প্রতিবেদন

গরু মোটাতাজাকরণে সক্রিয় অসাধু সিন্ডিকেটের তৎপরতা কমেনি : ভয়াবহ স্বাস্থ্যঝুঁকির আশঙ্কা

নিজস্ব প্রতিবেদক : গত ঈদুল আজহায় গরু মোটাতাজাকরণে সক্রিয় ছিল বেশ কয়েকটি অসাধু সিন্ডিকেট। সরকারের বিভিন্ন পদক্ষেপের ফলে গরু মোটাতাজাকরণ সিন্ডিকেটের সক্রিয়তা কিছুটা কমলেও একেবারে বিলুপ্ত হয়নি। গতবারের মতো এবারও এই সিন্ডিকেট নিষিদ্ধ ডাইকোফেন ও স্টেরয়েড হরমোন প্রয়োগ করে পশু মোটাতাজা করছে। এতে একদিকে যেমন প্রাণীটি স্বাস্থ্যঝুঁকির মধ্যে পড়ছে, অন্য দিকে এ ধরনের মাংস ভক্ষণ করে মানুষের ভয়াবহ স্বাস্থ্যঝুঁকির আশঙ্কা রয়েছে। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা বলছেন, স্টেরয়েড হরমোন প্রয়োগ করা কৃত্রিম মোটাতাজা পশুর মাংস ভক্ষণ করলে মানুষ দীর্ঘমেয়াদে শুধু পঙ্গুত্ববরণই নয়, কিডনি, লিভার নষ্ট ও বন্ধ্যাত্বসহ বিভিন্ন জটিল রোগে আক্রান্ত হতে পারে।
সূত্র বলছে, লাভজনক হওয়ায় অন্যান্যবারের মতো এবারও গরু মোটাতাজাকরণের এই প্রবণতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। স্বল্প সময়ে গরু মোটাতাজা করতে খামারিদের হাতে তুলে দেয়া হচ্ছে বিষাক্ত রাসায়নিক। প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের ১১ কর্মকর্তার সিন্ডিকেট এসব রাসায়নিক বিক্রি করতে গড়ে তুলেছে ওষুধ কোম্পানি। কোরবানির ঈদ সামনে রেখে এগুলো বিক্রি করে শতকোটি টাকা হাতিয়ে নেয়ার মিশনে নেমেছেন এই ১১ কর্মকর্তা। অথচ গরু মোটাতাজা করায় বিষাক্ত রাসায়নিক ব্যবহার রোধে খামারিদের উপদেশ দেয়ার দায়িত্ব এই কর্মকর্তাদেরই।
জানা গেছে, প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের ১১ কর্মকর্তার এ সিন্ডিকেট বিষাক্ত রাসায়নিক বিক্রি করে শতকোটি টাকা হাতিয়ে নেয়ার টার্গেট নিয়ে মাঠে নেমেছেন। এ কর্মকর্তারা তাদের অধীন কর্মকর্তাদের মাধ্যমে সারাদেশে বিষাক্ত রাসায়নিক বিক্রির নেটওয়ার্ক তৈরি করেছেন। ১১ কর্মকর্তার সিন্ডিকেট কোরবানির ঈদের বাজার ধরতে হীরা অ্যানিমেল হেলথ কেয়ার, স্কাই অ্যাগ্রো ফার্মা, কাজিব ড্রাগস, সাইফ অ্যাগ্রোভেট বাংলাদেশ, কিউর লাইফ, গ্লোয়ার স্টক, আলফা অ্যাগ্রোভেট নামে ৭টি কোম্পানিও খুলেছে। রাজধানীর যাত্রাবাড়ী, খিলতে, রামপুরা, বাড্ডা, টঙ্গী, গাবতলী, সাভার, গাজীপুরের জয়দেবপুরে এসব কোম্পানির ওষুধ তৈরি হচ্ছে। এর বাইরে ময়মনসিংহ, যশোর, কুষ্টিয়া, সিরাজগঞ্জ, মেহেরপুর, মানিকগঞ্জ, রাজশাহী, খুলনা, গোপালগঞ্জ, ফরিদপুর