রাজনীতি

নির্বাচনি রোডম্যাপে ইসি : ভোটের মাঠে সরগরম দেশের রাজনীতি

নিজস্ব প্রতিবেদক : একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে নির্বাচন কমিশন সম্প্রতি নির্বাচনি রোডম্যাপ প্রণয়ন করেছে। কিছু রুটিন সমালোচনা থাকা সত্ত্বেও সেই রোডম্যাপ অনুযায়ী সংস্থাটি ইতোমধ্যে তাদের রুটিন কার্যক্রম শুরু করেছে। নির্বাচনি রোডম্যাপের অন্যতম অনুষঙ্গ ছিল স্টেকহোল্ডারদের সঙ্গে ইসির সংলাপ। সেই সংলাপে বসতে শুরু করেছে নির্বাচন কমিশন। এরই মধ্যে সুশীল সমাজের সঙ্গে সংলাপ শেষ হয়েছে। ১৬ ও ১৭ আগস্ট গণমাধ্যম প্রতিনিধি দলের সঙ্গে সংলাপ শেষ করে ইসি। চলতি মাসের শেষের দিকে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে সংলাপ শুরু করার পরিকল্পনা ও কার্যক্রমের কথাও বলেছে ইসি। এবার নিবন্ধন তালিকার শেষ থেকে সংলাপে ডাকা শুরু হবে ৪০টি রাজনৈতিক দলকে। প্রতিটি দলের ১০ জন আমন্ত্রণ পাবেন। প্রতিদিন দুইটি দলকে ডাকা হবে। প্রথম দিন সংলাপের ডাক পাবে বাংলাদেশ ন্যাশনালিস্ট ফ্রন্ট (বিএনএফ) এবং বাংলাদেশ সাংস্কৃতিক মুক্তিজোট। কারণ এই দুটি দলই ইসিতে সর্বশেষ নিবন্ধিত হয়েছিল। ঈদুল আজহার আগেই দল দুটি ডাক পাবে বলে ইসি সূত্রে জানা গেছে।
সুশীল সমাজ, গণমাধ্যম প্রতিনিধির পর রাজনৈতিক দলের সঙ্গে ইসির সংলাপকে গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছে সাধারণ মানুষ। মানুষের মধ্যে এ নিয়ে উৎসাহ-উদ্দীপনার কমতি নেই। পাশাপাশি কিছু রুটিন সমালোচনা সত্ত্বেও ইসির সংলাপ কার্যক্রম শুরু হওয়ার পর থেকে ভোটের মাঠে সরগরম হয়ে উঠেছে দেশের রাজনীতি। সব দলের নেতাকর্মীদের বাইরে সাধারণ মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে গেছে নির্বাচনি আলোচনা। গ্রাম-মফস্বলের টি স্টলে চায়ের কাপে ঝড় উঠছে। বর্তমান ইসি আগের ইসিদের মতোই পুরনো পথে হাঁটবে বলে কেউ কেউ মত দিচ্ছেন। আবার অনেকেই ইসির রোডম্যাপ প্রণয়ন-পরবর্তী কার্যক্রম দেখে এই ইসির পক্ষেই একটি নিরপেক্ষ নির্বাচন সম্ভব বলে মত দিচ্ছেন। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের অনেক আগে থেকেই সংলাপের মতো কাজ শুরু করে দেয়াতে ইসির প্রতি মানুষের আস্থা ক্রমেই বাড়ছে।
জানা গেছে, ঈদুল আজহার আগে ৬টি দলের সঙ্গে সংলাপ করার কথা রয়েছে। দিনণ চূড়ান্ত না হলেও ২৪ অথবা ২৭ আগস্টের মধ্যে ওই ৬টি দলকে ডাকা হবে। বাকি দলগুলোর সঙ্গে ঈদের পর সংলাপ হবে। প্রতিটি রাজনৈতিক দলের ১০ জন প্রতিনিধি এ সংলাপে অংশগ্রহণের সুযোগ পাবেন। মতাসীন আওয়ামী লীগ, অন্যতম বিরোধী দল বিএনপি চাইলে কমিশনের অনুমতি নিয়ে প্রতিনিধির সংখ্যা বাড়াতে পারবে।
নির্বাচন কমিশন সচিব স্বদেশ খবরকে বলেন, রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে সংলাপের আগে সুশীল সমাজ ও গণমাধ্যম প্রতিনিধিদের সঙ্গে কমিশন সংলাপ করেছে। তবে আগস্টের শেষ সপ্তাহ থেকে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে সংলাপ শুরু হবে। সবার শেষে সর্বপ্রথম নিবন্ধন পাওয়া রাজনৈতিক দলের সঙ্গে বসবে ইসি। সেেেত্র নিবন্ধনের শেষ ক্রমানুসারে সংলাপে আমন্ত্রণ জানানো হতে পারে। নিবন্ধিত দলের তালিকানুসারে আওয়ামী লীগের অবস্থান ৬, বিএনপি ৭ এবং জাতীয় পার্টি ১১ নম্বরে রয়েছে। ইসি কর্মকর্তারা জানান, ঈদের আগে ৬টি দলের সঙ্গে সংলাপ শেষ করে ঈদের ছুটি শেষে ১০ সেপ্টেম্বর থেকে শুরু হয়ে বাকি ৩৪টি দলের সঙ্গে সংলাপ করা হবে।
সুশীল সমাজের প্রতিনিধিদের সঙ্গে একদিনে শেষ করলেও গণমাধ্যম প্রতিনিধিদের সঙ্গে দুইদিন সংলাপ করে ইসি। একদিনে আমন্ত্রিত সবাই অংশ নিলে পর্যাপ্ত সময় কথা বলতে পারেন না। তাই সুশীল প্রতিনিধিদের ন্যায় সমানসংখ্যক গণমাধ্যম প্রতিনিধিকে আমন্ত্রণ জানানো হলেও তাদের সঙ্গে দুইদিন সংলাপে বসেছে ইসি।
ইসি সূত্র জানায়, সাংবাদিকদের তিনটি বিভাগে ভাগ করেছে ইসি। অনলাইন, ইলেকট্রনিক মিডিয়া ও পত্রিকা। সংলাপের প্রথম দিনে অনলাইনের ৪ জন, ইলেকট্রনিক মিডিয়ার ২৮ জন, ইংরেজি পত্রিকার ৮ জন, বাংলা পত্রিকা ও সাংবাদিক নেতাসহ ৩৪ জনকে আমন্ত্রণ জানানো হয় এবং তারা সবাই সংলাপে অংশ নেন। দ্বিতীয় দিন আমন্ত্রণ জানানো বাদবাকি ৪০ জনের সঙ্গে সংলাপে বসে ইসি।
৩১ জুলাই সুশীল সমাজের প্রতিনিধিদের সঙ্গে ফলপ্রসূ সংলাপ হয়েছে জানিয়ে ইসি সচিব বলেন, অক্টোবরে নির্বাচন বিশেষজ্ঞ, সাবেক প্রধান নির্বাচন কমিশনার, নির্বাচন কমিশনার নারী নেতৃত্বের সঙ্গে সংলাপ করা হবে। সংলাপ থেকে যেসব সুপারিশ আসবে তা সমন্বয় করে কমিশনে উপস্থাপন করা হবে। পরবর্তীকালে আইনকানুনের কোনো সংশোধন প্রয়োজন হলে প্রস্তাবনা তৈরি করে সরকারের কাছে পাঠানো হবে।
নির্বাচন বিশ্লেষকরা মনে করছেন, আগামী একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন আন্তর্জাতিক মহলে দৃশ্যমান করতে এবং তাদের আস্থা অর্জনের জন্যই বর্তমান ইসি এ ধরনের কর্মকা- চালাচ্ছে। সংলাপের এজেন্ডায় নির্বাচনি রোডম্যাপ বাস্তবায়ন, গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ-১৯৭২ (আরপিও) সংশোধনী এনে যুগোপযোগী করা এবং সীমানা পুনর্নির্ধারণ সংক্রান্ত অধ্যাদেশ সংশোধন বিষয়ে অংশীজনদের মতামত নেয়া হচ্ছে।
উল্লেখ্য, সংবিধান অনুযায়ী ২০১৯ সালের ২৮ জানুয়ারির আগের ৯০ দিনের মধ্যে একাদশ সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠানের বাধ্যবাধকতা রয়েছে। ২০১৮ সালের ৩০ অক্টোবরের পর শুরু হবে একাদশ সংসদ নির্বাচনের সময় গণনা।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, ২০১৮ সালের ৩০ অক্টোবরের পর একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সময় গণনা শুরু হলেও প্রকৃত প্রস্তাবে সময় গণনা শুরু হয়ে গেছে ২০১৭ সালের শুরু থেকেই। কারণ চলতি বছরের শুরু থেকেই প্রধান প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে কথা বলা এবং ভোট চাওয়া শুরু করে দেয়। আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা যেমন সরাসরি নৌকার পক্ষে ভোট চান, তেমনি বিএনপি চেয়ারপারসনও ধানের শীষের পক্ষে ইতোমধ্যে ভোট চান। এসবের পাশাপাশি নির্বাচন কমিশনও একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের জন্য রোডম্যাপ প্রণয়ন করে গত জুনে। এর ফলস্বরূপ গত ঈদুল ফিতরে ভোটের মাঠ বেশ গরম হয়ে ওঠে। ঈদুল আজহায় ভোটের মাঠ যে আরো গরম হয়ে উঠবে, তা এখনই বোঝা যাচ্ছে। তবে শুধু যে রাজনৈতিক দলগুলোর তৎপরতার কারণেই ভোটের মাঠ সরগরম হয়ে উঠেছে এমন নয়। মানুষের মধ্যে নির্বাচনি আবহ সৃষ্টি করার ক্ষেত্রে নতুন সিইসি প্রায় দুই বছর আগে থেকেই তৎপরতা শুরু করেছেন। বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও ইসির তৎপরতায় আশা করা যায়, একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়া পর্যন্ত ভোটারদের উৎসাহ-উদ্দীপনা অব্যাহত থাকবে এবং ইসির ব্যবস্থাপনায় সবার অংশগ্রহণে একটি সুন্দর নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে।