প্রচ্ছদ প্রতিবেদন

মাসব্যাপী নানা কর্মসূচির মাধ্যমে পুরো জাতি পালন করছে শোকাবহ ১৫ আগস্ট : শোককে শক্তিতে পরিণত করে জনকল্যাণে আত্মনিয়োগ করার জন্য দলীয় নেতাকর্মীদের প্রতি শেখ হাসিনার আহ্বান


নিজস্ব প্রতিবেদক : বাঙালি জাতির সবচেয়ে বড় সম্পদ হারানোর শোকের মাস আগস্ট। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বাংলার মানচিত্রে কৃষ্ণগহ্বরে ত সৃষ্টি করেছিল দুর্বৃত্তরাÑ হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি, বাংলাদেশের স্বাধীনতার স্বপ্নদ্রষ্টা রূপকার জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যার মাধ্যমে। এই হত্যাকা- ছিল বিশ্বের জঘন্যতম অন্যায় কাজগুলোর অন্যতম। ৪২ বছর ধরে এই অন্যায়ের প্রায়শ্চিত্ত করে যাচ্ছে বাঙালি। এরই অংশ হিসেবে আগস্ট মাসজুড়ে জাতীয় শোক দিবস পালন করছে পুরো জাতি। তারা শোকের মাস আগস্টে জঙ্গিমুক্ত অসাম্প্র্রদায়িক সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছে আবারো। জাতির জনকের কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা শোকের মাস আগস্টে শোককে শক্তিতে পরিণত করে জনকল্যাণে আত্মনিয়োগ করার জন্য দলীয় নেতাকর্মীদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন।
১৯৭৫-২০১৭ এর মধ্যে ৪২ বছর পার হলেও বাঙালি জাতি স্বাধীনতার প্রকৃত স্বাদ কতটুকু লাভ করতে পেরেছে? যে ল্য এবং স্বপ্নকে সামনে রেখে বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন, বঙ্গবন্ধুকে হত্যার মধ্য দিয়ে সেই স্বপ্ন নস্যাৎ হয়ে যায়। যখন বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় মতায় স্বাধীনতাবিরোধী শক্তি মতাসীন আর মতাসীনরা ১৯৭১ সালের পরাজিত শক্তির ক্রীড়নক, তখন এই বাংলায় ২১ আগস্ট কিংবা ১৭ আগস্টের মতো নজিরবিহীন ঘটনা অস্বাভাবিক নয়। বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলা আজ জঙ্গি-সন্ত্রাসীদের ধারালো দন্ত আর নখের আঁচড়ে তবিত, রক্তাক্ত। বঙ্গবন্ধু তো আজকের এমন বাংলাদেশের জন্য স্বাধীনতা সংগ্রাম করেননি। বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতা সংগ্রাম করেছিলেন দেশ ও জাতির অর্থনৈতিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক মুক্তির লক্ষ্যে। সোনার বাংলা গড়ে তোলার জন্য। সময়ের স্বল্পতার জন্য জাতির পিতা বাংলাদেশকে পুরোপুরি সোনার বাংলায় পরিণত করে যেতে পারেননি। আশার কথা তাঁর সুযোগ্য কন্যা শেখ হাসিনা জঙ্গি ও সন্ত্রাসমুক্ত বাংলাদেশ গড়ার পাশাপাশি ২০২১ সালের আগেই দেশকে মধ্যম আয়ের দেশে এবং ২০৪১ সাল নাগাদ বাংলাদেশকে উন্নত রাষ্ট্রে পরিণত করার লক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছেন। তিনি গোটা পরিবার হারিয়েও শোককে শক্তিতে পরিণত করে দেশ ও জাতির কল্যাণে নিরলস কাজ করে যাচ্ছেন। এখন গোটা জাতির শোককে শক্তিতে পরিণত করার সময় এসেছে। ১৫ আগস্ট আমরা আমাদের সর্বস্ব হারিয়েছি; কিন্তু শোকে বিহ্বল হলে চলবে না। এই শোককে শক্তিতে পরিণত করতে হবে। শোকের বেদনা যখন জাতির মধ্যে প্রবল শক্তি হয়ে দেখা দেবে তখনই অধরা থেকে যাওয়া বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলা আমাদের দরজায় এসে দাঁড়াবে, জঙ্গি ও সন্ত্রাসমুক্ত উন্নত দেশে পরিণত হবে বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের বাংলাদেশ।
আগস্ট আমাদের চেতনার ধমনিতে নতুন করে সাড়া জাগায়। বীর বাঙালির ইতিহাসে কলঙ্কিত এক অধ্যায় সূচিত হয়েছে এ মাসেই। ইতিহাসের দীর্ঘ পথ পেরিয়ে বাঙালি কলঙ্কমুক্ত হলেও আমাদের প্রতিটি শিরা উপশিরা ও ধমনিতে তীব্র ঘৃণার উদ্রেক করে এ মাস।
’৭৫-এর ১৫ আগস্ট কালরাতে ঘাতকরা শুধু বঙ্গবন্ধুকেই হত্যা করেনি, তাদের হাতে একে একে প্রাণ দিয়েছেন বঙ্গবন্ধুর সহধর্মিণী বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিব, বঙ্গবন্ধুর সন্তান শেখ কামাল, শেখ জামাল, শিশু শেখ রাসেলসহ পুত্রবধূ সুলতানা কামাল ও রোজি জামাল। বাঁচতে পারেননি বঙ্গবন্ধুর সহোদর শেখ নাসের, ভগ্নিপতি আব্দুর রব সেরনিয়াবাত, ভাগ্নে যুবনেতা ও সাংবাদিক শেখ ফজলুল হক মনি, তার সহধর্মিণী আরজু মনি ও কর্নেল জামিলসহ পরিবারের সদস্য ও আত্মীয়-স্বজন ১৭ জন। সেনাবাহিনীর কিছুসংখ্যক বিপথগামী সদস্য সপরিবারে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করার পর গোটা বিশ্বে নেমে আসে তীব্র শোকের ছায়া এবং ছড়িয়ে পড়ে ঘৃণার বিষবাষ্প।
জাতির পিতাকে হারানোর সেই দুঃসহ স্মৃতি ৪২টি বছর বয়ে নিয়ে বেড়াচ্ছেন তার সুযোগ্য কন্যা আওয়ামী লীগ সভাপতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও তার ছোট বোন শেখ রেহানা। দেশের বাইরে থাকায় তাঁরা সেদিন প্রাণে বেঁচে যান। মহান আল্লাহতায়ালার অপার করুণা তাদের বাঁচিয়ে দিয়েছিল।
আগস্ট মাসব্যাপী নানা কর্মসূচি
জাতীয় শোক দিবস ও বঙ্গবন্ধুর ৪২তম শাহাদতবার্ষিকী উপলে আগস্ট মাসব্যাপী নানা কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে। ১ আগস্ট মধ্যরাত ১২টা ১ মিনিটে আওয়ামী লীগ ও এর সহযোগী ও ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠনসমূহের উদ্যোগে ধানমন্ডির ৩২ নম্বরে বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতিতে শ্রদ্ধাঞ্জলি নিবেদন, আলোক শিখা প্রজ্বলন, মিছিল ও শপথ গ্রহণের মাধ্যমে শোকের মাস আগস্টের মাসব্যাপী কর্মসূচি শুরু হয়। বিকেলে বঙ্গবন্ধু ভবন প্রাঙ্গণে কৃষক লীগের উদ্যোগে রক্তদান কর্মসূচি, কৃষকের কণ্ঠ বইয়ের মোড়ক উন্মোচন ও আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়। এতে প্রধান অতিথি ছিলেন প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা।
একই দিন শিল্পকলা একাডেমি মিলনায়তনে বাঙালির হৃদয়ের ফ্রেমে জাতির পিতা গ্রন্থের সংবাদচিত্র প্রদর্শনীর উদ্বোধন হয়। ৪ আগস্ট শহীদ শেখ কামালের জন্মদিন উপলে যুবলীগের উদ্যোগে আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়।
৫ আগস্ট ধানমন্ডি আবাহনী কাব প্রাঙ্গণে শহীদ শেখ কামালের জন্মদিনে শ্রদ্ধার্ঘ্য অর্পণ, মিলাদ ও দোয়া মাহফিলে যোগ দেয় আওয়ামী লীগ, সহযোগী ও ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠনসমূহ। একই কর্মসূচি পালিত হয় বনানী কবরস্থানে।
৭ আগস্ট বঙ্গমাতা শহীদ ফজিলাতুন্নেছা মুজিবের জন্মদিন উপলে ছাত্রী সমাবেশ করে বাংলাদেশ ছাত্রলীগ। একই দিন বঙ্গমাতা বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিবের জন্মদিন উপলে আলোচনাসভা করে আওয়ামী যুবলীগ।
৮ আগস্ট সকাল সাড়ে ৮টায় বনানী কবরস্থানে বঙ্গমাতা শহীদ ফজিলাতুন্নেছা মুজিবের জন্মদিনে শ্রদ্ধার্ঘ্য অর্পণ, কোরআনখানি, মিলাদ ও দোয়া মাহফিল অনুষ্ঠিত হয়। এতে অংশ নেয় আওয়ামী লীগ, ঢাকা মহানগর উত্তর ও দণি শাখা আওয়ামী লীগ, সহযোগী ও ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠনসমূহ।
১০ আগস্ট জাতীয় শোক দিবস পালন উপলে আলোচনা সভার আয়োজন করে আওয়ামী যুবলীগ। ১১ আগস্ট বঙ্গবন্ধু ভবন প্রাঙ্গণে জাতীয় শোক দিবস উপলে আলোচনাসভার আয়োজন করে আওয়ামী স্বেচ্ছাসেবক লীগ। ১২ আগস্ট টুঙ্গিপাড়ায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের মাজার জিয়ারত করে কৃষক লীগ। ১৩ আগস্ট বিএমএ অডিটোরিয়ামে আলোচনাসভা করে স্বাধীনতা চিকিৎসক পরিষদ (স্বাচিপ)। ১৩ থেকে ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু ভবন প্রাঙ্গণে আলোকচিত্র প্রদর্শনীর আয়োজন করে আওয়ামী স্বেচ্ছাসেবক লীগ।
১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু ভবন প্রাঙ্গণে মিলাদ ও দোয়া মাহফিল আয়োজন করে মহিলা আওয়ামী লীগ। একই দিন বঙ্গবন্ধু ভবন প্রাঙ্গণে বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতিতে পুষ্পার্ঘ্য অর্পণ, বনানী কবরস্থানে শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা, দিনব্যাপী দোয়া, মিলাদ মাহফিল এবং সন্ধ্যায় দুস্থদের মাঝে খাদ্য বিতরণ করে আওয়ামী স্বেচ্ছাসেবক লীগ। এছাড়া বঙ্গবন্ধু ভবন প্রাঙ্গণে বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতিতে পুষ্পার্ঘ্য অর্পণ, বনানী কবরস্থানে শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা এবং টুঙ্গিপাড়ায় বঙ্গবন্ধুর সমাধিতে শ্রদ্ধার্ঘ্য অর্পণ করে আওয়ামী যুবলীগ। পাশাপাশি জাতীয় শোক দিবস উপলে ঢাকা মহানগরের অন্তর্গত বিভিন্ন থানা ও ওয়ার্ডে খাদ্য বিতরণ করে আওয়ামী যুব মহিলা লীগ।
