আন্তর্জাতিক

আফগানিস্তানে আরো সেনা পাঠাবে যুক্তরাষ্ট্র : চীন ভারত পাকিস্তানকে ঘিরে নয়া মেরুকরণের ইঙ্গিত

নিজস্ব প্রতিবেদক : নির্বাচন-পূর্ববর্তী সময় থেকে আফগানিস্তানে মার্কিন সেনা মোতায়েনকে শক্তি, অর্থ ও সময় য় হিসেবে অভিহিত করেছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তবে দায়িত্ব নেয়ার ৭ মাসের মাথাতেই সেই অবস্থান থেকে ১৮০ ডিগ্রি ঘুরে জানালেন, প্রত্যাহারের কোনো সুযোগই নেই, বরং আফগানিস্তানে মার্কিন সেনা সংখ্যা আরো কয়েক হাজার বাড়াতে যাচ্ছেন তিনি।
কমান্ডার ইন চিফ হিসেবে দেয়া প্রথম আনুষ্ঠানিক ভাষণে ট্রাম্প স্বীকার করেন, ওভাল অফিসের ডেস্কের অন্য প্রান্তে বসে এখন পরিস্থিতিকে ভিন্ন দেখাচ্ছে। তিনি বলেন, আমি পুরোপুরি সেনা প্রত্যাহার করতে চেয়েছিলাম। এ সময় ১৬ বছরের আফগান যুদ্ধে কয়েক হাজার মার্কিন সেনা নিহত হওয়া এবং মার্কিন করদাতাদের ট্রিলিয়ন ডলার অর্থ অপচয়ের বিষয়টি উল্লেখ করে নিজের হতাশার কথাও জানান। তবে কয়েক মাস ধরে ভাবনা-চিন্তার পর তিনি উপলব্ধি করেন, আফগানিস্তান থেকে দ্রুত সেনা প্রত্যাহার হবে একই সঙ্গে অনুমাননির্ভর এবং অগ্রহণযোগ্য। সে েেত্র আফগানিস্তানে এমন একটি শূন্যতা তৈরি হবে, যা সন্ত্রাসীরা দ্রুতই পূরণ করে ফেলবে।
আফগান লড়াই শুরু হয় ২০০১ সালের অক্টোবরে। এর আগের মাসেই নিউইয়র্কে ভয়াবহ হামলা চালায় সন্ত্রাসীরা। আর হামলার সঙ্গে জড়িতদের খুঁজে বের করতেই ওই অভিযান শুরু হয়। ২০১০ সালে ১ লাখ সেনা প্রত্যাহার করা হয়। বর্তমানে আফগানিস্তানের পুলিশ ও সেনা সদস্যদের প্রশিণের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের ৮ হাজার ৪০০ সেনা অবস্থান করছে।
এদিকে নতুন সৈন্য পাঠানোর পাশাপাশি তালেবানের সঙ্গে আলোচনার পথও খুলে দিয়েছেন ট্রাম্প। ট্রাম্পের পররাষ্ট্রমন্ত্রী রেক্স টিলারসন আলোচনার বিষয়ে অনেক বেশি আশাবাদী। তিনি বলেন, আফগান সরকার ও তালেবানের মধ্যে যেকোনো আলোচনায় সহযোগিতা করতে যুক্তরাষ্ট্র প্রস্তুত এবং তা যেকোনো পূর্বশর্ত ছাড়াই। বক্তব্য রাখার সময় ট্রাম্পের পাশে ছিলেন তার জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা, চিফ অব স্টাফ ও প্রতিরামন্ত্রী। এরা প্রত্যেকেই সামরিক বাহিনীর সাবেক কর্মকর্তা। আফগানিস্তানে আরো সেনা পাঠানোর পরিকল্পনা এদেরই। মধ্য জুলাইয়েই এই পরিকল্পনা তৈরি করা হয়। তবে ট্রাম্প এতে সম্মত ছিলেন না। কিন্তু তার জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টারা তাকে আফগানিস্তানে সেনা প্রেরণের বিষয়টি এমনভাবে বুঝিয়েছেন যে, ট্রাম্প একেবারে ইউটার্ন নিয়ে এখন আফগানিস্তান থেকে সেনা প্রত্যাহারের পরিবর্তে সেনা প্রেরণের সিদ্ধান্ত নেন। এখন প্রশ্ন উঠেছে, আফগানিস্তানে নতুন করে যুক্তরাষ্ট্রের সেনা প্রেরণের অন্তর্নিহিত তাৎপর্য নিয়ে। অনেক আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকই এর কারণ অনুসন্ধানে নেমেছেন।
আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক পরিম-লে চীন, ভারত ও পাকিস্তান কেন্দ্রিক রাজনৈতিক ও সামরিক তৎপরতা বেশি পরিলতি হচ্ছে বিশ্বের প্রতিষ্ঠিত ও উদীয়মান শক্তিগুলোর মধ্যে। এই তৎপরতার পেছনে মূলত বেশ কয়েকটি কারণ ও উদ্দেশ্য কাজ করছে। এর মধ্যে প্রধান কারণগুলো হচ্ছেÑ ১. বিশ্ব মতার বলয়ে চীনের সামরিক ও অর্থনৈতিক শ্রেষ্ঠতায় দ্রুত উত্থান। ২. ভারতের স্বার্থ সংরণে এবং অভিন্ন দৃষ্টিকোণের আলোকে ভারত কর্তৃক যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের সাথে কৌশলগত সম্পর্ক। ৩. সুনির্দিষ্ট ল্য নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র, ন্যাটো ও ভারতের আফগানিস্তানে অবস্থান গ্রহণ। ৪. মুসলিম বিশ্বে ইসলামিক শক্তি হিসেবে পাকিস্তান ও ইরানের পারমাণবিক শক্তি অর্জন ও প্রযুক্তিগতভাবে খুব দ্রুত এগিয়ে যাওয়া। ৫. দণি ও মধ্য এশিয়ার বিপুল প্রাকৃতিক খনিজসম্পদের ওপর পশ্চিমাদের লোলুপ দৃষ্টি। ৬. চীন ও ভারতের কর্তৃত্বের দ্বন্দ্ব এবং ৭. আরব সাগর, ভারত মহাসাগর ও দণি চীন সাগরে কৌশলগত কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা।
