কলাম

বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশ ও আওয়ামী লীগের রাজনীতি

অধ্যাপক ড. আবদুল মান্নান চৌধুরী : আওয়ামী লীগের জন্ম ১৯৪৯ সালের ২৩ জুন। জন্মের সঙ্গে ইতিহাস সম্পৃক্ততা লণীয়। এই দিনে ১৭৫৭ সালে তথাকথিত বাংলার স্বাধীনতা সূর্য অস্তমিত হয়েছিল। জন্মলগ্নে প্রতিষ্ঠানটির নাম ছিল আওয়ামী মুসলিম লীগ অর্থাৎ আমজনতার মুসলিম লীগ। যতই বিতর্ক হোক না কেন মুসলিম লীগের একটি জনমুখী কর্মসূচি ছিল, কিন্তু নেতৃত্বে নবাব-জমিদার আর খাজা-গজাদেব অবস্থানের কারণে তার আদর্শ আমজনতার আদর্শের সঙ্গে মেলবন্ধনে ছিল না। আওয়ামী লীগের জন্মলগ্নের ঘোষিত আদর্শ ছিল তৎকালে অর্জিত পাকিস্তানের স্বাধীনতা সুসংহতকরণ এবং মুসলিম গণমানুষের মঙ্গল নিশ্চিতকরণ।
কোনো দল তখনই রাজনৈতিক দল হিসেবে দৃষ্টি আকর্ষণ করবে, স্বীকৃতি পাবে, বর্ধিষ্ণু হবে এবং প্রতিকূল আবহাওয়ায় টিকে থাকবে কিংবা ফিনিক্স পাখির মতো জেগে উঠবে যদি তার থাকে জনাশ্রিত মহৎ আদর্শ। তা না হলে মতায় বসে কিংবা শুধু মতা অর্জনের প্রয়াসে কোনো জনগোষ্ঠী মন-মানসিকতা ও আদর্শের ভিন্নতা সত্ত্বেও সুসংগঠিত হতে পারে; তখন তাকে দল না বলে ফোরাম বলাই সমীচীন হবে। বিএনপির কট্টর সমালোচকদের অনেকেই বলতে শুনেছি বিএনপি মানে বাংলাদেশ ন্যাশনাল পার্টি নয়, বেসিক্যালি নো পার্টি। এ কথা এই সেদিনও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলা ভবনের সম্প্রসারিত ভবনের শীর্ষে শোভা পেত।
জন্মলগ্নে আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাতার নাম হিসেবে মওলানা ভাসানীসহ অনেকের নাম উঠে এলেও এবং বঙ্গবন্ধুর অবস্থান যুগ্ম-সম্পাদক হলেও তিনিই প্রকৃত প্রস্তাবে (উবভধপঃড়) আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাতা এবং তিনি ছাত্রলীগেরও প্রতিষ্ঠাতা। ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করে ও ভবন নির্মাণ অসমাপ্ত রেখে উদ্যোক্তা ব্যক্তিটি যেকোনো কারণে উধাও হলে তিনি উদ্যোক্তা, মালিক বা কীর্তিমান কিছুই থাকেন না। প্রাদেশিক পর্যায়ে শেখ মুজিবই আওয়ামী লীগকে একটা দৃঢ়ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠা করেছিলেন এবং আজীবন তাকে ধরে রেখেছিলেন। প্রসঙ্গত, ইত্তেফাক পত্রিকার কথা এসে যায়। ইত্তেফাক পত্রিকার সঙ্গে অনেক নাম যুক্ত হলেও ইতিহাস তোফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়াকে তার প্রতিষ্ঠার আসনে বসিয়েছে। পাকিস্তান আওয়ামী লীগের প্রেসিডেন্ট ও সাধারণ সম্পাদক হিসেবে যথাক্রমে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী ও শেখ মুজিবের নাম