ও মাদারীপুর এলাকায় এসব কোম্পানির সাব-অফিস থেকেও ওষুধ তৈরি করে বিক্রি করা হচ্ছে। অবৈধ এসব কারখানায় গরু মোটাতাজাকরণের ভেজাল ওষুধ ও ইনজেকশন তৈরি হচ্ছে। কয়েক বছর আগে লাইফ অ্যাগ্রোভেট বাংলাদেশ লিমিটেড নামে ঢাকার ডেমরা এলাকায় ওষুধ কারখানা গড়ে তোলা হয়। কাগজপত্রে কোম্পানির পরিচালক দেখানো হয় প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের ১১ কর্মকর্তার স্ত্রীদের। অথচ কোম্পানির অংশীদার ছিলেন ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদরের ভেটেরিনারি সার্জন ডা. আজিজুল হক, পশু গবেষণা ইনস্টিটিউটের ডা. ইজমাল কাওসার হাসান, রাজশাহীর ভেটেরিনারি সার্জন ডা. কাউসার আলী, ডা. নাজিমুল ইসলাম, ডা. লুৎফর রহমান, ডা. মকবুল হোসেন, ডা. আবদুল খালেক, ডা. ইকবাল, ডা. রিজভী, সাভারের শহীদুল্লাহ কাউছার ও ডা. হাসিন আহমেদ। এবারও এ কর্মকর্তারা বিষাক্ত রাসায়নিকের ব্যবসায় জড়িত আছেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র নিশ্চিত করেছে।
কোরবানির ঈদ সামনে রেখে প্রতি বছরই কৃত্রিমভাবে গরু মোটাতাজাকরণের ভয়ঙ্কর খেলায় মেতে ওঠে একশ্রেণির খামারি। ঈদের কিছুদিন আগে রোগাক্রান্ত ও শীর্ণকায় গরু অল্প টাকায় কিনে হরমোন, ইনজেকশন ও রাসায়নিক ওষুধ প্রয়োগ করে গরু মোটাতাজা করা হয়। বেশি মুনাফার লোভে অসাধু ব্যবসায়ীরা অতিরিক্ত ডোজ ব্যবহার করে ফুলিয়ে-ফঁাঁপিয়ে বড় করে গরুগুলো কোরবানির হাটে তোলে। এসব গরু ঈদের এক থেকে দুই সপ্তাহের মধ্যে জবাই না করলে মারা যায়। গরুর শরীরের পরতে পরতে ঢুকিয়ে দেয়া স্টেরয়েড, হরমোন কিংবা এর চেয়েও ভয়ঙ্কর রাসায়নিকের কারণে গরুর মৃত্যু হয়। এসব গরুর মাংস খেলে লিভার, কিডনি, হৃদযন্ত্র ও মস্তিষ্ক তিগ্রস্তসহ মারাত্মক রোগে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। প্রাণী বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নির্দিষ্ট ফর্মুলায় খাদ্য দিয়ে গরু মোটাতাজা করলে মাংস তির কারণ হয় না। তবে স্টেরয়েড দিয়ে মোটা করা গরুর মাংস জনস্বাস্থ্যের জন্য তিকর।
নিষিদ্ধ হলেও দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের দোকানে গরু মোটাতাজাকরণের এ ধরনের ওষুধ পাওয়া যাচ্ছে। প্রত্যন্ত অঞ্চলের মুদি দোকানেও বিক্রি হচ্ছে বিষাক্ত ওষুধ। অসাধু ব্যবসায়ী বা খামারিরা এসব দোকান থেকে সহজেই নিষিদ্ধ পণ্য কিনে গরুর শরীরে প্রয়োগ করছে। মাত্র ১ টাকায়ও ট্যাবলেট পাওয়া যায়। প্রেসক্রিপশন ছাড়া এসব ওষুধ বিক্রির নিয়ম না থাকলেও বিক্রি হচ্ছে দেদার।
