প্রচ্ছদ প্রতিবেদন

দুদক হটলাইনে অভিযোগের পাহাড় : শত্রুতা আর প্রতিশোধপরায়ণতায় ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কায় শঙ্কিত নিরীহ নিরপরাধ মানুষ


নিজস্ব প্রতিবেদক : দুর্নীতি সংক্রান্ত অভিযোগ সরাসরি দাখিলের জন্য দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) হটলাইনে অভিযোগের পাহাড় জমা হয়েছে। হটলাইনে প্রতি মিনিটেই নতুন নতুন অভিযোগ আসছে। সশরীরে হাজির না হয়ে এবং লিখিত অভিযোগ না দিয়ে শুধু ফোনের মাধ্যমে দুদকের হটলাইনে অভিযোগ জানাতে পেরে অনেকে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলছেন। আবার অনেক নিরীহ নিরপরাধ মানুষ শত্রুতা আর প্রতিশোধপরায়ণতার মুখে পড়ে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কায় শঙ্কিত হয়ে পড়েছেন।
দুদকের চলমান হটলাইন সম্পর্কে মন্তব্য করতে গিয়ে জনৈক ভদ্রলোক নাম-পরিচয় গোপন করা শর্তে স্বদেশ খবরকে এ প্রসঙ্গে একটি গল্প বলেন। গল্পটি এমনÑ অত্যন্ত সাধারণ মানের একজন চিটার, যার প্রকৃত অর্থে সুনির্দিষ্ট কোনো কর্মকা- বা পরিচয় নেই। যে ছোটখাটো তদবির-দালালি ও প্রতারণা করে জীবনযাপন করে এমন একজন নিম্নমানের বাজেলোক সম্প্রতি এক ভদ্রলোক থেকে ধারের কথা বলে ১ হাজার টাকা মেরে দেয়ার মতলব করে। আর ওই ভদ্রলোক পাওনা টাকা চাইতে গেলে উক্ত চিটার তার বিরুদ্ধে দুদক হটলাইনে অভিযোগ করার ভয় দেখায়। তাই এ ধরনের মিথ্যা অভিযোগকারীর বিরুদ্ধেও আইনানুগ কঠোর ব্যবস্থা সংবলিত বিধানের কথাও জনগণের নিকট দুদকের ঘোষণা দেয়া জরুরি বলেও মনে করেন ওই গল্পের কত্থক। আসলে দুদকের এই কার্যক্রমের ফলে মানুষের শঙ্কিত হওয়ার সংখ্যাটাই বেশি। কেউ কারো ভালো চায় নাÑ এটা বাঙালির মজ্জাগত দোষ। আর এই দোষেই একজন দুর্নীতিহীন ব্যক্তির বিরুদ্ধে দুদকে দুর্নীতির অভিযোগ আসছে। আশঙ্কার বিষয় হলো এই ধরনের অভিযোগের সংখ্যাই বেশি। একই প্রতিষ্ঠানে কাজ করে এক কর্মী আরেক কর্মীর বিরুদ্ধে অভিযোগ জানাচ্ছে। এক ঘুষখোর নিজে সাধু সেজে তার প্রতিদ্বন্দ্বী ঘুষখোরকে ফাঁসিয়ে দেয়ার চেষ্টা করছে। এক চিকিৎসককে আরেক চিকিৎসক, এক প্রকৌশলীকে আরেক প্রকৌশলী, এক আইনজীবীকে আরেক আইনজীবী, এক প্রতিবেশীকে আরেক প্রতিবেশীÑ এভাবে প্রায় সব ডিপার্টমেন্টেই একজন আরেকজনকে ফাঁসিয়ে দেয়ার চেষ্টায় নেমেছে। দুদকের হটলাইনে ফোন করে আবার অনেকে গভীর আত্মপ্রসাদও লাভ করছে এ কারণে যে, ‘আর কিছু না হোক, দুদকের খাতায় তো তার (প্রতিপক্ষ) নামটি লেখানো গেছে।’
অনেকে বলছেন, অভিযোগকারীর পরিচয় গোপন রাখা হবে, শুধু এই সুযোগটির কারণে প্রকৃত অভিযোগের চেয়ে ভুয়া অভিযোগের সংখ্যা অনেক বেশি। দুদকের এখতিয়ারের মধ্যে পড়ে না এমন অভিযোগও দুদককে শুনতে হচ্ছে। এর ফলশ্রুতিতে দুদক কর্মকর্তাদের রুটিন ওয়ার্ক মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। কেউ কেউ আশঙ্কা করছেন, দুদকের এই হটলাইন কার্যক্রমটি না শেষ পর্যন্ত ঠগ বাছতে কম্বল উজাড়ের মতো হয়ে যায়।
