প্রতিবেদন

ড. ইউনূস ইস্যুতে ফেঁসে যাচ্ছেন সাবেক মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিলারি কিনটন!

নিজস্ব প্রতিবেদক : যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিলারি কিনটন ড. মুহাম্মদ ইউনূসের দুর্নীতি সংক্রান্ত মামলা প্রত্যাহারে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও তার ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয়কে যে চাপ প্রয়োগের চেষ্টা করেছেন তা এখন অনেকটাই স্পষ্ট। তাই সংশ্লিষ্টরা আশঙ্কা করছেন, মার্কিন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রভাব খাটিয়ে ব্যক্তিগত বিষয়ে রাষ্ট্রীয় বিভিন্ন সংস্থাকে ব্যবহারের অভিযোগে ফেঁসে যাচ্ছেন হিলারি কিনটন! এই ঘটনার জন্য বাংলাদেশে নিযুক্ত তৎকালীন মার্কিন রাষ্ট্রদূতও অভিযুক্ত হতে পারেন বলে মনে করা হচ্ছে। সম্প্রতি এ বিষয়ে আবারও একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে মার্কিন সংবাদমাধ্যম দ্য ডেইলি কলার।
প্রকাশিত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, হিলারি কিনটন মার্কিন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশে মার্কিন দূতাবাস ও বিশ্বব্যাংকের কর্মকর্তাদের দিয়ে ড. ইউনূসকে মামলা থেকে উদ্ধার করতে চেয়েছিলেন। হিলারি কিনটন কয়েকবার ইউনূসের প হয়ে বাংলাদেশকে হুমকি দিয়েছিলেন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে সতর্ক করে তিনি বলেছিলেন, ড. ইউনূসের দুর্নীতি সংক্রান্ত মামলা প্রত্যাহার করা না হলে পদ্মা সেতুর জন্য বিশ্বব্যাংক তার ১ হাজার ২০০ কোটি ডলারের প্রতিশ্রুত ঋণ থেকে সরে যেতে পারে।
দুই মাস আগেই বর্তমান পররাষ্ট্রমন্ত্রী রেক্স টিলারসনের কাছ থেকে এই বিষয়ে জানতে চান সিনেটর চাক গ্রাসলি। গ্রাসলি টিলারসনকে লেখা চিঠিতে বলেন, যদি ব্যক্তিগত কারণে পররাষ্ট্রমন্ত্রী তার পদকে ব্যবহার করে সার্বভৌম কোনো রাষ্ট্রের স্বাধীন তদন্ত প্রভাবিত করতে চান তবে সেটা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হবে না। ১ জুন লেখা ওই চিঠিতে আরও বলা হয় যে, মার্কিন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের সঙ্গে বেশ কয়েকবার কথা হয়েছিল প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিষয়ক উপদেষ্টা সজীব ওয়াজেদ জয়ের। সবগুলো বৈঠকেই ঘুরেফিরে ইউনূস প্রসঙ্গ চলে আসে এবং এই তদন্ত বন্ধে সজীব ওয়াজেদ জয়কে চাপ দেয়া হয়।
প্রতিবেদনে আরো বলা হয়, মার্কিন কংগ্রেস থেকে বাংলাদেশ সরকারকে দুর্নীতি মামলা প্রত্যাহারের অনুরোধ জানানো হয়। দণি এশিয়ার দরিদ্রতম দেশে নিজের ধনকুবের বন্ধুকে সাহায্য করতে কঠিন কৌশল অবলম্বন করেছিলেন হিলারি কিনটন। সেসময় বাংলাদেশে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত জেমস মরিয়ার্টি, পরবর্তীতে ড্যান মজিনা, ডেপুটি শেফ অব মিশন জন ড্যানিলোউইকস, ইউএসএআইডির প্রশাসক রাজিভ শাহের সঙ্গে দেখা করেছিলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ছেলে জয়। এর মধ্যে জন ড্যানিলোউইকস তাকে বলেছিলেন, ড. ইউনূসের ব্যাপারে তদন্ত কাজ বন্ধে শেখ হাসিনাকে রাজি করাতে না পারলে যুক্তরাষ্ট্রে তার (জয়) বিরুদ্ধে অডিটও করা হতে পারে।
গ্রাসলি তার চিঠিতে লেখেন, সজীব ওয়াজেদ জয়ের সঙ্গে বারবার একই বিষয়ে কথা বলার জন্য মাঝে মাঝে দুঃখও প্রকাশ করেছেন মার্কিন কর্মকর্তারা। তারা জানিয়েছেন, আসলে সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে তাদের এমনই নির্দেশনা দেয়া হয়েছে এবং তাদের কিছু করার নেই। এছাড়া জয়কে বলা হয়, ড. ইউনূস এই তদন্ত বন্ধে হিলারি কিনটনকে অনুরোধ করেছেন এবং বাংলাদেশে মার্কিন দূতাবাসের মাধ্যমে চাপ প্রয়োগ করতে বলেছেন।
