী ঢাকা ও বন্দরনগরী চট্টগ্রামের সুস্থ-সুন্দর পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে প্রয়োজন পরিকল্পিত পরিকল্পনা। এতে সরকার, সিটি করপোরেশন, ওয়াসাসহ নগর উন্নয়ন কর্তৃপরে চলাচল উপযোগী জনবান্ধব নগরী গড়তে সবার যৌথ প্রচেষ্টা অবশ্যই জরুরি। কী করলে বড় এই দুই শহরের জলাবদ্ধতা নিরসনে মঙ্গলজনক উপায় বেরিয়ে আসবে, সেই পথে হাঁটতে হবে। উন্নয়ন অগ্রগতির পাশাপাশি জনগণের জীবনাচরণে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে, এমন উপসর্গের স্থায়ী সমাধান খুঁজে বের করতে হবে। নগর বিশেষজ্ঞদের মতামত নিয়ে পরিকল্পিত পদপে গ্রহণ করতে হবে। স্মরণে রাখা ভালো, ঢাকা-চট্টগ্রাম শুধু সেখানে বসবাসরত মানুষের জন্যই নয়। প্রতিদিন ল লক্ষ মানুষ যাতায়াত করছে শহরদ্বয়ের ভেতর ও বাইরে। তাই সবকিছু বিবেচনায় নিয়ে সুষ্ঠুভাবে এগোতে হবে।
লেখক : কলাম লেখক