১৫ আগস্ট জাতীয় শোক দিবসে আওয়ামী লীগের কর্মসূচির মধ্যে ছিল সূর্য উদয় ণে বঙ্গবন্ধু ভবন এবং কেন্দ্রীয় কার্যালয়সহ সংগঠনের সকল স্তরের কার্যালয়ে জাতীয় ও দলীয় পতাকা অর্ধনমিতকরণ ও কালো পতাকা উত্তোলন; সকাল ৬টা ৪৫ মিনিটে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঐতিহাসিক স্মৃতি-বিজড়িত ধানমন্ডি বঙ্গবন্ধু ভবন প্রাঙ্গণে বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতিতে শ্রদ্ধা অর্পণ। এছাড়াও ঢাকা মহানগর আওয়ামী লীগ, সহযোগী ও ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠন এবং নগরীর প্রতিটি শাখা থেকে শোক মিছিলসহ বঙ্গবন্ধু ভবনের সম্মুখে আগমন এবং শ্রদ্ধা নিবেদন। সকাল ৭টা ৩০ মিনিটে বনানী কবরস্থানে ১৫ আগস্টের শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধার্ঘ্য নিবেদন, মাজার জিয়ারত, ফাতেহা পাঠ, মোনাজাত ও মিলাদ মাহফিল। সকাল ১০টায় টুঙ্গিপাড়ায় জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সমাধিতে শ্রদ্ধার্ঘ্য নিবেদন, ফাতেহা পাঠ, মিলাদ ও দোয়া মাহফিল। টুঙ্গিপাড়ার কর্মসূচিতে আওয়ামী লীগ কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদের নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন। টুঙ্গিপাড়ায় জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সমাধিসৌধে অনুষ্ঠেয় আওয়ামী লীগের সকল কর্মসূচিতে সহযোগী ও ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠনের কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন। ১৬ আগস্ট রাজধানীর বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে আলোচনা সভা করে আওয়ামী লীগ। সভায় প্রধান অতিথি ছিলেন আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলা থেকে জঙ্গি
সন্ত্রাসীদের মুলোৎপাটনের অঙ্গীকার
যেকোনো বিচারেই বঙ্গবন্ধু ছিলেন এক অনন্য বিশ্ব মানের নেতা। সহজ-সরল, সাদামাটা অথচ দৃঢ়চেতা এক মানুষ। দেহসৌষ্ঠবে এবং বজ্রকণ্ঠের বিস্ময়কর শক্তি এই মানুষটিকে সহজেই এবং আলাদাভাবে চেনা যেত। বাংলাদেশ নামের রাষ্ট্রটির জন্মের সঙ্গে অবিচ্ছেদ্যভাবে জড়িয়ে আছে তাঁর নাম। বায়ান্ন থেকে একাত্তর পর্যন্ত স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রতিটি পর্যায়ে বঙ্গবন্ধু ছিলেন সংগ্রামী জনতার পুরোভাগে। বজ্রকণ্ঠে তিনি ডাক দিয়েছিলেন স্বাধীনতার। তাঁর আদর্শ, ত্যাগ, দূরদর্শিতা এবং অকুতোভয় আপসহীন নেতৃত্বে দেশ পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর কবল থেকে মুক্ত হয়, বাঙালি জাতি পায় হাজার বছরের কাক্সিক্ষত প্রিয় স্বাধীনতা, স্বাধীন পতাকা ও স্বাধীন মানচিত্র। পাকিস্তানি হানাদাররা এই বিশাল হৃদয়ের মানুষটিকে কারাগারে বন্দি রেখে, নির্যাতন করে দমাতে পারেনি। নীতি থেকে, সংগ্রামের পথ থেকে একচুলও নড়াতে পারেনি। অথচ স্বাধীন বাংলার মাটিতেই তাঁকে একদল বিপথগামী সেনাসদস্যের হাতে নির্মমভাবে জীবন দিতে হয়েছে। এ দেশের মানুষ পুরো আগস্ট মাসে গভীর শোক ও শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করছে বঙ্গবন্ধুসহ ১৫ আগস্টে নিহত সকল শহীদকে।