গ্রাসলি একটি চিঠিতে পররাষ্ট্রমন্ত্রী রেক্স টিলারসনকে লিখেছিলেন, আবারও সেক্রেটারি অব স্টেটস হিলারি কিনটনের কর্মকা-ে যৌক্তিক সন্দেহ জাগ্রত করেছে যে, তিনি এসব নিয়ম লঙ্ঘন করেছেন এবং পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ন্যায়পরায়ণতার ব্যাপারে মানুষের আস্থা খর্ব করেছেন।
গ্রাসলি লিখেছেন, বিভিন্ন ই-মেইলে দেখা যায়, হিলারি কিনটনসহ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা ও কিনটন ফাউন্ডেশনের কর্মীরা ইউনূসকে তার ব্যাংক থেকে অপসারণ করার ওপর ঘনিষ্ঠ নজর রেখেছিলেন। এমনকি বাংলাদেশে নিযুক্ত তৎকালীন মার্কিন রাষ্ট্রদূত ইউনূসকে নিয়ে সরকারি তদন্ত অবসানের জন্য চাপ প্রয়োগ করতে প্রধানমন্ত্রীর সাাৎও চেয়েছিলেন।
ড. ইউনূসকে ‘ব্যবসায়ী’ আখ্যায়িত করে সিনেটর গ্রাসলি বলেন, তিনি হিলারির পারিবারিক দাতব্য সংস্থা কিনটন গ্লোবাল ইনিশিয়েটিভ ও কিনটন ফাউন্ডেশনের দাতা ছিলেন। অভিযোগ রয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসরত বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর ছেলেকে এই বলে হুমকি দেয়া হয় যে, যদি তিনি ড. ইউনূসের বিরুদ্ধে বাংলাদেশ সরকারের তদন্ত থামাতে সহায়তা না করেন, তাহলে তার বিরুদ্ধে আর্থিক তদন্ত (আইআরএস অডিট) করা হবে।
তিনি বলেন, আইন মন্ত্রণালয়ের কাছে ২০১৬ সালের আগস্টে লেখা চিঠিতে আমি যেমনটা বলেছি, কেন্দ্রীয় আইন মোতাবেক নির্বাহী বিভাগের কর্মকর্তারা সেসব বিষয় নিয়ে হস্তপে করতে পারেন না যা তার নিজের আর্থিক স্বার্থ বা তার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কোনো সংগঠন বা ব্যক্তির আর্থিক স্বার্থের সরাসরি বা অনুমেয় সংশ্লেষ রয়েছে।
সিনেটর গ্রাসলির ওয়েবসাইটে প্রকাশিত বিবৃতিতে বিভিন্ন সংবাদ প্রতিবেদনের উদ্ধৃতি দিয়ে বলা হয়, প্রধানমন্ত্রীর ছেলে বলেছেন, একাধিকবার ইউনূসকে নিয়ে তদন্ত বন্ধ করতে চাপ দিয়েছে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা। এমনকি একপর্যায়ে তাকে বলা হয়, তিনি যদি নিজের প্রভাব ব্যবহার করে তার মা’কে দিয়ে ইউনূসের বিরুদ্ধে তদন্ত বন্ধ করতে সহায়তা না করেন, তাহলে তার বিরুদ্ধে আইআরএস (আয়কর/রাজস্ব সংস্থা)-কে দিয়ে তদন্ত করা হবে।
সিনেটরের ভাষ্য, যদি হিলারি যুক্তরাষ্ট্রের বৈধ পররাষ্ট্র সম্পর্কীয় স্বার্থ ছাড়া স্রেফ কিনটন ফাউন্ডেশন উৎসরিত নিজের ব্যক্তিগত ও আর্থিক সম্পর্কের কারণে নিজের মতা ব্যবহার করে একটি সার্বভৌম রাষ্ট্রের স্বাধীন তদন্তে হস্তপে করার চেষ্টা করে থাকেন, তবে তা হবে অগ্রহণযোগ্য।
বিভিন্ন সূত্র উল্লেখ করে সিনেটর আরও লিখেছেন, সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট ও হিলারির স্বামী বিল কিনটন যখন আরকানসাস অঙ্গরাজ্যের গভর্নর ছিলেন তখন থেকেই ইউনূসের সঙ্গে তার সম্পর্ক। কয়েক দশক ধরে কিনটন ফাউন্ডেশনের বিভিন্ন অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন ইউনূস। তার দাবি, খোদ বিল কিনটন নরওয়ের নোবেল কমিটিতে ইউনূসকে নোবেল পুরস্কার পাইয়ে দিতে লবিং করেছেন। এছাড়া মতায় থেকে হিলারির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় মার্কিন করদাতাদের ১ দশমিক ৩ কোটি ডলার ইউনূসের ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানকে দিয়েছে।
গ্রাসলি বলেন, পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে তার সরকারি পদের সঙ্গে নিজের পারিবারিক ফাউন্ডেশনকে মিলিয়ে ফেলাটা যথাযথ নয়। (বাংলাদেশের) প্রধানমন্ত্রীর ছেলেকে আইআরএস অডিটের হুমকি দেয়ার েেত্র পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কোনো ভূমিকা রয়েছে কি নাÑ তা নির্ণয় করাটাও গুরুত্বপূর্ণ।