শুধু জড়িয়ে নেই; সংগঠনটির স্থায়িত্ব ও সমাপ্তির সঙ্গে উভয় নেতা জড়িয়ে আছেন। বঙ্গবন্ধুর অসমাপ্ত আত্মজীবনী কিংবা কারাগারের রোজনামচা বিশ্লেষণ করলে এ কথা সুস্পষ্ট যে প্রথম থেকে আওয়ামী লীগের ভিত্তি সুদৃঢ়করণ ও বিনির্মাণে বঙ্গবন্ধুই মুখ্য ভূমিকা পালনকারী। এমনকি বঙ্গবন্ধু ছাত্রলীগের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য হিসেবে আনুষ্ঠানিক অবস্থান না নিলেও আওয়ামী লীগ প্রতিষ্ঠার অনুসর্গ কিংবা ত্রে প্রস্তুতের প্রয়াসী ভূমিকা ছাত্রলীগের তথা বঙ্গবন্ধুর।
বঙ্গবন্ধুর ছাত্রলীগ ছিল আওয়ামী লীগের সম্পূরক ও পরিপূরক শক্তি। তাই বাংলাদেশের ইতিহাস লিখতে গেলে বলতে হয় বঙ্গবন্ধু মানে বাংলাদেশ, ছাত্রলীগের ইতিহাস মানে বাংলাদেশের ইতিহাস, একই দমে বলতে হয় আওয়ামী লীগের ইতিহাস মানে বাংলাদেশের ইতিহাস।
বঙ্গবন্ধুর আওয়ামী লীগ প্রথম থেকেই ছিল একটি লড়াকু রাজনৈতিক সংগঠন যার ল্য ছিল গণমুক্তি, গণ-উন্নয়ন ও গণমানুষের ভাগ্য উন্নয়ন। ক্রমশ তার সঙ্গে উপায় কিংবা কৌশল হিসেবে যুক্ত হয়েছে স্বায়ত্তশাসন, পূর্ণাঙ্গ স্বায়ত্তশাসন এবং স্বাধীনতা। জন্ম থেকে রূপকল্প ছিল বলেই আওয়ামী লীগ একটি কৌশলী সংগঠন। বিভিন্ন সময়ে তার কৌশলের পরিবর্তন হয়েছে; কিন্তু তার ল্য সামান্যই পরিবর্তন হয়েছে। স্বায়ত্তশাসন বা স্বাধীনতা অর্জনের কৌশলের ভিন্নতা ছিল, এমনকি স্বাধীনতার পর সোনার বাংলার স্বপ্ন বাস্তবায়নে বিভিন্ন কৌশল অবলম্বিত হয়েছিল। বঙ্গবন্ধুর জীবদ্দশায় তার সর্বশেষ কৌশল ছিল বাকশাল। যতই সমালোচনা হোক না কেন যে কৌশলটি সে সময়ে প্রাপ্ত আবহে ল্যার্জনের সঠিক ও দ্রুততর উপায় ছিল, তা অস্বীকারের জো সামান্যই। সেই পদপেটি ছিল কায়েমি স্বার্থবাদী ও শোষক শ্রেণির বিপরীতে শোষিতের গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার প্রয়াস। এর জন্য বঙ্গবন্ধু সপরিবারে ও সবান্ধব মূল্য দিয়েছিলেন।
বঙ্গবন্ধু যদি ১৯৭৫ সাল থেকে ১৯৮২ সাল পর্যন্ত নির্বিঘেœ বাংলাদেশের শাসন চালিয়ে যেতে পারতেন, তাহলে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে ১৯৮২ সালে বাংলাদেশ হতো বিশ্বের উন্নয়নের রোল মডেল। যার প্রবৃদ্ধির হার হতো ৭ দশমিক ৪ শতাংশ; দারিদ্র্যের হার হতো ২২ শতাংশ; মাথাপিছু আয় হতো ১ হাজার ৬০২ ডলার; রিজার্ভের পরিমাণ হতো ৩৩ বিলিয়ন; দেড় কোটি মানুষের কর্মসংস্থান হতো; ৫ কোটি মানুষ নিম্ন আয় থেকে মধ্যম আয়ে হিজরত করত, দেশ খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ হতো; সারতার হার হতো ৭১ শতাংশ; ৫৫ লাখ মানুষ সামাজিক নিরাপত্তা বলয়ে আসত। ৮০ ভাগ মানুষ বিদ্যুৎ পেত; স্বাস্থ্যসেবা অধিকাংশ মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে যেত। মানুষের গড় আয়ু হতো প্রায় ৭২ বছর। যোগাযোগ ব্যবস্থায় বৈপ্লবিক পরিবর্তন হতো; মাতৃ ও শিশু মৃত্যুর হার অকল্পনীয় হারে কমে যেত; জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণে থাকত; সুপেয় পানি সরবরাহ নিশ্চিত হতো; ধনী-দরিদ্রের ব্যবধান কমে একটি জনকল্যাণমূলক মানবিক বাঙালি সমাজ প্রতিষ্ঠিত হতো। গণতন্ত্র অর্থাৎ শোষিতের গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি পেত, ধর্ম ব্যবসায়ীরা নির্মূল হতো, সাম্প্রদায়িকতা মূলোৎপাটিত হতো, শোষক ও পুঁজিবাদীরা নপুংসক রূপ নিত। বঙ্গবন্ধুর অকাল মৃত্যুতে সব স্তম্ভিত হয়ে পড়ল বা চাকাটা উল্টোমুখো হয়ে দাঁড়াল। সৌভাগ্য এই জাতির, বঙ্গবন্ধুর শাহাদতের পর তার কন্যা শেখ হাসিনা দলের হাল ধরলেন এবং গণমানুষের স্বপ্নের ফেরিওয়ালা হিসেবে আবির্ভূত হলেন। শেখ হাসিনা আওয়ামী লীগকে কেবলমাত্র একটি রাজনৈতিক সংগঠন হিসেবে সুদৃঢ় অবস্থানে নিয়ে এলেন না, তাকে উন্নতি ও প্রগতির বাহন হিসেবে সংস্থাপিত করলেন। এেেত্র কিছু অভিন্নতা ও ভিন্নতা লণীয়।
বঙ্গবন্ধু মাত্র ৩৩ বছর বয়সে আওয়ামী লীগের হাল ধরেছিলেন। স্বাধীনতার ল্য অর্জনে বলিষ্ঠ গণভিত্তি ও সংগঠন প্রয়োজন ছিল। তাই মন্ত্রিত্ব অপো দলের সাধারণ সম্পাদকের পদটি তিনি বেছে নিলেন। সেটি যে সঠিক সিদ্ধান্ত ছিল, তা তো ইতিহাস প্রমাণ করেছে। ত্যাগ-তিতিা ও আন্দোলন সংগ্রামে তিনি নিজেকে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন বঙ্গবন্ধু হিসেবে, জাতির পিতা হিসেবে এবং সর্বশেষ সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি হিসেবে। সরকার অপো তার দলই প্রকৃত ক্রিয়াশীল ছিল। আর শেখ হাসিনা মাত্র ৩৪ বছর বয়সে দলের হাল ধরেন। ছিন্নভিন্ন ও ধ্বংসমুখী নৌকার হাল ধরাটা ছিল সাহসের প্রতীক ও জীবন বিপন্ন করার উন্মুক্ত সড়ক। বঙ্গবন্ধুর বিপে ছিল কায়েমি স্বার্থ ও আন্তর্জাতিক চক্র। শেখ হাসিনার বিপে রয়েছে উপরোক্ত দুই চক্র ছাড়াও মৌলবাদী ও ধর্ম ব্যবসায়ী সংগঠন, যারা সবাই মিলে মোটামুটি ১৭-১৮ বার তার জীবন সংহারের পদপে নিয়েছিল। তবুও তিনি ভয়হীন, ভ্রুকুটিহীন, অনড়, অটল, দল ও রাষ্ট্র মতাকে করেছেন উন্নয়ন ও প্রগতির হাতিয়ার হিসেবে। বেছে নিয়েছেন ডিজিটাল বাংলাদেশ অর্থাৎ দতা ও দায়বদ্ধতা। তবে বাবার ল্যকে সামনে রেখেই শেখ হাসিনা সামনে এগিয়ে যাচ্ছেন এবং যাবেন বলে আমাদের বিশ্বাস।
লেখক : শিাবিদ, মুক্তিযোদ্ধা এবং উপাচার্য
ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