এ কথা সত্য যে, একটা সময় ছিল যখন বঙ্গবন্ধুর নাম এক রকম নিষিদ্ধ ছিল। শিশু-কিশোরদের দীর্ঘকাল জানতে দেয়া হয়নি মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস। শুধু বঙ্গবন্ধুকে অস্বীকার করাই নয়, নানাভাবে তাঁর সম্পর্কে অপপ্রচারও করা হয়েছে। তাঁর অবদানকে নানাভাবে খাটো করা, এমনকি অস্বীকারও করা হয়েছে। কিন্তু তাদের সে অপচেষ্টা সময়ের বিবর্তনে নস্যাৎ হয়ে যায়। বাংলার মাটিতে তাঁর হত্যার বিচারও সম্পন্ন হয়েছে। ঘাতকদের দ-াদেশ কার্যকর হয়েছে। পিতৃহত্যার কলঙ্ক থেকে জাতি মুক্তি পেয়েছে। তবে বঙ্গবন্ধু হত্যার সেই ষড়যন্ত্র যেন শেষ হয়নি। দুঃখের বিষয়, এখনও কোনো কোনো মহল থেকে আরেকটি ১৫ আগস্ট ঘটানোর হুমকির কথা শোনা যায়। বিষয়টি হালকাভাবে দেখলে চলবে না। কারণ যারা এই হুমকি দিচ্ছে তারা মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে নির্মূল ও মুক্তিযুদ্ধের পরে শক্তিকে ধ্বংস করতে চায়, দেশকে জঙ্গি ও সন্ত্রাসীদের অভয়াশ্রমে পরিণত করতে চায়।
এখন বঙ্গবন্ধুর কন্যা রাষ্ট্রমতায়। দেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রোপট বদলেছে। শেখ হাসিনার নেতৃত্বে দেশে এখন গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা বিরাজ করছে। এই ব্যবস্থাকে বাধাগ্রস্ত করতে দেশি-বিদেশি ষড়যন্ত্রের শেষ নেই। দেশে আন্তর্জাতিক জঙ্গি সংগঠন আইএস, আল-কায়েদা আছেÑ এটা স্বীকার করানোর কাজে মরিয়া অনেকে। কিন্তু বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা জঙ্গি-সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্সে থাকলেও সবসময়ই বাংলাদেশে আইএসের অস্তিত্ব মানতে নারাজ। এই নারাজির জন্যও চাপে আছেন বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা। শোকাবহ আগস্টের প্রথম দিনেও তিনি অঙ্গীকার করেছেন, বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলা থেকে তিনি জঙ্গি-সন্ত্রাসীদের মূলোৎপাটন করবেন।
কিভাবে এত বড় বেঈমানি করল তারা
প্রতিনিয়ত যারা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের বাসায় যাতায়াত করত, যারা বঙ্গবন্ধুর স্নেহের ছিল, তারাই কিভাবে বেঈমানি করে বঙ্গবন্ধু ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের হত্যা করল? বিস্ময় প্রকাশ করে এমন প্রশ্নই রেখেছেন বঙ্গবন্ধুকন্যা ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। রাজধানীর ধানমন্ডির ৩২ নম্বরে শোকের মাস আগস্ট স্মরণে এক কর্মসূচির বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন। কৃষক