উল্লেখিত কারণগুলোর কারণে এতদঞ্চলের রাষ্ট্রগুলো রাজনৈতিক ও সামরিক গাঁটছড়ার মাধ্যমে নয়া অবস্থান গ্রহণের দিকে ধাবিত হচ্ছে। চীনের সঙ্গে দ্বন্দ্বে জড়িয়ে ভারত যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের চেষ্টায় আছে। এই অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান মিত্র পাকিস্তানকে বলা হলেও এখন সে অবস্থা ফিকে হয়ে আসছে। এর প্রধান কারণ পাকিস্তানের সঙ্গে চীনের ঐতিহাসিক বন্ধুত্ব। দেশ দুটির এই বন্ধুত্বের কারণেই যুক্তরাষ্ট্র ভারতের দিকে ঝুঁকছে।
বিশ্ব মতার বলয়ে চীনের আবির্ভাব এশিয়া ও পশ্চিমা বিশ্বে সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলোর ঘুম হারাম করে দিয়েছে। জাপানকে টপকে বিশ্ব অর্থনীতিতে দ্বিতীয় শক্তি হিসাবে আবির্ভাবের পর অধুনা প্রথম স্থানটিও চীনের দখলে চলে আসবে বলে বিশেষজ্ঞদের অভিমত। যদিও প্রথম স্থানে থাকা যুক্তরাষ্ট্র পৃথিবীর মধ্যে সবচেয়ে ঋণগ্রস্ত দেশ হিসাবেও প্রথম স্থানের অধিকারী। সামরিক অনেক েেত্র যুক্তরাষ্ট্রকে টপকে যাওয়া চীন যুক্তরাষ্ট্রের ঘরের দেশ কিউবা, বলিভিয়া, ভেনিজুয়েলা ও অন্যান্য প্রতিবেশীদের সম্পর্কের বাহুডোরে যেভাবে বেঁধে ফেলছে ঠিক তেমনি ইউরোপ, এশিয়া ও আফ্রিকাতেও চলছে। রাজনৈতিক কারণে পাশ্চাত্য তৃতীয় বিশ্বের যেসব দেশে সাহায্য বন্ধ করে দিচ্ছে সেখানে সহায়তার হাত বাড়িয়ে দিচ্ছে চীন। বিচ্ছিন্নতাবাদ উসকে দিয়ে যেসব দেশ থেকে ফায়দা লুটছে সাম্রাজ্যবাদী দেশগুলো সেসব দেশকে চীন সামরিক ও অর্থনৈতিক সহায়তার মাধ্যমে বিচ্ছিন্নতাবাদ দমনে সচেষ্ট হচ্ছে। যার কারণে বিশ্বে প্রভাব প্রতিপত্তিতে মার্কিন ও পাশ্চাত্যের চুশূল হয়ে দাঁড়িয়েছে চীন। পাশাপাশি চীনের প্রতিবেশী ভারত তার প্রতিপরে তালিকায় পাকিস্তানকে দ্বিতীয় নাম্বারে সরিয়ে দিয়ে প্রথম স্থানে বসিয়েছে চীনকে। তাই চীনকে কাবু করার মানসে দণি এশিয়ার বৃহৎ দেশ ভারত সহযোগীদের সাথে নিয়ে দণি-পূর্ব এশিয়ায় পৃথিবীর তৃতীয় বৃহত্তম দেশ চীনকে মোকাবিলা করতে বলয় সৃষ্টির চেষ্টা করছে! ভারত ভালো করেই জানে একার পে চীনকে মোকাবিলা করা তার পে অসম্ভব এবং ভারতের দীর্ঘদিনের বন্ধু রাশিয়াকে চীনের বিরুদ্ধে কাজে লাগানো সম্ভব নয়। কারণ চীন ও রাশিয়া দ্বিপাকি ও আন্তর্জাতিক েেত্র দূরদৃষ্টি দিয়ে একটি নির্দিষ্ট ল্য নিয়ে এগোচ্ছে। যেখানে নিজস্ব স্বার্থ সংরণে ভারতের স্বার্থ দেখা রাশিয়ার কাছে গৌণ হয়ে দাঁড়ায় সময়ে সময়ে। তাই উপায়ান্তর না দেখে চীন, পাকিস্তান, আফগানিস্তান ও অন্যান্য উদ্দেশ্যকে ঘিরে একই মনোভাবাপন্নের দেশ যুক্তরাষ্ট্র, ইসরাইল ও পাশ্চাত্যকে বেছে নিয়েছে ভারত। আর সে জন্যই হয়ত একেবারে ইউটার্ন নিয়ে আফগানিস্তানে নতুন করে সেনা পাঠাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ট্রাম্পের আমলেই আফগানিস্তানে লাখ লাখ মার্কিন সৈন্যের উপস্থিতি ঘটবে বলে আশঙ্কা করছেন আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা। কারণ একটাই। ভারত, চীন ও পাকিস্তানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রের নয়া মেরুকরণের ইঙ্গিতই যে এতে পরিস্ফুটিত।