‘দুর্নীতি রুখবে-১০৬’ এমন স্লোগানে ২৭ জুলাই থেকে শুরু হওয়া এ কার্যক্রমে ১০ আগস্ট পর্যন্ত সারাদেশ থেকে দেড় লাখেরও বেশি মানুষ দুদকে কল করে তাদের অভিযোগ, অনুযোগ ও নালিশ জানিয়েছেন। এতে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নিয়োগ দুর্নীতি, পুলিশের অনিয়ম-দুর্নীতি, শিা ব্যবস্থাপনা, স্বাস্থ্যসেবা, পাসপোর্ট, ভিজিএফ, কাবিখা, কাবিটা, সরকারি ত্রাণ কার্যক্রম ও মাদক ব্যবসাসহ নানা ধরনের অভিযোগ আসছে। এমনকি গৃহকর্মী নির্যাতনের খবরও দেয়া হচ্ছে। জমি দখল, জমি উদ্ধার, জাল দলিল বিষয়েও অভিযোগ দেয়া হচ্ছে। হটলাইনে থাকা দুদকের কর্মকর্তারা অত্যন্ত ধৈর্য ও বিনয়ের সঙ্গে এসব অভিযোগ, অনুযোগ, নালিশ শুনে এরই মধ্যে দুদকের তফসিলভুক্ত অপরাধের আওতায় থাকা অভিযোগগুলো লিপিবদ্ধ করছেন। এ ধরনের দেড় লাখের বেশি কলের মধ্য থেকে দুদকের তফসিলভুক্ত অপরাধ বিবেচনায় নিয়ে প্রায় ৪০০ অভিযোগ লিপিবদ্ধ করে ব্যবস্থা গ্রহণের নিমিত্তে যাচাই-বাছাই শাখায় পাঠানো হয়েছে বলে দুদক সূত্রে জানা গেছে। একইসঙ্গে ঘুষ লেনদেনের ঘটনায় তাৎণিকভাবে অভিযান পরিচালনার প্রস্তুতিও নিয়েছে দুদক। উপযুক্ত অভিযোগকারী পাওয়া গেলে তাৎণিকভাবে এ অভিযান পরিচালিত হবে বলে দুদক সূত্রে জানা গেছে।
এ বিষয়ে দুদকের উপপরিচালক ও জনসংযোগ কর্মকর্তা প্রণব কুমার ভট্টাচার্য স্বদেশ খবরকে জানান, দুর্নীতি বা দুদকের তফসিলভুক্ত অপরাধের বাইরে কোনো অভিযোগ নেয়ার সুযোগ নেই। জনসাধারণের তরফ থেকে দুর্নীতিবিরোধী এ ধরনের ব্যাপক সাড়া দুর্নীতি প্রতিরোধে সহায়ক হবে। এর চেয়েও বড় কথা হচ্ছে দুর্নীতি দমনে নাগরিকের সঙ্গে দুদকের সরাসরি যোগাযোগের যে অপরিহার্যতা ছিল তা হটলাইনের মাধ্যমে সফল হচ্ছে।
দুদকের হটলাইন টেলিফোন নম্বরটি হলো-১০৬। এটি একটি হান্টিং নম্বর? একইসঙ্গে ৩০টি ফোন কল রিসিভ করা যায় এ নম্বরে। এর সঙ্গে কম্পিউটার সংযুক্ত রয়েছে। কোনো কল রিসিভ করা না গেলে যিনি কল করেছেন তার ফোন নম্বরসহ তার বক্তব্য রেকর্ড হয়ে যায়। আর যাদের ফোন রিসিভ করা হয়, তাদের কথোপকথনও রেকর্ড হয়ে থাকে। এ কল সেন্টারে সহকারী পরিচালক পদমর্যাদার কর্মকর্তারা কাজ করছেন। ছুটির দিন বাদে সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত ২০ কর্মকর্তা কাজ করেন এ কল সেন্টারে। যেসব কল রিসিভ করা হয়, তার মধ্যে যেসব অভিযোগ দুর্নীতি সংক্রান্ত নয়, সেগুলো কোথায় করতে হবে তার পরামর্শ দেন দুদক কর্মকর্তারা। আর দুর্নীতি সংক্রান্ত অভিযোগগুলো বিস্তারিত লিপিবদ্ধ করেন। দুর্নীতির যেসব অভিযোগ লিপিবদ্ধ করা হয়, তা যাচাই-বাছাই করা হয় এবং যাচাই-বাছাই শেষে যুক্তিসঙ্গত অভিযোগগুলো তদন্তের জন্য গ্রহণ করা হয়। তদন্তের জন্যও দুদকের রয়েছে তিনটি বিশেষ টিম। প্রতিটি টিমের প্রধান রয়েছেন দুদকের পরিচালক পদমর্যাদার কর্মকর্তারা। এ টিমগুলো অভিযোগের তদন্ত ছাড়াও ঘুষ লেনদেনের ঘটনায় তাৎণিক অভিযান চালাবে। এ টিমের সদস্যদের জন্য তিনটি গাড়ি এবং আনুষঙ্গিক সরঞ্জামসহ প্রয়োজনীয় সবকিছু সার্বণিকভাবে প্রস্তুত রাখা হয়েছে।
দুদকের জনসংযোগ কর্মকর্তা ও উপপরিচালক প্রণব কুমার ভট্টাচার্য আরও বলেন, প্রচলিত পদ্ধতিতে দুদকে অভিযোগ করা অনেক জটিল। আর আমরা বুঝতে পারছি মানুষ সরাসরি অভিযোগ জানাতে চায়। লিখতে হয়, সশরীরে আসতে হয়, অভিযোগ দাখিল করতে হয়। অথচ হটলাইন সিস্টেমে কোনো ঝামেলা নেই। কল করে মুখে অভিযোগ জানালেই হলো। এরপর সেই অভিযোগ নিয়ে খতিয়ে দেখার কাজ আমাদের। তবে মানুষ এমন অনেক অভিযোগ করেন, যা আমাদের তফসিলভুক্ত অপরাধের বাইরে। তবুও আমরা সেসব অভিযোগ শুনে পরামর্শ দিই। সবচেয়ে বড় কথা হলো মানুষ সরাসরি অভিযোগ করার সহজ কোনো জায়গা পাচ্ছিল না। এবার হটলাইনের সুযোগ পেয়ে এখানেই সব অভিযোগ জানাচ্ছে।
এ বিষয়ে দুদকের চেয়ারম্যান ইকবাল মাহমুদ স্বদেশ খবরকে বলেন, দুদকের হটলাইন ১০৬ জনগণের সাথে দুদকের প্রত্য সংযোগ ঘটিয়েছে। আমরা সম্মিলিতভাবে জনগণকে সাথে নিয়ে জনগণের আকাক্সা অনুযায়ী দুর্নীতি প্রতিরোধে কাজ করতে চাই। তাই এই সংযোগ অব্যাহত রাখতে আমাদের সকলকে একযোগে কাজ করতে হবে। আমার বিশ্বাস এই হটলাইনের মাধ্যমেই জনগণের নিকট কমিশনের জবাবদিহি করতে হবে। এর মাধ্যমে দুর্নীতিবিরোধী জনমত সৃষ্টি এবং দুদকের প্রতি জনআস্থা সৃষ্টি হচ্ছে। অভিযোগকারীদের তাৎণিক সমাধানের ব্যাপারে দুদক চেয়ারম্যান বলেন, সকল সমস্যার তাৎণিকভাবে সমাধান করা সম্ভব নয়, তবে যে সকল অভিযোগ তাৎণিকভাবে নিষ্পত্তিযোগ্য তা তাৎণিকভাবেই নিষ্পত্তির ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে।
এ দিকে অভিযোগকারীদের পে তাৎণিক ব্যবস্থা নেয়ার জন্য দুদক চেয়ারম্যান ইকবাল মাহমুদ কমিশনের কর্মকর্তাদের নিয়ে প্রায় প্রতিদিনই বিশেষ বৈঠক করছেন। কমিশনের এরকম এক বৈঠকে তিনটি বিশেষ টিম গঠন করা হয়েছে। এই টিমের সদস্যদের জন্য গাড়ি এবং অন্যান্য আনুষঙ্গিকসহ সবকিছু সার্বণিকভাবে প্রস্তুত রাখা হয়েছে। কমিশনের তফসিলভুক্ত যেকোনো অপরাধের জন্য এই সকল টিম তাৎণিকভাবে অভিযান চালাবে। আরেক বৈঠকে হটলাইন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের উদ্দেশে দুদক চেয়ারম্যান বলেছেন, ‘কোনো অভিযোগকারীর সাথে খারাপ ব্যবহার করা যাবে না। কেউ খারাপ আচরণ করলেও আপনারা কেউ খারাপ ব্যবহার করবেন না। বিনয়ের সাথে কথা বলবেন। শুনবেন বেশি, বলবেন কম।’
দুদক চেয়ারম্যানের নির্দেশ মোতাবেক দুদকের হটলাইন কর্মকর্তারা বাস্তবিকই শুনছেন বেশি, বলছেন কম। বেশি শুনতে গিয়ে তারা অকাজের কথাই বেশি শুনছেন। অভিযোগপ্রবণ বাঙালিকে দুদক অভিযোগের সুযোগ করে দেয়ায় আগামীতে অবস্থা হয়ত এমন দাঁড়াবে যে, খুব কমসংখ্যক লোকই অভিযোগের বাইরে থাকবেন। দৈনিক কমবেশি ১০ হাজার অভিযোগ আসাকে দুদক এখন ইতিবাচকভাবে দেখলেও অচিরেই এই উদ্দীপনায় ছেদ পড়তে পারে। অভিযোগের এই গতি অব্যাহত থাকলে দেশের সব লোক অভিযোগের আওতায় চলে আসতে খুব একটা সময় লাগবে না। তার মানে কী, দেশের সিংহভাগ লোকই দুর্নীতিবাজ। সীমিত জনবল দিয়ে এত দুর্নীতিবাজকে দুদক কী করে ধরবে?
দুদক যে হটলাইন কার্যক্রম শুরু করেছে তার ইতিবাচক দিক যেমন রয়েছে তেমনি নেতিবাচক দিকও রয়েছে। তবে গত ১০ দিনের অভিযোগের স্তূপ দেখে এই কার্যক্রমের নেতিবাচক দিকটাই বেশি ফুটে উঠেছে। একজনের বিরুদ্ধে আরেক জনের অভিযোগের নমুনা দেখে প্রতীয়মান হচ্ছে, প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতি খোঁজার চেয়ে দুদক ব্যক্তির দুর্নীতি খুঁজতে বেশি ব্যস্ত হয়ে পড়েছে। কিন্তু এটা প্রতিষ্ঠিত সত্য যে প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতি দূর করা না গেলে ব্যক্তিক দুর্নীতি দূর করা যায় না। যে প্রতিষ্ঠানে ঘুষ লেনদেন হয়, সে প্রতিষ্ঠানে ঘুষখোর থাকবেই। একজন একজন করে ঘুষখোর ধরে দুদক কত দিনে ওই প্রতিষ্ঠানকে দুর্নীতিমুক্ত করবে? দুদক এক ঘুষখোরকে শাস্তি দেবে, পরক্ষণেই সেখানে আরেক ঘুষখোর দাঁড়িয়ে যাবে। তারচেয়ে প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতি কমিয়ে আনার বিষয়ে কাজ করাই কি দুদকের জন্য অধিক উত্তম নয়?
শেষ কথা
দুদকের চলমান হটলাইনÑ১০৬ কার্যক্রম ইতোমধ্যে সারাদেশে ব্যাপক সাড়া জাগিয়েছে। সাধারণ মানুষ সরকার তথা দুদকের চলমান এ পদক্ষেপকে খুবই ইতিবাচকভাবে দেখছেন এবং সাধুবাদ জানাচ্ছেন। অতীতেও দেখা গেছে দুর্নীতিবিরোধী কোনো বিশেষ অভিযান পরিচালনা করলে তা সাধারণ মানুষের মাঝে ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায়; যেমনটি দেখা গিয়েছিল ১/১১-এর সময়কালীন সরকারের সময়ে। কিন্তু তখন শুরুর দিকে এ অভিযান জনগণের মাঝে ব্যাপক সাড়া ফেললেও পরবর্তীতে দীর্ঘমেয়াদে এটি কার্যকর সুফল বয়ে আনতে পারেনি। শেষ পর্যায়ে তখনকার দুদকের কার্যক্রম লেজেগোবরে অবস্থার সৃষ্টি করে। তাই সংশ্লিষ্টরা বলছেন, অতীত থেকে শিক্ষা নিয়ে দুদককে পরিকল্পিত উপায়ে সঠিকভাবে তার কর্মকা- পরিচালিত করতে হবে; যাতে করে এটি টেকসই ও দীর্ঘস্থায়ী হয়। পাশাপাশি খেয়াল রাখতে হবে জনগণের নিকট দীর্ঘমেয়াদে দুদকের এ কর্মকা- যেন গ্রহণযোগ্যতা না হারায়। বিশেষ করে খেয়াল রাখতে হবে কোনো নিরপরাধ মানুষ যাতে দুদকের এ কর্মকা-ে কোনোভাবেই যেন ক্ষতিগ্রস্ত না হয়। তাহলেই কেবল দুদকের চলমান এ হটলাইন প্রকল্প সফল হবে এবং সাধারণ মানুষের নিকট গ্রহণযোগ্যতা পাবে।