লীগ আয়োজিত রক্তদান কর্মসূচির উদ্বোধন ও আলোচনা অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা। অনুষ্ঠানে ৩৭ মিনিটের বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী ১৯৭৫-এ বঙ্গবন্ধু ও তাঁর স্বজনদের হত্যা, হত্যা-পরবর্তী দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি, তাঁরা দুই বোন ও আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের ওপর জুলুম-নির্যাতন, বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর জিয়াউর রহমানের নানা দুঃশাসনের কথা তুলে ধরেন।
১৯৭৫-এ বঙ্গবন্ধুর ঘনিষ্ঠজনদের বেঈমানির কথা তুলে ধরে শেখ হাসিনা বলেন, ‘এই হত্যাকা- যারা ঘটাল তারা প্রতিনিয়ত আমাদের বাসায় যাতায়াত করত। খুনি ডালিম, ডালিমের শাশুড়ি, ডালিমের বউ, ডালিমের শালী দিন-রাত আমাদের বাসায় পড়ে থাকত। মেজর নূর মক্তিযুদ্ধ চলাকালে দেরাদুনে ট্রেনিং নিয়ে আসে। একটি পর্যায়ে তাকে জেনারেল ওসমানীর এডিসি হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়। মেজর নূর এবং কামাল দুজনেই ছিল এডিসি। একই সঙ্গে তারা কাজ করেছে। কর্নেল রশীদ খুনি মোশতাকেরই আত্মীয়।
খুনি মোশতাক আওয়ামী লীগেরই নেতা। ১৯৪৯ সালে আওয়ামী লীগ যখন গঠন করা হয় তখন আওয়ামী লীগের যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক মোশতাক। বঙ্গবন্ধুও যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। তাঁরা একই ক্যাবিনেটের মন্ত্রী ছিলেন। তিনিও ওই কাজই করেন। মেজর জিয়া, তাকে প্রমোশন দিলেন বঙ্গবন্ধু। তার যে পারিবারিক সমস্যা ছিল স্ত্রীর সঙ্গে, সেটিও বঙ্গবন্ধু সমাধান করে দিয়েছিলেন। মাসের মধ্যে দুবার, তিনবার তার স্ত্রীকে নিয়ে আমাদের বাসায় চলে আসত। যেহেতু আমাদের বাসাটি ছিল সকলের জন্য উন্মুক্ত। যেকোনো সময় এসে সোজা আমার বাবার রুমে গিয়ে বসে থাকত।’
আবেগ ভারাক্রান্ত হয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘এত কাছে ছিল স্নেহ পেয়ে, এত কিছু পাওয়ার পর এত বড় বেঈমানি তারা কিভাবে করল! আমার বাবার ক্যাবিনেটে যিনি অর্থমন্ত্রী ছিলেন মল্লিক সাহেব, তাঁর শালীর ছেলে কর্নেল ফারুক। হয়ত এ ঘটনাগুলো আপনারা জানেন না। আমি মাঝে মাঝে মনে করি, এ ঘটনাগুলো আপনাদের জানা উচিত। বাংলাদেশের মানুষের জানা উচিত যে কিভাবে কত বড় বেঈমানি হয়েছে। পাকিস্তানিরা যে বারবার চেষ্টা করেছে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুকে এ পৃথিবী থেকে সরিয়ে দিতে, ফাঁসি দিয়ে হত্যা করতে, মিথ্যা মামলা দিয়ে। এমনকি একাত্তরের ২৬ মার্চ যখন স্বাধীনতা ঘোষণা দিলেন তখন গ্রেপ্তার করে পাকিস্তানের কারাগারে নিয়ে যাওয়া হলো, তাঁর ফাঁসির হুকুম হলো, তাঁর সেলের পাশে কবর খোঁড়া হলো। তারপর বিশ্বের চাপে, ভারতের চাপে বঙ্গবন্ধু বেঁচে গেলেন। ২৬ মার্চ যখন বাংলাদেশে হামলা চালানো হলো সেদিন তাদের উদ্দেশ্য ছিল বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করবে। কিন্তু তারা পারেনি। এই পাকিস্তানি শত্রুরা যেটা পারেনি, ঘরের আপনজন হয়ে দিন-রাত যারা ঘোরাঘুরি করত তারা এই বেঈমানি করল। আর এই ধরনের হত্যাকা- একই সঙ্গে তিনটি বাড়িতে ঘটাল।’
শেখ হাসিনা বলেন, ‘এই হত্যাকা-ের পর আমরা বাংলাদেশে কী দেখেছি? যে আদর্শ, উদ্দেশ্য নিয়ে দেশ স্বাধীন করা হয়েছিল বাংলাদেশকে তার উল্টোপথে নিয়ে যাওয়া হলো। আর খুনিদের বিচার না করে তাদের ইনডেমনিটি দেয়া হলো এবং বিচার করা যাবে না এই অধ্যাদেশ জারি করা হলো। পঞ্চম সংশোধনীর মাধ্যমে সেই অধ্যাদেশ করা হলো।’
বঙ্গবন্ধুকে হত্যার সঙ্গে বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমান যুক্ত ছিলেন জানিয়ে শেখ হাসিনা বলেন, ‘অবৈধভাবে মোশতাক নিজেই নিজেকে প্রেসিডেন্ট ঘোষণা করল এবং প্রেসিডেন্ট ঘোষণা করেই জিয়াউর রহমানকে সেনাপ্রধান ঘোষণা করল। এই ঘটনার মধ্য দিয়ে মোশতাক ও জিয়ার যে একই সঙ্গে যুক্ত এতে কোনো সন্দেহ থাকে না। জিয়াউর রহমানকে সেনাপ্রধান করেছিল মোশতাক কিন্তু মোশতাক নিজেও বেশি দিন মতায় থাকতে পারেনি।
দেশ গঠনে বঙ্গবন্ধুর অবদানের কথা তুলে ধরে শেখ হাসিনা বলেন, ‘একটি দেশ, যেটা ছিল পাকিস্তানের প্রদেশ, যেটা ছিল শোষিত, বঞ্চিত, যেখানে শতকরা ৮০ থেকে ৯০ ভাগ মানুষ ছিল বঞ্চিত, যেখানে একটি ধ্বংসস্তূপের ওপর দাঁড়িয়ে বঙ্গবন্ধু দেশকে পুনর্গঠিত করলেন, তিনি যখন সমস্ত জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করলেন ঠিক তখন বঙ্গবন্ধুর বিজয়টাকে যারা সহ্য করতে পারেনি তারাই জাতির পিতাকে নির্মমভাবে হত্যা করেছে।’
শেখ হাসিনা বলেন, ‘১৫ আগস্ট বাংলাদেশের মানুষের জন্য সবচেয়ে কালো অধ্যায়। আমি আমাদের স্বজনদের হারিয়েছি। আর বাংলাদেশ হারিয়েছিল তার স্বপ্ন। আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, যদি বঙ্গবন্ধু বেঁচে থাকতেন, এই বাংলাদেশ স্বাধীনতার ১০ বছরের মধ্যে সারা বিশ্বে উন্নত সমৃদ্ধ দেশ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হতো। বাঙালি জাতি হতো বিশ্বের কাছে একটি মর্যাদাপূর্ণ জাতি। বাংলাদেশ হতো সারা বিশ্বের কাছে একটি দৃষ্টান্ত যে কত দ্রুত একটি দেশ উন্নত-সমৃদ্ধ হতে পারে।’
শেখ হাসিনা বলেন, ‘জাতির পিতা যে ল্য নিয়ে বাংলাদেশ স্বাধীন করেছিলেন সেই ল্য পূরণ, বাংলাদেশকে একটি উন্নত ও সমৃদ্ধ দেশে পরিণত করাই এখন আমাদের একমাত্র ল্য। দেশের মানুষের মুখে হাসি ফোটানোই আমাদের ল্য।’ এই লক্ষ্যে জাতির পিতার সুযোগ্য কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা শোককে শক্তিতে পরিণত করে জনকল্যাণে আত্মনিয়োগ করার জন্য দলীয় নেতাকর্মীদের প্রতি উদাত্ত আহ্বান জানিয়েছেন।