বাজারে খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, নোভিটা গ্রুপের এডাম-৩৩ এবং অরাডেক্সন খামারিরা বেশি কেনে। ডেল্টা ফার্মার ডেকাট্রন বিক্রি হয় বেশি। এছাড়া রয়েছে নোভিটা কোম্পানির রোক্সডেক্স ইনজেকশন। একেকটি ইনজেকশন বিক্রি হয় ২৫ টাকায়। এছাড়াও রয়েছে ভারতীয় বিভিন্ন কোম্পানির ওষুধ। আগস্টের মাঝামাঝি পর্যন্ত বিজিবি দেশের বিভিন্ন সীমান্তপথে এসব ওষুধের অন্তত ৩০টি অবৈধ চালান আটক করেছে।
জানা গেছে, পাবনা, সিরাজগঞ্জ, কুষ্টিয়া, মেহেরপুর, চুয়াডাঙ্গা, রংপুর, দিনাজপুর, নীলফামারী, গাইবান্ধা, কুড়িগ্রাম, ঠাকুরগঁাঁও, পঞ্চগড়, মানিকগঞ্জ, ফরিদপুর, মাদারীপুর, ময়মনসিংহ ও ঢাকার আশপাশের এলাকাগুলোতে তিকর নানা ওষুধ ও রাসায়নিক প্রয়োগের মাধ্যমে গরু মোটাতাজা করা হয়। জনস্বাস্থ্যের জন্য বিপজ্জনক এমন গরু বাজারজাত রোধে এ বছর সরকারের প থেকেও আগের চেয়ে বেশি সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে।
ঈদুল আজহা গরুর মাংস খাওয়ার উৎসব নয়। এটি ইসলাম ধর্মের ইতিহাস ও ঐতিহ্যে লালিত অন্যতম তাৎপর্যপূর্ণ ধর্মীয় উৎসব, ত্যাগের মহিমায় ভাস্বর। ইসলাম ধর্মে সুস্থ ও সুন্দর পশু কোরবানি করার নির্দেশ রয়েছে। পশুস্বাস্থ্য এবং জনস্বাস্থ্যের কথা বিবেচনা না করে অত্যন্ত তিকর ওষুধ প্রয়োগের মাধ্যমে গরু মোটাতাজা করা একদিকে দেশীয় আইন এবং স্বাস্থ্যবিধি সম্মত নয়, অন্য দিকে ধর্মীয় অনুশাসন ও নির্দেশনা এ ধরনের কর্মকা- সমর্থন করে না। অবৈধ মাদক ও ওষুধ প্রয়োগে মোটাতাজা করা পশুর মাংস বিষাক্ত, যা দীর্ঘমেয়াদে মারাত্মক স্বাস্থ্য জটিলতা ও মৃত্যু ডেকে আনতে পারে। কোনো বিবেচনাতেই এ ধরনের তৎপরতা চলতে দেয়া যায় না। এ বিষয়ে মসজিদের ইমাম ও দেশের আলেম সমাজকেও ভূমিকা পালন করতে হবে। অবৈধ ওষুধের উৎস বন্ধ করতে হবে। গরু মোটাতাজাকরণ খামারগুলো এবং ওষুধ ও পশুখাদ্যের দোকানগুলোর ওপর স্বাস্থ্য বিভাগ, পশুসম্পদ অধিদপ্তর এবং ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের নজরদারি বাড়াতে হবে। স্টেরয়েড ও হরমোন প্রয়োগে মোটাতাজা করা গরু বিক্রি বন্ধ করতে প্রয়োজনে পশুর হাটগুলোতে গরুর স্বাস্থ্য পরীার কার্যকরী ব্যবস্থা রাখতে হবে। এসব গরু কেনা থেকে জনসাধারণকে বিরত রাখতে প্রয়োজনীয় প্রচারণা ও জনসচেতনতা গড়ে তোলার উদ্যোগ নিতে হবে সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগকে।