আন্তর্জাতিক

ডোকলাম সংকট : যুদ্ধ নয় কূটনৈতিক সমাধান খুঁজছে ভারত-চীন

স্বদেশ খবর ডেস্ক : ডোকলাম উপত্যকাকে কেন্দ্র করে গত প্রায় দুই মাস ধরে ভারত, চীন ও ভুটান সীমান্তে টান টান ও রুদ্ধশ্বাস সামরিক উত্তেজনা বিরাজ করছে। দুই মাসের মধ্যে বেশ কয়েকবার ভারত ও চীন যুদ্ধে প্রায় জড়িয়েই গিয়েছিল। যুদ্ধ হয়নি ঠিকই, তবে সীমান্তে শান্তির খোঁজ এখনো অধরা। অব্যাহত হুমকি দিয়ে চীন বলছে, তাদের জমি থেকে ভারতের সেনা সরানোই আলোচনায় বসার একমাত্র শর্ত। ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুষমা স্বরাজ সংসদে বলেছেন, ভারতকে যদি সরতে হয়, চীনকেও ডোকলাম ছেড়ে যেতে হবে। কারণ তিন দেশের সীমান্তের ওই ‘তেমাথা’র প্রকৃত দাবিদার এখনো অমীমাংসিত। ২০১২ সালের চুক্তি অনুযায়ী একমাত্র তিন দেশের মধ্যে আলোচনাতেই তার মীমাংসা সম্ভব।
দুই দেশই নিজেদের অবস্থানে অনড়। তাই ডোকলামে একটা যুদ্ধ যুদ্ধ পরিস্থিতি এখন সব সময়ের। চীনা গণমাধ্যম এবং সরকারের কেউ কেউ প্রায় প্রতিদিনই নিয়ম করে মনে করিয়ে দিচ্ছে, তাদের সামরিক শক্তির কাছে ভারত কিছুই নয়। প্রয়োজনে সেই শক্তি প্রদর্শনে তারা পিছপা হবে না। চীন সরকারিভাবে এ কথাও জানিয়ে দিয়েছে, ভারত যেন মনে না করে, অনির্দিষ্টকাল এভাবেই কাটানো যাবে। এ কথাও যেন না ভাবে, নভেম্বর মাস কাটিয়ে দিতে পারলেই যাবতীয় সমস্যা বরফের তলায় ঢাকা পড়ে যাবে।
চীনের মতো হুংকার কিন্তু ভারত দিচ্ছে না। ভারতীয় নেতৃত্ব বারবার আলোচনার ওপর জোর দিচ্ছে এবং তথ্য দিয়ে বোঝাতে চাইছে, অপরাধটা ভারত করেনি, করেছে চীন। একতরফাভাবে বিতর্কিত এলাকায় রাস্তা তৈরির উদ্যোগ নিয়েছে চীন। ভুটানের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক যে ঐতিহ্যগতভাবে অনন্য এবং সেই সম্পর্কের সুবাদেই ডোকলামে উপস্থিতি, চীনকে সে কথাও ভারত মনে করিয়ে দিচ্ছে।
১৯৬২ সালের যুদ্ধের পর ভারত-চীন-ভুটান সীমান্তে এই প্রথম কেন এতটা টান টান উত্তেজনা, তার অনেকগুলো ব্যাখ্যা রয়েছে। দণি এশিয়ার অন্য দেশগুলোকে চীনের অর্থনৈতিক সাহায্যের মাধ্যমে ভারতের প্রাধান্য খর্ব করা একটি কারণ অবশ্যই। কিন্তু অন্য কারণ চীনকে উপো করার স্পর্ধা। চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সাধের বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ-এ (বিআরআই) ভারতের পাশাপাশি অনুৎসাহ দেখিয়েছে ভুটানও। চীন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডোরের (সিপিইসি) েেত্র ভারতের আপত্তিও চীনকে অবাক ও ুব্ধ করেছে। এই অঞ্চলে ভারতের প্রভাব খর্ব করে প্রতিবেশীদের কাছে তাকে একঘরে করে বিআরআইয়ের উদ্যোগ সার্থক করতে একটা কিছু চীনকে করতেই হতো। ডোকলামই সেই উত্তর।
চীনের অভ্যন্তরীণ কারণও আছে। দেং জিয়াও পিংয়ের অর্থনৈতিক সাম্রাজ্যবাদ প্রতিষ্ঠার দর্শন থেকে বেরিয়ে শি জিনপিং এখন ভৌগোলিক প্রভাব বিস্তারের স্বপ্নে বিভোর। দণি চীন সাগরে প্রভুত্ব বিস্তার এবং বিআরআই উদ্যোগে লগ্নির মধ্য দিয়ে পৃথিবীর বিভিন্ন অংশে উপস্থিতি জাহির করে চীনকে ধরাছোঁয়ার বাইরে নেয়ার স্বপ্ন দেখছেন শি জিনপিং। সামনে চীনা কমিউনিস্ট পার্টির ১৯তম কংগ্রেস। নতুন কেন্দ্রীয় কমিটি সেখানে নির্বাচিত হবে। ৭ সদস্যের পলিটব্যুরো, স্ট্যান্ডিং কমিটিও নতুন করে গঠিত হবে। পার্টিতে নিজের অবস্থান দৃঢ় করা জিনপিংয়ের জন্য জরুরি। জাতীয়তাবাদী চরিত্র তাকে বড় করে তুলে ধরতেই হবে। ডোকলাম নিয়ে অনড় অবস্থান থেকে এখনই সরে আসা তার পে তাই এতটাই কঠিন। ভারতীয় নিরাপত্তা বিশ্লেষক সি রাজামোহন ডোকলাম বিষয়ে বলেন, তিন-চার বছর ধরে যে নতুন চীনকে আমরা দেখতে পাচ্ছি, তারা অনেক আগ্রাসী। ভারত যে এইভাবে রুখে দাঁড়াবে, তা তারা আন্দাজ করতে পারেনি। রাজীব গান্ধীর সময় থেকে দুই দেশের সম্পর্ক যতটা স্বাভাবিক হচ্ছিল, শি জিনপিং ও মোদির আমলে তা বদলে গেছে। খুব দ্রুত এর হ্যাপি এন্ডিং না হওয়ারই সম্ভাবনা।
রাজ্যসভায় ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুষমা স্বরাজ গুরুত্বপূর্ণ ও ইঙ্গিতবাহী কথা বলেছেন। তিনি বলেছেন, যুদ্ধ কোনো উত্তর নয়। আলোচনাই একমাত্র উপায়। ভারতকে সেনা সরাতে হলে চীনকেও ওই স্থান থেকে সরে যেতে হবে। ভারতের বাজারের সঙ্গে চীনের স্বার্থ আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে। দুই পই ডোকলাম থেকে সরে গিয়ে তিন প মিলে আলোচনায় বসুক।
চীন এখনো এই আলোচনার প্রস্তাবে সাড়া দেয়নি। যেভাবে তারা দিনের পর দিন হুমকির তীব্রতা বাড়িয়ে চলেছে, তাতে রাস্তা তৈরির কাজ ছেড়ে চলে যাওয়াটা তাদের পে সম্ভব নয়। চীন না সরলে ভারতের পওে সরে আসা অসম্ভব। সে েেত্র দণি এশিয়ায় তার কর্তৃত্ব তলানিতে গিয়ে ঠেকবে। ভুটানের সঙ্গে চীনের এখনো কোনো কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপিত হয়নি। ছোট্ট এই পাহাড়ি রাষ্ট্রের অতিমাত্রায় ভারত নির্ভরতারও অবসান ঘটাতে পারবে চীন, যার হৃত গৌরব ফিরিয়ে আনার ডাক চীনা প্রেসিডেন্টেরই দেয়া। শি জিনপিংয়ের এই স্বপ্ন সফল হলে বাংলাদেশ, নেপাল, মালদ্বীপ ও শ্রীলঙ্কায় ভারতের প্রভাব কমতে বাধ্য।

ভারতের বিশাল বাজার উপো করা চীনের কাছে সম্ভব কি না, এটি বলে সুষমা বাস্তবতার মুখে দাঁড় করাতে চেয়েছেন চীনকে। ২০১৫ সালের হিসাব অনুযায়ী, চীন-ভারত বাণিজ্যের পরিমাণ ৬ হাজার কোটি ডলারেরও বেশি। এর মধ্যে ভারতে তাদের রপ্তানি প্রায় ৫ হাজার কোটি ডলার। সম্পর্কের অবনতি ঘটালে ভারতের বাজার দখলে রাখা চীনের পে যে সহজ হবে না, সুষমা স্বরাজ প্রকারান্তরে সেটাই মনে করিয়ে দিতে চেয়েছেন।
সুষমার প্রস্তাবে ডোকলাম-সংকট মিটবে কি নাÑ এটাই এই মুহূর্তের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন। সম্ভাব্য যে সূত্রটি আলোচিত, তা এরকমÑ ভুটানের অনুরোধে ভারত সেনা সরাল, চীনও রাস্তা তৈরির কাজ বন্ধ রাখল। তারপর সীমান্ত চূড়ান্ত নির্ধারণে ত্রিপীয় আলোচনা।
ভারতের সাবেক কূটনীতিক পিনাক রঞ্জন চক্রবর্তী বলেন, যুদ্ধ অবধারিত নয়। কারণ তাতে চীনের কোনো লাভ নেই তা তারা ভালো করেই জানে। ভারত যে রুখে দাঁড়াবে, সেটা ওরা বোঝেনি। ওদের পার্টি কংগ্রেস সামনে। ওদের কঠোর অবস্থান নিতে হবে। কূটনৈতিক সমাধানই একমাত্র উপায়। সীমান্ত বিবাদ মেটানোর প্রকৃত চেষ্টা এখন হবে বলে মনে হয়।
অপরদিকে চীনা প্রতিরা মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রেন গুয়োকিয়াং এক বিবৃতিতে জানান, চলমান ঘটনার শুরু থেকেই কূটনৈতিক পন্থায় সংকট নিরসনে চীন চরম সদিচ্ছা দেখিয়ে এসেছে। দ্বিপাকি সম্পর্ক, আঞ্চলিক শান্তি ও নিরাপত্তার কথা মাথায় রেখে চীনা সেনাবাহিনীও চরম ধৈর্যের পরীা দিয়েছে। উভয় পক্ষের আলোচনায় এটাই প্রতীয়মান হয়, ভারত ও চীনÑ কোনো পক্ষই যুদ্ধ চাচ্ছে না। ডোকলাম নিয়ে কূটনৈতিক সমাধানই খুঁজছে দুই দেশ।